Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৬ আশ্বিন ১৪২৬, রবিবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১:৪৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

হুমায়ুন আজাদ ও হেলাল হাফিজের প্রেমের কবিতা: সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য


১৫ অক্টোবর ২০১৬ শনিবার, ১২:২৮  এএম

মুস্তাক মুহাম্মদ

বহুমাত্রিক.কম


হুমায়ুন আজাদ ও হেলাল হাফিজের প্রেমের কবিতা: সাদৃশ্য বৈসাদৃশ্য

একুশ শতকে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান দুই কবি হুমায়ূন আজাদ (১৯৪৭-২০০৪) এবং কবি হেলাল হাফিজ (১৯৪৮-)। যাদের কবিতা পড়ার সময় পাঠকের অন্তরাত্মা জেগে উঠে।

উপলব্ধিতে গভীর আঁচড় কাটে। প্রাণে প্রোথিত ভাব-ভাষা অলংকার উপমা রসে জীবনের গভীর অনুভতি সংবেদনশীলতার প্রকাশ করে কবিতার Fandamental দাবি Aesthetic এর সুপ্রকাশ, যা Classical ফর্মকে সম্পূর্নরূপে অনুসরণ করে তাঁদের কবিতা।

বিশুদ্ধ কবিতা বলতে যা বুঝি তাদের কবিতা তাই। রবি ঠাকুরের একটি বিখ্যাত গীতি কবিতার বলেছেন , “আমারো পরানো যা চাই তুমি তাই তাই গো” তেমনি উল্লেখিত কবিদ্বয়ের কবিতা। প্রেমের ক্ষেত্র ,প্রকাশ ভঙ্গি, রচনা শৈলী, আঙ্গিক বিন্যাসে সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্যর নান্দনিক উপস্থাপনা।

১৭৯৮ সালে ওয়ার্ডসওয়াথ এবং কোলরিজের Lilical Ballad প্রকাশের মাধ্যমে রোমান্টিক যুগ শুরু হলেও রোমঞ্চের আবেদন চিরকালীন। কল্পনা ব্যক্তিগত আবেগ অনুভূতিকে আরো গভীরভাবে প্রকাশ করে শেলী ও কীটস্।

বাংলা সাহিত্যে কালিদাসের ‘মেঘদূত’ কাব্যে প্রেমের অপূর্ব উপস্থাপনা দেখতে পাওয়া যায়। প্রেম ভালোবাসা কবিতার আদি Theme| বহু প্রকার প্রেমের মধ্যে বিশেষ করে নর ও নারীর প্রেম এমন কোনো মানুষ নেই তাতে আকর্ষণবোধ করেনি বা করে না।

প্রেমের এই রূপের তীব্র নান্দনিক প্রকাশ লক্ষ্য করা যায় হুমায়ূন আজাদ ও হেলাল হাফিজের কবিতায়। সে Theme নিয়ে দু’চার কথায় কম্পন তোলার অভিপ্রায় পোষণ করি। বড় প্রেমের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক বিরহ। বিরহ প্রেমকে স্থায়ী রূপ দান করে। কিন্তু এই স্থায়ী রূপ পেতে হলে অনেক তপস্যার প্রয়োজন হয়। অভিমান প্রেমের আর একটি অপরিহার্য উপাদান।

অভিমান করে প্রিয়র সাথে কোনো রকম যোগাযোগ না রাখলেও তার সম্পূর্ন সত্তা জুড়ে থাকে প্রিয়র উপস্থিতি। অস্থির প্রেমিক হৃদয় কত কিছু ভাবে। ভাবনার জালে থাকে বিগত দিনে অসংখ্য স্মৃতি; কষ্টের তীর বিদ্ধ করে। নিজের উপরে অভিমান বাড়ে। জীবনকে মূল্যহীন মনে হয়।

মনে হয় ভালোবাসাটা জীবনের সবচেয়ে ভুল। কত কিছু করলাম প্রিয়ার একটু হাসির জন্য।এমন কি অনেক কিছু ত্যাগ করেছি, করেছি অনেক সুযোগ হাত ছাড়া শুধু মাত্র প্রিয়র একটু হাসির জন্য। অস্থির মুহূর্তে মনে হয় যাক সবকিছু চলে। যাক জীবটা নষ্ট হয়ে। তবু সান্ত¡না প্রিয়ার জন্য এই কষ্ট, নষ্ট জীবন। এ পরিস্থিতে প্রিয়ার সবকিছু সহ্য ও মেনে নেওয়ার ক্ষমতা জন্মায়।

