Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৪ আশ্বিন ১৪২৭, শনিবার ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১১:৩২ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

নেতাজি, ফিরে আসুন...


২৪ জানুয়ারি ২০২০ শুক্রবার, ০২:২০  পিএম

মেহেদী কাউসার ফরাজী

বহুমাত্রিক.কম


নেতাজি, ফিরে আসুন...

ব্যবসা করার উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডের ঈস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি জলপথে ভারতীয় উপমহাদেশে পদার্পণ করে। ভারতের সম্পদের প্রাচুর্য্যে লোভী হয়ে আর ভারতীয় জনতার সরলতার সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ক্রমেই ইংরেজরা বাংলা তথা ভারতীয় রাজনীতির দখল নেয়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর প্রান্তরে মীর জাফরের হৃদয়বিদারক বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা পরাজিত হন ইংরেজ সেনাপতি লর্ড ক্লাইভের নিকট। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হওয়ার পরবর্তী সময়ে এদেশীয় তোষামোদী, চাটুকার ও দেশদ্রোহী একটি শ্রেণীর সহযোগীতায় ১৯০ বছর এদেশ শাসন করে ইংরেজ রাজশক্তি।

যুগে যুগে ইংরেজ শাসনকে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়ে দেশমাতৃকার স্বাধীনতা অর্জনের পথকে সুগম করেছেন যেসব বীর বিপ্লবী, সুভাষ চন্দ্র বসু তাঁদের মধ্যে সাম্প্রতিক এবং অনন্য। ১৮৯৭ সালের ২৩ জানুয়ারি পিতার কর্মস্থল উড়িষ্যার কটক শহরে জন্ম নেয়া বাঙালি সুভাষই পরবর্তীতে নিজের কর্মগুণে হয়ে ঊঠেছিলেন তেত্রিশকোটি ভারতবাসীর প্রিয় ‘নেতাজি’।

শৈশবে ইংরেজ স্কুলে পড়াশোনা করা সুভাষ অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের ঘটমান বীরত্ব শিহরিত হয়েছেন, যৌবনে লোভনীয় আইসিএস অফিসারের চাকুরী ছেড়ে আত্মমর্যাদার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে স্বদেশী আন্দোলনের একজন যোগ্য নেতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। নিজের মেধা, দেশপ্রেম আর বীরত্বের গুণে ক্রমেই সমসাময়িকদের পেছনে ফেলে পৌঁছে গিয়েছেন সুউচ্চ স্থানে। স্বীয় দলের নেতাদের নীচু মানসিকতায় কাঁপন ধরিয়ে দিয়ে কংগ্রেসের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন পরপর দুইবার। ফলে, আত্মকেন্দ্রিক ও স্বার্থপর নতজানু নেতাদের বিরাগভাজন হয়ে বাধ্যতামূলক পদত্যাগ করেছেন, কিন্তু, থেমে যান নি।

