Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৯, সোমবার ০৫ ডিসেম্বর ২০২২, ২:৫১ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩২তম তিরোধান দিবসের উদ্বোধন


১৭ অক্টোবর ২০২২ সোমবার, ১১:৫১  পিএম

এসএম জামাল, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩২তম তিরোধান দিবসের উদ্বোধন

আওয়ামীলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক ও কুষ্টিয়া-৩ সদর আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ বলেছেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন ছিলেন সুফি সাধক, সুস্রষ্টা মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক চেতনার মানুষ। লালনের জীবদ্দশায় সমাজে অনেক জাত ছিলো। সেই সময়ে জাত, ধর্মীয় অনুশাসন, ধর্মের গোড়ামি ছিলো- তার বিরুদ্ধে তিনি কথা বলেছিলেন। তিনি ধর্ম, জাত, বর্ণ অনুসারে মানুষের ভেদাভেদে বিশ্বাস করতেন না। আমার দৃষ্টিতে তিনি মহামানব ছিলেন।

তিনি বলেন, বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ কোন ধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন না। তিনি জাতপাত বিশ্বাস না করে মানবতার কল্যাণে কাজ করে গেছেন।

সোমবার (১৭ অক্টোবর) সন্ধ্যায় কুষ্টিয়া লালন একাডেমিতে মরমী সাধক বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহের ১৩২তম তিরোধান দিবস-২০২২ উদযাপনের উদ্বোধনী ও আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, যার মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তেমন ছিলো না কিন্তু তার চিন্তা, চেতনা ও উন্নত দর্শন ছিলো মানবের জন্য, সমাজের জন্য এবং দেশের জন্য। লালন শাহ ছিলেন মানবতাবাদী, সুফি সাধক। তিনি অসাধারণ, অসাম্প্রদায়িক মানুষ ছিলেন। দুই হাজারের মতো গান লিখেছেন। সমাজ পরিবর্তনে মানবতার পক্ষে তিনি এসব গান গেয়ে গেছেন। এটা একটা অসাধারণ বিষয়।

তিনি বলেন, লালন বলেছেন- সব লোকে কয় লালন কী জাত সংসারে। লালন বলে জাতের কি রূপ দেখলাম না এই নজরে’। আসলে লালন সবসময় মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখেছেন। মানবতার কথা বলেছেন। মানুষে সকলে এক তিনি এই দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। সমাজে দেখবেন প্রতিযোগিতা হয় কেউ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যারিস্টার, উকিল, বড় সরকারি কর্মকর্তা হবে, অর্থ বিত্তশালী হবে। কেউ আদর্শ মানুষ হওয়ার জন্য কথা বলে না, চিন্তা করে না। কিন্তু লালন সেই আদর্শ মানুষ হওয়ার কথা বলেছেন। মানুষ মানুষের জন্য সেটি তার চিন্তা, দর্শনে প্রতিফলিত হয়েছে।

লালন বলেছেন, ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি’। এ পাখি হচ্ছে মনের পাখি। লালন বিশ্বাস করতেন সব মানুষের মধ্যে এক মনের মানুষ বাস করে। আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আসল মানুষ বের করে আনতে হবে। মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবে। মানুষকে আত্মশুদ্ধির মধ্য দিয়ে চিন্তা-চেতনার প্রসার করে আমরা সোনার মানুষ হতে পারি-যোগ করেন তিনি।

লোক সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়াচ্ছে উল্লেখ করে আওয়ামী লীগের এই জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, একসময় যে সমাজে সাম্প্রদায়িকতা ছিলো, ধর্মের গোড়ামি ছিলো আমরা তা থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু আবারো আমরা সেই সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। যে সমাজের বিরুদ্ধে জাতির পিতা লড়াই করেছিলেন। তিনি ধর্মনিরপেক্ষতা সম্পর্কে বলেছিলেন, ধর্ম যার যার, আমরা মানুষ হবো সবার। সেই কথাগুলো লালনও বলেছিলেন। দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় বাংলাদেশে একসময় জারি-সারি, লালন গানের প্রচলন ছিলো। লোক সংস্কৃতি হারিয়ে গেছে। আর আজ এসব হারিয়ে যাওয়ার কারণে, না থাকার কারণে সমাজে সাম্প্রদায়িকতার বীজ ছড়াচ্ছে।

