Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১ আশ্বিন ১৪২৬, মঙ্গলবার ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১০:৩৮ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী শকুন মহাবিপন্ন


০৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯ শনিবার, ০৮:৫১  পিএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতাকর্মী শকুন মহাবিপন্ন

মৌলভীবাজার : গবাধি পশুসহ মৃত প্রাণী বা পচা-গলা ও বর্জ শকুনের খাবার। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে শকুনই প্রকৃতি হতে মৃত দেহ সরানোর কাজ করে রোগব্যাধী মুক্ত পরিবেশ সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। এজন্য শকুন প্রকৃতির পরিচ্ছন্নতা কর্মী কিংবা ঝাড়–দার হিসাবেই পরিচিত।

সারা বিশ্বে শকুনকে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচাতে প্রতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ১ম সপ্তাহের শনিবার আন্তজার্তিক শকুন সচেতনতা দিবস পালিত হচ্ছে। রেমা কালেঙ্গায় শকুনের কিছু অস্থিত্ব থাকলেও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে নেই কোন শকুন।

কয়েক দশক আগেও দেশের গ্রামগঞ্জে গরু, মহিষসহ গবাধি পশুর মৃত দেহ যেখানে ফেলা হতো দলে দলে হাজির হতো শকুন। প্রাণীর মৃত দেহের রোগ জীবানু মরে না। এগুলো সংক্রমিত হয়। শকুন এগুলো খেয়ে ফেললে রোগ বিস্তার রোধ হতো। শকুনের পেটে দ্রুত ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ায় দ্রুত তারা মৃত গবাধি পশুর মাংস খেয়ে সাবাড় করে দেয়।

তবে নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনে শকুনের আবাসস্থল বিনষ্ট আর গবাধি পশু চিকিৎসায় ‘ডাইক্লোফেনাক’ ও ‘কিটোপ্রোফেন’ দেয়া গরু, মহিষ, ছাগলের মৃত দেহ খেয়ে শকুনের কিডনী নষ্ট হয়ে অল্প সময়ের মধ্যে মারা যায়। তবে শকুন সংরক্ষণে গত কয়েক বছর ধরে দেশে ব্যাপক কার্যক্রম পরিলক্ষিত হচ্ছে।

বাংলাদেশে ৬ প্রজাতির শকুনের মধ্যে বাংলা শকুনটি-ই কোনমতে টিকে আছে। এদেশে বেশি দেখা যেত বলেই তাদের নামের শেষে বাংলা শব্দটি চলে এসেছে। দেশীয় প্রজাতির বাংলা শকুন ইংরেজী নাম ডযরঃব-ৎঁসঢ়বফ াঁষঃঁৎব। গবেষকদের মতে গত দু’দশকে ৯৯ দশমিক ৯ শতাংশ শকুন হারিয়ে গেছে। বর্তমানে শকুন মহাবিপন্নের তালিকায়। দেশে যে কয়েকটি শকুন আছে তাদের বেশির ভাগ সুন্দরবন এলাকায় এবং কয়েকটি দল হবিগঞ্জের রেমা কালেঙ্গা এলাকায় রয়েছে। এ কারনেই বাংলাদেশ সরকার ২০১৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর সিলেটের রেমা-কালেঙ্গা ও সুন্দরবনকে সেভ জুন ঘোষণা করে। সেভ জুন ঘোষণার পর থেকে শকুন সংরক্ষণ ও বৃদ্ধির বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।

সাধারণত লোকচক্ষুর আড়ালে বট, পাকুড়, অশ্বত্থ, ডুমুর প্রভুতি বিশালাকার গাছে এরা বাসা বাঁধে। গুহায়, গাছের কোটরে বা পর্বতের চুড়ায় ডিম পাড়ে। গবেষকদের তথ্য মতে, সারা বিশ্বে প্রায় ১৮ প্রজাতির শকুন দেখা যায়। দেশে ৬ প্রজাতির মধ্যে ২ প্রজাতি স্থায়ী আর অন্যরা পরিযায়ী। শকুন বা বাংলা শকুন ছাড়াও এতে রয়েছে রাজ শকুন, গ্রীফন শকুন বা ইউরেশীয় শকুন-হিমালয়ী শকুন, সরুঠোঁট শকুন, কালা শকুন ও ধলা শকুন। বাংলা শকুনের বৈজ্ঞানিক নাম জেপস বেঙ্গালেনসিস।

গলা লম্বা, লোমহীন মাথা ও গলা গাঢ় ধূসর। পশ্চাদেশের পালক সাদা। পা কালো। ডানা, পিঠ ও লেজ কালচে বাদামি। একই বাসা টিকটাক করে বছরের পর বছর ব্যবহার করে। সেপ্টেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত তাদের প্রজননকাল। ৪৫-৫০ দিনে ডিম ফোটে।

