Bahumatrik Logo
১৯ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ০৩ ডিসেম্বর ২০১৬, ১২:৪২ অপরাহ্ণ

আসুন খাসিয়াদের জানি


২৬ জুন ২০১৪ বৃহস্পতিবার, ০৪:০৭  পিএম

এ কে এম মাজহারুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


আসুন খাসিয়াদের জানি

(পূর্ব প্রকাশের পর)

সামাজিক সংগঠন
গোত্র ও গোষ্ঠী: খাসি সমাজের মূল স্তম্ভ হচ্ছে কুর বা কুল বা বংশ। কুল-এর ভিত্তি করে তাদের সমাজ ও ধর্মীয় সামাজিক কর্মাদি আবর্তিত হয়। কুর হচ্ছে একটি গোত্র বা গোষ্ঠী বা সম গোত্র বংশ এবং পরিবার বর্গ যারা একই আদি মাতা হতে উৎপত্তি লাভ করেছে। তারা পরস্পরের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে পারে না। খাসিদের বিশ্বাস যে, আদিতে সাতটি খাসি পরিবার ছিল এবং এ সপ্ত পরিবারের ৭ জন আদিমাতা বা Family eve ছিলেন।

জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে এবং বাসস্থান পরিবর্তনের কারণে এ ৭ টি আদিমাতা হতে আরও অনেক আদি উপমাতার সৃষ্টি হতে থাকে। খাসি সমাজে এ ধারাটি এখনও বজায় রয়েছে। প্রতিটি বংশে তিন উপমাতা বা ৮ জেনারেশন পর নতুন উপ আদিমাতা সৃষ্টি হতে পারে এবং নতুন উপাধি গ্রহণ করা যায়। এ নতুন উপধি বা জাহদের (Jaid) সাথে তাদের মূল কুর এর সম্পর্ক বজায় থাকে। খাসিদের পদবি বা টাইটেল এর সংখ্যা প্রায় হাজারের অধিক। কুর বিভক্ত হয়ে জাড সৃষ্টি হয়। জাড বাকুর এর অধীনে কয়েকটি পরিবার সৃষ্টি হয় পরিবার ( Ka ling) দুই বা তিন প্রজন্মের সদস্যদের নিয়ে গঠিত।

একটি জাড বা কুর অন্য একটি কুরের সাথে কুর বা আত্মীয় সম্পর্ক স্থাপন করতে পারে। মূল কুর বা বংশের প্রত্যেক আদিমাতা বা প্রত্যেক আদি উপমাতা থেকে গৃহীত উপাধিই নামের সাথে যুক্ত থাকে এবং এটাই তার গোত্র পরিচয়। উত্তরাধিকার মূত্রটি মাতার দিক থেকেই গণ্য করা হয়। তবে এ সমাজে মূল ক্ষমতাধারী লোক হলেন বড় মামা। তিনি একাধারে নেতা, কুর বা বংশ বা পরিবারের শিক্ষক, শাসক ও গুরু। যিনি সম্পত্তি দেখাশোনা করেন। তবে পরিবারের আদি সম্পত্তি ভাই বোন অর্থাৎ মায়ের ছেলেমেয়েদের জন্য ব্যয় করা হয়। মামাদের নিজের ছেলেমেয়েদের জন্য কদাচিৎ ব্যয় করা হলেও তা শুধু তাদের ভরণ পোষণের জন্য। প্রতিটি কুর বা বংশ পরিবারের মধ্যে একটি পরিষদ থাকে, যেখানে পরিবার বা গোত্রের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করা হয় এবং বিভিন্ন সিদ্ধান্তগুলো বাস্তবায়ন করা হয়।

অঞ্চল ও ভাষাভিত্তিক অবস্থান: খাসি সমাজে অঞ্চলভিত্তিক বা আঞ্চলিক ভাষাগত পার্থক্যের কারণে কয়েকটি ভাগ রয়েছে। তবে এ আঞ্চলিকতা কোন গোত্র নয়। অঞ্চল ভেদে শিলং মালভূমি অঞ্চল খাসিদেরকে খেনরিয়াম, পূর্ব অঞ্চলের অর্থাৎ জৈন্তিয়া পাহাড়ে বসবাসরতদের দক্ষিনাঞ্চলদেরকে ওয়ার এবং আসাম সংলগ্ন উত্তর অংশের খাসিদের ভয় এবং সর্ব পশ্চিমাঞ্চলে বসবাসরতদের লিঙাম বলা হয়। বাংলাদেশে ওয়ার ভাষাভাষীদের সংখ্যা বেশি। লিঙামরা সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা অঞ্চলে বসবাস করছে।