হেলাল হাফিজের শব্দের চিত্রায়ণে দেখি সেই রূপ-
“কোন কথাটা অষ্টপ্রহর কেবল বাজে মনের কানে
কোন স্মৃতিটা উস্কানি দেয় ভাসতে বলে প্রেমের বাণে
পত্র দিয়ো, পত্র দিয়ো।।
আর না হলে যত্ন করে ভুলেই যেয়ো, আপত্তি নেই।
গিয়ে থাকলে আমার গেছে, কার কী তাতে?
আমি না হয় ভালোবেসেই ভুল করেছি ভুল করেছি,
নষ্ট ফুলের পরাগ মেখে
পাঁচ দুপুরের নির্জনতা খুন করেছি, কী আসে যায়?

এক জীবনে কতোটা আর নষ্ট হবে,
এক মানবী কতোটা আর কষ্ট দেবে।” (প্রস্থান)

হেলাল হাফিজের যে কথা বলতে ভাবতে সময় লেগেছে তবু শেষে বলতে পেরেছে সমগ্র জীবনটা না হয় প্রিয়র জন্য উৎসর্গ করলাম। একটু Hesitation ক্রিয়াশীল আছে। কিন্তু হুমায়ুন আজাদের মধ্যে সে রূপ ছিল না। তিনি স্পষ্ট ঘোষণা করেছে একটি শৈল্পিক স্বপ্ন মেঘদল দুঃখর জন্য , প্রিয়ার ছোট একটি দীর্ঘশ্বাসের জন্য জীবন উৎসর্গ করতে প্রস্তুত তিনি । কত স্পষ্ট উদাত্ত ত্যাগের ঘোষণা পাই তাঁর কবিতায় -
“আমি সম্ভবত খুব ছোট্ট কিছুর জন্যে মারা যাবো
খুব ছোট একটি স্বপ্নের জন্য
খুব ছোট দুঃখের জন্যে
আমি হয়তো মারা যাবো কারো ঘুমের ভেতরে
একটি ছোট দীর্ঘশ্বাসের জন্যে
একফোঁটা সৌন্দর্যেও জন্যে।” (আমি সম্ভবত খুব ছোট কিছুর জন্য)

প্রেমের সবচেয়ে কমন বৈশিষ্ট্য প্রিয়াকে নিয়ে অবাস্তব আকাশ কুসুম স্বপ্ন দেখা। যা অলংকারও বলা যেতে পারে।বাংলাদেশের বেকার সমস্যা প্রবল। এছাড়া রয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সেশন জট। কর্মমুখি শিক্ষার অভাব। চাকুরীর ক্ষেত্রের অপ্রাচুর্যতা।শিক্ষিত তরুণদের প্রতিষ্ঠিত হতে কাঠ-খড় পোড়ানোর সাথে অনেক সময় ব্যয়িত হয়।যৌবনের যে কাল প্রেম-রোমাঞ্চের জন্য সবচেয়ে উপযোগী সেই সময়টা হারিয়ে ফেলে ক্যারিয়ারের পেছনে ছুটাছুটি করে। যুগ ধর্মের প্রভাব।

একদিকে যৌবনে প্রেম আসবে আসবেই এটা যেমন স্বাভাবিক তেমনি এই সময় বস্তুবাদী পৃথিবীটা উপেক্ষা করার সুযোগ থাকে না। ব্যাত্যয় হলে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে হয় । যা সচেতন আধুনিক মানুষ মাত্র কাম্য নয়।বস্তুর পেছনে ছুটতে ছুটতে এক সময় তা পরাজয় বরণ করে ,ধরা দেয়। তখন নিজের একটি সাজানো গোছানো আলাদা জগত হয়।কিন্তু মনের মানুষ আর থাকে না । যার জন্য এত সব তাকে হারায়েই সব পাওয়া।পাওয়া এবং না পাওয়ার এই দ্বন্ধ¦ নিয়ে হেলাল হাফিজের চিরন্তীয় বাণী-

