Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৭ শ্রাবণ ১৪২৬, মঙ্গলবার ২৩ জুলাই ২০১৯, ৫:৩৭ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

‘বাবাতন্ত্র’ আশামণির ভিন্ন আঙ্গিকের সমাজ পরিব্রজ্যা


০৬ জুলাই ২০১৯ শনিবার, ০২:১২  পিএম

রুদ্ধ অনির্বাণ

বহুমাত্রিক.কম


‘বাবাতন্ত্র’ আশামণির ভিন্ন আঙ্গিকের সমাজ পরিব্রজ্যা

বাবাতন্ত্র

আশামণি; চর্চা গ্রন্থ প্রকাশ; ইসলামী টাওয়ার, তৃতীয় তলা, ১১/১ বাংলা বাজার, ঢাকা-১১০০,
একুশে বইমেলা,২০১৮ খ্রিঃ; মূল্য: ২০০ টাকা 

১.

কবি আশামণি প্রগতিবাদি মানবতার পূজারী এবং সভ্যতার আলোকিত দিক নিয়ে চর্চাকারী একজন ব্যক্তিত্ব। তিনি তাঁর লেখনির মাঝে তুলে আনেন আমাদের সমাজের চারিদিকের নানান অনুষঙ্গ। এসব অনুষঙ্গে থাকে আবেগ-বাস্তবতার কঠিন কষাঘাত এবং সমাজের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা দৃশ্যপট। তিনি মূলত: কবিতার লোক হলেও ছোট গল্প,উপন্যাস ও প্রবন্ধ লেখায়ও সিদ্ধহস্ত। আপন মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা অনেক কথা-আবেগ-দ্রোহ ও প্রতিবাদের কথা আমরা অনেকেই প্রকাশ করতে পারি না-গুছিয়ে বলতে পারি না। বিশেষত: নারীর প্রতি পুরুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণ এবং আমাদের সমাজের পুরুষতন্দ্রের ভয়াল থাবা নিয়ে নারী সমাজ অনেকক্ষেত্রে সচেতন নয়। আশা মণি আমাদের অনেকের মনের ভেতর লুকিয়ে থাকা এই না বলা দ্রোহ-আবেগ-প্রতিবাদ ও অবদমিত মনের ভাব প্রকাশ করে চলেছেন তার লেখনির মাধ্যমে। চেষ্টা করছেন নারীকে জাগরিত করতে তার আত্মশক্তিতে। মুখোশ উন্মোচন করতে পুরুষতন্দ্রের। সাম্প্রতিক সময়ে তাঁর এ ধরনের দুটি উপন্যাস প্রকাশিত হয়েছে ‘বাবাতন্ত্র’ ও ‘লাম্পট্য’ নামে। এ দুটো উপন্যাসই আমাদের সমাজের চলমান ‘সেলুলয়েড’ বলে মনে হবে বোদ্ধা পাঠকের মানসপটে।


২.
আশামণির ‘বাবতন্ত্র’ বইটি পড়ার পর এটি নিয়ে আলোচনা করতে অনুরুদ্ধ হয়েছি বলা যাবে না। আপমন মনের তাগিদ অনুভব করছি বই নিয়ে কিছু অনুভূতি প্রকাশ করার জন্য। সমালোচনা একটি শিল্প ও একটি দুরুহ কাজ। আমার মতো অর্বাচীন মানুষের পক্ষে সেটি করা অসম্ভব বলেই আমি ও পথে না গিয়ে একজন পাঠক হিসেবে ‘বাবাতন্ত্র’ নামক একটি ‘চমৎকার’ সমাজ দলিলকে মূল্যায়ন করার অক্ষম চেষ্টা করতে প্রয়াসী। সুকুমার সেন বলেছিলেন, ‘সমালোকের আসল কাজ, লেখকের ও পাঠকের মধ্যে না বোঝার অন্তরাল যথাসাধ্য অপসারণ করা এবং রচনায় কোন মূল্য থাকিলে তাহাও পাঠকের গোঁচরে আনা। উঁচু সমালোচক হইলে তিনি রচনার মূল্য আবিস্কার করিতে পারেন। তখন সমালোচক ও ¯্রষ্টার মধ্যে পার্থক্য ঘুচিয়া যায়। বাঙ্গালা সাহিত্যে এই কাজে রবীন্দ্রনাথ একক ও অপ্রতিম।’ সুকুমার সেনের এই মহান আপ্তবাক্যটি মনে রেখে আমি কবি, ঔপন্যাসিক ও লেখক আশামণির অনবদ্য একটি উপন্যাস ‘বাবাতন্ত্র’কে মূল্যায়ন করতে চাই লেখক ও পাঠকের মাঝে সেতুবন্ধন সৃষ্টির মানসে।

