Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১৭ ফাল্গুন ১৪২৭, সোমবার ০১ মার্চ ২০২১, ৭:৫৫ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

গাঁধা


২২ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সোমবার, ১১:২২  এএম

অনিন্দ্য রায়

বহুমাত্রিক.কম


গাঁধা

প্রায় ছয় মাসের মত হয়ে গেল রন’র হাতে কোনো কাজ নেই। এমনিতেই প্রাইভেট ফার্মের খুব একটা নিশ্চয়তা থাকে না তবুও ধরা ছারা করে দিন পার হত। নানা চিন্তায় তার রাত-দুপুর কেটে যায়। ভাগ্যের চাকা না ঘুরলে আর কিছু করার নেই। এবারের বৈশাখে গা পোড়ান গরম পরেছে – দুপুর যেন কাটেনা। পড়ন্ত দুপুরে আরমোড়া ভেঙে ভাবছে বিকেলের দিকে একটু ঘুরে আসবে খালের পাড় ধরে ঐ শেষের বদাই গ্রামের দিকে।কিছুক্ষণ অন্তত অকারণ চিন্তা ভাবনাগুলোকে সরিয়ে রাখা যাবে। অনেকগুলি হারিয়ে যাওয়া গাছ পশুপাখি দেখা যায়, এখনও মানবিক দুষণ হলেও প্রাকৃতিক দুষণ একটু কম পরিমাণে আছে। আর ওর পাড়ার আশপাশে এতটাই শহুরে ছোয়া যে গরু ছাগল ত দুর এখন কাক চড়ুইগুলোও দেখা যায় না। ধীরে ধীরে কি এরা সত্যিই হারিয়ে যাবে? আর কখন দেখা যাবে না? কি আশ্চর্য সভ্যতা! অনেকদিন আগে মনিমালার হাটের দিকে একটা ঘোড়া দেখা যেত, বিয়ে বা কোন অনুষ্ঠানে ভাড়া দেয়া আর ফুটবল ম্যাচের দিন মাঠের পাশে ঘোড়ার পিঠে চড়িয়ে ইনকাম করা মালিকের ব্যবসা ছিল সেটা এখন আর দেখা যায় না।

আসলে একটি নির্দিষ্ট কাজে এথন যুক্ত না থাকার জন্য নানা আতীত – বর্তমান কথার মালা একের পর এক মাথায় আসে তাই নিয়ে নিজের সঙ্গে নিজের নানা তর্ক – বিতর্ক চলে। মনের আসন কখন কারও খালি যায় না তাই রণ’র মনে নানা ঢেঊ নানা আকারে খেলতে থাকে। হটাৎ মানে পড়ল আশেপাশে কোনো গাঁধা দেখা যায় না কেন? গাঁধা কি পোষ মানে না, আচ্ছা গাঁধা গৃহপালিত না হলেও মানুষের কোন ব্যবহারে আসে না? কারণ, যদি গাঁধার প্রয়োজনীয়তা থাকত তবে কোথাও না কোথাও পোষা হত।
যেমন গরু ছাগল পাঠা বলদ ছাড়া ঘোড়ার অনেক চাহিদা আছে। টঙাওলা খচ্চর পোষে তাদের জীবিকার জন্য কাজে আসে কিন্তু গাঁধা পোষে গাঁধার পিঠে কাপড়ের গাটঠি নিয়ে যায় ধোপারা তাই। রূপকথার গল্পগুলোতেও গাঁধার ব্যবহার ওই ব্যবসায়ীদের হাতে। কিন্তু বিনা অর্থ ব্যয়ে মালবাহক এই পশুটা মানব সমাজ থেকে হারিয়ে যাছে কি? সাত্যি একটা খটকা লাগা – জিজ্ঞাসা বটে। বনেজঙ্গলে গাঁধার অস্তিত্ব ঠিক কি পর্যায়ে তাও জানা রণ’র। মানে বাঘ ভাল্লুকের প্রিয় খাদ্য হলে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক চ্যানেলে দেখা যেত। ছোট বয়সে কোন সার্কাসেও দেখেছে বলে মনে পড়ে না। সেই ছোট বেলায় ঝুলনের খেলনা থেকে আজ পর্যন্ত বাচ্চাদের খেলনাও দেখা যায়নি। মনে হয় গাঁধার দেহের রং বিন্যাস, দুরন্ত বা হিংস্র স্বভাব বা কোন কিছু আমাদের আর্কষণীয় নয়।