“ইচ্ছে ছিল রাজা হবো
তোমাকে সাম্রাজ্ঞী করে সাম্রাজ্য বাড়াবো,
আজ দেখি রাজ্য আছে
রাজা আছে
ইচ্ছে আছে,
শুধু তুমি অন্য ঘরে।”(ইচ্ছে ছিলো)

সমস্ত দ্বিধা- দ্বন্ধ পেছনে ফেলে তবু এক সময় তিনি প্রেমে পড়ে খুন হতে পারেন সেই ঘোষণা দেন। তিনি প্রচলিত সমাজের রীতি-নীতিকে ভেঙেছেন গুপ্ত ঘাতকের মত। তা এক সময় তো প্রকাশ পেয়েছে।

যেমন- 
“ নারী তুমি শৈল্পিক তাবিজ,
এতোদিন নারী ও রমনীহীন ছিলাম বলেই ছিলো
দুঃখের আরেক নাম হেলাল হাফিজ।”(দুঃখের আরেক নাম)
অথবা
“ যদি কেউ ভালোবেসে খূনী হতে চান
তাই হয়ে যান
উৎকৃষ্ট সময় কিন্তু আজ বয়ে যায়।”(নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়)

যেখানে হেলাল হাফিজ সবকিছু বুঝেও কিছু করতে পারিনি, প্রিয়াকে কাছে রাখতে পারেনি সেখানে হুমাযুন আজাদ সফল।প্রেমকে সফল করার জন্য সবকিছু ত্যাগ করেছেন তার নায়িকা ।তিনিও প্রিয়ার য়ৌবনের ঊষালগ্নে যখন ভালবাসার মানুষ খুঁজতে গিয়ে অপ্রেমমূলক দেহজ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে কোনো রকম Hesitation ছাড়া সে সত্য বাস্তবকে স্বীকার করে নেন শুধুমাত্র প্রেমকে জয়ী করার জন্য।সেখানে সমাজ ছিল। তিনি সমাজকে ভেঙেছেন বুলটোজার দিয়ে।তার প্রিয়াও প্রচলিত রীতি-নীতিকে তুচ্ছ - বৃদ্ধাঙ্গুল দেখিয়ে দুঃসাহস নয় সাহসের পরিচয় দিয়েছে।খাঁটি প্রেমের চিরন্তন দাবীকে পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
প্রচলিত রীতিকে ভেঙে এই সংস্কারক লিখেছেন-

“শহর আর সভ্যতার ময়লা স্রোত ভেঙে তুমি যখন চৌরাস্তায় এসে
ধরবে আমার হাত,তখন তোমার মনে হবে এ শহর আর বিংশ শতাব্দীর
জীবন ও সভ্যতার নোংরা পানিতে একটি নীলিমা-ছোঁয়া মৃণালের শীর্ষে
তুমি ফুটে আছো এক নিষ্পাপ বিশুদ্ধ পদ্ম -
পবিত্র অজর।” (আমাকে ভালোবাসার পর)

প্রিয় যদিও অভিমানে সাময়িকভাবে দূরে সরে যায় অথবা বিরহ আসে তবু দু’জন দু’জনাকে ভুেেল থাকতে পারে না। স্মৃতিকে ভুলা যায় না। দেহের কোথাও ক্ষত/জখম হলে তা এক সময় শুকিয়ে গেলেও তার দাগ সারা জীবন বয়ে বেড়াতে হয়।তা কখনো মুছে ফেলা যায় না। সর্বদা সাথে থাকে। প্রেম হৃদয়ে চির জাগরুক থাকে। ভালবাসায় এক যন্ত্রণা থাকে যা ভালবাসার অলংকার সদৃশ।সে যন্ত্রণা মাঝে মাঝে এমন অসহ্য হয় যে বিরহ অনিবার্য হয়ে যায়। কিন্তু সে বিরহ সাময়িক।এ বিচ্ছেদ বহিরাবরণের ,নয় অন্দরের। হেলাল হাফিজ লিখেছেন-

