Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৭ আশ্বিন ১৪২৭, মঙ্গলবার ২২ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:২২ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনাকালের রমজান হোক প্রকৃত সংযম ও আত্মশুদ্ধির


২৬ এপ্রিল ২০২০ রবিবার, ১১:৫৪  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


করোনাকালের রমজান হোক প্রকৃত সংযম ও আত্মশুদ্ধির

করোনা এখন বৈশ্বিক মহামারি যা আর কাউকে মনে করিয়ে দেওয়ার কোন প্রয়োজন পড়েনা। প্রতিদিনই বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এবং দেশে পশুপাখির মতো আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ আর মারাও যাচ্ছে পাখির মতোই। সকল প্রাণি থেকেই মানুষের মূল্যই যেন সবচেয়ে কম! দেশে যখন কোন সাধারণ নির্বাচন থাকে তখন টেলিভিশনের স্ক্রলে এবং টিভি ইনসেটে নির্বাচনের ফলাফল আপডেটের জন্য একটি স্থান নির্ধারিত করা থাকে।

অত্যন্ত কষ্টের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে কোভিড-১৯ রোগি সম্পর্কিত পরিস্থিতির সর্বশেষ আপডেট জানানোর জন্যও এখন ঠিক একইভাবে টেলিভিশনের স্ক্রিন সেটিং দিয়েছে। যেহেতু লকডাউনের কারণে দেশের বেশিরভাগ মানুষই এখন ঘরে আছেন, সেজন্য সকলের চোখই এখন টেলিভিশনের স্ক্রিনে। আর প্রতিদিন দেশ বিদেশে যে হারে কোভিড-১৯ রোগির সংখ্যা, মৃতের সংখ্যা বেড়ে চলেছে গা শিউরে উঠছে।
   
এমনি একটি পরিস্থিতিতে শুরু হয়েছে এবারের (২০২০) পবিত্র রমজান মাস। মুসলিম ধর্মে ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের একটি হলো রমজান। এটি মুসলমানদের জন্য অন্যতম একটি ফরজ ইবাদত। আমাদের বাংলাদেশ অন্যতম একটি মুসলিম দেশ বিধায় পুরো জাতি তো বটেই গোটা মুসলিম উম্মাহ কষ্ট পাচ্ছে রমজান মাসটি সঠিক পদ্ধতি অনুসরণ করে পালন করতে পারার কারণে। দেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানগণ তাই এ মাসটাকে করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব থেকে অধিকতর নিরাপদে থাকার জন্য খুবই নিয়ন্ত্রিতভাবে পালন করছেন। কেন এবারে অন্য রকমভাবে রমজান পালিত হচ্ছে সেই প্রসঙ্গে দুয়েকটি বিষয় নিয়ে আলোকপাত করছি।
   
রমজান মাস শুরু হওয়ার আগেই অর্থাৎ শবেবরাতের পর থেকেই মুসলমানদের ঘরে রমজানের আমেজ চলে আসতে থাকে। কি কি বাজার করতে হবে, কি কি জিনিস দিয়ে ইফতার করতে হবে, ইফতারে কাকে কাকে দাওয়াত করে খাওয়াতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। এ যেন এক বড় বিবাহ আনুষ্ঠান আয়োজনের মতো। রসনা বিলাস তো বাঙালির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ তকমা। আর সেটি রমজানের সময়ে আরো বেশি করে ফোঁটে উঠে। এবারের রমজান মাসে সেটি করা সম্ভব হচ্ছে না বাঙালি মুসলমানদের ঘরে। সবই হচ্ছে সাদা মাটা। তারপরও অবশ্য কিছু কিছু অবিবেচক মানুষ এ রমজানের মাঝেও সকল ধরনের বাজার-সদাই বেশি বেশি করে দীর্ঘদিনের জন্য সঞ্চিত করে রাখছে। এতে বাজারে একসাথে অনেক নিত্যপণ্যের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে এবং প্রভাব পড়ছে বাজার মূল্যের উপর।
   
আমরা জানি করোনার জন্য জনসমাগম, সামাজিক ও শারীরিক দূরত্ব নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আর তাই ইসলাম ধর্মের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দেশ সৌদি আরবেও নামাজ ও জনসমাবেশ নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। সেকারণেই মসজিদেও জামাত পড়ার ক্ষেত্রে ধর্ম মন্ত্রণালয় ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে স্বাাভাবিক ওয়াক্ত, জুমা’র নামাজ ও তারাবির নামাজের জামাত মসজিদে পড়ার ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধিবিধানমতেই কিছুটা অনুশাসন জারি করা হয়েছে। সেই অনুশাসনের আওতায় স্বাভাবিক ওয়াক্তে ইমাম, মোয়াজ্জিন, খাদেমসহ সর্বমোট পাঁচজন, জুমা’র জামাতে দশজন এবং পবিত্র রমজান উপলক্ষে তারাবিতে সর্বোচ্চ বার জনকে নিয়ে জামাত পড়ার কথা বলা হয়েছে। আর অন্যদের নিজ নিজ বাসস্থানেই তাদের নামাজ আদায় করে এ করোনা মহামারির সঙ্কট থেকে মুক্তির ফরিয়াদ ও দোয়া করতে বলা হয়েছে।
   
