Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩০ কার্তিক ১৪২৬, শুক্রবার ১৫ নভেম্বর ২০১৯, ৪:১৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

বড় মেয়ে


০৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বুধবার, ১২:০৪  পিএম

এ কে এম গোলাম কাওসার

বহুমাত্রিক.কম


বড় মেয়ে

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে এক বান্ধবীকে খুব খেয়াল করতাম। ওর নাম চাঁদনী। চাঁদমুখ না হলেও ক্যাম্পাস সুন্দরীদের তালিকায় প্রথমের দিকেই ছিল। দায়িত্ববোধের বেড়াজালে সর্বদা তটস্থ থাকতো। পাঁচ ভাই-বোনের পরিবারে সবার বড় হওয়ায় ছোট ভাই-বোনদের অনেক দায়িত্বই তাকে নিতে হয়েছে। পরিবারের প্রধান বাবা ছিলেন। এতোগুলো ছেলেমেয়ের সংসার চালানোর সক্ষমতা খুব একটা ছিল না। সংগত কারনেই বড় মেয়ের উপর বেশ চাপ পড়তো। ২০০১-০২ সালের দিকে পুরো মাস চালানোর জন্য পরিবার থেকে সে বড়জোড় ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা নিত।

বাকিটা শিক্ষকদের বাচ্চাকে পড়িয়ে, কোচিং এ ক্লাস নিয়ে চালাতে হতো। কখনো বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ তহবিল থেকে প্রাপ্ত সামান্য বৃত্তি, প্রতিমাসে প্রাপ্ত স্টিপেন্ড দিয়ে মাস চালাতে হতো। এসবের মধ্যেও পরিবার কখনো বিপদে পড়লে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে ধার করে পাঁঠাতে হতো। চাঁদনী পড়াশুনায় বরাবরই খুব ভালো ছিল। ক্লাস ফাইভে ট্যালেন্টফুলে বৃত্তি, ক্লাস এইটে বৃত্তি এবং এসএসসি ও এইচএসসি তে ভালো রেজাল্ট ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সেমিস্টারে ওর ভালো জিপিএ ছিল। গণিত খুব ভালো বুঝতো। পরীক্ষার সময় বন্ধু-বান্ধবরা বহু গণিত ওর কাছ থেকে বুঝে নিতো।

সবসময় পরিবারের চিন্তা ছিল চাঁদনীর। ছোট বোন দুইটার কোনটার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, কোনটার ভর্তি পরীক্ষা, ভাই-দুটার একটার পলিটেকনিকে ভর্তি, আরেকটার প্রাইভেট, মায়ের অসুখ, বাবার দোকানের ঋণ সহ বহু বিষয়ে ওর মাথা সর্বদাই ভারী থাকত। বন্ধু-বান্ধবদের সাথে গল্প-আড্ডাতেও ওর পরিবারের গল্পই থাকতো বেশী। আজকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছোট-বোনটা বাবার কাছে মোবাইল চেয়েছে, বাবা তো দিবে না, আমাকেই একটা ব্যবস্থা করতে হবে। আরেকজনের রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা ভালো হয় নাই, এখন মওলানা ভাসানী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষাটায় ভালো করতে হবে। আজকে মা ফোন দিছিল, তাকে নিয়ে চিন্তা করতে না করেছে। আজ ভাইটা পলিটেকনিকে প্রথম বর্ষের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে। আজ বাবা সব ছোট ভাই টাকে মেরেছে, স্কুল ফাকি দিয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়ার জন্য । এসব নিয়েই তার নিত্যদিনের পথচলা। এই নিত্যদিনের দায়িত্বপূর্ণ ব্যস্ত সময়গুলোতেও ওর জীবনে এসেছিল প্রেম। প্রেমিক বন্ধুকে সময় দেয়ার মতো নতুন দায়িত্বও নিতে হয়েছে তাকে।

প্রেমিক বন্ধুটিও তার ভালোবাসার মানুষের সাথে দায়িত্ব ভাগাভাগি করার চেষ্টা করেছিল বেশ। সম্পর্কের প্রথম বছরগুলো ভালোই কাটছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে আরো বেশী পারিবারিক দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে চাঁদনী তার প্রেমিক বন্ধুকে কম সময় দিচ্ছিল কিংবা কিছু ক্ষেত্রে অবহেলা করছিল, প্রেমিক সেটা মেনে নিতে পারে নি। সম্পর্ক শেষ করে চলে গেছে। চাঁদনী হয়তো নিজের ইচ্ছাতে এরকম করে নি। হয়তো ভেবেছে, আপন মানুষ শত কষ্ট পেলেও ছেড়ে যাবে না। হয়তো ফেরাতে চেয়েও অজানা অভিমানে আর ফেরানোর চেষ্টা করেনি। আবার হয়তো জীবনে এসেছে নতুন কেউ, তাকেও ধরে রাখতে পারেনি দায় ও দায়িত্বের কঠিন বাস্তবতায়।

এভাবে চলতে চলতেই চাঁদনী খুব ভালো একটা চাকুরী পায়। বেতন ভালো, স্ট্যাটাসও আছে। মাস শেষে প্রাপ্ত বেতনটুকু পরিবারের অন্যদের মুখে হাসি ফুটানোর জন্য ব্যয় করতে গিয়ে নিজের জন্য কিছুই করা হয়নি ওর। বিশ্ববিদ্যালয়ে যেমনে তিনটা/চারটা থ্রি-পিস দিয়ে ক্লাস, টিউশনি, বন্ধু-বান্ধবদের বার্থডে পার্টি সারতো, কোন সময় বান্ধবীদের কাছ থেকে ধার করা শাড়ী-গহনা দিয়ে পহেলা বৈশাখ, পহেলা ফালগুনের অনুষ্ঠানে যেত। এখনও ঠিক আগের মতোই। প্রয়োজনের জন্য যে কয়টা জরুরি সে কয়টাই।

