Bahumatrik Logo
২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ

সাঙ্গুর বাঁকে বাঁকে


২৭ মে ২০১৪ মঙ্গলবার, ০৩:০৩  পিএম

হাসান ইমাম চৌধুরী

বহুমাত্রিক.কম


সাঙ্গুর বাঁকে বাঁকে

ঢাকা: বান্দরবান ভ্রমণের এবারের প্ল্যানটাও অন্য ভ্রমণগুলোর মতোই হুট করে মাথায় চেপে বসল। ফোনে কথা বললাম চট্টগ্রামের চন্দনের সাথে, ঠিক করলাম এবার বান্দরবানের কোনোদিকটায় যাওয়া যায়। একে তো আয়তনে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম এই জেলা, তার উপর দুর্গম পাহাড়ি জনপদ। টুকরো টুকরোভাবে বান্দরবানকে আবিষ্কার করতে হবে। এক যাত্রায় পুরোটা সম্ভব নয়। সিদ্ধান্ত হলো, এই যাত্রায় থানচি উপজেলা থেকে সাঙ্গু নদী ধরে আন্ধারমানিক পর্যন্ত যাব। এটাই এবারের রুট।

বান্দরবান পার্বত্য চট্টগ্রামের অংশ। অঞ্চলটি ১৫৫০ সালের দিকে প্রণীত বাংলার প্রথম মানচিত্রে বিদ্যমান ছিল। তবে এর প্রায় ৬০০ বছর আগে ৯৬৩ সালে আরাকানের রাজা এ অঞ্চল অধিকার করেন। ১২৪০ সালের দিকে ত্রিপুরার রাজা অঞ্চলটি দখল করেন। ১৫৭৫ সালে আরাকানের রাজা পুনর্দখল করেন এবং ১৬৬৬ সাল পর্যন্ত অধিকারে রাখেন। মুঘল সাম্রাজ্যে ১৬৬৬ হতে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত এলাকাটি সুবা বাংলার অধীনে শাসন করে। ১৭৬০ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এ এলাকা নিজেদের আয়ত্বে আনে। ১৮৬০ সালে এটি ব্রিটিশ ভারতের অংশ হিসেবে যুক্ত হয়।

ব্রিটিশরা এ এলাকার নাম দেয় চিটাগাং হিল ট্র্যাক্টস বা পার্বত্য চট্টগ্রাম। এটি চট্টগ্রাম জেলার অংশ হিসেবে বাংলা প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৪৭ সালে এ এলাকা পূর্ব পাকিস্তানের অংশ হয়। আর ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর এটি বাংলাদেশের জেলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। আশির দশকে শুরুতে পার্বত্য চট্টগ্রামকে তিনটি জেলা- রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে বিভক্ত করা হয়। বাংলাদেশের তিনটি পার্বত্য জেলার মধ্যে একটি হচ্ছে বান্দরবান। এটি বাংলাদেশের কম জনবসতিসম্পন্ন স্থান।

এখানকার সড়কপথে সংযোগগুলো হচ্ছে চিম্বুক-রুমা, বান্দরবান-রোয়াংছড়ি-রুমা, আজিজনগর-গজালিয়া-লামা, খানহাট-ধোপাছড়ি-বান্দরবান, বান্দরবান-চিম্বুক-থানচি-আলীকদম-বাইশারী-ঘুনধুম এবং চিম্বুক-টঙ্কাবতী-বারো আউলিয়া। বাংলাদেশের ভেতরে বান্দরবানকে ঘিরে রয়েছে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, রাঙামাটি এবং খাগড়াছড়ি। অন্যদিকে রয়েছে মায়ানমারের চীন প্রদেশ এবং আরাকান প্রদেশের সীমান্ত।
ঢাকা থেকে বান্দরবানের দূরত্ব ৩৩৮ কিলোমিটার।

শুধু সড়কপথেই বান্দরবান যেতে পারবেন। ঢাকার গাবতলী, কলাবাগান, আরামবাগ, সায়েদাবাদসহ সবকটি বাসস্ট্যান্ড থেকে বান্দরবানের বাস পাওয়া যাবে। ভাড়া কমবেশি ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। যেতে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ ঘণ্টার মতো। বান্দরবান জেলা সম্পর্কে আমাদের ধারণা খুবই অল্প। বরং বলা যায়, বাংলাদেশের এ দুর্গম পাহাড়ি জনপদটি সম্পর্কে আমাদের ভুল ধারণাই বেশি।

অনেকেই ভাবেন এ জেলার মানুষ এখনও গাছে বাস করে, কাপড় পরে না, কাঁচা মাছ খায়, অনেকটা আদিম যুগের মতো। আবার অনেকেই জানতে চায়, বান্দরবান শহরে থাকার মতো হোটেল আছে কি না, খাবার পাওয়া যায় কি না, চলাচলে রাস্তাঘাট আছে কি না ইত্যাদি। এর কারণ হিসেবে বলা যায়, এ জেলাভিত্তিক তেমন কোনো বইপুস্তক বাজারে পাওয়া যায় না। তাছাড়া পার্বত্য অঞ্চলে ঘটে যাওয়া কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনার প্রভাবসহ বিগত বছরগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে বান্দরবানে বেড়ানো বিষয়ে কড়াকড়ি, বিভিন্ন ধরণের অনুমতি, ভয়ভীতি ইত্যাদিকে দায়ী করা যেতে পারে। তবে এখন সেসব অনেকটাই শিথিল হয়েছে। তাই ভ্রমণপিপাসুরা ভিড় করছেন এই প্রাকৃতিক মায়াময় জেলাটিতে।

চট্টগ্রাম হয়ে কক্সবাজার যাওয়ার পথে কেরানীরহাট থেকে বামে রাস্তাটি ধরে গেলেই বান্দরবান শহর। তবে বেশ খানিকটা যেতে হবে। রাস্তাটা সিঙ্গেল ওয়ে হলেও ভালো। তেমন একটা যানবাহনের ভিড় নেই। তবে পাহাড়ি পথ বেশ আঁকাবাঁকা। যেতে পথে দেখতে পাবেন বাংলাদেশের একমাত্র রাইফেলস ট্রেনিং সেন্টার এন্ড স্কুল। এখানে বর্ডার গার্ড বা বিজিবির সদস্যদের ট্রেনিং দেয়া হয়।

বর্তমান সময়ে ছুটির দিনগুলোতে বান্দরবানে ভ্রমণপিপাসুদের বেশ ভিড় লেগেই থাকে। তাই আগে থেকেই শহরের হোটেলগুলোতে রুম বুকিং দিয়ে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ হবে। বান্দরবান শহরে ভালো, মাঝারি ও সাধারণ মানের সব মিলিয়ে ২০ থেকে ২৫ টির ও বেশি হোটেল আছে। ভালো মানের খাবারের হোটেলও আছে বেশ ক’টি। শহরে রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটো রিকশা নিয়ে ঘুরতে পারবেন। শহর থেকে দূরে এখন বেশ ক’টি রিসোর্ট তৈরি হয়েছে, চাইলে সেখানেও থাকা যাবে।

