Bahumatrik Logo
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৮:৪০ অপরাহ্ণ

সম্ভাবনাময় বিদেশি ফল স্টার আপেল


০২ আগস্ট ২০১৪ শনিবার, ১১:৫৫  এএম

ড. শৈলেন্দ্র নাথ মজুমদার

বহুমাত্রিক.কম


সম্ভাবনাময় বিদেশি ফল স্টার আপেল

বিএআরআই, গাজীপুর: স্টার আপেল সফেদা (Sapotacee) পরিবারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গ্রীস্ম মন্ডলীয় ফল। এর বৈজ্ঞানিক নাম (Chrysophyllum cainito L)। স্পেনে এটাকে কাইমিটা বা এস্টেরেলা, ওয়েস্ট ইন্ডিজে পোম সুরেট, বারবাডোজে স্টার পাম, কলম্বিয়াতে কাইমো, আর্জেন্টিনাতে আগুয়ে বা অলিভোয়া, চীন বা সিঙ্গাপুরে এটাকে চিকল ডুরিয়ান বলা হয়। তবে এর ভিতরের বীজগুলি ও পাল্প স্টার (*) এর মত থাকায় সাধারণ ভাবে এটাকে স্টার আপেল বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশের আবহাওয়া এটি ভালভাবেই  অভিযোজিত এবং ভাল ফলন ও গুনগত মানের ফল পাওয়া যাচ্ছে।

উৎপত্তি ও বিস্তারঃ সাধারণভাবে স্টার আপেল সেন্ট্রাল আমেরিকার ফল বলা হলেও এ নিয়ে মতভেদ আছে। কারও মতে এর উৎপত্তি মেক্সিকো ও পানামা অথবা ওয়েস্ট ইন্ডিজ। গুয়াতে মালা, উত্তর আর্জেন্টিনা, পেরু, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুজ, বাবমুদা, হাইতি, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও হাওয়াই প্রভতি অঞ্চলে বর্তমানে স্টার আপেল প্রচুর চাষ হয়। ইদািনং সামুয়া, মালয়, উত্তর ভিয়েতনাম, উত্তর ট্রপিক্যাল আফ্রিকা, জাঞ্জিবার প্রভৃতি আঞ্চলে এ ফলটি বেশ জন্মাতে দেখা যাচ্ছে।

উদ্ভিদতত্ত্বঃ স্টার আপেল গাছ মাঝারি আকারের (৮-৩০ মিটার) উচ্চতা, ছোট কান্ড (১-৩ মিটার) বাদামী রোমশ এবং শাখা কাটলে সাদা কষ বের হয়। এর গাড় সবুজ প্রায় চর্মবৎ পাতার নিচের দিক খয়েরী রঙের সুক্ষ রোমযুক্ত। পাতা ৫-১০ সে.মি.লম্বা ও ৪-১০ সে.মি. চওড়া হয়ে থাকে। পত্র কক্ষে ছোট গুচ্ছে সবুজাভ হলুদ বর্নের ফুল উৎপন্ন হয় যাতে ৫টি দল থাকে।

ফল গোলাকার কখনো সামান্য ও ভাল বা লম্বাটে, ৫-১০ সে.মি.লম্বা ৫-১০ সে.মি.ব্যাস যুক্ত সবুজ থেকে বেগুনী বর্নের হয়ে থাকে। ফলের ভিতরে নরম জিলেটিনযুক্ত দুগ্ধবৎ সাদা মিষ্টি স্বাদযুক্ত পরস্পর সংযুক্ত ৬-১১টি কোষ থাকে যা কেন্দ্রীয় অক্ষের চতুর্দিকে ঘনসন্নিবিশিষ্ট থাকে। আডাআড়ি কাটলে এটা এ স্টার বা তারার মত দেখায় বলে সম্ভবত এ ফলটিতে স্টার আপেল বলা হয়।

ফলত্বক বা খোসা ৫-১০ মি.মি.পুরু নরম ও কস্টা থেকে তিক্ত স্বাদবিশিষ্ট এবং খাওয়ার অনুপযোগী।
ফলের ভিতরে কাল বর্নের ১.৫-২.০ সে.মি.লম্বা, ১-১.২৫ সে.মি. চওড়া ও ৪-৬ মি.মি.পুরু ৩-১০ টি পর্যন্ত বীজ থাকতে পারে। তবে সবগুলি লোব বা কোষ বীজ থাকে না। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ৩-৫টি বীজ দেখা যায়। বীজ শুকালে হালকা বা কালচে বাদামী রং ধারন করে।

আহাওয়া ও মাটিঃ স্টার আপেল ট্রপিক্যাল বা সাব ট্রপ্রিক্যাল অঞ্চলে এলাকায় ৪২০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত জন্মাতে দেখা যায়। গরম আবহাওয়া এটা ভাল জন্মে। তাপমাত্রা হিমাংকের বা তার নিচে নেমে গেলে এ গাছ মারা যায়। স্টার আপেল যে কোন ধরনের সুনিস্কাশিত গভীরতা সম্পন্ন বেলে থেকে এটেঁল মাটিতে চাষ করা যেতে পারে।

