Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩১ বৈশাখ ১৪২৮, শুক্রবার ১৪ মে ২০২১, ২:০৪ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

বিজেপির কলকাতা জয়ের সম্ভাবনা কতটা? বিশ্লেষণে জয়ন্ত ঘোষাল


২৩ এপ্রিল ২০২১ শুক্রবার, ০১:১৬  পিএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


বিজেপির কলকাতা জয়ের সম্ভাবনা কতটা? বিশ্লেষণে জয়ন্ত ঘোষাল

‘কলকাতা’ নামক এই শহরটার মধ্যেই আছে অনেকগুলো কলকাতা। এক একটা কলকাতার স্বাদ এক একরকম। কোনো কলকাতার স্বাদ যদি একটু মিষ্টি হয়। কোনো কলকাতার স্বাদ একটু তেতোও হতে পারে। তবে এ কথাটা ঠিক কলকাতার রাজপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক সময় মনে হয়, যে আমাদের কলকাতা শহরে কী মুম্বই শহরের মতো বা দিল্লির মতো আরেকটু ঐশ্বর্য, আরেকটু প্রার্চুযের চিহ্ন শরীরে থাকলে ভালো হতো না ?

১৯৮৫ সালে প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী বলছিলেন, কলকাতা একটি মৃত শহর। তাতে তুলকালাম হয়ে গিয়েছিল। অনেক সমালোচনা। অনেক হইচই। তারপর রাজীব গান্ধীর সেই বক্তব্যকে মেরামত করার জন্য কংগ্রেসের নেতাদের ও সেই সময় প্রচুর কথা বলতে হয়েছিল। কিন্তু এই একটা ধারণা, যে কলকাতার মানুষের মাথায় বুদ্ধি আছে। কিন্তু মানিব্যাগে পয়সা নেই। পার্সটা খালি। এই ধারণাটা কী বদলানোর সময় আসেনি ? আর ঠিক এই জায়গাটা নিয়ে বিজেপি কিন্তু এবারের বিধানসভা নির্বাচনে কাজ করছে।

পশ্চিমবঙ্গে কলকাতায় আগে মোট আসনের সংখ্যা ছিল ২২টা। তারপরে ডিলিমিটেশন হয়ে যাওয়ার পরে সেই সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ১১টা। এই ১১টা আসনের মধ্যে টালিগঞ্জে ভোট হয়ে গেছে। কিন্তু এবারে কলকাতার বাকি আসনগুলোতে কী হবে সেটা অত‍্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। দেখার বিষয়। বিজেপির মূল প্রচারের বিষয়বস্তুটাই হচ্ছে, যে কলকাতা মৃতকল্প, যে কলকাতাকে আমরা সোনার বাংলা করবো, সোনার কলকাতা করবো। মনে করে দেখা যাক বিধান রায় মুখ‍্যমন্ত্রী। জ‍্যোতি বসু বিরোধী নেতা।

বিধানসভায় জ‍্যোতিবাবু বক্তৃতা দিতেন, যে ব্রিটিশ রাজধানী ছিল কলকাতা সেই ব্রিটিশ রাজধানী থেকে Flight up capital হয়ে গেল। অর্থাৎ পুঁজি চলে গেল। কেন চলে গেল ? বোম্বে হয়ে গেল বাণিজ্যিক রাজধানী। ১৯১১ সালে দিল্লি রাজনৈতিক রাজধানী হয়ে গেছিল। সুতরাং প্রথম থেকেই দিল্লির একটা অবিচার বাঙালির উপর পড়েছে। এটা একটা সাধারণ ভাবে অভিযোগ ছিল। এই অভিযোগ বিধান রায়েরও ছিল। নেহেরুর সঙ্গেও তাঁর যথেষ্ট মতপার্থক্য হয়েছিল। উদ্বাস্তু সমস্যার সমাধান নিয়েও যেভাবে পাঞ্জাবে উদ্বাস্তুদের সমস্যার সমাধান হয়েছিল, সেভাবে পশ্চিমবঙ্গে হয়নি এমন একটা সাধারণ ধারণা বাঙালিদের মনের মধ্যে রয়েছে। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গে কলকাতায় যে ঐশ্বর্য থাকার কথা ছিল, সেটা লুন্ঠন হয়ে গেছে।

