Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, বুধবার ১২ ডিসেম্বর ২০১৮, ২:১৯ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

খুলছে সম্ভাবনার দ্বার : গোপালগঞ্জে রেশমগুটি উৎপাদনে সাফল্য


০৪ এপ্রিল ২০১৮ বুধবার, ০২:০৯  পিএম

নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


খুলছে সম্ভাবনার দ্বার : গোপালগঞ্জে রেশমগুটি উৎপাদনে সাফল্য
ছবি : সংগৃহীত

গোপালগঞ্জ : বৃহত্তর রাজশাহী অঞ্চল রেশম চাষের জন্য প্রসিদ্ধ হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের পার্বত্য চট্টগ্রামসহ সমতলের অন্যান্য জেলাতেও সাফল্য আসছে। এর ধারাবাহিকতায় গোপালগঞ্জে পরীক্ষামূলক রেশম গুটি উৎপাদনে সাফল্যের খবর দিয়েছে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড সিবিএ।

বুধবার গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে সাফল্যের এই খবর দেন বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড সিবিএ সভাপতি মোঃ আবু সেলিম।

সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, গত মার্চ (২০১৮) রেশম উন্নয়ন বোর্ডের গোপালগঞ্জের গোপিনাথপুর কার্যালয়ে রেশম বোর্ড সিবিএ’র উদ্যোগে এবং রেশম গবেষণা ইনষ্টিটিউটের সহযোগীতায় গোপিনাথপুরের উৎপাদিত তুঁতগাছের পাতা ব্যবহার করে পলুপালন করে গোপালগঞ্জে ১ম বারের মত সাফল্যজনকভাবে পরীক্ষামূলক উন্নতজাতের রেশম গুটি উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। প্রমাণিত হয়েছে গোপালগঞ্জ এবং পার্শ্ববর্তী অঞ্চল রেশম চাষের উপযোগী। বিধায় এই অঞ্চলের বাঁধ, রাস্তার ধার, জমির আইলে এবং নিজস্ব জমিতে তুঁত চাষের মাধ্যমে করে রেশম গুটি উৎপাদন করে উন্নতজাতের রেশম উৎপাদন সম্ভব।

আবু সেলিম বলেন, ভাঙ্গা থেকে পায়রাবন্দ এবং ভাঙ্গা হতে যশোহর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের কাজ চলমান রয়েছে। রেলপথের ২ পার্শ্বে যদি তুঁতগাছ রোপণ করা হয় তাহলে বৎসরে ১০ হতে ১২ লাখ তুঁতগাছ রোপণ করে ২৫০ হতে ৩০০ টন রেশম উৎপাদন করা সম্ভব। যেহেতু তুঁতগাছের উচ্চতা ৬-৭ ফুট হয়ে থাকে যা রেল চলাচলে কোন বিষন্ন সৃষ্টি করবে না বরং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় সহায়ক ভূমিকা পালন করবে এবং এতে ৫০,০০০ লোকের কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব হবে। এই অঞ্চলে উৎপাদিত রেশম ব্যবহার করে একটি রেশম বস্ত্র উৎপাদন কারখানা স্থাপন করে রেশম বস্ত্র উৎপাদন ও বিপণন করা সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, গোপালগঞ্জের গোপীনাথপুর, লতিফপুর, সিঙ্গিপাড়া (টুঙ্গিপাড়া) ও কুশলী ইউনিয়নে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের প্রকল্পের অর্থায়নে ৬ টি ব্লকে ৬০০০টি তুঁতগাছ রোপণ করা হয় এবং ৬ জন স্থানীয় পাহারাদারের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়।