৩.
‘বাবাতন্ত্র’ নামটি কেমন যেন একটি মিশ্র অনুভূতির দ্যোতনাদায়ক। ‘বাবা’ শব্দটি আমাদের মনের মাঝে যে আবেগ ভালোবাসার জন্ম দেয় সেটি অতুলনীয় কিন্তু এর সাথে যখন ‘তন্ত্র’ নামক একটি প্রত্যয় যোগ হয়, তখন আর এতে পেলবতা থাকে না-হয়ে যায় একটি জগদ্বল পাথরের মতো বিষয় যেটি আমাদের সমাজকে একটি ভিন্ন পথে পরিচালিত করে। আমরা জানি: বাবা শুধুমাত্র একজন মানুষ নন, ¯্রফে একটি সম্পর্কের নাম নয়। বাবার মাঝে জড়িয়ে আছে বিশালত্বের এক অদ্ভুত মায়াবী প্রকাশ। বাবা এই শব্দটি উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যে কোন বয়সী সন্তানের হৃদয়ে শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা আর ভালবাসার এক অনুভতি জাগে। বাবা কতভাবে অবদান রেখে যান সন্তানের জন্য তার চুলচেরা হিসাব কেউ বের করতে পারবেন না। বাবার কাঁধটা মনে হয় অন্য সবার চেয়ে চওড়া । না হলে কী করে সমাজ সংসারে এত দায়ভার বয়ে বেড়ান। বাবার পা বোধহয় অন্য সবার চেয়ে অনেক বেশি দ্রুত চলে। না হলে এতোটা পথ এত অল্প সময়ে কি করে অতিক্রম করেন-এতো শক্ত করে সবকিছু আগলে রাখেন কী করে? আর বাবার ছায়া.. সেতো আমাদের নিরাপত্তার চাদর হয়ে থাকে সারাটি জীবন।

বাবা শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের সকলের সামনে আবির্ভূত হন এমন একজন ব্যক্তি যিনি তাঁর আদর্শিক চেতনার মশাল তুলে দেন সন্তানের হাতে বন্ধু-অভিভাবক ও পথ-নির্দেশক (Friend-Philosopher-Guide) হিসেবে। এ জন্যই বোধহয় শাস্ত্রীয় বাণীতে সগর্বে ধ্বনিত হয়-


পিতা স্বর্গঃ পিতা ধর্মঃ পিতা হি পরমং তপঃ।
পিতরই প্রীতিমাপন্নে প্রীয়ন্তে সর্ব দেবতাঃ।

শাস্ত্রবচন থেকে আমরা আরও জেনেছি ‘ভূমের্গরীয়সী মাতা স্বর্গদুচ্চতরঃ পিতা।’ পিতা প্রকৃতপক্ষে স্বর্গের চেয়েও উচ্চতর। পিতার আদরে-ভালবাসায়-¯েœহে-ও আশ্রয়ে পরম শান্তি লাভ করে থাকি। পিতার নিরাপদ হাতের ছোয়ায় আমাদের শৈশব কাটে আনন্দে-পিতার বিশাল বক্ষে মুখ রেখে আমরা দুঃখ ভুলে জীবন চলার পথ আবিস্কার করি। বাবা শব্দটি উচ্চারণ করে আমরা সবাই শান্তি পাই, আশ্রয় পাই আর বাবাকে জড়িয়ে ধরে পরম নির্ভরতায়।