“যদি যেতে চাও ,যাও
আমি পথ হবো চরণের তলে
না ছুঁয়ে তোমাকে ছোঁব
ফেরাবো না, পোড়াবোই হিমেল অনলে।” (অচল প্রেমের পদ্য- ১)
অথবা,
“ তোমার হাতে দিয়েছিলাম অথৈ সম্ভাবনা
তুমি কি আর অসাধারণ? তোমার যে যন্ত্রনা
খুব মামুলি,বেশ করেছো চতুর সুদর্শনা
আমার সাথে চুকিয়ে ফেলে চিকন বিড়ম্বনা।” ( অচল প্রেমের পদ্য - ৪)
যে প্রেম হৃদয়ে একবার স্থান করে নেয় তাকে কখনো ভোলা যায় না।হুমায়ুন আজাদও সহমত পোষণ করতে দেখি শব্দের অলংকারে।প্রিয়ার কাছে হৃদয় দিতে দিতে কখন সমস্ত হৃদয়টা দিয়ে দেয় তা প্রেমিক হৃদয় বুঝতে পারে না।কবি আজাদ লিখেছেন-
“তোমার পুষ্পের কলি মধুমদগন্ধময়,
সেখানে বিন্দু বিন্দু জমে আমার হৃদয়।’(গোলাপ ফোটাবো)


হৃদয়ে যখন ভালবাসা জাগে তখন দিন - রাতের হিসেব থাকে না। অস্থিরতা ঘিরে ধরে সবকিছুতে।প্রিয়াকে এক মুহূর্ত চোখের আড়ালে যেতে দিতে চায় না প্রেমিক। কোনো কাজে মন বসে না। সব কিছু কেমন এলোমেলো হয়ে যায়।সেই উদাসীন বেলায় শুধুমাত্র প্রিয়ার কোমল হাত স্থিরতা-প্রশান্তি দিতে পারে। নাটোরের বনলতা সেন যেমন হাজার বছরের ভ্রমণের ক্লান্তি দূর করে জীবনানন্দ দাসকে দু’দ- শান্তি দিয়েছিলো তেমনি হেলাল হাফিজ, আজাদের প্রিয়তমা এমনকি পৃথিবীর সব প্রিয়তমা সেই প্রশান্তি দেয়। হেলাল হাফিজ এবং হুমায়ুন আজাদ যথাক্রমে লিখেছেন-
“কেউ জানে না আমার কেন এমন হলো।
কেন আমার দিন কাটে না রাত কাটে না
রাত কাটে তো ভোর দেখি না
কেন আমার হাতের মাঝে হাত থাকে না
কেউ জানে না।

কেউ ডাকেনি তবু এলাম,বলতে এলাম ভালোবাসি।”(যাতায়াত)
অথবা,

“প্রিয়তমা , তুমি হাতখানি রাখো আমার গুমোট বুকে।
শুনতে পাচ্ছো শব্দ? কে যেনো হাতুরি ঠুকে চলছে?

উল্লাসে বিদ্বেষে নিরন্তর সে হাতুড়ি
ঠুকছে দুই হাতে,
কিছুতে ঘুমোতে পারছিনা আমি,
দিনে কিংবা রাতে।” (তুমি হাতখানি রাখো)

আধুনিক দুই মহারথি কাব্যে প্রেমের ক্ষেত্র, প্রকাশ ভঙ্গি, ধরণে সাদৃশ্যÑবৈসাদৃশ্য পরিলক্ষিত হলেও তা মূলত একই সূত্রে গাঁথা।প্রকৃত প্রেমের বিজয় গীতি গাওয়া মূলত তাঁদের লক্ষ্য।বাস্তবের সাথে প্রেমিক/প্রেমিকার দ্বগ্ধ যা চিরকালীন প্রথা। এই প্রথাকে ভেঙেচুরে তছনছ করেছেন তাঁরা।

আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে সমাজকে বৃদ্ধাঙ্গুল দেখায়ে প্রকৃত প্রেমকে সার্থক রূপদান করতে সচেষ্ট মহারথিদ্বয়।হেলাল হাফিজ সমাজের রীতি-নীতি মেনে প্রেমকে সার্থক করতে সচেষ্ট । আর হুমায়ুন আজাদ প্রচলিত প্রথাকে উপেক্ষা করে নতুন পথে প্রেমকে স্থায়ী করতে সচেষ্ট ছিলেন। বাঁধা আসবে এ কথা জেনেই তিনি প্রবলভাবে বিদ্রোহী।এ ক্ষেত্রে তিনি হেলাল হাফিজ থেকে স্বতন্ত্র। তবে উভয়ের পথ মত ও লক্ষ্য শাশ্বত প্রমে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।