এটা বাঙালির ডিএনএ তে আছে। এই কারণে বাঙালি র‍্যাডিকাল বাঙালি হয়ে গেল। কংগ্রেসের যখন পতন হল তখন জ‍্যোতিবাবুরা বললেন, আমরা পশ্চিমবঙ্গে উন্নতি নিয়ে আসবো। তার বদলে পশ্চিমবঙ্গে ‘নেহি চালেগা নেহি চালেগা’ হল। সিপিএম জমানায় আমরা নেতিবাচক রাজনীতি, ধংসাত্মক রাজনীতি দেখেছি। ট্রেড ইউনিয়ন, শিল্প ধর্মঘট, এইসব করতে গিয়ে একটা দীর্ঘ সময় ধরে জ‍্যোতিবাবুর সিপিএম পশ্চিমবঙ্গকে আরও আন্দোলনমুখী করলো। তার মধ্যে নকশাল আন্দোলন হয়ে পশ্চিমবঙ্গের মেরুদন্ডটার আরও ক্ষতি হল। তারপর জ‍্যোতিবাবুরা একটা সময় পর বুঝলেন, শিল্পায়নের পথে যেতে হবে।

তারা উন্নতি, উন্নয়ন এবং শিল্পায়নের কথা বলল। উন্নততর বামফ্রন্টের কথা বলা হল। কিন্তু বুদ্ধবাবু সামলাতে পারলেন না। বুদ্ধবাবু উন্নতি চেয়ে ছিলেন। কিন্তু তারপরে দেখা গেল নন্দীগ্ৰামে গুলি চলল। কলকাতার বাঙালিরা সিপিএমের অপশাসনের হাত থেকে বাংলাকে বাঁচানোর জন্য মমতাকে সমর্থন করেছিল। তা নাহলে শহুরে, উচ্চবিত্ত, এলিট, অভিজাত বাঙালিরা যে সবাই মমতার পক্ষে ছিল তা নয়। কিন্তু তারা মমতাকে এইজন্য সমর্থন করল যাতে সিপিএমকে দুর করা যায়। তা নাহলে মমতার আর্থ-সামাজিক অবস্থান এবং কলকাতার শহুরে বড়লোকদের এক ছিল না। আজ বিজেপি চেষ্টা করছে এবং অনেকদিন ধরে কলকাতার পাবলিক ইন্টেলেকচুয়ালদের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলা।

নাগরিক সমাজের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলা। মোহন ভাগবত সেই কবে কলকাতার বিভিন্ন বিশিষ্ট মানুষজনের সাথে দেখা করছেন। কখনো সম্পাদকের সঙ্গে দেখা করছেন। কখনো মিঠুন চক্রবর্তী, কখনো প্রসেনজিৎ, কখনো গায়ক অজয় চক্রবর্তী। তাদের বাড়িতে চলে যাচ্ছেন অমিত শাহ। এই যে জন-সম্পর্ক তৈরি করা। সৌরভ গাঙ্গুলিকে কাছে টানার চেষ্টা। এইসব কিন্তু কলকাতার হার্টলাইন টাকে মমতার হাত থেকে মুক্ত করার জন্য। যেটা সিপিএমের হাত থেকে মমতা পেয়েছিল। একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, কলকাতার আসনগুলো ট্রাডিশনালি কংগ্রেসের ছিল। যেটাকে আমরা গাই-বাছুরের কংগ্রেস বলতাম। সেই জায়গাটা থেকে গ্ৰামীন বাংলাটা সিপিএম আগে পেয়েছিল।

তারপরে জ‍্যোতিবাবু সাদা ধুতিপরা ভদ্রলোকের ভাবমূর্তি দিয়ে বিধান রায়ের কলকাতাকে, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসুর কলকাতাকে করায়াত্ত করেছিলেন। তারপরে মমতা গ্ৰামীন বাংলায় জনপ্রিয় হলেন। কিন্তু সাথে কলকাতা টাকেও দখল করলেন এবং ক্ষমতায় এলেন। এখন বিজেপি চেষ্টা করছে ঠিক একইভাবে যেভাবে সেদিন ভদ্রলোকেরা সিপিএম খ‍্যাদানোর জন্য মমতাকে পছন্দ করুন আর করুন সমর্থন করেছিল। এইবারে সবাই যে একেবারে হিন্দুত্ববাদী বিজেপি তা নয়। কিন্তু বাঙালির একটা বড় অংশ তারা বিজেপি কে সমর্থন করতে শুরু করেছে। তার একটা বড় কারণ হচ্ছে তারা মমতার হাত থেকে পরিত্রাণ চাইছে। সেটা বিজেপির প্রচারটাকে উস্কে দিয়ে তোলাবাজি, সিন্ডিকেট ইত্যাদি ইত্যাদি এবং মুসলিম তোষণ কেও একটা বড় ইস‍্যু করা হচ্ছে।

