Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১৭ ফাল্গুন ১৪২৭, সোমবার ০১ মার্চ ২০২১, ৮:০৮ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

অস্তিত্ব সংকটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মাতৃভাষা


১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১ মঙ্গলবার, ০৩:২৯  পিএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


অস্তিত্ব সংকটে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মাতৃভাষা

বৃহত্তর সিলেটসহ বিভিন্ন স্থানে বসবাসরত নানা জাতিগোষ্ঠি ও ভাষাভাষির মানুষের মাতৃভাষা রয়েছে সংকটে। তাদের প্রত্যেকের আলাদা আলাদা বৈচিত্র্যপূর্ণ সংস্কৃতি, ইতিহাস, ধর্মীয় ঐতিহ্য, কৃষ্টি, প্রথা ও উৎসব বাঙালিদের মুগ্ধ করলেও নিজেদের নানা সমস্যার মধ্যে হারিয়ে যেতে বসেছে তাদের মাতৃভাষা। প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা কেন্দ্র ও সরকারি পৃষ্টপোষকতা না পাওয়ার কারণে তাদের মাতৃভাষা এবং নিজস্ব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি রয়েছে হুমকির মুখে। বাংলা ভাষার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষা রক্ষায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি সংশ্লিষ্টদের।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বৃহত্তর সিলেটে আদিবাসী তালিকায় খাসিয়া, গারো, ত্রিপুরা, মুন্ডা, সাওতাল, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরী, মৈতৈ মণিপুরীসহ ১৩টি সম্প্রদায় রয়েছে। এদের বাইরে চা বাগানে তেলেগু, রবিদাস, কৈরী সহ অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির বসবাস। চা বাগান আর পাহাড়ি টিলা বেষ্টিত তাদের অধিকাংশরা পাহাড়, টিলার পাদদেশে, বনজঙ্গলে কিংবা সমতল ভূমিতে মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে জীবন যাপন করছেন।

দেশে অর্থনৈতিকভাবে তাদের যথেষ্ট অবদান রয়েছে। তবে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমির অধিকার সহ জনগুরুত্বপূর্ণ সমস্যার পাশাপাশি নিজেদের মাতৃভাষাকেও হারাতে বসেছেন। নিজেদের প্রাতিষ্ঠানিক মাতৃভাষা চর্চাকেন্দ্র না থাকা, সরকারি পৃষ্টপোষকতার অভাব, বাড়িঘর সহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা ব্যবহার সব মিলিয়ে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জাতিগোষ্টির মাতৃভাষার অধিকার হারাচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

লাউয়াছড়া উদ্যানের সাজু খাসি জানান, আমার জানামতে মাগুরছড়া ও কালেঞ্জী পুঞ্জিতে বিদ্যালয় থাকলেও বইসহ নানা সংকট রয়েছে। অন্যান্য অনেক পুঞ্জিতে এধরণের সুবিধাটুকুও নেই। মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের মনিপুরী থিয়েটারের সভাপতি ও নাট্যকার শুভাশীষ সিনহা বলেন, বাংলা ও ইংরেজীতে শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হওয়ায় আমাদের মনিপুরীদের ভাষাও সংকটে রয়েছে। প্রাতিষ্ঠানিক বা একাডেমীক কোন চর্চার ব্যবস্থা না থাকলে আগামীতে আরও সংকটে পড়বে আমাদের মাতৃভাষা।

মণিপুরী আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সমরজিত সিংহ ও মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির জিডিসন প্রধান সুচিয়ান বলেন, প্রাতিষ্ঠানিক কিংবা একাডেমিক ব্যবস্থা না থাকার কারনে নিজস্ব কৃষ্টি, সংস্কৃতি হারিয়ে যেতে বসেছে। সরকারি পৃষ্টপোষকতা না পেলে এসব কৃষ্টি ও সংস্কৃতি অদূর ভবিষ্যতে হারিয়ে যাবে। বর্তমানেও সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির মাতৃভাষা। তাছাড়া প্রত্যেক সামাজিক, পারিবারিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিজস্ব ভাষা ব্যবহার করে আসছি।

লেখক-গবেষক আহমদ সিরাজ বলেন, সিলেট সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় ও ক্ষুদ্র ভাষাভাষির মানুষ আছে। আন্তজার্তিকভাবে স্বীকৃতি বাড়ার সাথে সাথে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠি তাদের নিজস্ব ভাষার প্রতিও দায়িত্ববোধ বেড়ে গেছে। অনেকেই নিজস্ব ভাষা চর্চা করেন না। ফলে বাংলা ভাষা তাদের গ্রাস করছে।

মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী ফিলা পত্মী বলেন, বৃহত্তর সিলেটের ৭০টি খাসিয়া পুঞ্জির মধ্যে হবিগঞ্জের আলীয়াছড়া ও জাফলং এর নকশিয়ার পুঞ্জিতে দু’টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া আর সরকারি কোন বিদ্যালয় নেই। তবে খাসিয়াদের চাঁদায় পরিচালিত হচ্ছে কয়েকটি কমিউনিটি বিদ্যালয়ে নিজস্ব ভাষা চর্চার চেষ্টা চলছে।

ডানকান ব্রাদার্স শমশেরনগর চা বাগানের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক অপূর্ব নারায়ন ও চা বাগান থেকে প্রকাশিত মাসিক চা মজদুর পত্রিকার সম্পাদক সীতারাম বীন বলেন, চা বাগানে আমাদের অসংখ্য ভাষাভাষির লোকদের মধ্যে বাংলা ভাষায়ই অধিকাংশরা কথা বলেন। নিজস্ব মাতৃভাষা কেউ ব্যবহার না করার কারনে এবং বাড়িঘরেও চর্চা না করার কারনে আমাদের মাতৃভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। এজন্য সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মাতৃভাষা চর্চা কেন্দ্র চালু করা প্রয়োজন বলে তারা মন্তব্য করেন।

প্রগতিশীল রাজনৈতিক কর্মী কবি শহীদ সাগ্নিক বলেন, সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসনকৃত সমাজ ব্যবস্থায় প্রত্যেক জাতিগোষ্ঠীর ভাষা হুমকির মুখে। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তের কবল থেকে মানুষ যেদিন মুক্ত হবে সেদিন প্রত্যেক সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ও মানুষের জীবন যাপন বিকশিত হয়ে উঠবে ও তাদের জাতীয় সংস্কৃতি স্বমহিমায় সমুজ্জ্বল হয়ে উঠবে।

কমলগঞ্জ সরকারি গণমহাবিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রভাষক দীপংকর শীল বলেন, ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠির লোকেরা তাদের মাতৃভাষা রক্ষায় আগের চেয়ে অনেক সচেতন। তবে সরকারিভাবে তাদের উৎসাহ প্রদান করলে তাদের মাতৃভাষা চর্চা ও বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।