শকুন মহাবিপন্নের তালিকায় হলেও বর্তমানে বিশ্বব্যাপী শকুন সংরক্ষণ গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশ বনবিভাগ ও আইইউসিএন এর যৌথ উদ্যোগে শকুন সংরক্ষণে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। আইউসিএন এর তথ্য মতে, ২০১৪ সন থেকে এ পর্যন্ত মনিটরিং এ শকুন কমে নাই। বাচ্চা ফুটাচ্ছে। আইউসিএন এর মুখ্য গবেষক সারোয়ার আলম বলেন, ২০১৩ থেকে কার্যক্রমে এ পর্যন্ত শকুনের সংখ্যা কমেনি, বরং বৃদ্ধি পেয়েছে। ৬ বছরে মাত্র ৫টি শকুনের মৃত দেহ পাওয়া গেছে। তাছাড়া শকুন মারা যাওয়ার জন্য দায়ী ক্ষতিকর ঔষধও কমেছে ১০ শতাংশ এবং উপকারী ঔষধ বেড়েছে ১০ শতাংশ।

তিনি আরও বলেন, ২০১৪ সনে সার্ভে করাকালীন ২৬০টি শকুনের সংখ্যা পাওয়া যায়, বর্তমানে এটি দ্বিগুণের ছেয়েও বৃদ্ধি পেয়েছে। পরবর্তী সার্ভে করার সময় প্রকৃত সংখ্যা পাওয়া যাবে।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুনারুঘাটে রেমা কালেঙ্গায় আশি থেকে শতাধিক শকুন রয়েছে। এখানে বেশ কয়েকটি শকুনের বাসা এবং গত বছরে ৯টি বাচ্চা দিয়েছে। তাছাড়া এর আগেও ১৬টি বাচ্চা ফুটিয়েছে। বনবিভাগের হবিগঞ্জস্থ বিভাগীয় সহকারী বন সংরক্ষক আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বর্তমানে এখানে ১৫৬টির উপরে শকুন রয়েছে।

উঁচু গাছের উপরে নেট বসিয়ে দেয়ায় শকুন সেখানে বাসা বাঁধছে এবং বর্তমানে নতুন বাচ্চাও দেখা যাচ্ছে।

শকুন আমাদের প্রকৃতি ও পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পৃথিবীব্যাপী শকুন বিলুপ্ত হওয়ায় পরিবেশের ভারসাম্যহীনতার পাশাপাশি বিভিন্ন রোগ ব্যাধি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, শকুন না থাকার কারনে বাংলাদেশে অ্যানথ্রাক্স, যক্ষ্মা, ক্ষোরা রোগ ইত্যাদি ছড়িয়ে পড়ার এবং জলাত্মঙ্ক রোগ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শকুন বিলুপ্ত হওয়ার আরো বড় একটি কারণ বাসস্থানের অভাব। প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে উঠা বৃহদাকার বৃক্ষরাজিতে বসতি গড়তো শকুন। এই ধরণের বড় ও উচুঁ গাছগুলিতে শকুন বাসা বাঁধে। তবে কালের পরিক্রমায় বর্তমানে শকুনের বসতি তৈরী ও বিশ্রাম নেয়ার মতো গাছগুলো বিলীন হচ্ছে।

আইইউসিএন-এর সহযোগী সংগঠন বার্ডস্লিস্ট অর্গানাইজেশন উল্লেখ করেছে, কীটনাশক ও সারের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারের ফলে পানির দূষণ, খাদ্য সঙ্কট, কবিরাজি ঔষধ তৈরিতে শকুনের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ব্যবহার, বিমান-ট্রেনের সাথে সংঘর্ষ, ইউরিক এসিডের প্রভাবে বিভিন্ন রোগ, বাসস্থানের অভাব প্রভৃতি কারণে শকুন বিলুপ্ত হচ্ছে।

শকুন পরিবেশের জন্য খুবই উপকারী পাখি। অ্যানথ্রাক্স ব্যাকটেরিয়া, খুরা রোগ, গবাধি পশুর যক্ষ্মা, কলেরার জীবানু খুব সহজেই শকুন হজম করতে সক্ষম। তাই শকুনকে টিকিয়ে রাখতে ও প্রজনন বৃদ্ধি করা প্রয়োজন।

শ্রীমঙ্গলস্থ বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের বিভাগীয় সহকারী বন সংরক্ষন মো. আনিসুর রহমান বলেন, লাউয়াছড়া উদ্যানে কোন শকুন নেই। বন সংরক্ষক (কেন্দ্রিয় অঞ্চল) আর.এস.এম. মনিরুল ইসলাম বলেন, শকুন সচেতনতা দিবস হিসাবে ইতিপূর্বে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও খুলনায় দিবস পালন করা হয়েছে। এ বছর কাল রবিবার ঢাকায় পালন করা হবে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।