Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

জ্যৈষ্ঠ ১০ ১৪৩১, রোববার ২৬ মে ২০২৪

বাংলাদেশকে উন্নয়ন অভিযাত্রার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর

ড. আতিউর রহমান

প্রকাশিত: ১৯:০৩, ২৮ এপ্রিল ২০২৩

আপডেট: ১৯:০৭, ২৮ এপ্রিল ২০২৩

প্রিন্ট:

বাংলাদেশকে উন্নয়ন অভিযাত্রার নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফর

-ড. আতিউর রহমান

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর জাপান সফর শেষ করে ওয়াশিংটন যাবেন বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংক অংশীদারির ৫০ বছর উদযাপনের সমাপনী অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার জন্য। এরই মধ্যে যত দূর জানা গেছে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর খুবই সফল হয়েছে। ৩০ বিলিয়ন ইয়েনের বাজেট সহায়তা ছাড়াও কৃষি, তথ্য-প্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তাসহ আটটি সমঝোতা স্মারকও স্বাক্ষরিত হয়েছে জাপান সরকারের সঙ্গে। সবচেয়ে বড় কথা, এই সফরের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ-জাপান কৌশলগত অংশীদার হলো। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভাবধারা ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ আরো সুপ্রতিষ্ঠিত হলো। এই কৌশলগত বোঝাপড়ার মধ্যে দুই দেশের ক্রমেই প্রসারমাণ অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরো জোরদার করার জন্য সমীক্ষা ও বিনিয়োগ উদ্যোগ নেওয়া হবে।

জাপানের প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে যেভাবে তার সাফল্য দেখিয়েছে তাতে দেশটি জাপানি বিনিয়োগের একটি আকর্ষণীয় কেন্দ্রে পরিণত হতে যাচ্ছে। জাপানি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো, বিশেষ করে মাতারবাড়ীকেন্দ্রিক গভীর সমুদ্রবন্দরসহ যে সমন্বিত অবকাঠামো উন্নয়নের গতি লক্ষ করা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশে বিনিয়োগের পরিবেশ আরো উন্নত হবে। সেই সঙ্গে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কেরও উন্নতি ঘটবে। এই শিল্প ও অবকাঠামো হাব শুধু বাংলাদেশ নয়, ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলসহ আশপাশের দেশগুলোর ব্যবসা-বাণিজ্য উন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। জাপান ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী মনে করেন যে এসব শিল্পাঞ্চলে জাপানি আধুনিক প্রযুক্তি ও উন্নয়ন অভিজ্ঞতার ছোঁয়া লেগে দুই দেশের মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে ও সমৃদ্ধি অর্জনে বড় মাপের প্রভাব ফেলবে।

বাংলাদেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে প্রধানমন্ত্রীর এই সফরজাপান বাংলাদেশের পুরনো বন্ধু। মুক্তিযুদ্ধের পরপরই নতুন দেশের পুনর্নির্মাণে জাপান যেভাবে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল তা বাংলাদেশ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে মনে রেখেছে। ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর জাপান সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের সুদৃঢ় ভিত্তি তৈরি করে। সে কারণেই জাপান আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় উন্নয়ন সহযোগী। বিশেষ করে জাপানি সরকারি বিনিয়োগের বড় উপকারভোগী বাংলাদেশ। এখন সময় এসেছে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগের এই ধারাকে আরো গতিময় করার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এই সফরের পর জাপান থেকে বাংলাদেশে এফডিআই প্রবাহে নিশ্চয় বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটবে। জাপান সারা বিশ্বে যে হারে এফডিআই প্রবাহিত করে তার চেয়ে বাংলাদেশে আসা এফডিআইয়ের হার এখনো বেশ কম।

