Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

জ্যৈষ্ঠ ২১ ১৪৩৩, শুক্রবার ০৫ জুন ২০২৬

পদ্মায় বাস পড়ে যাওয়া তদন্তে ২ কমিটি : নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

বহুমাত্রিক ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৯:৪৪, ৫ জুন ২০২৬

প্রিন্ট:

পদ্মায় বাস পড়ে যাওয়া তদন্তে ২ কমিটি : নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরি ঘাটে আবারও নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এসবি পরিবহনের একটি বাস পদ্মা নদীতে ডুবে যাওয়ার ঘটনা তদন্তে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার দুপুরে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান।

শুক্রবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ৭ নং ফেরি ঘাটে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে র‌্যাম ভেঙ্গে বাসটি পদ্মা নদীতে পড়ে এ ঘটনা ঘটে। প্রায় আড়াই ২ ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধার করেছে। তবে নৌ-পুলিশের তৎপরতায় ফেরিতে উঠার আগেই বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে দেওয়া হয়। ফলে প্রাণে বাঁচে বাসের ৪২ যাত্রী। এতে আহত হন বাসের চালক ঝন্টু আলী (৪৫) ও হেলপার শাকিল হোসেন (৩৬)। তাদেরকে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। সকাল ১১.৫৫ টায় উদ্ধারকারী জাহাজ হামজা বাসটি উদ্ধার করে। 

বিআইডব্লিউটিসি দৌলতদিয়া ঘাট কার্যালয়ের সহকারী মহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে ঢাকাগামী এসবি পরিবহনের একটি বাস দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরিঘাট পন্টুন থেকে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে র‌্যাম ভেঙে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বাস থেকে যাত্রী নামানোর কারণে বড় দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায়। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, এসবি পরিবহনের বাসটি দৌলতদিয়ার ৭ নম্বর ফেরি ঘাটে থাকা ‘কবরী’ নামের ফেরির কনভেনশন পকেট দিয়ে প্রবেশ করছিল। এ সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাসের ধাক্কায় ফেরির বিপরীত পাশের র‌্যাম ভেঙে যায় এবং বাসটি সরাসরি পদ্মা নদীতে পড়ে ডুবে যায়। ড্রাইভার ও হেলপার সাতরে কুলে উঠলে ফায়ার সার্ভিস ও পুলিশ তাদেরকে উদ্ধার করে গোয়ালন্দ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। 

স্থানীয় প্রশাসন নির্দেশনা অনুযায়ী, আগে থেকেই প্রতিটি বাস ফেরিতে ওঠার আগে বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয়। তবে বাসটির চালক ও সহকারী (হেলপার) নদীতে পড়ে যান। দুর্ঘটনার পরপরই ডুবে যাওয়া বাসটি উদ্ধারে কাজ শুরু করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ডুবুরি দল। বাসটি নদী থেকে টেনে প্রায় ২ ঘন্টা পর তোলে উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’। 

বাসের যাত্রী, বিশ্ববিদ্যালয়ছাত্রী টিউলিপ বলেন, ‘আমি কুষ্টিয়া থেকে বাসে উঠেছি। গাড়ি ভরা যাত্রী ছিল। ঘাটে এসে ফেরিতে ওঠার আগে বাস থেকে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়া হয়। আমি লাস্ট বাস থেকে নামছি। আমার পরে কেউ বাসে ছিল না। বাসে শুধু হেলপার আর ড্রাইভার ছিল। বাসটি নন এসি ছিল। কুষ্টিয়া থেকে বাসটি ৭টায় ছাড়ে।’ 

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দৌলতদিয়া ঘাটে আসেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান। ছবি: আমাদের সময়

বিজিবি সদর দপ্তরের নুর মোহাম্মদ পাবলিক কলেজের শিক্ষক আব্দুস সালাম বলেন, ‘বাসের সব যাত্রীকে নামিয়ে দেয় নৌ-পুলিশ। অনেক যাত্রী নামতে অনীহা প্রকাশ করে। তবে যাত্রীদের স্ব-উদ্যোগে নামা উচিত। আজ না নামলে বড় ধরণের দুঘর্টনা ঘটত। এখন মনে হচ্ছে পুলিশের আহ্বান না শুনে বাসে থাকলে বড় দুঘর্টনা ঘটত।’ 