রণ ছোট বোনের শ্বশুর বাড়ি রায়নায়, গ্রামের বাড়িতে আনেক বার গেছে কিন্তু গরু মোষ বলদ পাঠা ছাগল কত কি? গ্রামে ঘোড়া ছিল কিন্তু কেউ গাঁধা পুষেছেন তা দেখা যায় নি। রণ এখন ভাবছে কি একটা বোকা বোকা ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছে। বেকারদের চিন্তা অর্থ উপার্জনের রাস্তা খোঁজা। একটু রাজনীতি বা নেতার ঘেটে দেওয়া কোন ব্যাপার, না হলে একটু তোষামোদি প্রেম চলতে পারে তবে কি একটা বিদ্‌ঘুটে ম্যাটার মাথায় ঘুর ঘুর করছে। বন্ধুদের বললে তো সাবাই খিল্লি ওড়াবে! ধূত—য়ু—ত, অন্য আইটেম মনে পড়ছে না। মনের গজগজানিটা নিয়েই সাইকেলটা নিয়া বাড়ি থেকে বের হল। বাড়ির বা দিকের রাস্থা দিয়ে সোজা মনিমালার হাটের সামণে থেকে বড় রাস্তা পার হয়ে, বদাই গ্রামে ঢুকবে ঠিক করেছে সেই মুহুর্তে বাবুরাম সামনে দাড়াল, চোখে চোখ হতেই বলল “কিরে!—এ—কোথায় চল্লি? কোন আয়াস ছাড়াই রণ’র মুথ থেকে বেড়িয়ে এল “গাঁধা খুঁজতে”।

বাবুরাম এক মিনিট ‘থ’ মেরে গেল, বেশ আবাক করা খোঁজ বটে। মুখের হাসি নিয়ে জানাল “সে ত এখন গালাগাল, এখন ত দেথা যায় না, ও তো লুপ্তপ্রায় প্রাণী।” কথা না বাড়িয়ে প্যাডেলে চাপ দিয়ে এগিয়ে গেল। আর – গাঁধা শুধু গালাগালেই আটকে থাকে তবে গরু কি? সে- ও—তো গাল তাই বলে গরু কি বিলুপ্ত হয়েছে! গাঁধা গাঁধা গাঁধা, খালের ধারে ধোপার ঘাট থেকে রাস্তার পাশে ধানের মাঠ নিরীক্ষণ করে চলেছে।

গাঁধা কেমন ডাকে তা কোনদিন শোনেনি তো কিন্তু ভাষা ভাষা মনে পড়ছে কার কাছে যেন শুনেছিল – মহারানা প্রতাপ নাকি ঘোড়া আর গাঁধার মিলন ঘটিয়ে খচ্চরের সৃষ্টি করে যার মুত্রে তরবারি ভিজিয়ে রাখতো অতি বিষাক্ত হবার জন্য। এক কোপে শত্রু পক্ষের ক্ষত অংশে পচন শুরু হবে, সুতারাং গাঁধার এইটা প্রয়োজনীয়তা এক সময় ছিল। হয়তো তা গল্প, এখন কোন বিজ্ঞাপনেও গাঁধার ছবি নেই। অতি নিরীহ পশুদের নিয়ে কোনখানে মার্কেটিং চলে না। গাঁধা ত গাঁধাই অর্কমন্য।

ফর্সা মাসি রাস্তার বা ধারে দাঁড়িয়ে ছিল, বাজারে শাক‌ বিক্রি করে মুখচেনা একজনকে দেখে ফিস্‌ করে হেসে কিছু জিজ্ঞাসা করবে করবে, রণ সে দিকে ভ্রুক্ষেপ না করে দুরের দিকে দৃষ্টি রেখে এগিয়ে গেল। এদিকে আগেও এসেছে চেনা চেনা অনেকটা কিন্তু কালের নিয়মে কিছু কিছু পরির্বতন চোখে পরে। কুরন চাচার কলা বাগানের মধ্যে একটা টমাটো সস্‌ তৈরির শেড্‌ হয়াছে। কয়েকটি মেয়ে বউ কাজ করছে, ঢালে একটা এড়ে গরু বাধা। কাপাসিয়ার মাঠে পাশ ঘেষে তাস্‌লিমের মসজিদ ফেলে ইট ভাটার দিকের রাস্তা ধরল, সুরথি থোয়ার মোরা লাল ধুলোয় ধোয়াশা পথ। এখানে ইট ভাঙ্গতে সাঁওতাল শ্রমিকগুলো মুরগি ছাগল কিছু কিছু পাখিও পোষে। সাইকেল থেকে নেমে রণ কিছুক্ষণ ভাটার পগ মিলের দিকে তাকিয়ে থাকে। দুটো কালুর বলদ ঘুরেই চলেছে। কতগুলি বলদ আরে বলদে টানা গাড়ি দেথে রণর মনে হল ‘আচ্ছা গাঁধা দিয়ে এই কাজ হয় না?’ কয়েকটি ছোট সাঁওতালি ছেলে মেয়ে রাণকে ঘিরে জিজ্ঞাসু মনে চারপাশে ঘুরাঘুরি করছে তখন। রণ ওদের দিকে ফিরে জানতে চাইলো এইখানে কোনো গাঁধা আছে কিনা।