তবে অনেক জাপানি কম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেছে। আড়াইহাজারে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর চালু হওয়ার পর ব্যক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগের হার নিশ্চয় বাড়বে। সে জন্য আমাদের নিয়ম-নীতি আরো সহজ, ধারাবাহিক ও বিনিয়োগবান্ধব করতে হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক, বিডা, বিএসইসি এবং এনবিআর নিশ্চয় এ ক্ষেত্রে মিলেমিশে বড় অবদান রাখতে পারে। বিশেষ করে আইসিটি ও পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ জাপানে ভালো ব্যবসা করছে। তাই উভয় দেশের বিনিয়োগকারীদের নিয়ে যে বিনিয়োগ সামিট টোকিওতে হয়ে গেল তা খুবই আশাপ্রদ। আমাদের আরো আকর্ষণীয়ভাবে গতিময় বাংলাদেশের অর্জন ও সম্ভাব্য উন্নয়নের গল্প বলতে হবে। আর এই গল্পের বড় রূপকার প্রধানমন্ত্রী নিজেই। তিনি জাপানের নেতাদের ও উদ্যোক্তাদের সেই গল্পটিই প্রাঞ্জল ভাষায় বলেছেন। এই গল্পের রেশ জাপানসহ সারা বিশ্বেই থেকে যাবে। সেই রেশের অংশ হিসেবেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বিশ্বব্যাংকে যাচ্ছেন বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের অসামান্য গল্প বলার জন্য।

১ মে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সশরীরে উপস্থিত থাকবেন বিশ্বব্যাংকের সদর দপ্তরে। বাংলাদেশ-বিশ্বব্যাংকের উন্নয়ন অংশীদারির ৫০ বছর উদযাপনের অংশ হিসেবে আয়োজিত এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানে তিনি যোগ দেবেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট ডেভিড মালপ্যাসের বিশেষ আমন্ত্রণে তিনি এই অনুষ্ঠানে যোগ দেবেন। ১৯৭২ সালে যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের পুনর্নির্মাণের জন্য পাঁচ কোটি ডলার সহযোগিতার মাধ্যমে যে গল্পের শুরু তার আকার বেড়ে বাংলাদেশকে দেওয়া বিশ্বব্যাংকের ঋণ সহায়তার অঙ্গীকার এ বছর ৩০০ কোটি ডলারেরও বেশি। গত ৫০ বছরে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশকে গ্র্যান্ট, সুদমুক্ত ও সহজ শর্তের ঋণ বাবদ ৩৯ বিলিয়ন ডলারের অঙ্গীকার করেছে। অবশ্য শ্লথ বাস্তবায়নের কারণে এই অর্থের পুরোটা খরচ করা যায়নি। শুধু বিশ্বব্যাংকের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সমিতি বা আইডিএ থেকে এযাবৎ ১৬ বিলিয়ন ডলারের ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। ৫৬টি প্রকল্পে এই ঋণ পাওয়া গেছে।

কারিগরি, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং আর্থিক সহযোগিতার অধীনে বাংলাদেশ ধারাবাহিকভাবেই বিশ্বব্যাংক থেকে ঋণ ও অন্যান্য সহায়তা পেয়ে আসছে। মাঝে ২০১২ সালে পদ্মা সেতু প্রকল্পের ঋণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের বড় ধরনের টানাপড়েন সৃষ্টি হয়। নিজের আত্মমর্যাদা রক্ষার প্রশ্নে অবিচল বাংলাদেশ ওই সময় এই ঋণ প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নেয়। পরে অবশ্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে থাকে। ২০১২ সালের এই ‘দুর্ঘটনার’ পরের বছরে এক বিলিয়ন ডলারের মতো ঋণ ও অন্যান্য সহায়তার অঙ্গীকার করে বিশ্বব্যাংক। অচিরেই তা দুই বিলিয়ন ডলারে উঠে যায়। আর আগেই বলেছি, চলতি অর্থবছরে তা তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। বাংলাদেশ এক দশকের মধ্যে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হওয়ার যে ‘ভিশন’ বা সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য ঠিক করেছে, তা অর্জনের জন্য প্রচুর অবকাঠামো নির্মাণের প্রয়োজন রয়েছে। আর এ ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কভিড থেকে অর্থনীতিকে জাগিয়ে তোলার জন্য ৩০ কোটি ডলারের সহায়তা দেওয়ার পাশাপাশি টেকসই উন্নয়নের জন্য জলবায়ুবান্ধব অবকাঠামো উন্নয়নে সহায়তার উদ্যোগ নিতে তার অঙ্গীকারের কথা বলে যাচ্ছে।