পরিবারের ধরণ: বাংলাদেশের খাসিরা সাধারণত একটি পুঞ্জিতে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস করে। এক্ষেত্রে তাদের পবিবার কাঠামো ছিল প্রধানত যৌথ পরিবারই। কিন্তু বর্তমানে নানা কারণে তা ভেঙ্গে যাচ্ছে। বিবাহের পর বাবার বাড়ি বা শশুরবাড়িাতে না গিয়ে নতুন বাড়িতে ওঠে। পুঞ্জিতে যৌথ পরিবারের অস্তিত্ব থাকলেও এখন একক পরিবার বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। খাসি সমাজ মাতৃসূত্রীয় সমাজ বিধায় সন্তানেরা মায়ের পদবী গ্রহণ করে থাকে এবং এই কারণে সম্পত্তিতে নারীরদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। তবে মাতৃসূত্রীয় এ সমাজে পরিবারের কর্তা মামা হলেও গোষ্ঠী বা বংশের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী হলেন মামা।

তবে পরিবারের সাধারণ বিষয়ে নারীদের মতামত নেওয়া হয়। বাংলাদেশে পারিবারিক ব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে নারীরাই পরিবারের কর্তা হিসেবে ভূমিকা রাখে। ঐতিহ্যগতভাবে খাসিদের অর্থনীতি পরিবার বা বংশের নিয়ন্ত্রণাধীনে থেকে যে কাউকে দিতে পারে। সে নিজের জন্য অথবা বোনের জন্য অথবা ছেলেমেয়েদের জন্য ব্যয় করতে পারে। অবিবাহিত পুরুষরা মা বাবার জন্য আয় রোজগার করে।

জীবনচক্র

জন্ম : খাসি পরিবারে সন্তান জন্মগ্রহণ করা সবার জন্যই খুশির খবর। মাতৃসূত্রীয় সমাজে কুল বা বংশ রক্ষার্থে মেয়ে সন্তান সকলের কাম্য। আগেকার আমলে গর্ভবতী মেয়েদের খুবই যত্ন করা হতো এবং বিভিন্ন ধর্মীয় আচার অনুসরণ করা হতো। সন্তান জন্মের পর তার নাম রাখার পর্ব পালন করা হতো। এটাকে জের খুন (Jar Khun বলা হয়। এক্ষেত্রে কয়েকটি চিহ্ন ব্যবহৃত হয়। ছেলে হলে আরাধনা স্থানের সামনে তরবারি, ধনুক ও তীর রাখা হয়। মেয়ে হলে ঝুড়ি এবং ঝুড়ি বাহনের ফিতা রাখা হয়।

নাম রাখার পর্বে সাধারণত তিনটি নাম উপস্থাপন করা হয়। কোনো নাম রাখা যাবে সেটি ধর্র্মীয় আচারের মাধমে নির্ধারিত হয়। লাউ এ চুঙ্গা হতে পানির ফোটা ছিটানোর মাধ্যমে অথবা ডিম ফাটানোর মাধ্যমে অথবা বাঁশ টুকরার মাধ্যমে (লটারির কার্যক্রম) দেবদেবীর ইচ্ছা অনিচ্ছা জানার চেষ্টা করা হয়। নাম রাখার পরের দেবদেবী সন্তুষ্ট থাকার সম্ভাবনা থাকে না। এটা থেকে মুক্তির যে পর্বটি রয়েছে একে বলা হয় তার লুবড়ী (Ka tap lubri/confirmation) । যদি সন্তানের স্বাস্থ্য ঠিকঠাক থাকে তাহলে ধরে নেওয়া হয় যে সব ঠিক আছে। কিন্তু ব্যতিক্রম হলে এই পর্ব করা হয়। এক্ষেত্রে ধর্মকর্মের মাধ্যমে অর্থাৎ প্রার্থনার পর ছেলেকে একটি জেকেট (Jymphong) এবং মেয়ে হলে জাইন কেরশ্ (Jain kyrshah) নামক গামছা প্রদান করা হয়। বর্তমানে এ আচারগুলো পালন হয় না বললেই চলে।