বান্দরবান যাবার সিদ্ধান্ত নিতেই ফেসবুকে পেয়ে গেলাম উৎসাহী ট্র্যাকার শিবলীকে। তার দায়িত্ব বান্দরবান শহর থেকে থানচি যাওয়ার জিপ, পথের খাবার-দাবার, ওষুধ ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। পুরানো বন্ধু মনা ভাইকে পেয়ে গেলাম সাথে। উনি আমাদের দেখে-শুনে রাখার দায়িত্ব নিলেন। সাথী হলো ফটোগ্রাফার শারমীন। আর আমার ক্যামেরা এক্সপার্ট রাহাত তো আছেই। গত বছরের ২ নভেম্বর রাতে বাসে চড়ে রওনা হলাম বান্দরবান। ভোরে বাস চট্টগ্রাম পৌঁছুলে চন্দন পাঁচটা লাইফ জ্যাকেট ও পাহাড় বাওয়ার সরঞ্জাম নিয়ে আমাদের বাসে উঠল। সকাল সাড়ে আটটায় বাস পৌঁছাল বান্দরবান শহরে।

শিবলী সাড়ে তিন হাজার টাকা ভাড়ায় একটা টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার জিপ নিয়ে হাজির বাসস্ট্যান্ডে। চলতি ভাষায় এটাই ‘চান্দের গাড়ি’। বাস থেকে মালামাল স্থানান্তর হলো জিপে। বান্দরবানে যাত্রাবিরতি না করেই আমরা ছুটলাম থানচির পথে। এখান থেকে থানচির দূরত্ব ৮৮ কিলোমিটার।

বান্দরবান শহর থেকে আট কিলোমিটার আসতেই চোখে পড়ল শৈলপ্রপাত। এটা একটা পাহাড়ি ঝরনার অংশ। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে নেচে চলেছে পানির ধারা, গড়িয়ে পড়ছে নিচে। শহরের খুব কাছে হওয়ায় দারুণ এই দৃশ্য দেখতে ভিড় জমায় পর্যটকেরা। শৈলপ্রপাতের ওপরটায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের ছোট্ট একটা বাজার আছে। কিছুটা সময় শৈলপ্রপাতে কাটিয়ে আবার যাত্রা শুরু হলো আমাদের।

বান্দরবান শহর থেকে ২৬ কিলোমিটার আসতেই আরেক আকর্ষণ-দু’হাজার দু’শো ফুট উচ্চতার চিম্বুক। এখানে মোবাইল ফোনের টাওয়ার, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ক্যাম্প, রেস্ট হাউজ ও দোকান আছে। এখানকার পাহাড়ে মেঘেদের ভেসে বেড়ানো আর রোদের সঙ্গে লুকোচুরি খেলা পর্যটকদের মন ছুঁয়ে যায়।
চিম্বুকের দোকানে বসে বাংলা কলা খেয়ে রওনা হলাম গন্তব্যের উদ্দেশ্যে।

এক কিলোমিটার যেতেই দেখা মিলল বিজিবি’র ক্যান্টিন। কিন্তু বিধি বাম। খাবার শেষ। অগত্যা খিদে পেটে ছুটলাম সামনের দিকে। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা ধরে ছুটে চলেছে আমাদের জিপ। দু’পাশের নিসর্গ দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়।

এবার পথে পড়ল নীলগিরি। সেনাবাহিনীর হিলটপ রিসোর্ট। সুন্দর করে সাজানো। ৪/৫টি কটেজ আছে। তাঁবুর ব্যবস্থাও আছে। কটেজগুলোর ভাড়া প্রতি রাত চার থেকে ছয় হাজার টাকা। এখানে থাকতে সেনাবাহিনীর অনুমতি প্রয়োজন। বান্দরবান শহর থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে আর সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দু’হাজার চারশ’ ফুট উচ্চতায় এই নীলগিরি। নীলগিরিতে পেয়ে গেলাম মুরগির কম্বো খিচুড়ি। ছোট এক বাটি ৪০ টাকা। বাটি হাতে পেতেই শুধু গপাগপ শব্দ হলো।

আহ....... ঘড়িতে তখন প্রায় বিকেল ৪টা। তাই দেরি না করে রওনা দিলাম থানচির উদ্দেশ্যে। আরও ৪২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে হবে। রাস্তা সুবিধের নয়। সরু রাস্তা, পাহাড়ি ঢাল আর আঁকাবাঁকা। পথে বালিপাড়া বিজিবি ক্যাম্পে জিপচালক রিপোর্ট করে এলেন।

থানচিতে ঢুকতেই দেখা গেল সাঙ্গু নদীর ওপর নতুর ব্রিজ তৈরি হচ্ছে। ব্রিজ তৈরি শেষ হয়ে গেলে গাড়ি সরাসরি থানচি শহরে (বাজারে) চলে যাবে। অগত্যা কিছু মালামাল পোর্টারের মাথায় দিয়ে আমরা সবাই নামলাম সাঙ্গু নদীর ধারে। অন্ধকার হয়ে গেছে। খেয়াল করলাম কুট কুট করে কী যেন কামড় দিচ্ছে। শিবলী মশারোধক অডোমস বের করতেই মাঝি জানাল এগুলো মশা না, এদের নাম হাতিপোকা। জীবনে প্রথম হাতিপোকার কামড় খেলাম।

থানচি বাজারে এসেই ছুটলাম একমাত্র রেস্ট হাউজের দিকে। বাজার থেকে একটু উপরে এর অবস্থান। ৫ রুমের দোতলা থানচি রেস্ট হাউজের দু’টি রুম পেয়ে গেলাম। যদিও রুম পেয়েছি, কিন্তু কেউ রুমে থাকলাম না। টাঙ্গানো হলো আমাদের বিলাসবহুল (!) বিশাল তাঁবু। এর মাঝে বেশ ক’জন মাঝি আমাদের সাথে যোগাযোগ করা শুরু করল। আমি আর চন্দন দামদর ঠিক করতে লাগলাম। শারমীন আর শিবলী ছুটল বাজারে খাবার খুঁজতে। মনা ভাই আর রাহাত লেগে গেলেন রাতের ক্যাম্প ফায়ার আর বার-বি-কিউয়ের আয়োজনে।

হালকা এক শীতের আমেজে আমরা টের পেলাম। আকাশ ভরা তারার মাঝে চাঁদের দেখা নেই। আজ থেকে পরপর তিনদিন চাঁদের দেখা পাওয়া যাবে না। ঘোর অমাবস্যা চলছে।
রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে দু’জন মাঝির সাথে কথা পাকা করে রেখেছিলাম, তারা সকালে আমাদের ডেকে নৌকায় নিয়ে যাবে। সকাল পার হয়ে গেলেও তাদের দেখা পেলাম না। কী আর করা! আবারও নৌকা ঠিক করতে হবে। এই দিনটা থানচিতে রয়ে গেলাম। সাঙ্গু নদীতে নৌকা ভ্রমণের একটা বিষয় আছে, এখানে ইঞ্জিন ও হাতে বাওয়া নৌকা ভাড়া পাওয়া যায়। ইঞ্জিনের নৌকা দ্রুত চলে; আর হাতে টানা নৌকা ধীরে যায়, তবে শব্দ করে না এবং নৌকা ঠেলার জন্য তেমন একটা নামতে হয় না।