আমাদের প্রাত্যহিক জীবনের অভিজ্ঞতায় আমরা সন্তানেরা উপলব্দি করতে পারি যে, বাবা মানে-(১) সব আব্দারের এক অফুরন্ত ভা-ার; (২) ‘ভয় কীসের আমি তো আছি’ এ আশ্রয় বাক্য; (৩) নিজে কৃপণতা করে সন্তানের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চয় করা; (৪) শত অভাব অনটন থাকলেও সস্তানের উপর তার আঁচ লাগতে না দেওয়া; (৫) শত শাসন সত্বেও এক নিবিড় ভালবাসার নাম; (৬) সারাদিন কঠোর পরিশ্রমের পরেও হাসিমুখে বাড়ি ফেরা এবং (৭) পৃথিবীর সবচেয়ে আদর্শ এক জায়গা-তীর্থস্থান। এরই তো নাম বাবা।

কিন্তু ঔপন্যাসিক আশামণি ‘বাবা’ শব্দের সাথে ‘তন্ত্র’ যোগ করে যে জীবন বাস্তবতার কঠিন ছবি এঁকেছেন, সেখানে ‘বাবাতন্ত্র’ পুরুষতন্ত্রের প্রতিভূ হিসেবে আবির্ভুত হয়েছে। ‘তন্ত্র’ প্রত্যয়টি কোন একটি বিষয়ে সাথে যুক্ত হলে এর ভিন্ন একটি দ্যোতনা ফুটে ওঠে। আমরা ‘সমাজতন্ত্র’ ‘গণতন্ত্র’ বলতে যেমন একটি ইতিবাচক আন্দোলন দেখি, তদ্রুপ ‘একনায়কতন্ত্র’ ‘স্বৈরতন্দ্র’ ‘আমলাতন্ত্র’ বলতে আমাদের চোখের সামনে নেতিবাচক অবয়ব ফুটে উঠে। আশামণির ‘বাবাতন্ত্রে’ তাই ‘বাবা’ শব্দটির সাথে তন্ত্র যোগ হয়ে আমাদের সমাজ বাস্তবতার একটি পরিস্কার কলমি চিত্র তুলে ধরেছে আমাদের চোখের সামনে। ‘বাবাতন্ত্র’ এখানে চিত্রিত হয়েছে নারীর প্রতি পুরুষের চরম অবহেলার একটি চরমতম ফাঁসিকাষ্ঠ হিসেবে। এ দৃষ্টিকোণ থেকেই আমরা ‘বাবাতন্ত্র’কে নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।

৪.
‘বাবাতন্ত্র’ নামটি আমাদের চোখের সামনে একটি বিভ্রম সৃষ্টি করতে পারে। উপন্যাসটি হাতে নিলেই মনে হতে পারে এটি কী ধরনের উপন্যাস অথবা এর উপজীব্য কী? এ বিষয়ে আমরা লেখকের জবানী থেকে উত্তর পেতে পারি: ‘বাবাতন্ত্র কোন নিছক উপন্যাস নয়। যাপিত জীবনের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। আমাদের সমাজ সংসারে প্রতিনিয়ত যে দ্বন্দ্ব নিরন্তন বয়ে চলেছে নারী পুরুষের স্বার্থগত ও আদর্শিক প্রচ্ছদে, এর বহিঃপ্রকাশ ঘটছে আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয়, পেশাগত ও নেশাগত দ্যোতনায়। আমাদের যাপিত জীবনের দৈনন্দিন ঘটনা প্রবাহের টানাপোড়েনে আমার ক্ষুদ্র এ জীবনের চারিদিকে যে সব মানুষেরা বিমূর্ত অবয়ব থেকে মূর্ত অবয়বে এসেছেন ভাল মন্দে, আশা নিরাশায়,কদাকার চেহারায়, তাদের জীবনাঘাতের প্রতিবিম্ব নিয়ে এ উপন্যাসের রূপ পরিগ্রহ করা। কোন ব্যক্তির বিরুদ্ধে নয়, পুরুষতন্ত্র নামক একটি জগদ্বল পাথরসম সিস্টেমকে আঘাত করাই আমার উপন্যাসের উপজীব্য। ...পৃথিবীর সকল কন্যা সন্তান বাবাতন্ত্রের নাগপাশ থেকে মুক্ত হয়ে শোষণ ও বৈষম্যহীন পৃথিবী ও সমাজের আলোকিত নাগরিক হয়ে বিরাজ করুক-বাবাতন্ত্র উপন্যাসের গন্তব্যরেখা সেখানেই।’ ঔপন্যাসিকের এ ব্যাখ্যা ও তাঁর গন্তব্য আমাদের উপন্যাসের গভীরে যেতে উদ্বুদ্ধ করবে বলে আমরা বিশ^াস করি। এ আলোকেই আমরা ‘বাবাতন্ত্রের’ অন্দরে প্রবেশ করতে চাই।