হানিফ বলেন, অসাম্পদায়িক চেতনা নিয়ে আমরা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছি। যে অসাম্প্রদায়িক দেশের জন্য ৩০ লাখ মানুষ জীবন দিয়েছে, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি হয়েছে, যে বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন বঙ্গবন্ধু। এতো ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সেই বাংলাদেশে আজ সাম্প্রদায়িক ছোবল হানছে। এই সমাজকে নিয়ে সাম্প্রদায়িকতার দিকে নিয়ে যাচ্ছে একাত্তরে ধর্মের নামে গণহত্যা চালানো সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী। আজ স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি ও তাদের দোসররা আবারো মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।

লালন ভক্তদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, অসাম্প্রদায়িক চেতনার সমাজ গড়ার জন্য লড়াই করে দেশ স্বাধীন করেছি। সেই বাংলাদেশ আজ কোথায় চলে যাচ্ছে। প্রতিবছর আমরা একটা করে অনুষ্ঠান করি। এখানে অনেক কথা বলি, তার দর্শন, তত্ত্ব, চিন্তা-চেতনার কথা বলি। সেই চেতনার বাস্তবায়ন কোথায়। লালন ভক্তদের মাধ্যমে এই চেতনা সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। আমরা চাই লালনের দর্শনে সেই চেতনার মানুষ গড়ে উঠুক। লালনের দর্শন অনুযায়ী আমরা মানবতাবাদী, অসাম্প্রদায়িক মানুষ হবো। যারা লালনের বিশ্বাসী, যারা ধর্ম, জাতের মধ্যে নয় সাম্প্রদায়িকতার উর্দ্ধে উঠে আমরা লালনের দর্শন নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি এটাই কাম্য।

কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমীর সভাপতি মোহাম্মদ সাইদুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ব্যারিস্টার সেলিম আলতাফ জর্জ এমপি, আ. কা. ম. সরোয়ার জাহান এমপি, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার খাইরুল আলম, জেলা পরিষদ প্রশাসক রবিউল ইসলাম, জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী, কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) শারমিন আক্তার, জেলা আইনজীবি সমিতির সভাপতি এ্যাড. অনুপ কুমার নন্দী, কুষ্টিয়া সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি রাশেদুল ইসলাম বিপ্লব প্রমুখ। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-উপাচার্য মো. শাহিনুর রহমান।

অনুষ্ঠানের শুরুতেই আগত অতিথিদের কুষ্টিয়া লালন একাডেমীর পক্ষ থেকে ফুলের তোড়া, ক্রেস্ট ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক একতারা উপহার দিয়ে বরণ করে নেন।

তিন দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী দিনে লালন একাডেমী চত্বরে তিল ধারনের ঠাঁই ছিল না। কালী নদীর তীরে অবস্থিত উন্মুক্ত মঞ্চে প্রতিদিন লালন বিষয়ক আলোচনা, বিভিন্ন শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে লালনগীতি পরিবেশন এবং আখড়া বাড়ির বিশাল এলাকা জুড়ে বসেছে লালন মেলা। মাজারের অভ্যান্তরে আয়না মহলে চলছে সাধু-ভক্তদের লালনগীতি পরিবেশন। আলোচনা শেষে দ্বিতীয় পর্বে লালন মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পি ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সমন্বয়ে পরিবেশিত হয় লালন সংগীতি। স্থানীয় শিল্পীবৃন্দ লালন সঙ্গীত পরিবেশন করেন। গভীর রাত পর্যন্ত চলে এই সংগীত পরিবেশন। উৎসবকে ঘিরে পুরো একাডেমি চত্বরে খন্ড-খন্ড স্থানে গান পরিবেশনের সময় দর্শক-শ্রোতারাও নেচে-গেয়ে গানের সাথে সাথে তাল দেয়। দর্শক-শ্রোতারা কখনো পিন-পতন নীরবতায় গান শুনছেন আবার কখনো গানের তালের সাথে সাথে করতালি দিয়ে মুখর করে তুলছেন বাউল সম্রাট ফকির লালন শাহ’র আখড়াবাড়ীর আঙ্গীনা।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea

শিল্প-সংস্কৃতি -এর সর্বশেষ