শখ কিংবা বিলাসিতা করার সুযোগ হয় নাই। এসব করতে করতে একটা সময় আসে ছোটবোনদের পাত্রস্থ করার। এর আগে তো নিজের বিয়ে না হলে তো সমাজ বড় বোনের আগে ছোট বোনের বিয়ে নিয়ে কথা তুলবে। তাই শুধু পারিবারিক দায়বধ্যতার জেরে খুব তড়িঘড়ি করে বিয়ে করে চাঁদনী। ভাগ্যসহায় ছিল বলতে হবে। প্রতিষ্ঠিত ছেলে পেয়েছিল। নিজের বিয়ের পরে সবার সম্মতি নিয়ে বোনদের তাদের পছন্দসই পাত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছিল সে। নিজের জীবনে একজণ সঙ্গী পেয়ে আশা করেছিল দায়িত্বের কিছু অংশ বুঝি স্বামী বুঝে নিবে। পরিবারের বড় ছেলের মতো দায়িত্ব পালন করবে।

নিজের একটু স্বস্ত্বি হবে। কিন্তু হয়নি। দুজন দুজন কে বিয়ে করেছে পরিবার কিংবা সমাজের খাতিরে, ভালোবাসার খাতিরে নয়। ভালোবাসাটা ঠিক জমে ওঠার শুরু হয়েছে নতুন জটিলতা। স্বামী স্ত্রীর আয়ে ভাগ বসাতে চেয়েছে। যে চাঁদনী এপর্যন্ত শুধু পরিবারকেই নিয়েই ভেবেছে সেই পরিবারকে সে কিভাবে বঞ্চিত করবে? তাকে তো দু-পক্ষকেই ভালো রাখতে হবে। কোনটাকেই তো সে বাদ দিতে পারবে না। চাঁদনী যথেষ্ট বাস্তববাদী ও বিনয়ী একটি মেয়ে। সবকিছু মানিয়ে নেয়ার সক্ষমতা খুব ছিল ওর। ঠান্ডা মাথায় সব ঠিক করে নেয়ার চেষ্টা করছিল।

অনেক খাটা-খাটনীর পরে যখন চাঁদনী সবকিছুর একটা সম্মানজনক সমাধানের দিকে এগুচ্ছিল, ছোট ভাই-বোনেরা নিজেদের সুপথ বের করে নিচ্ছিল, পরিবারটা যখন একটু স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরছিল তখন ওর মা খুব বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ে। অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছিল ওর মাকে নিয়ে। কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। মারা গেলেন। খুব কষ্ট হয়েছিল চাঁদনীর। অনেক কেদেছিল সে। শত কষ্টের পরে মায়ের যখন একটুখানি সুখ ভোগ করার সময় সে সময় উনি চলে গেলেন। কি আর করার?

কেঁদে আর কি হবে? বড়দের কাঁদতে নেই। কষ্ট পেতে নেই। বড়রা যদি কাঁদে, কষ্ট পায়, তাহলে ছোটদের সান্তনা দিবে কে? চাঁদনীর দায়িত্ব আরো বেড়ে গেল। এখন মায়ের মতো ছোট ভাই-বোনদের আগলে রাখতে হবে। শত কষ্ট বুকে ধারন করে চাঁদনী আবার সোজা হয়ে দাড়িয়েছিল। বোনদুইটা এখন গ্রাজুয়েট, বোনরা তাদের প্রিয় মানুষগুলোর সাথে সংসার করছে। পলিটেকনিকের ছোট ভাইটা এখন একটা কোম্পানীতে চাকুরী করে। ছোট ভাইটা এখন কলেজে পড়ে। নিজের টিউশনি আর বড় বোনের পাঠানো টাকায় ভালোই কাটছে কলেজ জীবন । বাবা দোকানেই বসেন। সবাই বেশ ভালোই আছে।

সবার পথ মসৃণ করে মাঝে মধ্যে চাঁদনী যখন নিজের জন্য ভাবে, তখন দেখে তার সন্তুষ্টির খাতায় নিজের জন্য কিছুই নাই। নিজের একটা শখ কখনো পূরণ করা হয় নি তার। নিজের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তটা খুব কম ভেবেই নিয়েছে। সবাই নিজেদের ভালোবাসার মানুষগুলোকে কাছে পেয়েছে, সে পায় নাই। প্রেমিকবন্ধুগুলা কতই না ভালোবাসত তাকে। তাদের মধ্য থেকে কোন একজন কে বেছে নিতে পারতই সে। সারাজীবন চাঁদনীকে মাথার মুকুট করে রাখতো হয়তো। কতই না কষ্ট দিয়েছে তাদের। অবহেলা করেছে।

আজ সেই পুরানো ভালোবাসাগুলাকে খুবই মিস করে চাঁদনী। বার বার মনে হয়, কিছু ভুল হয়ে গেছে। একটু ভারসাম্য করার প্রয়োজন ছিল হয়তো। না হলে হয়তোবা ভালোবাসাহীন, আবেগহীন একটা সংসার থাকতো না চাঁদনীর। চাঁদনী ভাবে, এটাই তো তার প্রাপ্য ছিল, কারণ সে পরিবারের বড় মেয়ে।

সেপ্টেম্বর ২০১৯, চাপাইনবাবাগঞ্জ

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।