ইঞ্জিনের নৌকা, পাথুরে সাঙ্গু নদীর পানি কম থাকলে বারে বারে পাথরে আটকে যায়। তখন সবাই মিলে দড়ি দিয়ে টেনে এগোতে হয়। এ ক্ষেত্রে দুই নৌকার গন্তব্যে পৌঁছানোর সময় প্রায় এক। একদিকে ইঞ্জিনের নৌকার ভাড়া বেশি এবং বিকট শব্দ করে পরিবেশ দূষণ করে, অন্যদিকে হাতে বাওয়া নৌকার ভাড়া কম ও পরিবেশবান্ধব। তাছাড়া যারা বান্দরবানের প্রকৃতি আরাম করে দেখতে চায় এবং ছবি তুলতে চায় তাদের জন্য হাতে বাওয়া নৌকাই ভালো। যেহেতু হাতে বাওয়া নৌকা দেখতে চিকন ও লম্বা তাই একটি নৌকায় মালপত্র নিয়ে চারজন যাত্রী উঠলে আরামে ভ্রমণ করা যায়।

আমাদের সাঙ্গু অভিযানে আমরা প্রথমে যাব তিন্দু, সেখানে বড় পাথর দেখব। তারপর রেমাক্রি, সেখানে রেমাক্রি ঝরনা, ব্যাট কেভ (বাদুর গুহা) ও নাফাখুম ঝরনা দেখে চলে যাব ছোট মদক (মধু), তারপর বড় মদক (মধু), তারপর আন্ধারমানিক। দশ-বারো দিন হয়তো লাগবে। থানচির পরে মোবাইলের নেটওয়ার্ক পাওয়া যাবে না এবং তিন্দু ও রেমাক্রির খাবার হোটেলগুলোর স্টাইল পুরোটাই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠিদের মতো হয়ে যাবে কারণ থানচির পরে আর বাঙালি জনবসতি নেই। যেহেতু আজ আর রওনা দেয়া যাবে না, তাই থানচি ঘুরে দেখার পরিকল্পনা নিলাম সবাই মিলে।

থানচি বান্দরবানের একটি উপজেলা। এখানে সুন্দর, বড় একটি হাসপাতাল আছে। বাজারটা বেশ বড়। বান্দরবানের ভেতরের দিকের বাজারগুলোর একটা সাধারণ বৈশিষ্ট্য আছে। সবকটি বাজারই পাহাড়ের উপরে। চারদিকে দোকান আর মাঝখানে আয়তাকার মাঠ। মাঠের ভেতর চারচালা টিনের শেড থাকবে, যেখানে প্রতিদিনের কাঁচাবাজার বসে।

চারপাশে খাবার হোটেল, মনোহরি দোকান, চা-পানের দোকান, কামারের দোকানসহ অনেক ধরনের দোকান। থানচি বাজারের দোকানি এবং মানুষজন বেশ হাস্যোজ্জ্বল। অনেক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠি ও বাঙালি এখানে। তাদের সাথে আলাপ করতে করতে ঝুলন্ত ব্রিজের দিকে চলে এলাম। ঝুলন্ত ব্রিজ পার হলেই টিএনটি পাড়া। এটি এ এলাকার বাঙালিদের শেষ পাড়া।

থানচির টিএনটি পাড়ায় ঢুকেই আবুলের সাথে দেখা হলো। ওর সাথে আলাপে জানা গেল সে একজন মাঝি। আমি কী করি এবং কী করতে বান্দরবান এসেছি সেটা জানতেই আবুল আমাদের গাইড হওয়ার জন্য রাজি হয়ে গেল। শুরুতেই সে আমাদের মজার কিছু দেখাতে চাইল। থানচি ঝুলন্ত ব্রিজের নিচে যে ঝিরিটা চলে গেছে সেই ঝিরি ধরে ২০ মিনিট হাঁটলেই গোল গোল পাথরের আড্ডা দেখা যাবে। মনে মনে এমন একটা অফারই আমরা খুঁজছিলাম।

টিএনটি পাড়া পার হয়ে পাহাড় বেয়ে আমরা নিচে ঝিরিতে নেমে গেলাম। ঝিরির পা ভেজানো ছপাত ছপাত পানিতে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ একটা গোল ধরনের পাথর চোখে পড়ল। এতোক্ষণের সবকিছুই রাহাত তার চলমান ক্যামেরায় ধারণ করছিল, এবার তাকে বড় উৎসাহী দেখাল। দলের অন্য সদস্যদের মধ্যে চন্দন অনেকবার থানচি এসেছে, তার ভাষ্য অনুযায়ী এখানে যে এতো সুন্দর প্রকৃতি আছে তা তার জানা ছিল না। এভাবে কথা চলতে চলতে আমরা আসল সৌন্দর্যের সামনে চলে এলাম।

ওয়াও!! শত শত পাথর ঝিরির মুখ বন্ধ করে আছে। প্রাকৃতিকভাবে পাথরগুলো গোলাকার। কোনো কোনোটা বিরাট আকারের লাড্ডুর মতো গোল। দু’পাশে খাঁড়া পাহাড়। পাহাড়ে সবুজের ছাউনি। দারুণ এক প্রকৃতি! বান্দরবান ট্র্যাকিংয়ে যাওয়ার আগে এই ঝিরিতে হেঁটে দারুণ একটা প্র্যাকটিস হয়ে গেল আমাদের। সন্ধ্যার আগে আগে আমরা থানচি বাজারে ফিরে এলাম। আবুল মাঝি দু’টি নৌকা ঠিক করল। আমরা ছয়জন আর মাঝি চারজন। মাঝিদের মাঝে আবুল আর মফিজ রান্নায় পারদর্শী।

একটানা সাঙ্গু অভিযানের খাবার-দাবারসহ  প্রয়োজনীয় সবকিছু ঠিকঠাক করে ঘুমোতে গেলাম। কাল সকালে শুরু হবে জার্নি বাই বোট। ছপাত ছপাত লগি পড়ছে সাঙ্গু নদীর টলটলে পানিতে। সবার হাতেই ক্যামেরা। সবাই মহা আনন্দে উপভোগ করছে বান্দরবানের প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য। ফ্রেমবন্দি করে রাখছে এই সৌন্দর্যের খ- খ- অংশকে।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে আমরা সবাই কমবেশি নদী দেখেছি। তবে সাঙ্গু নদী না দেখলে এ সম্পর্কে ধারণা করা যাবে না। উঁচু থেকে একটা নদী কীভাবে ধাপে ধাপে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে সেই দৃশ্য দেখা যাবে এই নদীতে। থানচি থেকে ১ ঘণ্টা লগি ঠেলে আমাদের নৌকা বিশাল এক লেকের মতো জায়গায় চলে এলো। এখানে সাঙ্গুর পানির গভীরতা অনেক বেশি, মাঝিরা লগি রেখে দাড় বাওয়া শুরু করল। এই জায়গাটার নাম পদ্ম। পাশের পদ্ম ঝিরি এখানে এসে সাঙ্গু নদীতে মিশেছে। শুনেছি এই পদ্ম ঝিরি ধরেই সাকাহাফং ও তাজিনডং যাওয়া যায়। পদ্মর আশেপাশে জনবসতি নেই, কিন্তু ঝিরিমুখে একটা ছোট চায়ের দোকান আছে। নদীপথে চলাচলকারীরা এখানে যাত্রা বিরতি করে চা-বিস্কুট খায়। মাঝিরা বলল,
তিন্দুর পথে এই রকম আরো কয়েকটি খাঁড়ি পড়বে।