জাতঃ স্টার আপেল এর ফলত্বকের রং অনুসারে দুই ধরনের জাত দেখা যায়। একটি সবুজ ও অন্যটি বেগুনী রং এর হয়ে থাকে। ভাল ফল ধরে এমন গাছ থেকে অংগজ উপায়ে তৈরিকৃত কলম লাগানো ভাল। শাখা কলমের চারা ২-৪ বছর পর অপরদিকে বীজ এর চারায় ৭-১০ বছর বয়সে ফল দেয়।

বংশবিস্তারঃ বেশীর  ভাগ ক্ষেত্রে স্টার আপেল বীজ থেকে উৎপন্ন চারা ব্যবহার করা হয়। এর বীজে বেশ কয়েক মাস অংকুরোদগম ক্ষমতা থাকে এবং রোপনের পর দ্রুত (৭-১০ দিন) চারা গজায়। গুটি কলমে ৪-৭ মাসে শিকড় আসে। একই জাতের গাছের বীজ থেকে উৎপাদিত  চারার উপর বাডিং বা গ্রাফটিং এর মাধ্যমে ও বংশ বিস্তার করা যায়। বাডিং বা গ্রাফটিং এর চারা লাগানোর ১/২ বছর পরই গাছে ফল ধরতে শুরু করে অপরদিকে বীজ চারা থেকে রোপিত গাছ ৫ থেকে ১০ বছর পর ফল ধরে।

চাষাবাদঃ ভাল নিকাশযুক্ত যে কোন রকম মাটিতে স্টার আপেল গাছ ভাল জন্মায়। ৬-৮ মিটার দুরে দুরে বর্গাকারে বা ষড়ভূজী পদ্ধতিতে অন্যান্য ফল যেমন আম লিচু ইত্যাদির মত করে গাছ লাগানো যায়। মাঝারী আকারের গাছ বিধায় চারা লাগানোর আগে চারার জায়গায় ৪৫ সেন্টিমিটার (১ হাত) ব্যাসের ৪৫ সে. মি. গভীর গর্ত করে তাতে ১ ঝুড়ি পচা আবর্জনা বা পুকুরের তলার সার মাটি, আধা কেজি টি.এস.পি বা ১ কেজি এস.এম.পি অথবা ৩ কেজি হাড়ের গুড়া, ২৫০ গ্রাজ এম.পি অথবা ২ কেজি চূলার ছাই দিয়ে তা ভালভাবে মাটির সাথে মিশিয়ে গর্ত ভরাতে হবে। এবং তার ৭-১০ দিন পর চারা লাগাতে হবে।

পরিচর্যাঃ সদ্য লাগানো চারা গাছে প্রথম ৬ মাস পর্যন্ত সাপ্তাহিক ভাবে নিয়মিত পানি সেচ দিতে হবে। পরবর্তীতে মাটিতে রস না থাকলে সেচ দিতে হয়। তবে গাছে ফুল আসার পর পানি সেচ দিলে ফল ধারন বৃদ্ধি পায়। স্টার আপেল গাছে তেমন সার প্রয়োগ করা হয় না তবে দুর্বল মাটিতে সার প্রয়োগে ফলের আকার ও ফলন বাড়ে।

গাছের গোড়ার দফায় দফায় বছরে ৬-১০ ঝুড়ি পুকুরের তলার মাটি বা সার মাটির ঢেলা, ৫-৬ কেজি হাড়ের গুঁড়া ও ১০ কেজি ছাই দিলে আশাতিরিক্ত ফল পাওয়া যাবে। কারন এতে গাছ নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশ, চুন, ইত্যাদি খাবার পাবে এবং এর সাথে শুকনা মৌসুমে ১৫ দিন পর পর চার পাঁচ বালতি পানি দিলে এ খাবার গ্রহন করা গাছের পক্ষে সহজ হবে এবং গাছ দ্রুত ফলবতী হতে সক্ষম হবে।

ফল সংগ্রহঃ শীতের শেষ থেকে গ্রীস্মের প্রথম প্রর্যন্ত স্টার আপেল এর পাকা ফল সংগ্রহ করা যায়। তবে আমাদের দেশে চৈত্র মাস (মার্চ-এপ্রিল) সবচেয়ে বেশী পাকা স্টার আপেল পাওয়া যায়। গাছ থেকে পাকা ফল এর রং কিছুটা হালকা হয়ে এলে আর ফলত্বক স্পঞ্জ এর মত বা রাবার বলের মত নরম হলে ফল সংগ্রহ করা হয়। কাঁচা ফলে আঠা ও কষ্টা ভাব থাকে ফলে খাওয়া যায় না। গাছ থেকে সাবধানে পাড়তে হয় কেননা মাটিতে পড়লে নরম ত্বকের এ ফল ফেটে যায় ও বাজার মূল্য কমে যায়।