এই মুসলিম তোষণের জন্য হিন্দু বাঙালির ভদ্রলোক সম্প্রদায়ের মধ্যে একটা হিন্দুত্ববাদের একটা লুক্কায়িত চোরাস্রোত তৈরি করা। অর্থাৎ যেভাবে উত্তর ভারতের লোক ‘জয় শ্রীরাম’ বলে বিজেপি করে ঠিক তা নাও হতে পারে। কিন্তু মুসলিম তোষণের জন্য মমতাবিরোধী হয়ে এই হিন্দু বাঙালি বিজেপি কে ভোট দিতে পারে। সেটা উগ্ৰহিন্দু জাতীয়তাবাদ নয়। কিন্তু অনুপ্রবেশের প্রশ্নে বাংলাদেশীদের অত‍্যাধিক জনসংখ্যা বৃদ্ধি। এই সমস্ত নানান রকমের বিষয়ে একটা নাগরিক মতামত রয়েছে। সুতরাং সেইটাকে বিজেপি করায়াত্ত করতে চাইছে। এখানে একটা জিনিস মনে রাখতে হবে, যে ২০১৬ এ যখন বিধানসভা নির্বাচন হয়েছিল তখন কলকাতায় ১১টা আসনের মধ্যে তৃণমূল ১১টায় ১১টাই পেয়েছিল।

কংগ্রেস, বিজেপি, বামফ্রন্ট কেউ একটা আসনও পায়নি। কিন্তু ২০১৯ এ যখন লোকসভা হল তখন তৃণমূল পেল ৮টা আসন। আর বিজেপি বাকি ৩টে আসন পেয়েছিল। কংগ্রেস, বামফ্রন্ট ২০১৯। এও পায়নি। বিজেপি ২০১৯ এর লোকসভা নির্বাচনে যে ৩টে আসন কলকাতা থেকে লাভ করেছিল। সেটাকে বিজেপি গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে চায়। যেকারণে টালিগঞ্জে ভোট হয়ে গেছে। টালিগঞ্জে অরুপ বিশ্বাস প্রার্থী। কিন্তু ২০১৬ যখন ভোট হয়েছিল তখনও টালিগঞ্জে দেখা যাচ্ছে অরুপ বিশ্বাস জিতে ছিলেন কিন্তু বিজেপি একটা ভোট পেয়েছিল। এমন নয় যে পায়নি। সুতরাং সেই বেসটা বিজেপি মনে করছে তাদের আছে। সেই বেসটাকে ধরে তারা এগোতে চাইছে। কিন্তু সিপিএম অনেক বেশি ভোট পেয়েছিল।

যেমন টালিগঞ্জে ২০১৬ সালে মোট ভোটদাতা ছিল ২লক্ষ ৫৭ হাজার ৭০২ জন। তার মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের নেতা অরুপ বিশ্বাস পেয়েছিলেন ৯০ হাজার ৫০১ টা ভোট। সিপিএমের প্রার্থী এম.সেন রয় পেয়েছিলেন ৮০হাজার ৪৯৭ এবং বিজেপির এন.মোহন রাও পেয়েছিলেন ১৪ হাজার ৮৩৫। শিবসেনা মনোজিৎ মাইতি নামের একজন প্রার্থী দিয়েছিল। এবং ১ হাজার ৩২টা ভোট পেয়েছিল। এসইউসিআই এর রাজকুমার বসাক ছিল এবং ৫৭১টা ভোট পেয়েছিল। সুতরাং একটা জিনিস বোঝা যাচ্ছে, যে অরুপ বিশ্বাস এবং সিপিএমের মধ্যে তফাৎ সেই ভোটের ফারাক বিরাট ছিল না। যদিও বিজেপি ওখানে তখন ১৪ হাজার ৮৩৫ টা ভোট পেয়েছিল। এখন এই জায়গাটায় সেই রকম ভাবে বিজেপি পরিস্থিতি টাকে উন্নত করতে চেষ্টা করছে। আবার আরেকটা বড় ফ‍্যাক্টর। সেটা হল বাঙালি-অবাঙালি।