এমন এক পরিস্থিতে নোবেলজয়ী বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯শে আগস্ট, ১৯৩৯ সালে কলকাতায় ‘মহাজাতি সদন’ (নামটি কবিরই দেওয়া)-এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন উপলক্ষে ‘দেশনায়ক’ শীর্ষক যে অবিস্মরণীয় ভাষণ প্রদান করেন তাতে তিনি বলেছিলেন, ‘‘সুভাষচন্দ্র, বাঙালী কবি আমি, বাংলাদেশের হয়ে তোমাকে দেশনায়কের পদে বরণ করি... বাংলাদেশের অদৃষ্টাকাশে দুর্যোগ আজ ঘণীভূত। নিজেদের মধ্যে দেখা দিয়েছে দুর্বলতা, বাইরে একত্র হয়েছে বিরুদ্ধশক্তি। আমাদের অর্থনীতিতে, কর্মনীতিতে, শ্রেয়োনীতিতে প্রকাশ পেয়েছে নানা ছিদ্র, আমাদের রাষ্ট্রনীতিতে হাল দাঁড়ে তালের মিল নেই। দুর্ভাগ্য যাদের বুদ্ধিকে অধিকার করে, জীর্ণ দেহে রোগের মতো — তাদের পেয়ে বসে ভেদবুদ্ধি; কাছের লোককে তারা দূরে ফেলে, আপনকে করে পর, শ্রদ্ধেয়কে করে অসম্মান, সপক্ষকে পিছন থেকে করতে থাকে বলহীন, যোগ্যতার জন্য সম্মানের বেদী স্থাপন করে যখন স্বজাতিকে বিশ্বের দৃষ্টি-সম্মুখে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে মান বাঁচাতে হবে তখন সেই বেদীর ভিত্তিতে ঈর্ষান্বিতের আত্মঘাতক মূঢ়তা নিন্দার ছিদ্র খনন করতে থাকে, নিজের প্রতি বিদ্বেষ করে শত্রুপক্ষের স্পর্ধাকে প্রবল করে তোলে।’’
উল্লেখ্য, এই অনুষ্ঠানের মাত্র এক সপ্তাহ পূর্বেই ১২ই আগস্ট (১৯৩৯) ওয়ার্ধায় অনুষ্ঠিত জাতীয় কংগ্রেসের ওয়ার্কিং কমিটির এক বৈঠকে সুভাষচন্দ্রের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা অবলম্বন করে যে প্রস্তাবটি গৃহীত হয় তা হলো, ‘‘গুরুতর নিয়ম-শৃঙ্খলা ভঙ্গের জন্য শ্রীযুক্ত সুভাষচন্দ্র বসুকে বঙ্গীয় প্রাদেশিক রাষ্ট্রীয় সমিতির সভাপতির পদের অযোগ্য বলিয়া ঘোষণা করা হইল এবং ১৯৩৯ সালের আগস্ট মাস হইতে তিন বৎসরের জন্য তিনি কোনো নির্বাচিত কংগ্রেস কমিটির সদস্য হইতে পারিবেন না।’’বিঃদ্রঃ-নেপাল মজুমদার, রবীন্দ্রনাথ ও সুভাষচন্দ্র, সারস্বত, ১৪০৩, পৃঃ ১২৪

কংগ্রেস থেকে বেরিয়ে নেতাজী গঠন করলেন ফরোয়ার্ড ব্লক নামক একটি দল। সুভাষচন্দ্র মনে করতেন গান্ধিজির অহিংসার নীতি ভারতের স্বাধীনতা আনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট নয়। এই কারণে তিনি সশস্ত্র বিদ্রোহের পক্ষপাতী ছিলেন। ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার দাবি জানাতে থাকেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনালগ্নে তিনি লুকিয়ে ভারত ত্যাগ করে দুর্গম পথ পেরিয়ে আফগানিস্তান, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জার্মানি ও জাপান ভ্রমণ করেন ভারতে ব্রিটিশদের আক্রমণ করার জন্য সহযোগিতা লাভের উদ্দেশ্যে।

জাপানের সহযোগিতায় তিনি ভারতীয় যুদ্ধবন্দি এবং ব্রিটিশ মালয়, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলে কর্মরত মজুরদের নিয়ে গঠিত বিপ্লবী রাসবিহারী বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজ পুনর্গঠন করেন এবং পরে তার নেতৃত্ব দান করেন। জাপানের আর্থিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তায় তিনি নির্বাসিত আজাদ হিন্দ সরকার প্রতিষ্ঠা করেন এবং আজাদ হিন্দ ফৌজের নেতৃত্বদান করে ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিরুদ্ধে ইম্ফল ও মায়ানমারে যুদ্ধ করেন।

নেতাজি “আজাদ হিন্দ সরকার” গঠন করলে বিশ্বের নয়টি দেশ স্বীকৃতি প্রদান করে। নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ সরকার আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের অধিকার পায় এবং মিজোরাম ও নাগাল্যান্ড দখল করে নেন। নেতাজিই সর্বপ্রথম কোন ভারতীয় ভূখন্ডে (পোর্ট ব্লেয়ার) জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন ১৯৪৩ সালের ৩০ ডিসেম্বর। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জাপান পরাজিত হলে আজাদ হিন্দ সরকার কোণঠাসা হয়ে পড়ে।

নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু ছিলেন আদর্শবাদী, কট্টরপন্থী ও বিপ্লবী নেতা। নীতির প্রশ্নে তিনি কখনও আপোষ করেননি। মহাত্মা গান্ধী-নেহেরু সহ অনেক সমসাময়িক নেতাদের সাথে তার আদর্শগত মিল ছিল না। ভারতের স্বাধীনতা লাভের পশ্চাতে কোনোমতেই নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অবদান ও সুস্পষ্ট ভূমিকা কোনোদিন মুছে ফেলা যাবে না। এর প্রমাণ ইংরেজ কূটনীতিকদের ঐতিহাসিক দলিলপত্র ও মন্তব্যতেই মেলে।

১৯৫৬ সালে কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি ফণীভূষণ চক্রবর্তী যখন অস্থায়ীভাবে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে কর্মরত তখন একরাতে রাজভবনের নৈশভোজনে তাঁর বিশেষ অতিথি ছিলেন ভারতের স্বাধীনতাকালে কর্মরত ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্স এ্যাটলি। কথা প্রসঙ্গে ফণীভূষণ চক্রবর্তী এ্যাটলিকে জিজ্ঞেস করেন যে, ইংরেজরা কেন যুদ্ধের পরেই এত হুড়োহুড়ি করে ভারত ছেড়ে বিদায় নিল? এ কি গান্ধীজীর ভয়ে? এ্যাটলি উত্তর করেছিলেন না। ‘ইট ওয়াজ ফর বোস’। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র মজুমদারকে এই তথ্য দিয়ে যান ফণীভূষণ চক্রবর্তী। (বিঃদ্রঃ রমেশচন্দ্র মজুমদার, জীবনের স্মৃতিদীপে, পৃঃ ২২৯)।

একই তথ্য আমাদের দিয়েছেন, ঐতিহাসিক বরুণ দে, দি টেলিগ্রাফ পত্রিকায় (৩০শে জানুয়ারি ২০০৭) প্রকাশিত তাঁর এক রচনা ‘Experiment with truth in a fractured land’-তে। বরুণ দে ১৯৬০ সালে যখন অক্সফোর্ডে গবেষণারত তখন তাঁর সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে এ্যাটলি সাহেব ওই একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছিলেন যে সুভাষ বোসের জন্যই ব্রিটিশদের তড়িঘড়ি ভারত ছাড়তে হয়। বস্তুতই সুভাষচন্দ্র যে আগুন জ্বালিয়ে ছিলেন, ইংরেজরা জানতো তার থেকে নিস্তার সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পাবে না।
বিশ বছরের রাজনৈতিক জীবনে সুভাষ চন্দ্র ১১ বার গ্রেফতার হয়েছিলেন। তাঁকে ভারত ও রেঙ্গুনের বিভিন্ন জায়গায় রাখা হয়েছিল। ১৯৩০ সালে তাঁকে ইউরোপে নির্বাসিত করা হয়। ১৯২১ থেকে ১৯৪১ পর্যন্ত দেশের মাটিতে (রেঙ্গুন ধরে) তিনি সর্বসাকুল্যে ছয় বছর জেল খেটেছেন, আর ১৯৪৫ পর্যন্ত প্রবাসে থাকতে বাধ্য হয়েছেন নয় বছরের বেশি। সর্বমোট ২৪ বছরের রাজনৈতিক জীবনে এই প্রকার আত্মত্যাগের কোনো নজির নেই।

বাঙালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নেতাজির আদর্শকে ধারণ করতেন। সেই পথ ধরে তিনি সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি জাতির নিজস্ব রাষ্ট্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা এনেছিলেন। নেতাজি’র আপোষহীন রাজনৈতিক আদর্শ ও দেশপ্রেম থেকে নতুন প্রজন্মকেও শিক্ষা নিতে হবে। নেতাজির জন্মদিনে আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি। একইসঙ্গে প্রিয় নেতাজির প্রতি সশ্রদ্ধ আহবান জানাই, বেঁচে থাকলে সশরীরে কিংবা ইতিহাসের চোরাগলি থেকে সত্য ঘটনা নিয়ে ফিরে আসুন। উপমহাদেশের কোটি জনতা আপনার ফিরে আসার অপেক্ষায়, প্রিয় নেতাজি...।

লেখক: সাবেক যুগ্ম-সম্পাদক, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্টস এসোসিয়েশন, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত। 

ইমেইল: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।