Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, সোমবার ০৯ ডিসেম্বর ২০১৯, ৫:৩৪ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

নারী: তুমি কতোটা পথ এগিয়েছো?


০৭ মে ২০১৯ মঙ্গলবার, ০৬:০৭  পিএম

ড. এ কে এম নুরুজ্জামান

বহুমাত্রিক.কম


নারী: তুমি কতোটা পথ এগিয়েছো?

নারী-কে ’মা’ হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিনিয়ত আমরা শ্রদ্ধায় অবনত হই। শৈশবকালে আমাদের জীবনাচরন ’মা’ ছাড়া অচল। বাস্তবতা হলো, পরবর্র্তীতে ’মা’ আস্তে আস্তে আমাদের থেকে দূরে চলে যায় বা আমরা দূরে ঠেলে দেই। পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহন প্রক্রিয়ায় এবং সম্পদের অভিগম্যতায় অন্যান্যদের প্রবেশ ঘটে। আমি যে ব্যক্তি আজকে দুকলম লিখছি, সে মানুষটি তৈরির অন্যতম কারিগর ‘মা’। সেই মায়ের আইনগতভাবে আমার সম্পদের উপর তাঁর তেমন আর কোন অধিকার থাকে না। আমাদের এ দেশের অধিকাংশ নারী শৈশবে বাবার, যৌবনে স্বামীর এবং পরিণত বয়সে সন্তানের ছত্রছায়ায় জীবনাপাত সমাপন করে। তাঁরা শুধু দিয়েই যায়। বাংলা ভাষায় আমরা একটি শব্দ প্রায়শ ব্যবহার করি-’মেয়েমানুষ’ - মূলত নারীকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য। পুরুষ হলে পারতো নারী বলে পারছে না-এ মনোভাব সমাজে এখনও অনেকক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। অবস্থা এ পর্যায়ে গিয়েছে এখন সরকারকে মায়ের ভরণপোষন নিশ্চিত করার জন্য আইন করতে হয়েছে।

আমাদের বেড়ে উঠা ও শিক্ষার ভিত্তি তৈরি হয়, প্রাথমিকভাবে আমাদের পরিবারে, তারপর শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে যেখানে আমরা বসবাস করি। এ সবগুলো প্রতিষ্ঠানের আন্তঃমিথক্রিয়ার ফলে আমাদের ভেতর তৈরি হয় মূল্যবোধ, নারী ও পুরুষের সম্পর্কের প্রেক্ষাপট। এ সম্পর্কের আগা-গোড়ায় মূলত পুরুষরাই প্রাধান্য পায়। ফলে এ মূল্যবোধ বেড়ে উঠে একপক্ষীয়তার, বহুমাত্রিকতায় নয়। তা এখন পরিবর্তনের দাবী রাখে। এ জন্য দরকার যথাযথ আইন প্রণয়ন, আইনের কার্যকর প্রয়োগ এবং সর্বোপরি সকল স্তরে সব সময় সর্ব স্থানে নারী অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো। অনেকের মতো আমিও মনে করি, নারী-পুরুষের অসমতার বিষয়টি মূলত দৃষ্টিভঙ্গি বা মানসিকতার দ্বন্দ। নারী উন্নয়ন সংক্রান্ত জাতিসংঘ কর্তৃক চিহ্নিত তিনটি সংকটের সাথে মানুসিকতার সংকটটি যোগ করে দেশের ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ প্রায়শ নারীদের উন্নয়নে চারটি সংকটের কথা উল্লেখ করেন এক. শিক্ষা, দুই. কর্মসংস্থান, তিন. নির্যাতন ও চার. মানসিকতা। এটির মূল অনেক গভীরে গ্রোথিত। মানব মূল্যবোধের বিষয়সমূহ একান্ত উপলব্ধি, প্রতিনিধিত্ব, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট প্রভৃতির সমন্বয়ে গঠিত জালিকার মত একটি আরেকটার সাথে স¤পৃক্ত। নারীর ক্ষমতায়ন তাই শুধু একক বিষয় নয়, এটি একটি সমন্বিত প্রয়াস। ধারাবাহিকভাবে পরিবার, সমাজ ও রাষ্টের প্রতিটি কর্মকা-ে নারী-পুরুষের সমতার বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। নারীর ক্ষমতায়ন বলতে শুধুমাত্র অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন বুঝায় না, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নকেও বুঝিয়ে থাকে।