রেশম বোর্ডের শ্রমিক সংগঠনের এই নেতা জানান, গাছগুলির বয়স ২ বৎসর অতিবাহিত হলে ৩০ জন চাষীকে গাছগুলি হস্তান্তর করা হবে এবং তারা প্রতি বৎসর প্রত্যেকে ৫০-৬০ হাজার টাকা রেশম গুটি উৎপাদন করে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবে। এছাড়া গত মার্চ মাসে টুঙ্গিপাড়ার কুশলী ইউনিয়নে ১০ জন চাষী তাদের নিজস্ব জমিতে তুঁতচাষ করেছেন। যার মধ্যে অনেকেই একটি বাড়ী একটি খামার প্রকল্পের সুবিধাভোগী সদস্য। তারা এক বৎসর পর রেশম গুটি উৎপাদন করে অর্থ উপার্জন করতে সক্ষম হবে।

গোপালগঞ্জ সহ পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মাটি, আবহাওয়া ও জলবায়ু তুঁতচাষ ও রেশম উৎপাদনের উপযোগী এবং রেশম উৎপাদন প্রক্রিয়া এক শ্রমঘন কুটির শিল্প বিশেষ করে বেকার মহিলাদের বাড়ীতে বসেই অর্থ উপার্জন করা সম্ভব। সেকারণে এই অঞ্চলে ব্যাপক রেশম উৎপাদনের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ এবং অত্র অঞ্চলের জনপ্রতিনিধি, স্থানীয় সরকার ও স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগীতা সহ জনগণের স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণের জন্য সহযোগীতা কামনা করেন রেশম বোর্ড সিবিএ সভাপতি।

বাংলাদেশে রেশম শিল্পের গৌরবোজ্জ্বল অতীত তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রাকৃতিক রেশম বস্ত্রকে বস্ত্রের রাণী বলা হয়। এদেশে রেশম উৎপাদনে হাজার বছরের সাফল্যজনক ইতিহাস রয়েছে। একসময় বাংলাদেশ হতে ইউরোপে বিপুল পরিমাণ রেশম রপ্তানী হতো। পৃথিবীর প্রায় ৬০ টি দেশে রেশম উৎপাদন হয়ে থাকে। রেশম উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান ৯ম হলেও অন্যান্য উৎপাদনকারী দেশের তুলনায় বাংলাদেশী রেশমের বিশেষ বৈশিষ্ট রয়েছে তা হলো বাংলাদেশী রেশম অধিক টেকসই, উজ্জ্বল ও আরামদায়ক। সেকারণে বাংলাদেশী রেশম ক্রয়ে চীন আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এছাড়া ভারত রেশমের চাহিদা পূরণে প্রতি বৎসর চীন হতে ৯০০০ টন রেশম আমদানি করে থাকে। ফলে বাংলাদেশ চীনের চাইতেও কম মূল্যে ভারতে রেশম রপ্তানির যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।

এই শিল্পের সংকট ও সম্ভাবনার নানাদিক তুলে ধরে আবু সেলিম বলেন, বস্ত্র উৎপাদনে বাংলাদেশকে ৯৪-৯৫% কার্পাস তুলা বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। সেক্ষেত্রে রেশম খাতে সঠিক উদ্যোগ ও টেকসই দীর্ঘমেয়াদী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হলে কার্পাস তুলার ঘাটতি পূরণে রেশম বস্ত্রখাতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী ‘একটি বাড়ী একটি খামার’ প্রকল্পের সুবিধাভোগী সদস্যদের রেশম চাষে সম্পৃক্ত করণের মাধ্যমে তাদের আয় বৃদ্ধি ও দেশে রেশম উৎপাদন বৃদ্ধির যে নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেশম চাষ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছেন তা যথাযোগ্য প্রকল্প প্রণয়নের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলে দেশে রেশমের উৎপাদন বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে এবং দেশ ঐতিহ্যবাহী খাঁটি রেশম উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করতে সক্ষম হবে। ফলে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়তে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদক্ষ নেতৃত্বে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল রাষ্ট্র হতে উন্নত ও সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গড়তে রেশম গুরুত্ব্পূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলে আমরা বিশ্বাস করি।