ফলনঃ একটি প্রাপ্ত বয়স্ক ফলন্ত গাছ থেকে গাছের আকার ভেদে প্রতিটি ৫০-১০০ গ্রাম ওজনের ১৫০০-৩০০০ টি ফল পাওয়া যেতে পারে যার ওজন ৬০ থেকে ২৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।

ফল সংরক্ষণ: সাধারণভাবে পাকা ফল ২/৩ দিন রাখা গেলেও ৩-৬ সে. তাপমাত্রায় ৯০% আদ্রতায় ও সপ্তাহ পর্যন্ত এ ফল সংগ্রহ করা যায়। পাহাড়াঞ্চল কৃষি গবেষণা কেন্দ্র রামগড়এ এক গবেষণায় দেখা গেছে ষ্টার আপেল ফল সাধরন তাপমাত্রায় খোলা অবস্থায় রাখলে ২/১ দিনেই চামড়া শুকিয়ে কুচকে যায় এবং বাজার জাত অনুপযোগী হয়ে পড়ে। তবে এর ভিতরের অংশ ৪/৫ দিন ভাল থাকে। কাগজের বা কাগড়ের মোড়কে অথবা ছিদ্রযুক্ত পলিব্যাগে রাখা হলে সাধারন তাপমাত্রায় ১ সপ্তাহ এবং নি¤œ তাপমাত্রায় (৩-৬০ সে.) স্টার আপেল ১ মাস ভাল অবস্থায় রাখা যায়।

ব্যবহার ও পুষ্টি উপাদান: স্টার আপেল এর বীজ ও খোসা বাদে ভিতরের মাংসল অংশ (৫০%-৬০%) খাওয়া যায়। এর ভিতরের নরম দুগ্ধবৎ সাদা অংশ অনেকটা কচি ডাবের শ্বাঁসের মত তবে তুলনামূলকভাবে বেশী মিষ্টি। এর খোসা ও বীজ কিছুটা তিক্ত স্বাদের কারনে তা খাওয়া যায় না।

পাকা ফলের মাঝ বরাবর ছুরি দিয়ে কেটে চামচ দিয়ে ভিতরের অংশ তুলে খেতে এটা খুবই সুস্বাদু। এর নরম শাঁস থেকে বীজ আলাদা করে ডেজার্ট হিসাবে ও সালাদের সাথে খাওয়া যায়। জামাইকাতে এটাকে বিবাহ উৎসবে খাওয়া হয় ।অনকসময় স্ট্রবেরী ও ক্রীম সহযোগেও স্টার আপেল খাওয়া হয়। এর তিক্ত স্বাদের দুধসাদা কষ এবং বীজের শাঁস অনেক সময় ড্রিংক ও কনফেকশ্নারীতে ব্যবহৃত হয়। 

স্টার আপেল এর পাকা ফল খেলে ফুষফুসের প্রদাহ ও নিউমোনিয়া রোগের উপশম হয়। এর ফল ডায়াবেটিস রোগে ব্যবহৃত হয়। ভেনিজুয়েলাতে পাকস্থলী ও অন্ত্রের গোলযোগে কম পাকা ফল খাওয়া হয়।
তবে এরূপ কাচা ফল বেশী খেলে কেষ্ঠকাঠিন্য দেখা দিতে পারে।

পানিতে ফুটানো ফলের খোসা, বাকল ও পাতার ক্কাথ গার্গল করলে এনজিনা উপশম হয় ও এটা পেক্টোরাল হিসাবে ব্যবহৃত হয়। এর ট্যানিন সমৃদ্ধ বাকল উত্তেজক হিসাবে, ডায়রিয়া প্রতিরোধে, আমাশয়ে, রক্তপাত বন্ধে এবং গনোরিয়া রোগের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। কিউবাতে এটা ক্যানসার প্রতিরোধক হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

স্টার আপেল এর তিক্ত ঝলসানো এবং চুর্ণকৃত বীজ টনিক হিসাবে, মুত্রবর্ধক এবং ফেব্রিফিউজ হিসাবে সমাদৃত। ব্রাজিল ও ল্যাটিন আমেরিকায় ট্যানিন সমৃদ্ধ লেটেক্স বা কষ শুকিয়ে গুড়া করে টনিক, কার্সিনোজেনিক এবং ভার্মিফিউজ হিসাবে ব্যবহৃত হয়।  ষ্টার আপেল গাছের আঠা মোমের বিকল্প হিসাবে কাঠের আসবাবপত্রের ছিদ্র এবং ফাটল বন্ধ করার কাজে ব্যবহার করা হয়। ষ্টার আপেল গাছের সার কাঠ বেশ শক্ত যা গৃহস্থালীর কাজে, সৌখিন ফার্নিচার এবং নির্মান শিল্পে ভালভাবেই ব্যবহার করা যায়।

লেখক: উর্ধতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, গাজীপুর

shailenbari95@yahoo.com 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।