৫.
‘একজন লেখক পাঠকের কথা চিন্তা করে লিখলে সেটি লেখা হয় না। লেখাটা লেখক তাঁর ভেতর থেকে লিখবেন। তবেই সেটা সাহিত্য হয়ে উঠবে।’ কথাটি বলেছেন প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়। আমরা ‘বাবাতন্ত্র’ উপন্যাসেও তাই দেখি আশা মণির কলম থেকে তাঁর ভেতরের কথাই ফুটে উঠেছে যা আমাদের সকলের কথা হয়েই উঠেছে। বিশেষত: যারা সমাজে সাম্য ও মৈত্রী চান, নারী ও পুরুষের ভেদাভেদহীনতা চান, চান আমাদের সন্তানেরা ছেলে ও মেয়ে হিসেবে নয়- মানুষ হিসেবে বেড়ে উঠবে,তাদের কাছে ‘বাবাতন্ত্র’ উপভোগ্য ও আনন্দদায়ক পাঠ হবে। কিন্তু পুরুষতন্দ্রের ধ্বজাধারী যারা আছেন সমাজে, যারা নারীক শুধুই পণ্য হিসেবে দেখতে চান, ভোগ্য হিসেবে কামনা করেন, তাদের কাছে ‘বাবাতন্ত্র’ একটি আবর্জনা ও জঞ্জাল হিসেবেই পরিগণিত হবে। আমরা ‘বাবাতন্ত্রের’ গন্তব্যরেখায় লেখিকার আশাবাদের জায়গায় স্থিত হতে চাই। আমরা চাই ‘বাবাতন্ত্র’ বাংলা সাহিত্যের অন্দরমহলে তার ভিন্নতার জন্য, নারীবাদীতা নয়-মানববাদিতার জন্য অনন্য অবস্থানে আসুক।

৬.
উপন্যাস জীবনের কথা বলে-সমাজের কথা বলে-আমাদের কথা বলে। তাই উপন্যাসের চরিত্রগুলো কাল্পনিক হলেও অবাস্তব নয়। বাবাতন্ত্রও আমাদের সমাজের একটি জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। যে চরিত্রগুলো এ উপন্যাসে চিত্রিত হয়েছে, তারা আমাদের পরিবারের ও সমাজের কুশীলব। গঙ্গোত্রী ও হিমাদ্রী আমাদের চারপাশের নায়ক নায়িকা। গঙ্গোত্রীর বাবা আলতাফ সাহেব, বোন মেঘনা, মা রেখা বেগম, ভাই পান্থ, বাবার বন্ধু রশিদ সাহেব, মামা এডভোকেট শফিকউ্িদন. পিয়ন অন্ত মিয়া, বান্ধবী অপরূপা, অপরূপার বাবা হাবিব সাহেব, অপরূপার প্রেমিক আরেফিন সিদ্দিক, বস তাহের উদ্দিন, রমেশ স্যার, প্রেমিকের দ্বারা প্রতারিত মেয়ে সূচি, আয়া মমতাজ, সংস্কৃতি সেবক স্বতন্ত্র বুলবুল,অপরূপার ভাই রূপম এবং ভ- ও প্রতারক নীলার্দ্রী-এরা ভিনগ্রহের কোন প্রাণী নয়-আমাদেরই চারপাশে ঘুরে বেড়ানো এক একটি জীবন প্রতিচ্ছবি। এদের কথাই আশামণি তুলে ধরেছেন তার ‘বাবাতন্ত্র’ উপন্যাসের প্রতিটি পাতায় দরদ দিয়ে-মনন দিয়ে-যুক্তির রংতুলিতে ভাবাবেগের নির্মোহ পরশে। কাব্যিক উপমায় বলা যেতে পারে: লেখিকার মনে সঞ্জিবনী সুধা হয়ে আছে সৃষ্টির প্রতি ‘ভালবাসা’ নামক মহার্ঘ্য বস্তুটি। প্রগতিশীল ও আলোকিত চেতনার বিশ্বাসে বিশ্বাসী হয়ে বিশ্বাসের রথে চড়ে বিশ্বাস নামক বিশ্বাসের ঘরে আশামণি দৃঢ়বিশ্বাস নিয়ে লিখেছেন ‘বাবাতন্ত্র’।