নৌকা চলছে। ছোট ইয়াংরাই পার হয়ে দু’পাশের পাহাড়গুলো আরও উঁচু হয়ে গেল। বিরামহীন বালিপাথরের উঁচু পাহাড়ের মাঝে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নদী, দু’পাশে ঘন পাহাড়ি বন, বড় বড় গাছ, পাখির ডাক, বাতাসের শব্দ, কখনও কখনও তক্ষকের ডাক, নাকে বুনো ফুলের সুবাস, সাথে নৌকা বাওয়ার শব্দ। দারুণ আবহ! আমাদের দেশে যে এতো সুন্দর দৃশ্য আছে তা না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না।

দুপুর আড়াইটার দিকে আমাদের নৌকা তিন্দু বাজারের ঘাটে থামল। থানচি বাজারের মতোই নদী থেকে বেশ খানিকটা ওপরে আয়তাকার ছোট বাজার এটা। একই রকম চারদিকে দোকান ও ঘরবাড়ি, মাঝখানে খালি জায়গা ও চার চালা টিনের শেড। বাজারের পাশের উঁচু পাহাড়ের মাথায় তিন্দু বিজিবি ক্যাম্প। বাজার ঘিরেই লোকালয়। তিন্দুতে দুপুরের খাবার খেলাম। এখানে এন্টেনা লাগানো মোবাইল ফোনের ব্যবস্থা আছে। আড্ডায় জানা গেল তিন্দু ঝিরির খবর। সবাই হই... হই... করে ঝিরি দেখতে ছুটলাম। তিন্দু ঝিরিতে প্রথমেই চোখে পড়ল পরিষ্কার টলটলে পানির নহর। ছোট-বড় পাথরের খাঁজে বেঁধে বেঁধে সেই পানি আরও বেপরোয়া দুরন্ত হয়ে উঠছে।

তিন্দু ঝিরির শীতল ঝরনায় গা ধুয়ে বিকেলে রওনা হলাম বড় পাথরের উদ্দেশ্যে। তিন্দু রাজার নামেই এই এলাকার নাম হয়েছে তিন্দু। একসময় এখানে তিন্দু রাজার রাজ্য ছিল। সে আরেক কাহিনী। সে কাহিনীর তিন্দু রাজ্যের রাজাই হচ্ছে তিন্দু পার হয়ে সাঙ্গু নদীতে যে বড় বড় পাথরের রাজ্যে বড় পাথরটি দেখা যায়, সেটা।

ওই পাথরটার নাম রাজা পাথর। রাজা পাথরের আরেক নাম বড় পাথর। এখানে রাজা, রাণী, মন্ত্রীসহ রাজার অনেক কিছুই পাথর হয়ে নদীতে সারিবেঁধে আছে।
সাঙ্গুুর এই পাথুরে স্থানটিকে সবাই মান্য করে। রাজা পাথরকে পূজা করা হয়। যাতায়াতে অনেকেই এই পাথরে টাকা-পয়সা দান করে। অনেকে আগরবাতি, মোমবাতি জ্বালায়। মাঝি বলল, ভরা বর্ষায় অন্য পাথরগুলো ডুবে গেলেও রাজা পাথর কখনও ডোবে না। এই পাথরগুলোর জন্যই ছইঅলা বা শেড দেয়া নৌকা সাঙ্গুর এই অংশে চলাচল করতে পারে না। পানির টানে পাথরে ধাক্কা লেগে ছই ভেঙে যায়।
ভর সন্ধ্যায় আমরা বড় পাথর এলাকায় পৌঁছলাম। অদ্ভুত পাথুরে প্রকৃতি এখানে।

সুনসান নীরবতার মধ্যে খুব সাবধানে নৌকা বাইছে মাঝি। নৌকায় শক্ত হয়ে চুপচাপ বসে থাকতে আগে থেকেই বলে দিয়েছে আবুল মাঝি। বড় পাথরের পাশে আসতেই পানির টান শুরু হলো। নৌকার সামনে থেকে মফিজ মাঝি পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়ে নৌকা টেনে ধরল। পেছন থেকে আবুল লগি চেপে ধরল পাথরে। সাধারণত যাত্রীরা বড় পাথরে নেমে যায়, নৌকা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা পার হলে আবার নৌকায় ওঠে। আমরা যেহেতু ছবি তুলব তাই মাঝিরা আমাদের নিয়েই পাথর পার হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমরা যে যার লাইফ জ্যাকেট পরে নিলাম। শুরু হলো সাঁঝের আলোয় আপ স্ট্রিমে বড়পাথর র‌্যাফটিং। প্রায় আধা ঘণ্টা যুদ্ধের পর আমরা পার হলাম বড় পাথর।

সন্ধ্যার পর সাঙ্গু নদীতে নৌকা চালানো যায় না। আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নেয়া ছিল যে, বড় পাথর পার হয়ে নদীর প্রথম যে বাঁকটি আছে, সেখানে পাথরের চরে আমাদের রাতের ক্যাম্প হবে। ডুবে যাওয়া সূর্যের শেষ আভায় আমরা নামলাম সাঙ্গু নদীর পাড়ে দুই পাহাড়ের খাঁজে এক নির্জন বুনো পরিবেশে। শীতকালে এখানে অস্থায়ী চা-বিস্কুটের দোকান বসে। শীত এখনও শুরু হয়নি বলে এলাকাটা জনমানবহীন।

মানুষ বলতে আমরা ক’জন। শুরু হলো লাকড়ি জোগাড়, তাঁবু টাঙানো, মশাল বানিয়ে জ্বালানো এবং রান্নার কাজ। কাজের ফাঁকে চুটিয়ে আড্ডা আর শুটিং, মাঝরাত পর্যন্ত চলল। ভিডিও ক্যামেরায় নাইটভিশন চেক করা হলো। শীতের আমেজে, সাঙ্গু নদীর বহমান পানির শোঁ শোঁ শব্দে, আগুনের লাল আলোয়, নির্জন এমন এক পরিবেশে আমাদের আলোকিত তাঁবুগুলো দেখতে লাগছিল শৈশবে দেখা কোনো এক স্বপ্নের মতো। ছোটবেলায় এমন অনেক স্বপ্ন দেখেছি যা শুধু স্বপ্নেই সম্ভব, বাস্তবে নয়- বড় হয়ে তা বুঝেছি। তবে আজ আমার শৈশবের একটি স্বপ্ন পূরণ হলো। এ আনন্দ শুধুই উপলব্ধির। আমার সীমাবদ্ধতা এখানেই।
ঘুম ভাঙল খুব ভোরে।