রেশম খাতের রুগ্নদশার নেপথ্যে বিভিন্ন দেশিয় ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তের কথাও তুলে ধরেন তিনি। আবু সেলিম এই প্রসঙ্গে বলেন, রেশম উন্নয়নে কিছু প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। এতদ অঞ্চলে রেশম চাষে হাজার বছরের ঐতিহ্য থাকলেও ১৯৪৭ এর পর ভারত রেশম চাষ এগিয়ে থাকলেও এদেশে রেশম চাষ সেভাবে বৃদ্ধি পায়নি। যার প্রেক্ষিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু ১৯৭৪ সালে রেশম খাতের উন্নয়নের একটি পৃথক সংস্থা গঠনের উদ্যোগ নেন তাঁরই নির্দেশিত পথে রাজশাহীতে ‘বাংলাদেশ রেশম বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয়। বোর্ড প্রতিষ্ঠার পর রেশম উৎপাদন ১০ টি জেলা হতে ৪০টি জেলায় সম্প্রসারিত হয় এবং রেশম উৎপাদন ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পায় এবং ২০০০ সালের মধ্যে দেশের চাহিদা অনুযায়ী রেশম উৎপাদনের অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়। কিন্তু ১৯৯২ সালে তৎকালীন বিএনপি সরকারের ভ্রান্ত নীতি ও বিশ্বব্যাংকের নেতীবাচক ভুমিকার কারণে রেশম চাষীগন রেশম চাষ ছেড়ে অন্য পেশায় সম্পৃক্ত হতে বাধ্য হয়। যার প্রেক্ষিতে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ১৯৯৫ সালে বিরোধীদলীয় নেত্রী থাকাকালীন সময়ে রেশম বোর্ড সিবিএ’র আহ্বানে রেশম শিল্পের সুতিকাগার চাপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাটে রেশম উৎপাদনের বাস্তব অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং ১৯৯৬ সালে সরকার গঠনের পর বিশ্বব্যাংকের নেতিবাচক সিদ্ধান্ত বাতিল করে ঐতিহ্যবাহী রেশম কারখানা আধুনিকীকরণ সহ রেশম খাতে বিভিন্ন প্রকার উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়ন করেন। কিন্তু বিএনপি জোট সরকার বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী ২০০২ সালে ঐতিহ্যবাহী রেশম কারখানা বন্ধ ঘোষণা এবং গবেষণা ইনষ্টিটিউটকে স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান করায় রেশম খাতে ব্যাপক বিপর্যয় নেমে আসে এবং ২০০৮ সালে রেশম উৎপাদন মারাত্মক হ্রাস পায়।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রেশম খাতের ধংস্বযজ্ঞ উত্তোরনের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাংক প্রতিষ্ঠিত সিল্ক ফাউন্ডেশন লিঃ কে বিলুপ্ত করে রেশম খাতের ৩টি প্রতিষ্ঠানকে একীভূত করে ‘বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড’ আইন ২০১৩ প্রণয়ন করেন এবং প্রণীত আইনের আওতায় সাংগঠনিক কাঠামোসহ অন্যান্য আনুষ্ঠানিকতা বর্তমান রেশম উন্নয়ন বোর্ড মহাপরিচালকের প্রয়োজনীয় ভূমিকার কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি ফলে অনুমোদিত জনবলের ৫৫% শূণ্য পদ নিয়ে প্রতিষ্ঠানটি খুড়িয়ে খুড়িয়ে চলছে। বর্তমান সরকারের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে রেশম সেক্টরে যে ধরণের কর্মপরিকল্পনা প্রনয়ন করে উন্নয়ন ঘটানো যেত তা প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভব হয়ে উঠেনি। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারতে প্রতিবৎসর ১০-১৫% হারে রেশম উৎপাদন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

তিনি উল্লেখ করেন, রেশম উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের যথাযোগ্য ভূমিকা না থাকার কারণেই সিবিএ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেশমের উন্নয়ন ত্বরান্নিত করতে সারা বৎসর ব্যাপী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।