৭.
‘বাবাতন্ত্র’ একজন সংবেদনশীল পাঠককে আলোড়িত করবে বলেই আমার বিশ^াস। এর পাতায় পাতায় রয়েছে জীবনবোধের এক অনন্য জারক-কঠিন বাস্তবতার এক মোহনীয় মোড়ক। উপন্যাসের ভেতর আমরা উদ্বৃতিযোগ্য অনেক পংক্তি পাই যা আমাদের চারিদিকের জীবনযন্ত্রণার ও সমাজ বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে। কয়েকটি কোটেশন আমরা তুলে ধরছি: (১) ঊচ্ছৃঙ্খল পিতার সন্তান উচ্ছৃঙ্খল হবে, এটাই স্বাভাবিক। উল্টো হলে প্রকৃতির সংবিধান লংঘিত হয়-এটাই নিয়ম। (পৃ:১৫); (২) নৈতিকতা কেউ কাউকে শেখাতে পারে না। অনেক অনৈতিক বাবার সন্তানেরাও নৈতিকতার দৃষ্টান্ত হয়। আবার অনেক ভাল বাবার সন্তানও নর্দমার কীটের থেকেও নিকৃষ্ট মানুষ হয়। (পৃ:১৫); (৩) সন্তান বিপদগামী হবার পেছনে পরিবার বা পিতামাতার একটা ভূমিকা থাকে। (পৃ:১৮); (৪) মিথ্যাচারের ওপর ভিত্তি করে কোন সত্য প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। কাউকে বঞ্চনা করার চেয়ে আত্মবঞ্চনা শ্রেয়। (পৃ:৩৭); (৫) মানুষই হৃদয়হীন হয়। পশুপাখির যেহেতু হৃদয় নামক বস্তু নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। মানুষতো আর পশু নয়। তার উপর আবার মানুষের আগে পুরুষ শব্দটি লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। (পৃ:৫৪)। এভাবে জীবন পাথেয় হিসেবে গণ্য হতে পারে এ রকম অনেক আপ্তবাক্য উপন্যাসের মাঝে পাঠক খুঁজে পেতে পারেন।