তাঁবু থেকে মাথা বের করে দেখি সঙ্গীরা সবাই হাসিখুশি, এদিক-ওদিক ঘোরাঘুরি করছে। গত সন্ধ্যায় এই এলাকায় যে দৃশ্য দেখেছিলাম, এখন তা পুরোটাই পাল্টে গেছে। সাঙ্গু নদী এখানে ‘দ’ -এর মতো বেঁকে গেছে, আর ‘দ’ তৈরি করেছে উঁচু পাহাড়ের সারি। ওয়াও!! সবাই ঝাঁপিয়ে পড়লাম সাঙ্গুর শীতল পানিতে আর তখনই বুঝলাম পানির তোড় কাকে বলে। নদীর তিন-চার ফুট পানিতে দাঁড়িয়ে থাকলেই স্রোতে পা ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কোনোভাবেই ভারসাম্য রাখা যাচ্ছে না।

এমন স্রোতে নৌকা ডুবলে ভয়ংকর দুর্ঘটনা ঘটবে। ক্যাম্প গুটিয়ে, আশপাশ পরিষ্কার করে, নাস্তা সেরে রেমাক্রির উদ্দেশ্যে রওনা দিতে দিতে ১০টা বেজে গেল। নৌকা চলছে আঁকাবাঁকা সাঙ্গু নদীর পাথুরে বুক চিরে। নদীটা তেমন চওড়া নয়। আশেপাশের দৃশ্যগুলোর মধ্যে গতদিনের থেকে তেমন পার্থক্য নেই। চলার পথে দু’চারটা নৌকা এবং দু’একটা জুমঘরে দু’চারজন মানুষ ছাড়া মনুষ্য প্রজাতির দেখা মিলল না। দুপুর তিনটার দিকে চোখের সামনে ভেসে উঠল অপরূপ সুন্দর একটা ঝরনা। শিবলী চেঁচিয়ে বলল,
-এটা রেমাক্রি ঝরনা!

ঝরনার মুখে নৌকা ভেড়ানো হলো। রাতে বেশি করে খিচুড়ি রান্না করা হয়েছিল যেন সকালে আর দুপুরে রান্নার ঝামেলা না করতে হয়। আমরা নেমে গেলাম ঝরনায় আর মাঝিরা ডিম ভাজির জোগাড় শুরু করল।
রেমাক্রি ঝরনাটা কোনো পাহাড় থেকে নিচে আছড়ে পড়ছে না। একটা পানির স্রোত, আরেকটা পানির স্রোতে সিঁড়ির মতো চার-পাঁচটি ধাপ ভেঙে মিশে যাচ্ছে।

ধাপের স্থানটি বেশ প্রশস্ত। তবে পুরো ঝরনাটাই বেশ পিচ্ছিল এবং ছোট-বড় গর্তে ভর্তি, সঙ্গে আছে পানির পাগলা স্রোত। অনেক কসরত করে ঝরনার মাঝ বরাবর গিয়ে পানিতে গা এলিয়ে ক্যামেরায় পোজ দিলাম। সে এক অন্যরকম ফিলিংস। রেমাক্রি ঝরনার স্রোতের মধ্যে শ্যাওলা পাথরে হেঁটে, এ ধরনের পরিবেশে হাঁটার একটা প্র্যাকটিস হয়ে গেল। হেঁটে খেয়ে-দেয়ে সন্ধ্যার আগে আগে রেমাক্রি বাজারে হেঁটে হেঁটেই পৌঁছে গেলাম আমরা সবাই।

রেমাক্রি বাজারটিও একই রকম চার কোণা। তবে তিন্দু থেকে বড়। বাজারের পাশের পাহাড়ে কাঠের একটি রেস্ট হাউজ আছে। যেখানে দু’টি ঘর। ফাঁকা পেলে, বলতে গেলে নিখরচায় থাকতে পারবেন। একটা বিষয় জেনে রাখুন, তিন্দু এবং রেমাক্রি বাজারে খাবার হোটেলে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা আছে। এখনও পর্যন্ত যেকোনো খাবার দোকানে রাতে খাওয়া-দাওয়া করলেই থাকার ব্যবস্থা একদম ফ্রি, মানে থাকার জন্য আপনাকে কোনো ভাড়া দিতে হবে না। সবকটি হোটেলের দোতলাতে থাকার ব্যবস্থা আছে।

রেমাক্রি রেস্ট হাউজের একটি ঘর বুক করে মালপত্র রেখে বাজারে ছুটলাম। এখানেও এন্টেনা দিয়ে মোবাইল ফোনের সুবিধা আছে। সবাই ঘরের খোঁজ নিলাম। বাজারের লালপিয়ান বমের দোকানে খুব আড্ডা হলো। রেস্ট হাউজের কেয়ারটেকার মং তুয়াইনের কাছে নাফাখুম ঝরনার খবর জানলাম, খুব ভোরে রওনা দিলে দুপুরের মধ্যে ফিরে আসা সম্ভব। পুরোটাই পায়ে হাঁটা পথ। রেমাক্রি খাল ধরে হাঁটতে হবে। বর্ষার সময় প্রচুর জোঁকের আড্ডা থাকে। তবে এখন তেমন একটা জোঁক নেই। তাকে গাইড হিসেবে নিতে হলে ৫০০ টাকা দিতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। রেমাক্রিতে আবারও হাতি পোকার কামড় খেলাম।

তিন্দু, রেমাক্রি কোথাও ইলেক্ট্রিসিটি নেই। তবে সোলারের ব্যবস্থা আছে। সোলার দিয়ে সন্ধ্যের পর ক্যামেরার ব্যাটারি চার্জ দেয়া যায় না। বাজারের পাশেই একটা গির্জা আছে, গির্জার একটা জেনারেটর আছে। তেলের খরচ দিয়ে তিন ঘণ্টার জন্য জেনারেটর চালিয়ে ব্যাটারি চার্জের ব্যবস্থা হলো। রেমাক্রি বাজার থেকে সাড়ে তিনশ’ টাকায় একটি মোরগ কিনে রাতের রান্না করা হলো। খাওয়া-দাওয়া সেরে কাঠের   রেস্ট হাউজে ঘুমোতে ঘুমোতে রাত ১২টা বেজে গেল।