বাজেট সহায়তাসহ এসব উদ্যোগের জন্য ১ মে তারিখেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে অন্তত পাঁচটি প্রকল্পের জন্য ঋণচুক্তি সই হবে। এসব প্রকল্পের মধ্যে রয়েছে—১. কানেক্টিভিটি প্রকল্পের জন্য ৭৫৩ মিলিয়ন ডলার; ২. ‘সবুজ, সহিঞ্চু অন্তর্ভুক্তি উন্নয়ন’ (‘গ্রিড’) প্রকল্পের জন্য ৫০০ মিলিয়ন ডলার; ৩. জলবায়ু সহিঞ্চু, অভিযোজন ও ঝুঁকি নিরসনের অবকাঠামো (‘বিভার’) বাবদ ৫০০ মিলিয়ন ডলার; ৪. বাংলাদেশ পরিবেশ টেকসই ও রূপান্তর (‘বেস্ট’) প্রকল্প বাবদ ২৫০ মিলিয়ন ডলার; এবং ৫. পল্লী কর্ম সহায়ক ফাউন্ডেশনের (পিকেএসএফ) একটি প্রকল্প বাবদ ২৫০ মিলিয়ন ডলার। এ ছাড়া ৫০০ মিলিয়ন ডলারের আরো একটি প্রকল্প অনুমোদনের জন্য পাইপলাইনে রয়েছে।

বিশ্বব্যাংক বর্তমান বিশ্বে প্রধান এক আন্তর্জাতিক সহযোগী। চলমান ভূ-রাজনৈতিক টানাপড়েন এড়িয়ে কী করে সাধারণ মানুষের কল্যাণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলো নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের উন্নয়ন অভিযাত্রা অক্ষুণ্ন রাখতে পারে সেই পথকে সুগম করাও বিশ্বব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। আশা করি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বিশ্বব্যাংক সফরের মধ্য দিয়ে বিশ্বশান্তি ও বিশ্ব জনকল্যাণের ক্ষেত্রের পরিসরকে আরো প্রসারিত করার সুযোগ এনে দেবে। বিশ্বব্যাংকেও বইছে নেতৃত্বের পরিবর্তনের হাওয়া। এই প্রথম উন্নয়নশীল বিশ্বের একজন উদ্যোক্তা-নেতা মি. অজয় বাঙ্গা বিশ্বব্যাংকের নেতৃত্বে আসছেন। বিশ্ব অর্থনীতির এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে সবাই অপেক্ষায় তাঁর নেতৃত্বে কী করে উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায় পরিবর্তনশীল এই বিশ্বের অর্থনৈতিক চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে নয়া বিশ্ব অর্থনৈতিক কাঠামো নির্মাণে সহযোগী হবে বিশ্বব্যাংক। নিশ্চয় তাঁর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘতম সময়ের অভিজ্ঞ প্রধানমন্ত্রীর সংক্ষিপ্ত অথচ গুরুত্বপূর্ণ মতবিনিময় হবে।

জাপান ছাড়াও বিশ্বব্যাংকে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ‘আরেক বাংলাদেশ’-এর রূপকল্প তুলে ধরতে এই সফরে গেছেন। বাংলাদেশের পরিশ্রমী কৃষক, শ্রমিক, উদ্যোক্তা এবং তাঁদের সহযোগী উদ্ভাবনী সরকার এই অসামান্য গল্পের প্রকৃত নায়ক। সেই গল্পের মধ্যমণি বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা। এই সফর নিশ্চয় গতিময় বাংলাদেশকে টেকসই উন্নয়ন অভিযাত্রার এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। জয়তু বাংলাদেশ। জয়তু প্রধানমন্ত্রী।

 লেখক : বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর 

Walton Refrigerator Freezer
Walton Refrigerator Freezer