Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৮ কার্তিক ১৪২৬, মঙ্গলবার ১২ নভেম্বর ২০১৯, ৫:৩৭ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

সহজপ্রাপ্য নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রাণিজ আমিষ ডিম


১১ অক্টোবর ২০১৯ শুক্রবার, ০৯:২২  পিএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


সহজপ্রাপ্য নিরাপদ প্রাকৃতিক প্রাণিজ আমিষ ডিম

ঢাকা : ডিম একটি সহজপ্রাপ্য নিরাপদ প্রাণিজ আমিষ। এটি একটি সুপ্রিয় খাদ্য। ডিম খেতে পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুব কমই পাওয়া যাবে। খাদ্য হিসেবে ডিমের গুরুত্ব বিবেচনায় নিরাপদ ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যে, ডিম যে একটি ভালো ও নিরাপদ খাবার সে বিষয়ে প্রচার করার জন্য, গণ সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিশ্ববাসী ১৯৯৬ সাল থেকে বিশ্ব ডিম দিবস পালন করে আসছে।

ইন্টারন্যাশনাল এগ কাউন্সিল (আইইসি) কর্তৃক অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় অনুষ্ঠিত কনফারেন্সের সিদ্ধান্ত মোতাবেক প্রতি বছরের অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার বিশ্ব ডিম দিবস পালনের জন্য নির্ধারিত করা হয়। সে হিসেবে এবারে (২০১৯) অক্টোবর মাসের দ্বিতীয় শুক্রবার হিসেবে ১১ অক্টোবর বিশ্ব ডিম দিবস পালনের জন্য দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছে।

‘সুস্থ মেধাবী জাতি চাই, প্রতিদিন ডিম খাই’ প্রতিপাদ্যকে সামনে নিয়ে এবারে এ দিবসটি পালন করা হচ্ছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, মৎস্য অধিদপ্তর, বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংগঠন ও সমিতি যৌথভাবে দিবসটি পালন উপলক্ষে এর তাৎপর্য তুলে ধরে পৃথক পৃথক গৃরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে ডিমের গুরুত্ব বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি এবং ডিম দিয়ে আধুনিক অনেক রান্না-বান্নার রেসিপি তৈরী করে প্রদর্শণ করা হবে। ডিম এমন একটি খাবার যার অনেক খাদ্যমান ও পুষ্টিমান রয়েছে। ডিমের যে কত-শত সহজ রেসিপি রয়েছে তার কোন ঠিক-ঠিকানা নেই। ডিম দিয়ে কোন একটি আইটেম রান্না করতে পারে না, এমন কোন লোক নেই। কী পুরুষ, কী মহিলা, কী বাচ্চা, কী শিশু-কিশোর সবাই অন্তত ডিম দিয়ে এর মামলেট, অমলেট, ভাজি, সিদ্ধ করে লবণ-মরিচ দিয়ে ভর্তা করা ইত্যাদি সহজলভ্য আইটেম করতে পারে।

ঘরে যদি কিছুই না থাকে তারপরও মাত্র নিমিষে মেহমান আপ্যায়ন করার ক্ষেত্রে ডিমের জুড়ি ও বিকল্প নেই। একটি সময় ছিল যখন গ্রামে-গঞ্জে এমনকি শহরের বাড়িতেও তাৎক্ষণিক মেহমান আপ্যায়ন করার জন্য এ বাড়ি-ও বাড়িতে ডিম খোজা-খুজি শুরু হয়ে যেতো। তাদের আপ্যায়ন করার জন্য প্রতিজনের একটি ডিমই যথেষ্ট ছিল। এখনো তড়িৎ আমিষ জাতীয় খাবারের জন্য কিছুকিছু খাবারের সাথে ডিম একটি অপরিহার্য উপাদান হিসেবে উল্লেখযোগ্য। যেমন পোলাউ, বিরিয়ানি, তেহারি, ভুনা খিচুরি, নুডুলস, মোঘলাই পরোটা ইত্যাদি আরো কত কী!। ডিমে খাদ্যোপাদান হিসেবে যে আমিষ রয়েছে তাতে কোলেস্টেরল রয়েছে। তবে সেই কোলেস্টেরল অন্যান্য প্রাণিজ কোলেস্টেরলের মতো ক্ষতিকর নয়। ডিমের পুষ্টি উপাদান মানুষের শরীরে খুবই সহজপাচ্য যা অতি সহজেই হজম হয়ে যায়।