কৈশোর ও যৌবন : একজন ছেলে বা মেয়ে শৈশবে মা-বাবা, ভাইবোন, আত্মীয়স্বজন ও পাড়াপ্রতিবেশীদের সহযোগিতা ও øেহে গড়ে ওঠে। মেয়েরা ১৪ বছরের অধিক হলেই মায়েরা তাদের পোশাক পরিচ্ছেদের দিকে নজর রাখার উপদেশ দেয় এবং বাহিরে চলাফেরার করার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ছেলেরা কৈশোরে অধিক স্বাধীন জীবন-যাপন করে। এমনকি শিক্ষা সচেনতার অভাব ও সমাজের স্বাধীন চলাফেরার কারণে কিশোর-কিশোরী বয়সে বিবাহিত হতে দেখা যায় অনেককে। যুবরা পরিবারের আয়-উন্নয়নের কাজে জড়িত হয়। এসময় অনেকে পুঞ্জির পরিচালনা কমিটির সদস্য হিসেবে কমিউনিটি পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন।

বিবাহ : খাসি সমাজের একই গোত্র বা বংশের মধ্যে বিবাহ সম্পূর্ণ নিসিদ্ধ। একই গোত্রের বিবাহকে সমাজে মহাপাপ হিসেবে গণ্য করা হয়। বিবাহযোগ্য সম্ভাব্য ছেলেমেয়েদের ব্যাপারে অভিভাবকরা অবগত হলে পাত্রের অভিভাবক এবং আত্মীয়স্বজনরা পাত্রীর অভিভাবকদের কাছে প্রস্তাব নিয়ে যায়। তবে প্রস্তাবের আগে ধর্মীয় আচার, রীতিনীতি, গোত্রীয় সম্পর্ক ও সামাজিক ভালমন্দ যাচাই করা হয়। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রস্তাব অনুসারে বাগদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বাগদানের কিছু দিন পর বিবাহ অনুষ্ঠান আয়োজন করে বিয়ের কাজ সম্পাদিত হয়।

বিয়ে সম্পাদনের জন্য উভয় পক্ষের জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রয়োজন। মধ্যস্থতাকারীগণই বর ও কনের পক্ষে বিবাহ মঞ্চে ওকালতি করে। ধর্মীয় কার্যক্রম শেষ হওয়ার পরই জনসম্মুখে প্রচার করা হয়। তারপর বিয়ের ভোজ পরিবেশিত হয়। এলাকা ভেদে বিয়ের রীতি নীতি ভিন্ন হতে পারে। বর্তমানে অধিকাংশ খাসি খিস্ট্রধর্মাবলম্বী হওয়ায় তাদের বিবাহ ব্যবস্থায় পাশ্চাত্যের প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। আগেকার বিবাহ সংস্কৃতি প্রায় বিলুপ্তির পথে।

বিয়ের পর স্বামী স্ত্রী কোথায় থাকবে তা আগেই ঠিকঠাক করা হয়। খাসিদের মাতৃসূত্রীয় সমাজে পুরুষ বউ নিয়ে হুট করে মায়ের ঘরে উঠতে পারে না। তবে বিয়ের পরে স্ত্রী তার মায়ের ঘরে থাকলেও তা মেনে নেওয়া হয়। বিবাহের পর স্বামী স্ত্রী নতুন ঘরবাড়ি করে সংসার করতে হয়। তবে সর্বকনিষ্ঠা কন্যার বরকে অনেক ক্ষেত্রেই ঘর জামাই হওয়া বাধ্যতামূলক। সামাজে একক বিবাহ প্রচলিত। তবে পুরুষ ক্ষেত্র বিশেষ গোপন স্ত্রী রাখতে পারে। কোনো সন্তান সন্ততি না হলে, পুরুষের অত্যাচার, নির্যাতন, মদ্যপান, ব্যভিচার ইত্যাদি কারণে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে থাকে।