৮.
নারী পুরুষের চিরন্তর সম্পর্কটি দ্বান্দ্বিক । এ দ্বান্দ্বিকতার ভেতর অনেক রসায়ন কাজ করে। সুপ্রাচীন কাল থেকেই ‘পুরুষ’ নামক একটি লৌহ কারাগার ‘নার’ী নামক পেলব সত্বাকে বন্দী করে রেখেছে। লেখিকার মানসপটে তাই চেতনায় উৎসারিত হয় পুরুষ নারীকে শাসন-শোষণ-বঞ্চনার যাতাকলে’ পিষ্ট করে ‘বাবা’ হয়ে,‘স্বামী’ হয়ে, ‘ভাই’ হয়ে, ‘বন্ধু’ হয়ে, ‘প্রেমিক’ হয়ে। মেয়ে হয়ে জন্মানোটা তাই নারীদের জন্য হয়ে দাঁড়ায় ‘জন্মই আমার আজন্ম পাপ’ হিসেবে। মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বঞ্চনা ও অবহেলার কথা লেখিকা তাঁর উপন্যাসের নায়িকা গঙ্গোত্রীর মা রেখা বেগমের জবানীকে এভাবে বলেন- ‘ অত মেয়ে মেয়ে বলে গর্ব করো না। কোন মেয়ে সন্তান জন্মানোর সময় তুমি খুশি ছিলে না। তোমার মতো লেখাপড়া জানা উচ্চশিক্ষিত মানুষ যে কতটা বর্বর হতে পারে সেটা আমি ভাল করে জানি। মেয়েরা লেখাপড়া শিখে মানুষ হয়েছে তাদের নিজ নিজ দায়িত্বে। তোমার অহংকার করার মতো কিছুই নেই। যে চেষ্টা তুমি ছেলে দুটো মানুষ করতে করেছো, তার ছিঁটেফোঁটা তুমি মেয়েদের বেলায় করোনি। তোমার কাছে মেয়ে ছিল যন্ত্রণার। এখন ওই যন্ত্রণা চুষে খেয়েইতো বেঁচে আছো। সারাজীবন শ্বশুরের দয়ায় বেঁচে ছিলে-বাকী জীবন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বাঁচতে হবে।’ (পৃ:২২)। স্বামীর প্রতি রেখা বেগমের বক্রোক্তি যেন সমাজের প্রতিটি নারীরই মনের কথা। আবার গঙ্গোত্রীর বান্ধবী অপরূপা যখন তাঁর স্বামীর কাছে প্রত্যাখ্যাত হয়ে প্রেমিক আরেফিন সিদ্দিক ও বস তাহের উদ্দিনের কাছেও শুধুমাত্র ভোগের সামগ্রী হয়, তখন অপরূপার সামনে পুরুষের প্রতি আর কোনো বিশ^াস ও আস্থা থাকে না। অপরূপা তাই বলে ওঠে: নারী মুক্তির সব দ্বারই রুদ্ধ। যা দেখছিস সবই বোগাস। এই বোগাস মিথ্যাচার শুরু হয় হারামজাদা পুরুষের ঔরসে জন্মানোর পর পরিবার থেকে। কোথায়ও মুক্তি নেই। নারী ছাড়া ওদের এক মুহূর্তও চলে না। অথচ শুয়ে গিয়েই বলবে, বেশ্যা। বাবার সংসারে একটা মেয়ে বঞ্চনার শিকার হতে হতে বেড়ে ওঠে। সমাজ, রাষ্ট্র ভিন্ন ভিন্ন ফর্মুলায় করে বঞ্চনা। নারীকে তো একসময় মানুষ বলে গণ্য করা হতো না।’

৯.
কবি আশামণি, লেখিকা আশামণি ও ঔপন্যাসিক আশা মণি তাঁর সকল সৃজনসম্ভারে একজন মানবতাবাদী-প্রগতিপন্থী। তিনি সমাজের আলোকিত দিকের কথা ভাবেন অন্ধকার দিকের অপসারণ চেয়ে। তাইতো তাঁর ‘বাবাতন্ত্র’ উপন্যাসে আমরা সমাজের ‘পুরুষ’ নামক একটি ঠুনকো অথচ অত্যাচারী ‘তন্ত্রে’র বিরুদ্ধে প্রতিবাদ দেখি। পুরুষতন্ত্রের সকল আবিলতা ও কদাচার ‘বাবাতন্দ্রে’ আমরা দেখতে পাই। ‘বাবাতন্ত্র’ একটি নিষ্ঠুর প্রত্যয়। এর বিপরীতে আশামণি শ্বাশত সুন্দর ও নৈতিকতার ধ্বজাধারী করতে চান মানুষকে। ‘পুরুষ’ খারাপ না ও হতে পারে কিন্তু ‘পুরুষতন্দ্র’ অবশ্যই খারাপ-‘বাবা’ প্রচ- ইতিবাচক কিন্তু ‘বাবাতন্ত্র’ নেতিবাচকতায় ভরপুর। এখানেই কবি আশামণির অনন্যতা। নায়ক হিমাদ্রী তাই সুন্দরের প্রতীক আর গঙ্গোত্রী প্রতিভাত হয় ‘মানবতা ও নৈতিকতার’ স্বরূপে। আমরা উপন্যাসের শেষের দিকে হিমার্দ্রী ও গঙ্গোত্রী বিচ্ছেদ দেখতে পাই। স্থল অর্থে বিচ্ছেদ হলেও এটি প্রকৃত অর্থে মিলন-মহামিলন। মিলন আদর্শের-মিলন ভালোবাসার-মিলন সমাজ প্রগতির। প্রকৃত ভালোবাসা নারী পুরুষকে উদার করে-উন্মুক্ত করে। তখন সে বিলিয়ে দেবার মধ্যে আনন্দ পায়। সততার ও নৈতিকতার মাঝে জীবনের সার্থকতা তুলে ধরে। গঙ্গোত্রীরা তাই হিমার্দ্রীদের ভালোবেসে বলতে পারে:

‘আমি কাউকে বঞ্চনা করতে শিখিনি। আশা করি তুমিও তাই। একটা অভ্যাস,অভ্যস্ততা সহজে ত্যাগ করা সত্যিই কঠিন। কিন্তু তুমি আমি আমাদের ক্ষেত্রে এটা ঠিক নয়। কারণ আমরা দুজনেই পরিণত। আমাকে ভুল বোঝো না। তোমাকে দিয়েই আমি আমার নারী জীবনে একটা পুরুষের অস্তিত্ব,প্রয়োজন প্রথম অনুভব করতে শিখেছিলাম। এছাড়া এ জীবনে কোনো পুরুষের প্রভাব আমার জীবনে নেই। নারী পুরুষের শ্বাশত সম্পর্ক প্রেম আমি তোমাকে দিয়েই অনুভব করেছিলাম। সব সম্পর্কের গন্তব্য থাকলেও সবাই সেখানে পৌঁছাতে পারে না। কাউকে না কাউকে আগেই থামতে হয়। কারণ মানুষ বিবেকহহীন নয়। দায়বদ্ধতা, জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েই জাগ্রত বিবেকবানেরা পথ চলে। এ জন্য তাদের চড়া মূল্যও দিতে হয়। ব্যক্তিসত্ত্বা তাদের কাছে মূখ্য নয়, ব্যক্তি সুখ দুঃখও নয়। তোমাকে নিয়ে আমি ঘর বাধার স্বপ্ন দেখেছিলাম মিথ্যে নয়। আবার স্বপ্নভগ্নের জন্য আমি দুঃখিতও নই। কারণ যার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য থাকে না, তারই থাকে অগণিত গন্তব্য। নির্দিষ্ট গন্তব্য আমাদের মতো মানুষদের থাকতে নেই। সবার জন্য সবকিছু নয়। কিছু মানুষ বিচ্ছিন্ন থেকেই নিভৃতে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে সর্বত্র। আর সন্তান নেই বলে পৃথিবীর তাবৎ শিশুই আমার সন্তান এটা যদি আমি মনে করি, তাতেও কারোর ক্ষািত নেই। তাই সকল স্থুলতা থেকে নিজেকে মুক্ত করে তোমাকে মুক্তি দিলাম। তোমার পূজায় আমি সেই ‘মুক্তি’কে নৈবেদ্য দিলাম। তুমি বন্ধন চেয়েছিলে, আমি তোমাকে ‘মুক্তি’ উৎসর্গ করলাম। বন্ধন যে খুবই সস্তা, সেটা আমার থেকে তুমি ভাল জানো।’ (পৃ: ৮৭-৮৮)।

১০.