ওরা গাঁধা কি বুঝতে পারেনি হয়তো, এদিক ওদিক মুখ চাওয়া-চাওয়ি করে দৌঁড় লাগাল। রণ আরেকটু ভিতরের দিকে গিয়ে এদিক ওদিক করে নিজের দুস্প্রাপ্য প্রাণিটিকে খুঁজে পাবার চেষ্টা করে। বিফল মনোরথে এইবার ভাটায় বড় ঝিলের পাড়ে চিন্তাহীন ভাব নিয়ে দাঁড়ায়। টলটলে জল শ্যাওলার চিহ্ন মাত্র নেই, ছোট ছোট ঢেঊ এসে পাড়ে খেলছে। এখানে এসে রণ’র মনের থেকে ধীরে ধীরে যেন গাঁধার উদ্বেগ থিতিয়ে পড়ছে। আনমনে অনেক্ষণ দুরের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে ছিল। এখানে কোন কৌতুহলী প্রশ্ন কর্তার আগমন হয়নি। তাই নিজের মধ্যে নিজেকে ধারে রেখেছে । রোদঢালা পড়ন্ত ভ্যাপসা বিকেল, আকাশে কোন রং ধরেনি, যে জোস্‌ নিয়ে রণ সাইকেল ঠেংগিয়ে এতদুর এল এখন তা প্রায় অস্তাচলে। চিন্তামুক্ত কোন মানুষ এবার সাইকেল হাটিয়ে হাটিয়ে ইট ভাটার মাঝের পায়ে হাটার ছাপ ধারা ফাঁকা পথের মতন সেইখান থেকেই ফিরে পাকা গ্রামের রাস্তা ধরবে বলে চলতে শুরু করল।

পচা পাঁক পাঁক গন্ধ চারদিকে ছাড়িয়ে, একদল ছাগল নাদি ফেলে ফেলতে সামনে থেকে দৌড়ে গেল। যখন গেটের বাইরে আসবে সেই সময় দাড়োয়ান গোছের মোটাসোটা চেহারা হাঁকল ‘ কিছু বলবেন? কাউকে খুজছেন বাবু?’

রণ – ‘একটা গাঁধার খবর দিতে পার?’
সে – গাঁধা, এখানে ত ও... সবের কাজ নাই। অন্য জায়গায় দেখুন।
কলকাতার আশেপাশের জেলায় বিশেষ করে উত্তর চব্বিশ পরগণায় গ্রামগুলিতে তেমন মনোরম পরিবেশ আর নেই। প্রকৃতির সাজসাজ্জা এখানে কম কম মনে হয় – এইসব দেখতে দেখতে ফিরে আসছে রণ। এইটা প্রকান্ড কৃষ্ণচুড়া লাল আবির খেলে ধুমসো আকাশের দিকে নিজের অহংকার দেখাচ্ছে যেন, এতক্ষণে রণ’র মনটা ভাল লাগার স্বাদ পেল। এইসময় সাইকেলে কিছু খোচা লাগল যেন ফিরতাই কানে ঝাঝাল মেয়েলি গলা, না দেখে চলছে যেন, গাঁধা কোথাকার।

রণ সেই মুহুর্তে কিছুই বলতে পারল না। ঠিকই ত, ও দেখেইনি লক্ষ্য করে, ফুল দেখতে দেখতে কখন রাস্তার পাশে চলে এসেছিল, প্যাডেলের কোনায় ঐ মহিলার কাপড়ের খোস্টা উঠে গেল। তিনিও বলিহারি ঢাউস ব্যাগে ছাট কাপড়ের টুকরো নিয়ে চলেছেন। কথা বাড়ালে বে-পাড়ায় বেশি ঝামেলা হয়ে যাবে, মানে চুপচাপ চলে আসাই ভাল, শুধু গালটা হজম করতে হল আর কি! মসজিদ পাড়ায় তখন লাইট জ্বলল সবে এখন নীল সাদা লাইট। এই সরকারের উন্নয়নের নমুনা। যে সরকার শুয়োরের সংক্রমণ রোগ থেকে মানুষকে রেহাই দেবার জন্য বনের শুয়োর ধরে ধাঁপার মাঠে, হাওড়ার জলার পাশে খাচা বানিয়ে মশারি খাটিয়ে টাকার শ্রাদ্ধ করতে পারে; তারা গাঁধার ব্যাপারে কিছুই ভাবে না! আসালে গাঁধার বোধহয় কোন সংক্রামক রোগ নাই।

ঝিলের পাশে খাবির, মনতোষ ওড়া আড্ডা মারছে। মাংসের ব্যবসা; পাঠা খাশি নিয়ে কারবার, মুখোমুখি হতে মুচকি হেসে পাস কাটিয়ে এল। বাড়ির কাছাকাছি আসতে প্রায় সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। মাথায় কাজ করলেও পঞ্চ ইন্দ্রিয়কে এইটু বিশ্রাম দিতে হবে। বাড়িতে ফিরে সাইকেল স্ট্যান্ড করে দরজায় বেল বাজাল, রণ’র মা দরজা খুলে দিয়ে একটু উৎকণ্ঠার দৃষ্টিতে জিজ্ঞাসা করল কিরে কোথায় গেছিলি না বলে কয়ে ? সামনের দরজা হাট করে খোলা? রাস্তার উপর ঘর, একটা কিছু হয়ে গেলে? তোর কি বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পায়েছে নাকি? গাঁধা কথাকার !

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।