বৃদ্ধাবস্থা: বর্তমানে সমাজ ও সংস্কৃতি পরিবর্তনের কারণে বিবাহিত পুরুষদেরকে ছেলে-মেয়েদের সাথেই সারাজীবন অতিবাহিত করতে হয় এবং ছেলে-মেয়েরাই বাবার দেখাশোনার দায়িত্ব নেয়। আগেকার সময়ে বিবাহিত পুরুষের কঠিন রোগ বা সমস্যা হলে, সে অনায়াসেই মা বা বোনদের কাছে ফিরে যেতে পারতো এবং তারা তার সেবা-যতেœর দায়িত্ব নিতো। তাই বায়োজ্যেষ্ঠ হলেও মা-বাবার সেবা যত্নের তেমন কোনো অসুবিধা হতো না। এ ক্ষেত্রে বিবাহিত পুরুষ সাধারণত তার মা-বাবা বা বোনের ঘরে মৃত্যুবরণ করতো এবং তার পরিবারের কর্তাগণ তার সৎকার করতো। কিন্তু বর্তমানে বৃদ্ধ পুরুষরা স্ত্রী-সন্তানদের সান্নিধ্যে থেকেই মৃত্যুবরণ করে। বৃদ্ধ বয়সে তাদের মা-বাবা বা বোনের ঘরে নিয়ে যাওয়ার আর প্রয়োজন হয় না।

সৎকার : খাসি সমাজে মৃত্যু ও সৎকার অনুষ্ঠান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সাথে মৃত ব্যক্তির এবং তার আত্মীয়সজনদের ভালো মন্দ জড়িত বিদ্যমান। কেউ মারা গেলে তাকে গোসল করিয়ে নতুন কাপড় পরিয়ে দেওয়া হয়। নিকট আত্মীয়স্বজনদের খবর দেওয়া বাধ্যতামূলক। মৃত ব্যক্তির লাশ সাদা কাপড় দিয়ে ঢেকে দেওয়া হয়। নিকট আত্মীয়স্বজনেরা শোক পালন করে থাকে। মৃত ব্যক্তির আত্মার পথ প্রদর্শক স্বরূপ মোরগ উৎসর্গ করা হয়। দূর-দূরান্তের আত্মীয়দের জন্য মৃত দেহ এক রাত বা দুরাত পর্যন্ত রাখা হতে পারে। পরিবারের সাধ্য অনুযায়ী বিভিন্ন উৎসর্গ প্রদান করা যায়।

চিতা সাজানোর পর একটি কাঠের বাক্সে ঢোকানো হয় এবং চার জন ব্যক্তি মৃত ব্যক্তির চিতার বাক্স কাঁধে নিয়ে যায় পুড়ানোর জন্য। দাহ করার আগে আগে কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। উৎসর্গ, প্রার্থনা ও অন্যান্য ধর্মীয় আচার শেষে তার নিকট আপনজন মামা বা ভাই বা বাবা প্রথম অগ্নি সংযোগ করেন এবং তাকে অনুসরণ করে সকলেই এক এক করে চিতায় আগুন দেয়। এ সময় মৃত আত্মার স্বর্গ লাভ ও পরজীবনের জন্য প্রার্থনা করা হয়। মৃত ব্যক্তির সমন্ত দেহ পুড়ে ছাই হয়ে গেলে পানি দিয়ে নিভিয়ে ফেলা হয়। সেখান থেকে সারা অস্থি ও দেহাবশেষ সংগ্রহ করে সাদা কাপঢ়ে বেঁধে রাখা হয়। এসময় ধর্মীয় কিছু আনুষ্ঠানিকতা রয়েছে। অস্থি বা দেহাবশেষগুলো নিয়ে একটি বিশেষ স্থানে কবর দেওয়া হয় বা সংরক্ষণ করে রাখা হয়।

কুলবংশ বা পরিবারের মৃত ব্যক্তিরদের দেহাবশেষগুলো বিভিন্ন অস্থায়ী কবর বা সংরক্ষণ ভুমি হতে যোগাড় করে একটি মাত্র স্থানে জড়ো করা হয়। মৃত ব্যক্তির ফেলে যাওয়া আপনজন ও সন্তান- সন্ততিদের সান্ত্বনা প্রদানের জন্য তিন দিন তিন রাত শোক দিবস পালন করা হয়। পাড়া প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনরা এ সময় শোক-সন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সান্ত্বনা ও সহযোগিতা করে থাকেন। এটাকে ছেপ বলা হয়। মৃত ব্যক্তির দেহাবশেষ সংরক্ষণ করে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং সাধ্য হলে স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করা খাসি ধর্ম ও আচারের গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান। এ পর্বকে বলা হয় থেপ মাওবাই (Thep mawbah) অর্থাৎ মৃত ব্যক্তিদের অস্থি দেহাবশেষ এক স্থানে জড়ো করা । এক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিবারের অস্থি সংরক্ষিত ভূমি হতে এনে মূল সমাধি ভুমিতে নিয়ে যাওয়া হয়। কুল বা বংশের কর্তাগণ আলাপ আলোচনা করে এ দিন নির্ধারণ করে। এটা একটা বিরাট আয়োজন এবং সকল মানুষকে এ অনুষ্ঠানে নিমন্ত্রণ করা হয়।