খুব সকালে নাফাখুম আসা-যাওয়ার জন্য যা যা প্রয়োজন সেগুলো নিয়ে বাকি মালসামানা রেস্ট হাউজে গুছিয়ে, ঘরে তালা দিয়ে, গতরাতের গল্প শোনানো গাইড আর মফিজ মাঝিকে সঙ্গে নিয়ে রওনা হলাম। আধাঘণ্টা পাহাড়ি চড়াই-উতরাই পার হয়ে রেমাক্রি খালে পৌঁছুলাম। এই খালে কোনো নৌকা নেই। খালের পাড় ধরে হাঁটছি আর দু’পাশের সৌন্দর্য দেখছি। একটি কথা, নাফাখুম যেতে পথে ৪ বারের মতো খাল পেরোতে হবে। একেকবার একেকভাবে।

হাঁটতে হবে দু’আড়াই ঘণ্টার পথ। খালের পাড় ধরে হাঁটতে হয় বলে রাস্তা তেমন উঁচু-নিচু নয়, তবে পাথুরে। পাহাড়ি বুনো বন চারদিকে। রাস্তার সৌন্দর্য দেখার মতো। পাহাড়ি রাস্তায় চলতে হাতে একটা লাঠি রাখলে বেশ আরাম হয় আর পানি তো অবশ্যই নেবেন। তবে এই পথের ঝিরির পানি একেবারে মিনারেল ওয়াটার। সমস্যা মনে না করলে ঝিরির পানি আঁজলা ভরে পান করতে পারেন। চলার পথে চালতা, আমলকি, মেসতা, তিলসহ নানা রকম গাছের সারি। দু’একটা জুমঘর। এসব দেখছি আর টানা পায়ে হাঁটছি। কথার ফুলঝুরি আর ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক শব্দ ছাপিয়ে হঠাৎ কানে এলো ঝরনার শোঁ শোঁ শব্দ। বাঁক ঘুরেই চোখে পড়ল বহু প্রতীক্ষিত নাফাখুম ঝরনা।

নাফাখুমের সামনের খাঁড়িতে সবাই লাইন ধরে বসে পড়লাম। সঙ্গে আনা খাবার ভাগাভাগি হয়ে গেল। বেশ একটা আয়েশি ব্যাপার-স্যাপার। চোখের সামনে সাদা ফেনা তোলা বিপুল জলরাশি ধোঁয়া তুলে আছড়ে পড়ছে নিচের খালে। ধোঁয়ার জলকণায় সূর্যের আলো রঙধনু এঁকে দিচ্ছে।

চারদিকে পাথুরে সবুজ পরিবেশ। এ ধরনের দৃশ্য সাধারণত আমরা ক্যালেন্ডারের পাতায় দেখি। এর মধ্যে পাশের পাড়ার হেডম্যান জাল নিয়ে নাফাখুমে মাছ ধরতে এসেছে। তার কাছেই জানতে পেলাম, নাফাখুম নাম হয়েছে একটি মাছের নামে। নাফা নামে এখানে একসময় বড় বড় মাছ পাওয়া যেত আর খুম মানে ঝরনা। চন্দন বলল, নাকসিয়ান নামে আরও একটা ঝরনা আছে যা দেখতে এর থেকেও সুন্দর।
হেডম্যান সম্মতি দিল। আমাদের গাইডও বলল,  আছে, তবে আমি কখনও যায়নি সেখানে।

দুপুর বারোটার মধ্যে রেমাক্রি ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। আজ সন্ধ্যের মধ্যে ব্যাট কেভ মানে বাদুর গুহা দেখে ফিরতে হবে। আমরা যখন আলাপ আলোচনা করছি তখন বোদিচন্দ্র বিশ্বাস নামে এক সাক্ষাত দেবদূত এসে হাজির হলো। আমাদের কথা শুনে বলল, আমি নাকসিয়ান চিনি। এখান থেকে জিন্নাপাড়া যেতে হবে। সেখানে রাতে থেকে খুব ভোরে নাকসিয়ার রওনা দিলে সন্ধ্যের মধ্যে আবার জিন্নাপাড়ায় ফেরত আসা যাবে।
সেদিন রাতে থেকে পরদিন রেমাক্রি। সবার চোখ চকচক করে উঠল। দেবদূত চন্দ্র দাদা কাজের খোঁজে রেমাক্রি যাচ্ছিল। কাজ করে সে প্রতিদিন ১৮০ টাকা পায়। রোজ ২০০ টাকার বিনিময়ে চন্দ্র দাদা আমাদের রাস্তা দেখাতে হাসিমুখে রাজি হয়ে গেল। তবে রেমাক্রি গাইড মং তুয়াইন বলল, সে আর যাবে না।
কী আর করা, রেস্ট হাউজে অপেক্ষমান আবুল মাঝিকে খবরটা দিতে বলে আমরা রওনা হলাম জিন্নাপাড়ার পথে।

দুপুর গড়িয়ে যাচ্ছে। হাঁটছি তো হাঁটছি, এদিকে পেট চোঁ চোঁ করছে। পকেটে সর্বসাকুল্যে আটশ’ টাকা আছে। ক্যামেরার ব্যাটারি, টেপ একেবারে লিমিটেড। বাড়তি সবকিছুই রেমাক্রি রেস্ট হাউজে রেখে এসেছি। বিষয়টা নতুন গাইড বোদিচন্দ্র দাদাকে বললাম। দাদা বলল, সামনে পাহাড়ের উপরে মেম্বার পাড়ায় আমাদের বসত। ওখানে দু’টো খেয়ে আবার রওনা দেয়া যাবে।

কিন্তু সেই পাড়া কতোদূর! পথ যেন আর শেষ হয় না। অবশেষে খাড়া ২০ তলা পাহাড় বেয়ে চন্দ্র দাদার মেম্বার পাড়ায় উঠলাম। ছোট্ট একটা পাড়া। কোনো দোকান নেই। সবাই খুব উৎসাহ নিয়ে আমাদের দেখছে। একসময় খাবারের ডাক পড়ল। জুমের লাল বিন্নি চালের ভাত, বরবটি সেদ্ধ আর পাতলা ডাল, সঙ্গে ধানি কাঁচামরিচ। ভরপেট খেয়ে মেম্বারকে খাবারের খরচ দিতে চাইলাম। মেম্বার বলল,  অতিথিকে খাইয়ে তার কাছ থেকে কীভাবে টাকা নিতে হয় সেটা তার জানা নেই। আসলেই তো, আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম এটা বাংলাদেশ।

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ অতিথিপরায়ণ মানুষ এদেশে বাস করে। হোক না সে দরিদ্র, হোক না সে পাহাড়ি।
আবার হাঁটা শুরু হলো। হঠাৎ খেয়াল করলাম, দারুণ এক প্রি-হিসেট্রেক পার্কের ভেতর দিয়ে আমরা হেঁটে যাচ্ছি। খালের পাড়ে বড় বড় পাথরের স্লেট, থরে থরে সাজানো। তার ওপরে শেকড় দিয়ে আটকে আছে বিশাল বিশাল গাছের বন। কোনোমতে পাথরের দেয়াল ধরে ধরে কোথাও কোথাও রাস্তা চলতে হচ্ছে। পাশ দিয়েই বয়ে যাচ্ছে রেমাক্রি খালের চঞ্চল পানির ধারা। দু’তিনটা পাড়া চোখে পড়ল।