খাওয়া দাওয়ার ক্ষেত্রেও সীতি আকারে তেলের ভাজাপোড়া বাদে ঘরে তৈরি অতি সাধারণ খাবার দিয়ে ইফতার ও সেহরি চালিয়ে নেওয়ার পরামর্শ দিয়ে চলেছেন পুষ্টিবিদেরা। কারণ প্রথমত বেশি ও বাহারি খাবার গ্রহণের ক্ষেত্রে বাজার করা একটি সমস্যা। কারণ সকলকে ঘরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। চলছে লকডাউন। এ লকডাউন ভেঙ্গে অকারণে হাট-বাজারে বের হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বাধা দিয়ে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। অপরদিকে অন্য সময়ের মতো ভাজাপোড়া, মুখরোচক জাতীয় খাবার খেয়ে করোনা ভাইরাসের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাবে। কাজেই ভিটামিন জাতীয় ফলমূল, শাকসবজি, প্রোটিন জাতীয়, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ইত্যাদি খাবার কম তেলে বেশি সিদ্ধ করে খেতে বলা হয়েছে।
   
বাঙালির ইফতার হচ্ছে একদিকে একটি রাজনৈতিক কালচার এবং অপরদিকে সামাজিক সংস্কৃতিও। রমজানের শুরুতেই রাজনৈতিক দল ও বিভিন্ন সামাজিক ও সাস্কৃতিক সংগঠন ইফতারকে একটি প্লাটফরম হিসেবে ব্যবহারে অভ্যস্ত। পারিবাবিরভাবে এটি খুবই একটি গুরুত্বপূর্ণ শিষ্টাচার। একে অপরের বাড়িতে দাওয়াত, পাল্টা দাওয়াত- এটা যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। আবার বিশেষ বিশেষ এলাকার প্রসিদ্ধ কিছু ইফতারের আইটেম থাকে যা ঐতিহ্যগতভাবেই বিখ্যাত। ঢাকার চকবাজার এলাকার বাহারি ও রাজকীয় সেই ইফতারের পশরা এবারে আর নেই। নেই সেখানে কোন লোক সমাগম।
   
রমজান এলেই প্রতিটা হোটেল-রেস্তোরা, খাবারের দোকান তাদের নিজস্ব নামের, ব্রান্ডের ও দামের পণ্য দিয়ে পসরা সাজিয়ে বসত রাস্তার মোড়ে মোড়ে। ভাজা হতো জিলাপি, পিঁয়াজো, বড়া, বেগুনি, চপ ইত্যাদি আরো কত কি! আর এবার এসবই ঝড়ের মতো উড়িয়ে নিয়ে চলে গেছে করোনা নামক মারণঘাতী ভাইরাস। একটি অদৃশ্য জীবাণুর এত ক্ষমতা! সারা বিশ্বকে ধাপিয়ে বেড়াচ্ছে। নেই কোন ক্ষমা, নেই কোন সহনশীলতা। ডিসেম্বর ২০১৯ এ চীন থেকে শুরু হয়ে চতুর্থ মাসের মতো সারা বিশ্বকে অচল করে দিয়েছে করোনা নামের একটি ভাইরাস।

কাজেই বলতে দ্বিধা নেই এ অদৃশ্য জীবাণুকে ঘায়েল করার জন্য মহান সর্বশক্তিধর আল্লাহতায়ালাই পারেন আমাদের রক্ষা করতে। ভাল খেয়ে রোজা করি আর যেভাবেই করি না কেন আমাদের উচিত মহা শক্তিধর আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। কারণ আমরা দেখতে পাচ্ছি এ ভাইরাসের কারণে আমাদের রমজানকে ঘিরে কতশত কোটি টাকার ব্যবসা বাণিজ্য শেষ হয়ে গেছে। এবারের অন্যরকম রোজার দিনে এটিই হোক আমাদের হাতিয়ার, যার দ্বারা সর্বোচ্চ সংযমের মাধ্যমে সিয়াম সাধনা করে আল্লাহর নিকট মুক্তি প্রার্থনা করা। আসুন আমরা সকলে এ দেয়া করি।   
        
লেখক: ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।