ঐতিহ্যগত সামাজিক সংগঠন/ প্রতিষ্ঠান

পুঞ্জি ভিত্তিক মন্ত্রী প্রথা : বাংলাদেশের খাসিরা টিলা, উঁচু ভূমি, সমতল ভূমি বা পাহাড়ে বা যেখানেই থাকুক না কেন তারা সংঘবদ্ধ ভাবে কাছাকাছি অবস্থানে থেকে ঘরবাড়ি করে। ঐতিহ্যগতভাবে কিছু কিছু সম্পত্তির উপর সকলের অধিকার থাকে। এভাবে কিছু অঞ্চলে যৌথ সম্পত্তি (collective ownership) বিদ্যমান। ১০ থেকে ১০০ পরিবার নিয়ে এক একটি গ্রাম। গড়ে ৩০টি ঘর বা পরিবার থাকে । স্থানীয় সিলোটি ভাষায় এ গ্রামগুলো পুঞ্জি নামে পরিচিত। চেরাপুঞ্জি থেকে পুঞ্জি শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে বলে অনেকের ধারণা।

সামাজিক বিষয় ও উন্নয়ন পরিচালনার জন্য প্রতিটি পুঞ্জিতে রয়েছে ঐতিহ্যগত প্রশাসনিক কাঠামো। পুঞ্জি বা গ্রামে সামাজিক বিচার ও অন্যান্য কার্যাদি পরিচালনার জন্য এক একটি ক্ষুদ্র পরিষদ থাকে। এটাকে উঁৎধনধৎ ংযড়হড়হম বলা হয়। গ্রামের ভিতরে রেজিস্ট্রিকৃত বা জমিজমা আছে এমন সকল পুরুষ এ পরিষদের সদস্য হতে পারে। তবে প্রতিটি পরিবার থেকে একজন সদস্য উপস্থিত হওয়া বাধ্যতামূলক। এ দরবারের প্রধানকে মন্ত্রী বা ম্যান্ত্রি বা হডম্যান ডাকা হয়। দরবার বছরে এক বা দুবার বসে এবং দরবারে গ্রামের হিসাবপত্র, বার্ষিক রিপোর্ট, দেনা পাওনা এবং অন্যান্য নতুন আইনকানুন পাশ হয়। বছরের অন্যান্য দিনে সৃষ্ঠ সমস্যা সমাধানের লক্ষে কয়েকজন মুরব্বি নিয়ে একটি ছোট পরিষদ গঠিত হয়।

এটি সাধারণত হেডম্যনকে সাহায্য সহযোগিতার জন্য গঠিত হয়। হেডম্যান বংশানুক্রমে নির্বাচন বা নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা প্রাপ্ত হয়। বাংলাদেশে হেডম্যানগণের দায়িত্ব, কর্তব্য ও ক্ষমতা পরিলক্ষিত হয়। দরবার বা পরিষদ প্রথা খুবই কার্যকরী এবং দরবারে জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশগ্রহণ করে এবং নিজেদের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ করে। দরবারে সামাজিক বিধি নিষেধ, উন্নয়ন, রাস্তাঘাট, নিরাপত্ত, বিচার, শাসন ইত্যাদি বিষয়ের ফয়সালা হয়ে থাকে। সমতল ভূমিতে অর্থাৎ সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা অঞ্চলে বসবাসরত খাসিদের মধ্যে মন্ত্রী প্রথা নেই। তবে প্রতিটি গ্রামে গ্রাম মোড়ল বা হেডম্যান থাকেন যারা জনগণের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। ভারতে মন্ত্রী প্রথা নেই এবং ভারতের খাসিদের গ্রাম্য ব্যবস্থা আরো সংগঠিত।