এষড়নধষ এবহফবৎ এধঢ় জবঢ়ড়ৎঃ, ২০১৮ অনুযায়ী বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার সকল দেশের ওপরে। এ সাফল্যের পিছনে বাংলাদেশ সরকারের অনেকগুলো পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অনেকটাই নারী-বান্ধব। বাংলাদেশের সংবিধানের রাষ্ট্র ও জনজীবনের সর্বস্তরে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের বিষয়টি ধারা ২৮ (১)-(৩) এ ¯পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। বাংলাদেশের সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাঅনুসারে ২০২১ সালের মধ্যে এদেশ মধ্যম আয়ের একটি দেশে উন্নীত হওয়ার স্বপ্ন দেখে, যাকে আমরা বলে থাকি রূপকল্প-২০২১। এরই এক অন্যতম নির্দেশক ও চালিকা শক্তি হল অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ভাবে নারীর ক্ষমতায়ন। বাংলাদেশ সরকার জেন্ডার বৈষম্য দূরীকরণের মর্মে আইন,নীতিমালা, নির্দেশনা প্রস্তুত ও প্রচারের ব্যবস্থা করেছে। নারীদের প্রতি বৈষম্য দূরীকরণের জন্য নীতিগতভাবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চুক্তি ও সম্মেলনে সরকারি প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭৯ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের প্লাটফরম অফ একশন এর আওতায় আয়োজিত নারী বিষয়ক সম্মেলন `সিডো` যার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল ব্যক্তি ও জনজীবনে নারীর অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক কর্মকা-ে অংশগ্রহণের সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। বাংলাদেশ সরকার টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরই আলোকে অভীষ্ট-৫ এ উল্লিখিত নারী-পুরুষের সমতা অর্জনের লক্ষ্য সরকার `নারী ও উন্নয়ন`এর পরিবর্তে `উন্নয়নে নারী` ধারণাটি গ্রহণ করেছে। শিশু ও মায়ের স্বাস্থের নিরাপত্তার কথা ভেবে মার্তৃত্বকালীন ছুটি চার মাস থেকে বৃদ্ধি করে ছয় মাসে উন্নীত করা হয়েছে। পাসপোর্ট ও জন্মনিবন্ধনে ইতঃপূর্বে শুধু বাবার নাম থাকত, বর্তমানে মায়ের নাম লেখার প্রচলন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। জাতীয় সংসদ থেকে ‘পারিবারিক সহিংসতা (প্রতিরোধ ও সুরক্ষা ) আইন, ২০১০’ পাশ করা হয়েছে। উক্ত আইন সঠিকভাবে বাস্তবায়নের জন্য ‘পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ ও সুরক্ষা বিধিমালা, ২০১৩’ গৃহীত হয়েছে। বর্তমান সরকার কর্তৃক ‘মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২’ এবং ‘পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১২’ প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ৪০টি মন্ত্রণালয়ে জেন্ডার সেন্সেটিভ বিষয়ে বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য গ্রহণ করা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। যেমন: বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রসূতি ও দুগ্ধবতী মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ।এছাড়াও বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও সরকারি নীতিমালা বাস্তবায়নের জন্য ক্ষতিগ্রস্ত জনগণের জন্য রয়েছে ভিজিএফ কার্ড। এছাড়া নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ১০ শতাংশ এসএমই তহবিল ও ১০ শতাংশ শিল্প প্লটের কোঠা সংরক্ষণ করা হয়েছে। নারীদের পুনঃঅর্থায়নের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে ১৫ শতাংশ সংরক্ষিত তহবিল রয়েছে। নারীদের জন্য ক্ষুদ্র ও মধ্যম উদ্যোক্তা ঋণ হিসেবে ব্যক্তিগত জামিনের মাধ্যমে ২.৫ মিলিয়ন টাকা পর্যন্ত ঋণের সুযোগ রাখা হয়েছে। অধিকন্তু, সকল আর্থিক প্রতিষ্ঠান নারী উদ্যোক্তাদের সুবিধা সংরক্ষণের জন্য এককভাবে নিবেদিত ডেস্ক চালু করা হয়েছে। বর্তমানে ৩০ লাখের বেশি নারী শ্রমিক দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত রয়েছে। বাংলাদেশে দরিদ্রদের জন্য এনজিও কর্তৃক পরিচালিত ঋণ কার্যক্রমে ২০১৬-১৭ সালের হিসেব অনুসারে ঋণগ্রহীতার মোট সংখ্যা ছিল ৩৪ মিলিয়ন, যার মধ্যে ৩১ মিলিয়নই নারী ঋণগ্রহীতা। নারীর সামাজিক ক্ষমতায়নে গ্রামীণ, অসহায় ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্য সেবার সুবিধার্থে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা প্রত্যন্ত এলাকায় পৌঁছে দিতে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করা হয়েছে। জেলা পর্যায়ে স্থাপন করা হয়েছে নারী-বান্ধব মডেল হাসপাতাল, যেখানে অনেকটা বিনামূল্যেই পাওয়া যায় বিভিন্ন সেবা যেমন:প্রসব-পূর্ব তিনটি চেক-আপ, প্রসবকালীন সেবা ও প্রসব-উত্তরকালীন সেবা। নগর হাসপাতালগুলোতে অতিদরিদ্রদের জন্য বিশেষ ভাতার ব্যবস্থাও রয়েছে। ৬-১০ বছর বয়সী সকলের জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত নারী শিক্ষার্থীদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে। দেশের সাতটি বিভাগে ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার স্থাপনের মাধ্যমে চিকিৎসা, আইনগত সহায়তা প্রদান করা হয়ে থাকে। বিগত দুই দশকে মাতৃমৃত্যু হ্রাস পেয়েছে ৬৬%, যা প্রতিবছরে গড়ে প্রায় ৫.৫ শতাংশ। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত ৫টি নারী আসন থেকে বর্তমানে ৫০-এ উন্নীত করা হয়েছে। এছাড়া ইউনিয়ন কাউন্সিল, উপজেলা এবং পৌরসভায় জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত নারী সদস্য বা কাউন্সিলরদের সংখ্যা বৃদ্ধি করে এক-তৃতীয়াংশ করা হয়েছে। সরকারি চাকুরীর জন্য মোট আসন সংখ্যার বিপরীতে নারী কোটা সংরক্ষণ করা হচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধী দলীয় নেতা, ¯পীকার, উপনেতা সকলেই নারী। জাতীয় সংসদে নির্বাচিত নারী সদস্যদের মধ্য থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান ও পূর্ববর্তী ক্যাবিনেটে শিক্ষা, শ্রম, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, পরিবেশ, কৃষি, পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্র, মন্ত্রণালয়-এর নেতৃত্ব দান করেছেন নারী মন্ত্রীগণ। সারা দেশ থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচিত ১২ হাজার এর অধিক নারী জনসেবায় নিয়োজিত রয়েছেন। এক্ষেত্রে সরকারের উন্নয়ন সহযোগী হিসাবে পিকেএসএফ ইতোমধ্যে প্রতিবন্ধী নারী, হাওর ও নদী ভাঙ্গন এলাকার নারী, বেধে-দলিত, নারী ভিক্ষুকসহ দারিদ্র্য রেখার সর্বনি¤œ স্তরে থাকা অতিদরিদ্র জনগোষ্ঠীকে ১৬টি উপ-শ্রেনীতে ভাগ করে জীবনচক্রভিত্তিক বিশেষ কার্যক্রম গ্রহন করার মাধ্যমে পিছিয়ে পড়া-পিছিয়ে রাখা কিংবা পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর বিশেষত নারীর মানবমর্যাদা সমাজে সুপ্রতিষ্টিত করা প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছে।