একটি ডিমে কমবেশি মোটামুটি প্রায় ১০০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি পাওয়া যায়। সেটি ছোট-বড় সব আকারের ডিমের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যেখানে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সারাদিনের জন্য ২৫০০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তির প্রয়োজন হয়। এক পরিসংখানে জানা গেছে, প্রতিজন প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষের জন্য গড়ে বছরে কমপক্ষে ১০৪ টি ডিম খাওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বাংলাদেশে এর বর্তমান পরিমাণ মাত্র ৫১টি যা পূর্ণমাত্রার অর্ধেকেরও কম। ডিম এমন একটি সুষম খাদ্যমান সমৃদ্ধ খাবার যার মধ্যে প্রায় সবধরনের আদর্শ পুষ্টি উপাদানই সুষম আকারে বিদ্যমান থাকে। ডিমে রয়েছে ভিটামিন এ, ই, বি৬, বি১২, ফলেট, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, অয়রন, জিঙ্ক, ম্যাঙ্গানিজ, সেলেনিয়াম, অ্যামাইনো এসিড ইত্যাদি।বরং ডিমের মধ্যে যে প্রোটিন, ভিটামিন বি১২, রাইবোফ্লাবিন, ফলেট ও ভিটামিন ডি রয়েছে, তা কোলেস্টেরল বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব কমিয়ে দেয়।

অনেকে মনে করে থাকেন যে ডিমে কোলোস্টেরল বেশি রয়েছে সেজন্য ভয়ে ডিম খেতে চান না। কিন্তু ডাক্তারী মতে তা মোটেও ঠিক নয়। কারণ দেখা গেছে, একজন মানুষের শরীরের জন্য ৩০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কোলেস্টেরল সহনীয়। কিন্তু একটি ডিমে সর্বোচ্চ ২০০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত কোলেস্টেরল থাকায় প্রতিদিন একটি ডিম সবার জন্যই সহনীয়। সেজন্য রোগীদের পথ্যের মধ্যে প্রধান আইটেম হলো ডিম। দেখা গেছে হাসপাতালেও ভর্তিকৃত রোগীদের জন্য প্রতিদিনের এবং প্রতিবেলা খাবরের সাথেই এক বা একাধিক ডিম খাবারের আইটেমে যুক্ত থাকে। কারণ হাসপাতালে পুষ্টিবিদ এবং ডাক্তারী পরামর্শেই সে খাবার সরবরাহ করা হয়ে থাকে। রোগীদের জন্য ডিম যদি সমস্যাযুক্ত হতো তাহলে তা নিশ্চয়ই হাসপাতালে সরবরাহ করা হতো না।

একসময় গ্রামের বাড়িতে শুধুমাত্র গৃহপালিত হাঁস-মুরগীর ডিমকেই প্রাণিজ আমিষের প্রধান উৎস হিসেবে বিবেচনা করা হতো। বাকী অনেক সংখ্যক ডিম প্রয়োজনে বিদেশ থেকে আমদানী করা হতো।

কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার জন্য গৃহপালিত হাঁস-মুরগীর ডিম অপর্যাপ্ত হওয়ায় মানুষ এ চাহিদা পূরণের জন্য বিকল্প খুজতে থাকে। সেই চাহিদা মেটানোর জন্য কৃষিবিজ্ঞানীদের নিরলস পরিশ্রমের ফলে উন্নত জাতের হাইব্রিড হাঁস-মুরগী সংকরায়ন হতে হতে এমন উন্নত হতে লাগল, যেখানে আগে একটি দেশি হাঁস-মুরগী বছরে সর্বোচ্চ মাত্র ১২০ থেকে ১৩০টি ডিম দিতো, সেখানে নতুন ও উন্নত জাতের হাঁস-মুরগী বছরে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০টি পর্যন্ত ডিম দিতে শুরু করল। দেশের আনাচে কানাচে তৈরী হতে লাগল সেসব উন্নত জাতের হাঁস-মুরগীর খামার। বিগত দেড়-দুই দশকে বাংলাদেশে পোল্ট্রি শিল্পে ব্যাপক উন্নয়ন ও বিপ্লব সাধিত হয়েছে। সেজন্য আমরা মুরগীর মাংস এবং ডিমে শুধু এখন স্বয়ংসম্পূর্ণই নই, বছরে উদ্বৃত্ত কিছু এখন বিদেশে রপ্তানি করার স্বপ্নও দেখছে বাংলাদেশ।

এখন দেশে যেখানেই যাওয়া যায় সেখানেই পোল্ট্রি পল্লী গড়ে উঠেছে সেসব জায়গায়। এগুলো ক্ষেত্রে একধরনের বিপ্লব ঘটেছে বলতে হবে। কারণ এগুলোর মাধ্যমে একদিকে যেমন মাংস ও ডিম উৎপাদন সহজলভ্য হয়েছে, অপরদিকে সৃষ্টি হয়েছে অনেক যুব ও আত্ম-কর্মসস্থান। আর সেকারণেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি অর্থনৈতিক শিল্পায়নের জন্য আজ বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে এগিয়ে যেতে পারছে। এখন ডিম সহজলভ্য হওয়াতে সকলের খাদ্য তালিকাতেই দিনে অন্তত একটি করে ডিম থাকছে যা দেশের পুষ্টি চাহিদা পূরণে ব্যাপক ভূমিকা পালন করছে। যদি এসব শিল্প আমাদের দেশে ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি না ঘটত তাহলে এখন হয়তো একটি ডিম দুচোখেও দেখা যেতো না। যদিওবা পাওয়া যেত তবে তার দাম থাকতো সকলের হাতের নাগালের বাইরে।

কিন্তু এখন একটি ডিমের মূল্য অন্যসব সমমূল্যের একটি আমিষের দামের চেয়ে অনেক কম। মনে হতে পারে বর্তমানে ৮-১০টাকা প্রতিটি ডিমির দাম বলে তা খুব বেশি। কিন্তু এর পুষ্টিগুণ বিবেচনায় মোটেও তা নয়। সমমানের পুষ্টি উপাদানের অন্য যেকোন ধরনের খাবার কিনতে এর থেকে বেশি খরচ পড়বে। পরিশেষে বলা যায়, ডিম অবশ্যই একটি প্রাকৃতিক পুষ্টিকর খাদ্য, যার মধ্যে খাদ্যের সকল উপাদানই বিদ্যমান। সব বয়সের মানুষের পুষ্টির চাহিদা পূরণে ডিম অত্যন্ত কার্যকর। শিশুর দৈহিক বৃদ্ধি, মানসিক দক্ষতা এবং মহিলাদের শারীরিক চাহিদা পূরণে ডিম অত্যন্ত জরুরি। কাজেই ধনি-দরিদ্র সবারই মাংসের স্বাদ দেওয়ার অন্যতম উপাদান এ ডিম উৎপাদন, পরিবহন ও বাজারজাতকরণে সকলের সহযোগিতা থাকার প্রয়োজন। আর এটিই হলো এবারের বিশ্ব ডিম দিবেসর তাৎপর্য।

লেখক: ড. মো. হুমায়ুন কবীর, কৃষিবিদ ও রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।