বংশ পরিষদ : আগেরকার আমলে প্রতিটি ইয়িং বা পরিবারের বিশেষ এক একটি জনপরিষদ থাকতো। পরিবারের সকল সদস্য অর্থাৎ একই উপাধি প্রাপ্ত সাবালক পুরুষ সদস্য এবং কোনো বিশেষ ক্ষেত্রে মহিলা সদস্যরা এ পরিষদে বসতে পারে। ভাইয়ের স্ত্রী বা বোনের স্বামী এ পরিষদের সদস্য হতে পারে না। এখানে মূলত সম্পত্তি, বিবাহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, ছেলে মেয়েদের ভালো মন্দ, ভবিষ্যৎ, পড়ালেখা, দ্বন্দ্ব, ধর্মীয় কার্যদি ইত্যাদি বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ ধরনের আনুষ্ঠানিক পরিষদের অস্তিত্ব নেই বললেই চলে।

যেহেতু অনেক পরিবার নিয়ে একটি পরিষদ সৃষ্টি হয় তাই বংশের সদস্যদের নিয়েও একটি পরষদ স্থাপিত হতে থাকে। এটাকে বংশ পরষদ বা সেংকু (sen koor) ডাকা হয়। বংশের অন্তর্ভুক্ত পরিবার ও ব্যক্তিদের প্রধান প্রধান সমস্যা যেগুলো পারিবারিক দরবার বা জনপরষদের সমাধান যোগ্য নয়, সেগুলো বংশ পরষদে সমাধান করা হয়ে থাকে। আদিকালে এ পরিষদ খুবই ক্ষমতাপূর্ণ ও প্রতাপশালী ছিল। প্রয়োজনে এ পরিষদ অন্য গোত্র বা এলাকার বিরোদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা দিতে পারতো এবং বংশের সকল সদস্য কমান্ড মানতে বাধ্য। বংশের সকল বয়স্ক পুরুষ এ পরিষদের সদস্য এবং এদের মধ্যে যোগ্য ও সর্বজ্যেষ্ঠ মামাকে সভাপতি করা হয়।

খাদ্দুহ্ বা সর্বকনিষ্ঠা প্রতিষ্ঠান : খাসি সমাজের বিভিন্ন সামাজিক-ধর্মীয় প্রথা, উৎসব-অনুষ্ঠান, রীতিনীতি পালন ও গোত্র আলোচনা সম্পাদনের জন্য একটি ঐতিহ্যগত সামাজিক সংগঠন রয়েছে। এ ক্ষেত্রে খাসিদের সর্বকনিষ্ঠা প্রতিষ্ঠান বা ষবহমংবহম ষরহম শযধফঁয -এর অবদান খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খাসি সমাজ মাতৃসূত্রীয় হওয়ায় নিজেরাই পারিবারিক সম্পতির অধিকার লাভ করে। পারিবারে সবকটি মেয়েদেরই সম্পত্তি পাওয়ার অধিকার থাকে।

কিন্তু এক্ষেত্রে সর্বকনিষ্ঠা কন্যার অংশ সকলের থেকে বেশি। এ কন্যাকে খাদ্দুহ বলা হয়। এ কন্যাকে বংশ বা পরিবারের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির জিম্মাদার হিসেবে অধিকার দেওয়া হয়। তাই তার দায়-দায়িত্বও অনেক। যেহেতু খাসি ধর্মাবলম্বীদের কোনো পূজার স্থান বা উপাসনার ঘর নেই, তাই খাদ্দুহ-এর ঘরেই যাবতীয় সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি সম্পাদিত হয়। এ বাড়িকে ধর্মীয় বাড়ি বলে ডাকা হয়।

এই বাড়িতে সকল আত্মীয়স্বজন একত্রিত হয়ে সামাজিক আলোচনা, পরিবারের ও বংশের ভালোমন্দ, সম্পত্তির ভাগাভাগি ইত্যাদি কার্যাদি আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পাদন করে। এ বাড়ির প্রধান কর্তা গোষ্ঠীর মনোনীত বায়োজ্যেষ্ঠ মামা। তিনি পারিবারিক সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যাদি তদারক ও পরিচালনা করেন। সর্বকনিষ্ঠা কন্যা একজন কোষাধ্যক্ষ হিসেবে টাকা পয়সার হিসাবাদি রাখেন। এ খদ্দুহ্ প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণরূপে একটি আধুনিক ট্রাস্টির মতো। মামা ও সর্বকনিষ্ঠা কন্যা কর্মকর্তার মতো থেকে পারিবারিক কার্যাদি সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করে থাকে।

