ছবি: সংগৃহীত
নেপালের রাসুয়া জেলায় বুধবার আঘাত হানা এক শক্তিশালী আকস্মিক বন্যার পর নতুন করে আরেকটি ভয়াবহ বিপর্যয়ের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। কাঠমান্ডুভিত্তিক আন্তঃসরকারি সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ইন্টিগ্রেটেড মাউন্টেন ডেভেলপমেন্ট (ইসিমোড) জানিয়েছে, নেপাল-চীন সীমান্তের উজানে এখনও একটি বিশাল বাধা আটকে আছে। এর ফলে যেকোনো সময় দ্বিতীয় একটি জলোচ্ছ্বাস ধেয়ে আসতে পারে।
হিমালয় অঞ্চলের আটটি দেশ— ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং আফগানিস্তান নিয়ে কাজ করে ইসিমোড। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসিমোড হিমালয় জুড়ে পার্বত্য পরিবেশ, হিমবাহ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং দুর্যোগের ঝুঁকি নিয়ে গবেষণা করা শীর্ষস্থানীয় বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে একটি।
গত ২৬ আগস্ট ভোতে কোশি অববাহিকায় হঠাৎ করেই এই বন্যার সূত্রপাত হয়। স্থানীয় সময় সকাল ৯টার দিকে পানির স্তর দ্রুত বৃদ্ধি পেলে বিপুল পরিমাণ পানি, পলি ও পাথর ভোতে কোশি এবং ত্রিশূলী নদী দিয়ে নিচের দিকে নামতে শুরু করে। মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে গালছছিতে ত্রিশূলী নদীর পানির স্তর ৯ মিটার এবং মালেকুতে প্রায় ৭ মিটার পর্যন্ত বেড়ে যায়। এত অল্প সময়ে পানির এমন অস্বাভাবিক বৃদ্ধি উজান থেকে বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নির্গত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সম্ভাব্য প্রভাবের আশঙ্কায় ভাটির দিকের নুয়াকোট ও ধাদিং জেলার অন্যান্য এলাকাগুলোও বর্তমানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
ইসিমোডের সবচেয়ে জোরালো সতর্কতাটি এসেছে সংস্থাটির জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিভাগের প্রধান কিয়াংগং ঝাং-এর কাছ থেকে। তিনি বলেন, ‘গত বছরের রাসুয়ার বন্যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া একই স্থান আবারও হুমকির মুখে পড়েছে। লেন্দে খোলায় একটি বরফধস এর কারণ বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, তবে বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘নেপাল-চীন সীমান্তের উজানে এখনও একটি বাধা আটকে থাকায়, দ্বিতীয় একটি বন্যা আশঙ্কা রয়েছে। জিলং বন্দর এলাকা থেকে ইতোমধ্যেই মানুষ সরিয়ে নেওয়ার (ইভাকুয়েশন) নির্দেশ জারি করা হয়েছে।’
পার্বত্য অঞ্চলের ক্রায়োস্ফিয়ার অর্থাৎ হিমবাহ ও তুষারক্ষেত্র থেকে উদ্ভূত বিপদগুলোর বিষয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে এই ঘটনা।
ইসিমোডের দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস বিশেষজ্ঞ শাশ্বত সান্যাল জানান, লেন্দে খোলায় গত চৌদ্দ মাসে দুবার বন্যা হলো। ক্রায়োস্ফিয়ারের সামান্য একটি পরিবর্তন বা বিপদ কীভাবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই লোকালয়ে ভয়াবহ বন্যায় পরিণত হতে পারে, এটি তারই উদাহরণ।
সংস্থাটির সিনিয়র ক্রায়োস্ফিয়ার স্পেশালিস্ট মো. ফারুক আজম এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত চরম বিপদ মোকাবিলায় হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ ও সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন।
আজম বলেন, ‘ক্রায়োস্ফিয়ার বিপর্যয়ের ক্রমবর্ধমান মাত্রা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি দৃশ্যমান। এর গতি এত দ্রুত যে আমাদের চলমান প্রচেষ্টাগুলো এই দ্রুত পরিবর্তনের সাথে মানিয়ে নিতে সক্ষম হচ্ছে না। সরকারগুলোর উচিত এ ধরনের আন্তঃসীমান্ত বিপদ মোকাবিলায় কিছু যৌথ, সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।’
এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ে নেপালের সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা ও সংহতি প্রকাশ করেছেন ইসিমোডের মহাপরিচালক পেমা গ্যাম্তশো।
বর্তমানে বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট, সিসমিক ও হাইড্রোলজিক্যাল তথ্য বিশ্লেষণ করে উজানের সন্দেহভাজন বাধার স্থিতিশীলতা নির্ধারণে নিরলস কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে ভোতে কোশি ও ত্রিশূলী নদী ব্যবস্থার তীরের বাসিন্দাদের জন্য বিপদ এখনও পুরোপুরি কাটেনি বলে সতর্ক করেছে ইসিমোড।
উল্লেখ্য, নেপালে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬২ জনে দাঁড়িয়েছে। এ ঘটনায় ৪০৩ পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের মধ্যে ৩৪১ জনই বিদেশি নাগরিক। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
নেপালি পুলিশের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নিহতদের মধ্যে ৬৪ জনের মরদেহ চিতওয়ান জেলার ভাটির দিকের বিভিন্ন এলাকা থেকে এবং ২৬ জনের মরদেহ নাওয়ালপরাসি ইস্ট এলাকায় উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজদের মধ্যে ২৮ জন পুলিশ সদস্যও রয়েছেন।