নারীর এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে এতোসব ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করা সত্ত্বে এখনও সামাজিক ও পারিবারিক পর্যায়ে নারীরা নানাবিধ সহিংসতার শিকার। ইভটিজিং-এর কারণে অনেক সম্ভাবনাময় বালিকার বিদ্যালয়ে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। সামাজিক ও পারিবারিক চাপে এখনও ১৮ বছরের নীচের মেয়েদের বিয়ে হচ্ছে। যৌতুকের স্বীকার হচ্ছে অনেক নারী। নারীর গৃহশ্রমের এখনও মূল্য নেই। পুরুষের সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও নারীর কাজ বলে নারীকে কর্মভারে জর্জরিত করা এবং গৃহশ্রমের অসম বিভাজন তৈরি করার বিষয়টি বিদ্যমান রয়েছে। এমনকি নাটক, সিনেমা, বিজ্ঞাপনে কিংবা অন্যান্য মিডিয়াতে নারীদের বৈষ্যমমূলকভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে। আজও ব্যথিত চিত্তে বলতে হয় নারী তুমি আর কতোট পথ মাড়িয়ে গেলে তুমি তোমার অধিকারের পরিপূর্ণতা পাবে? এ প্রশ্নের উত্তর আমাদের আজও জানা নেই। তবুও বলি “সবাই মিলে ভাবো, নতুন কিছু করো, নারী-পুরুষ সমতার নতুন বিশ্বগড়ো”।

লেখক: উন্নয়ন সংগঠনক ও উর্ধতন কর্মকর্তা। 
পল্লী-কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।