অর্থনৈতিক সংগঠন

আর্থ-সামাজিক অবস্থা: বাংলাদেশে খাসিদের অর্থনৈতিক অবস্থা সচ্ছল নয়। প্রায় ৭০% লোক পান চাষ করে জীবিকা নির্বাহ করে। খাসিদের অর্থনীতি সম্পূর্ণভাবে বন ও ভূমির উপর নির্ভরশীল। যেহেতু চাষাবাদ যোগ্য জমি ও বনের পরিমাণ কমে যাচ্ছে তাই খাসিদের অর্থনৈতিক অবস্থাও দিন দিন খারাপ হচ্ছে। সমতল ভূমিতে বসবাসরত খাসিরা কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করে। কিছু সংখ্যক লোক চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য করে।

পাহাড় ও মাটির উপর অধিকাংশ নির্ভরশীলতাই খাসিদের সমস্যাকে আরো জটিল করেছে। সমতল ভূমিতে বসবাসরত খাসিরা স্থায়ী কাগজপত্র নিয়ে বসবাস করছে। তবে পাহাড়ে কিছু অংশ স্থায়ী কাগজপত্র নিয়ে এবং অনেকেই দখলীয় সরকারি খাস জমিতে, বনবিভাগের বরাদ্দকৃত ও লিজকৃত ভূমিতে বসবাস করছে। ফলে কোনো বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই দুল্যমানভাবে জীবনযাপন করছে। এদের অবস্থা এই যে, ভূমি থেকের জমি নাই। বাসস্থান থেকের ঘর নাই। তাছাড়া ভূমিহীন খাসিদের সংখ্যা কম নহে। পারিবারিক কাঠামো কারণে ভূমিহীনদের চিহ্নিত করা হয়নি।

তবে প্রতিট গ্রামেই ১০-১৫% লোক অন্যদের জমিতে শ্রম দিয়ে থাকে। জমি, ভূ-প্রাকৃতিক অবস্থা, শ্রম, বাজার ইত্যাদি অবস্থা অনুকূল হওয়ার কারনেই খাসিরা আদিকাল থেকেই এ অঞ্চলে খাসিয়া পান উৎপাদন করছে এবং দেশীয় অর্থনীতি উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খাসিদের জুম চাষ আর পার্বত্য চট্টগ্রমের জুম চাষ ভিন্ন। পান চাষ একটি স্থায়ী চাষাবাদ পদ্ধতি। পাহাড়ে বা বনভূমিতে পানের পাশাপাশি সাপোর্টিং ফসল হিসেবে লেবু, কমলালেবু, আনারস, কাঁঠাল, সুপারি, ও অন্যান্য ফসল চাষ করা হয়ে থাকে। শহরে বন্দরে পান আহার চেড়ে দিয়েছে।

তাই এ পেশায় ঝুকি অনেক এবং বর্তমানে পান বাজার ব্যবস্থা খুবই নাজুক। মধ্যস্বত্ব ভোগী মহাজনগণ ইচ্ছামতো লাভের সিংহভাগ নিয়ে থাকে। অনেকে পান চাষের প্রারম্ভে মহাজনের কাছে থেকে আগাম টাকা গ্রহণ করে। ফলে মহাজনগণ ইচ্ছামত দাম দিয়ে পান ক্রয় করে লাভে বিক্রয় করে। পানচাষিরাও এ মহাজন শ্রেণীর কাছে পুরোপুরি জিম্মি।

খাসিদের অর্থনীতি মূলত পান চাষ এবং কৃষি কাজকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত। জমি, ভূ-প্রকৃতি অবস্থা, শ্রম, বাজার অবস্থা অনুকূল হওয়ার কারণেই আদিকাল থেকেই এ অঞ্চলে খাসিয়া পান নামে পরিচিত পানের ব্যাপক উৎপাদন হচ্ছে এবং দেশের অর্থনীতিতে বিরাট ভূমিকা রাখছে। পাহাড় বা বনভুমিতে পানের পাশাপাশি সাপোর্টিং ফসল হিসেবে বিভিন্ন ধরনের লেবু, কমলালেবু, আনারস, কাঁঠাল, সুপারি ও অন্যান্য ফসল চাষ হয়ে থাকে। পান পাতার বাজার দিন দিন সংকুচিত হওয়ায় এ পেশা ঝুঁকির সম্মূখীন হচ্ছে। বর্তমানে তারা এনজিওসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করে অর্থনৈতিক চাকাকে চাঙ্গা রাখতে প্রয়াস চালাচ্ছে।

(চলবে) 

এ কে এম মাজহারুল ইসলাম: অধ্যাপক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।