পাড়ার বসতিদের সঙ্গে দেখা হলো, কথা হলো। খুবই মজার বিষয় লক্ষ্য করলাম, বান্দরবানের এতো ভেতরে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির মানুষগুলো বেশ ভালো বাংলা জানে। এভাবেই চলতে চলতে পাহাড় বাইতে শুরু করলাম। পাহাড় বাইতে বাইতে যখন একেবারে কাহিল অবস্থা আর একেবারে সন্ধ্যাও হয়ে গেছে, এমন সময় পৌঁছে গেলাম জিন্নাপাড়ার হেডম্যান রায় বাহাদুরের ঘরের সামনে।

জিন্নাপাড়ার হেডম্যান সাহেব তাদের সামাজিকতায় আমাদের আপ্যায়ন করলেন। পাড়ার সবাই জমা হলো হেডম্যানের ঘরে। সবাইকে আমাদের নাকসিয়ান যাওয়ার ইচ্ছে জানালাম। হেডম্যানের ছেলে ভাগ্যচন্দ্র আমাদেরকে নাকসিয়ান দেখানোর দায়িত্ব নিল। ওখানেই বসেই তিনজনের একটা গাইড টিম গঠন করা হলো। পারিশ্রমিক হিসেবে সব গাইডকে একদিনের কাজের মজুরি দিতে হবে। সবকিছু ঠিকঠাক। এরপর শুরু হলো গল্প। নাকসিয়ান খাল এসে রেমাক্রি খালের সঙ্গে মিশেছে।

নাকসিয়ান মানে হচ্ছে-যেখানে অনেক মাছ পাওয়া যায়। যেতে হবে তিনটি বড় বড় পাহাড় পেরিয়ে। সকাল ৬টার মধ্যে রওনা দিতে হবে। নাকসিয়ানে এ এলাকার মানুষ মাছ ধরতে যায়। ওখানে বেশকটা বড় বড় ঝরনা আছে। মৌমাছির বড় বড় চাক আছে। বড় বড় পাথর আছে। পাহাড়ের দেওয়ালের মধ্যে লেক আছে, ইত্যাদি ইত্যাদি অনেক গল্প। রাতে খেয়ে দেয়ে হেডম্যানের ঘরে ঘুম দিলাম।

সবকিছু গোছগাছ করে বের হতে হতে ৭টা বেজে গেল। প্রথমেই শুরু হলো পাহাড় বাওয়া। জিন্নাপাড়ার বিজিবি ক্যাম্প ছাড়িয়ে টানা দেড়ঘণ্টা ১১শ’ ফুট পাহাড়ে উঠে বিশ্রাম নিলাম। পেছনে ফেলে আসা পাহাড়গুলো উপরে অবস্থান করছি আমরা। দেখলাম মেঘের সমুদ্র আটকে আছে নিচের পাহাড়গুলোর চূড়ায়। এরই মধ্যে পরশু আমিয়াখুমে মাছ ধরতে যাওয়া মানুষটিকে পেয়ে গেলাম। তার পিঠের টুকরিতে কেজি দশেক মাছ আর জাল।

গাইডেরা তাদের ভাষায় রাস্তার খবর নিল। আবার শুরু হলো পাহাড়ে ওঠা-নামা। একটা কাজু বাদামের বাগান পেরিয়েই পায়ে হাঁটা পাহাড়ি পথটা গায়েব হয়ে গেল। শুরু হলো ঝোপঝাড় কেটে এগিয়ে চলা। শিবলী জোঁকের ভয়ে আগে থেকেই সজাগ ছিল, আর তাই বোধহয় নিজের পায়ের দুই আঙুলের ফাঁকে প্রথম জোঁকটা ও নিজেই আবিষ্কার করল। সবাই কার গায়ে ক’টা জোঁক ধরল সেটার হিসেব রাখার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত আর হিসেব রাখা হয়নি। জঙ্গল ঠেলে আমরা একটা পাহাড়ি ঝিরিপথ ধরলাম।

স্যাঁতসেতে ঝিরিতে উপর থেকে বড় বড় পাতা ও শেকড় ঝুলে আছে। পানি তেমন নেই কিন্তু সবুজ সাপ আছে। অনেকখানি পথ, সাবধানে দ্রুততার সঙ্গে জায়গাটা পার হলাম। শেষ পর্যন্ত বন-জঙ্গল ঠেলে আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম প্রায় খাড়া একটা পাহাড়ের মুখে। নিচে যতোদূর চোখ যায় শুধু বাঁশঝাড়। পুরাতন রাস্তাটা তেমন একটা ¯পষ্ট নয়। নিচ থেকে হালকা পানির শব্দ আসছে। ছায়াময় হিমহিম ঠা-া পরিবেশ। এই খাড়া পাহাড়ের ঢালে জায়গামতো পা পিছলে গেলে খবর আছে!

বাঁশ কেটে, মাটিতে সিঁড়ি খুঁড়ে ধীরে ধীরে অতি সাবধানে আমরা নিচে নামছি। অনেক নিচে। আস্তে আস্তে পানির শব্দটাও জোরালো হচ্ছে। হঠাৎ আশেপাশের গাছপালা, পরিবেশ পাল্টে গেল। বড় বড় পাম ট্রি, লম্বা লম্বা গাছ, গাছের গায়ে পাথরে সব জায়গায় কালচে সবুজ শেওলা চারদিকে কালচে অন্ধকার তৈরি করেছে। গাইড আবারো সবুজ সাপের কথা মনে করিয়ে দিল।

আমাদের কারোর ভেতরেই সাপ বিষয়ক আতঙ্ক লক্ষ্য করা গেল না। সবাই ছুটছে নাকসিয়ানের জন্য। নামতে নামতে হঠাৎ খেয়াল করলাম, আমাদের দলটা বেশ বড় হয়ে গেছে। জিন্নাপাড়া থেকে আরও তিনজন এসেছে মাছ ধরতে। তাদের সঙ্গে একটা গাদা বন্দুক আছে। মাছ ধরতে বন্দুক দিয়ে কী হবে জানতে চাইলে তারা বলল, এখানে চিতাবাঘ আর ভাল্লুক আছে। চিতাবাঘ তেমন একটা সমস্যা করে না তবে ভাল্লুক খুব বজ্জাত। এখানে আমরা দু’ দিন থাকব।

নাকসিয়ানের পানি এতোটাই স্বচ্ছ যে দিনের বেলা জাল ফেললে মাছ দেখে ফেলে, তাই এখানে রাতে মাছ ধরতে হয়। কথায় কথায় আমরা নেমে এলাম বিশাল পাহাড়ের খাঁজে প্রকৃতির এক অনন্য সুন্দর পরিবেশে। ব্লু লেগুনে।