এসবি পরিবহনের চালক (ড্রাইভার ) ঝন্টু আলী বলেন, ‘ফেরিতে ওঠার আগে সব যাত্রী বাস থেকে নামিয়ে দিই। শুধু হেলপার ও আমি ছিলাম। ফেরিতে ওঠার সময় হঠাৎ করে দেখতে পাই ব্রেকে কোনো কাজ করছে না। আমি হেলপারকে দ্রুত নেমে যেতে বলি। পরে আমিও লাফ দিয়ে নদীতে পড়ে যাই। সাঁতরে জনগণের সহায়তায় রক্ষা পাই।’ 

চালকের সহকারী শাকিল হোসেন বলেন, ‘বাস থেকে যাত্রী নামিয়ে টান দেওয়ার সাথে সাথেই ড্রাইভার আমাকে বলেন, ‘‘ব্রেক ফেইল করেছে, দ্রুত নেমে পড়।’’ আমিও নামতে না পেরে নদীতে পড়ে যাই। আমার পা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লেগেছে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করেছেন।’ 

এসবি পরিবহনের সুপারভাইজার আজমল হোসেন বলেন, ‘৭টায় কুষ্টিয়া থেকে রওনা দিয়ে সাড়ে ৯টায় দৌলতদিয়া ঘাটে আসি। মাইকে বাস থেকে যাত্রী নামার আহ্বান শুনে গাড়ি থেকে নেমে যাই। হেলপারকে বলি ফেরির টিকিট দেখাও। এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মা নদীতে পড়ে যায়। বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেল যাত্রীসহ সবাই।’ 

গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাথী দাস বলেন, ‘ফায়ার সার্ভিস, নৌ পুলিশ, থানা পুলিশ, ডুবুরী দল, বিআইডব্লিউটিএ সহ সকলের প্রচেষ্টায় দ্রুত উদ্ধার করা হয়েছে। যাত্রীদের মালামাল আমরা প্রমাণ সাপেক্ষে বুঝে দিয়েছি।’ 

নৌ-পুলিশের পুলিশ সুপার রবিউল ইসলাম বলেন, নৌ-পুলিশের তৎপরতার কারণে বাস থেকে আগেই যাত্রীরা নেমে যায়। এ কারণে বড় দুঘর্টনার হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। সবাইকে আরও সচেতন হতে হবে।

রাজবাড়ী পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মনজুর মোরশেদ, পিপিএম (সেবা) বলেন, দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। বড় ধরণের ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছে। যাত্রী, চালক ও সবাইকে আরও সতর্ক হতে হবে। 

রাজবাড়ী জেলা প্রশাসক আফরোজা পারভীন বলেন, ‘এ ধরনের দুর্ঘটনা কাম্য নয়। আমরা কঠোর ভাবে যাত্রী নামিয়ে ফেরিতে ওঠার নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। এ দুর্ঘটনা তদন্তে ৭ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। আগামী ৫ দিনের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’ 

নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী রাজিব আহসান বলেন, ‘আজকের দুঘর্টনায় কোন নিহতের ঘটনা ঘটেনি। দুঘর্টনার কারণ অনুসন্ধানে ৩ সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ৭ সদস্যবিশিষ্ট আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আজ সচেতনতার কারণে বড় দুর্ঘটনার হাত থেকে রক্ষা পেল।’ 

উল্লেখ্য, গত ২৫ মার্চ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটের ৩ নম্বর পল্টুন থেকে কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী যাত্রীবাহী ‘সৌহার্দ্য পরিবহনে’র একটি বাস ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে যায়। এ ঘটনায় মোট ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এরপর থেকেই ফেরিতে ওঠার আগে যাত্রী নামিয়ে দেওয়ার নির্দেশনা প্রদান করা হয়।

Walton
Walton