এবারে যেহেতু আউটসাইডার টাকে মমতা ইস‍্যু করেছে। সেহেতু এখানে যারা অবাঙালি ভোটার, যারা হিন্দি ভাষী আছে। সেনসাস রিপোর্ট অনুযায়ী কলকাতায় বাঙালির থেকে অবাঙালির সংখ্যা বেশি। অবাঙালি মানে মাড়োয়ারি শুধু নয়। পাঞ্জাবি শুধু নয়। বিহারী আছে। গুজরাটি আছে। সিন্ধি আছে। ননমাড়োয়ারি রাজস্থানী আছে। যেকারণে জোড়াসাঁকোতে এবারে স্মিতা বকসীকে প্রার্থী না করে মমতা বিবেক গুপ্তকে, যিনি একটি হিন্দি সংবাদপত্রের মালিককে প্রার্থী করেন। কেননা জোড়াসাঁকো বড়বাজারের কাছেই সেখানে যদিও বাঙালি ভোটার আছে। কিন্তু অবাঙালি ভোটার অনেক বেশি। এই অবাঙালি ভোটার যারা রয়েছে, তাদের মধ্যে বিজেপির ‘জয় শ্রীরাম’এর প্রভাব অনেকটা বেশি। সে ব‍্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। সেই কারণে মমতা বিবেক গুপ্ত কে হিন্দি অ্যাকাডেমির চেয়ারম্যান করেছে। হিন্দি জনসমাজের সঙ্গে যোগাযোগটা বিবেক গুপ্তর মাধ্যমে মমতা গড়ে তুলেছিলেন।

জোড়াসাঁকোয় ১৬৫ নং বিধানসভায় ভোটার ১ লক্ষ ৯৪ হাজার ৭৫৭ জন। সেখানে ২০১৬তে রাহুল সিনহা ৩৮ হাজার ৪৭৪ ভোট পেয়েছিলেন। এবং স্মিতা বকসী পেয়েছিলেন ৪৪ হাজার ৭৫৬। বিজেপি যে একদম ভোট পায়নি তাতো নয়। ওখানেও বিএসপি, আরজেডি, এসসিউসিআই, জেডিএস নানান রকমের অনেক নির্দল প্রার্থীও ছিল। সবাই কম-বেশি করে ভোট পেয়েছিল। আরজেডি তো ১৫ হাজার ৬২২ ভোট পেয়েছিল এই জোড়াসাঁকো কেন্দ্র থেকে। এখন এইবারে দেখার বিষয় বিজেপি এখানে কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারব। বিবেক গুপ্ত কে সেখানে পরাস্ত করতে পারবে কিনা।

বাঙালি-অবাঙালি এই ব‍্যাপারটার উল্টো জোড়াসাঁকোতে কুপ্রভাব মমতার জন্য পড়বে কিনা। তবে এখানে একটা জিনিস বিজেপি নেতারা বলছেন, মমতাকে ও আমরা আন্ডারএস্টিমেট করি না। কেননা মমতা রাহুল গান্ধী বা নবীন পট্টনায়ক নন। তিনি এখনো পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় নেত্রী। কলকাতা শহরে টলিউড এবং নাগরিক সমাজ এবং প্রচণ্ড শক্তিশালী ধর্মনিরপেক্ষ একটা বাহিনী ও কিন্তু বুদ্ধিজীবী দের মধ্যে আছে। অর্মত‍্য সেন যার পৃষ্ঠপোষক। অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ‍্যোপাধ‍্যায় তাঁর বড় শিষ্য। তাদের একটা বড় রাজনৈতিক পরিষর বাংলায় আছে। সবাই যে মমতার পক্ষে তা নন। কিন্তু যারা বিজেপিকে পরাস্ত করতে চায়, তারা সবাই এখন একটাও ভোট বিজেপি কে নয় এই প্রচারও করছে। এখন এইটাই দেখার, যে এই প্রচার এবং পাল্টা প্রচারের শেষ বেলায় কে জেতে আর কে হারে। সূত্র: কলকাতা২৪

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।