নিচে নেমে সবাই বিশাল এক পাথরের বেদীতে হাত-পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম। যুদ্ধ জয়ের তৃপ্তি সবার মুখে। আধশোয়া হয়ে দেখলাম, তিন দিকে বিশাল খাঁড়া পাথুরে পাহাড়ের দেওয়াল যার একদিকে খোলা। ওই পাহাড়ের খাঁজেই রয়েছে মৌমাছির বড় বড় চাক। ঝরনার শব্দ শোনা গেলেও দেখা যাচ্ছে না। ঝরনা থেকে বাঁকা হয়ে বয়ে আসছে ফিরোজা রঙের স্বচ্ছ পানির গভীর খাল। খুব একটা প্রশস্ত নয়। এই খাল পার হয়ে ঝরনার কাছে যেতে হবে।

খাল পেরোতে হলে বাঁশের চালি বানাতে হবে। সেই চালি বানাতে তিন-চারজন ছুটল। আমরা পাহাড়ের গা বেয়ে বেয়ে ব্লু লেগুনের ওপরে একটা বড় পাথরে বিশ্রাম নিলাম। প্রায় এক ঘণ্টা পর বাঁশের চালি নিয়ে ওরা ফিরে এলো। বড়সড় চালিতে আমরা সবাই চড়ে বসলাম। দু’পাশের খাড়া পাথুরে দেয়ালের মধ্য দিয়ে চালি এগিয়ে চলল ঝরনার দিকে।

মনে হচ্ছে ইন্ডিয়ানা জোনসের কোনো এক আ্যাডভেঞ্চারে আমরা চলেছি। আস্তে ধীরে নাফাখুমের মতো একটা বড় ঝরনা চোখে পড়ল। ঝরনার কিছু আগে বাদিকের দেয়াল ঘেঁষে চালি বেঁধে ফেলা হলো। আমরা পাথর বেয়ে বেয়ে ঝরনার ওপরে উঠে পড়লাম। আশ্চর্য এক জায়গা। নাইক্ষ্যং খালের ধারা এসে অনেক উঁচু থেকে রেমাক্রি খালের মধ্যে আছড়ে পড়ছে। আন্ধারমানিকে শুনেছি পাথরের দেয়ালের মধ্য দিয়ে নৌকা চালিয়ে যেতে হয়। এখানেও তেমনটি আছে। বোনাস হিসেবে আছে নাকসিয়ান ঝরনা। আর খাঁড়া পাহাড়ের বুক চিরে গড়িয়ে পড়া বিশাল জলরাশি।

সবাই মিলে ৩টা পর্যন্ত অনেক মজা করলাম। গাইড বলল, তাড়াতাড়ি না গেলে আমিয়াখুম ঝরনা দেখতে পাবো না। মনে মনে বললাম, এর থেকে আর কী ভালো আছে যা দেখতে হবে। ঢিলেঢালাভাবে ফিরতে শুরু করলাম। নাকসিয়ানে এ পাড়ে এসে ভেজা জামাকাপড় পাল্টে রওনা দিলাম আমিয়াখুম দেখতে। নাকসিয়ান থেকে আমিয়াখুম ডাউন স্ট্রিমে হাঁটাপথ, এক কিলোমিটার মতো হবে।

কখনও বড় বড় পাথর, কখনও পিচ্ছিল পাথুরে বেদী, আবার কখনও খাল পারাপার, এভাবেই এগোচ্ছি। আমরা যে জলরাশি ধরে হাঁটছি সেই জলরাশিই যে হঠাৎ করে পাহাড়ের নিচে এতোটা গভীরে পড়ে যাবে তা দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলাম। মূলত আমরা একটা বিশাল ঝরনার ওপরে দাঁড়িয়ে আছি। আমরা এতোক্ষণ যতো সৌন্দর্য দেখেছি তার মধ্যে এই আমিয়াখুম ঝরনা আরেকটা নতুনমাত্রা যোগ করল। এর একপাশে দতং পাহাড় খাঁড়াভাবে দাঁড়িয়ে আছে, অন্যপাশে আছে নাম না জানা সেই পাহাড় যা আমরা আজ সকালেই পাড়ি দিয়ে এসেছি। দতং পাহাড়ের ঠিক পেছনেই রয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দু’টি চূড়া সাকাহাফ্লং (৩৪৯০ ফুট) ও তাজিনডং (২৭১০ ফুট)।

আমিয়াখুম দেখে সবাই অবাক হয়ে গেলাম। নিজের ওপর খুব রাগ হলো, কেন যে আরেকটু সময় হাতে করে আসলাম না এখানে। বাংলাদেশের এ যেন আরেক রূপ। কতোরকম ছলনায় যে আমাদের কাছ থেকে দূরে রাখা হয়েছিল এতোদিন। এখনও অনেক কিছুই এই জেলাতে আছে যা আমাদের অজানা রয়ে গেছে। আমাদের এই অভিযানে বান্দরবানকে আরও নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম।

তবে এই সৌন্দর্য আমাদেরকে ধরে রাখতে হবে। বান্দরবানকে তার মতো থাকতে দিতে হবে। পাহাড়ের গাছগুলোকে কেটে নিয়ে গেলে এর সবুজ সরস প্রকৃতির সেই ভালো লাগা আর থাকবে না। বনের পশু-পাখিগুলো মেরে ফেললে হঠাৎ উঁকি দেয়া মায়া হরিণটা আর দেখা যাবে না। প্রকৃতি দেখতে মানা নেই, তবে আমরা যেন প্রকৃতি দেখতে এসে নিজের খামখেয়ালিতে পরিবেশ নষ্ট এবং নোংরা না করি।

মনে রাখতে হবে, এইসব সৌন্দর্য প্রকৃতির দান, যা আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য রক্ষণাবেক্ষণ করতেই হবে। দেশের পর্যটন শিল্পের নতুন দ্বার খুলে দেয়ার অপেক্ষায় আছে বান্দরবান। এই নয়নাভিরাম সৌন্দর্য যেন কেউ হামলে খুঁড়ে খেয়ে না ফেলে সেদিকে সবার কড়া নজর রাখতে হবে। এসব ভাবছি আর এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে অনেকভাবে আমিয়াখুম ঝরনাটাকে দেখছি।

এদিকে সময় গড়িয়ে যাচ্ছে, গাইড ফিরে যাবার জন্য তাড়া দিচ্ছে। যতোখানি পথ এসেছি, ঠিক ততোখানি আবার ফিরে যেতে হবে, আবার পাহাড় বাইতে হবে। তবে এবার অন্য পথ ধরে যাব আমরা। অন্ধকারে পাহাড়ি পথ ধরে যাওয়া এক কথায় অসম্ভব। আমি আগেই বলেছি, পাহাড়ে ঝুপ করে সন্ধ্যা নেমে আসে। অপরূপ আমিয়াখুম ঝরনার সঙ্গে ক’টা ছবি তুলেই আবার পাহাড় বাইতে শুরু করলাম। হাতের ডানে তাজিন ডং -এর চূড়া দেখতে আমরা চললাম জিন্নাপাড়া। তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে নিদিষ্ট গন্তব্যে।

লেখক: পরিভ্রাজক ও ইতিহাস গবেষক

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।