আনোয়ার সৈযদ হক বলেছেন: লেখালেখি এক ধরনের মানসিক ব্যাধি। ওসিডি (অবসেসিভ কমপালসিভ ডিসঅর্ডার)। এই ধরনের রোগীরা একটা জিনিস নিয়ে করে বলতে থাকে, একই জিনিস বারবার করতে থাকে। কারও হয়তো মনে হয়, বাসা থেকে বেরিয়েছি, ঘরে তালা দেওয়া হয় নাই। তিনি বার বার ফিরে আসেন। দেখেন, তালা দেওয়া হয়েছে তো। কেউবা শুধু হাত ধোয়। বার বার করে হাত ধোয়। তারপরও মনে হয়, হাতে ময়লা লেগেই আছে। তো যার এই রোগ আছে, সে হয়তো একবার হাত ধুলো, দুইবার হাত ধুলো, পাঁচবারের পর মনে হলো, এবার পরিস্কার হয়েছে। সে শান্ত হলো, শান্তি পেল। কিন্তু কতক্ষণ আর। একটু পর সে আবার হাত ধুতে শুরু করল। লেখকেরাও এই রকম। একটা লেখা লিখে মনে হবে, হয়নি। আবার লিখতে হবে। আবারও লিখল। তারপর মনে হলো, না, হয়নি। আবার লিখল। একবার মনে হলো, হ্যাঁ, হয়েছে। খানিকক্ষণ শান্তি। কিন্তু সেও ক্ষণিকের। আবারও লিখতে শুরু করল। আশামণিও এ ধরনের একজন কর্মমূখর ব্যক্তি যিনি অনবরত জ্ঞানচর্চা করেন, লিখে চলেন মনের আবেগ ভালোবাসা নিয়ে। ‘বাবাতন্ত্র’ আমাদের চোখের সামনে একটি কঠিন বাস্তব চিত্র তুলে ধরেছে। আমরা যারা বাবা আছি বা যারা মা, তারা আমাদের কন্যা সন্তানদের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন সমাজ উপহার দিতে চাই। যেখানে বাবা নামক বটবৃক্ষ আমাদের ছায়া দেবে-আশ্রয় দেবে কিন্তু ‘বাবাতন্ত্র’ নামক ভারী পাথর আমাদের চাপা দেবে না। আশামণি আমাদের সে পথের দিশাই দেখিয়েছেন তার অনবদ্য উপন্যাস ‘বাবাতন্ত্রে’।

১১.
বর্তমানে আমরা একটি অস্বাভাবিক সমাজ বাস্তবতায় বসবাস করছি। প্রতিদিনের সংবাদপত্র খুললেই আমরা নারীর প্রতি সহিংসতার বিভিন্ন অবয়ব দেখতে পাই। নারী ধর্ষণ, খুন, পৈশাকিতায় অত্যাচার সব আমাদের অথর্ব করে দেয়। এর পেছনের কারণ হিসেবে আশামণি ‘বাবাতন্ত্র’কেই দায়ী করেন। ‘বাবাতন্ত্র’ তাই সমাজের জন্য কোনো কল্যাণকর উপাদান বয়ে আনে না-এই আক্ষেপ বাক্যের অপনোদনে আমরা যারা পুরুষ আছি তাদেরকে প্রকৃত বাবা হিসেবে আবির্ভুত হতে হবে ‘বাবাতন্ত্র’ নির্বাসনে দিয়ে।

জীবন ঘনিষ্ঠ একটি উপন্যাস ‘বাবাতন্ত্র’ লেখার জন্য আমরা কবি ও ঔপন্যাসিক লেখিকা আশামণিকে সাধুবাদ দিতেই পারি। অনেক পাঠক তাঁর উপন্যাসের সকল কথার সঙ্গে একমত হবেন না জানি কিন্তু উপন্যাসের মূল মেসেজ বা বার্তার সঙ্গে তারা দ্বিমত করতে পারবেন না। উপন্যাসের কোনো কোনো বিষয়ে আমাদের মনে খটকা লাগলেও সার্বিক বিচারে আশামণির নামের প্রথম অংশ ‘আশা’কে ধারণ করে আমরা আশা করতেই পারি তাঁর ‘বাবাতন্দ্র’ উপন্যাসটি আমাদের সমাজের সকল কন্যা সন্তানের জীবনে সার্থক কল্যাণ বয়ে আনবে ‘বাবা’ তথা ‘পুরুষ’দের মনোজগত আলোকিত করে। আমি উপন্যাসটির বহুল প্রচার-প্রসার ও আলোকন প্রত্যাশা করি।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক ও তুলনামূলক গবেষক।

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।