Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৭ শ্রাবণ ১৪২৭, মঙ্গলবার ১১ আগস্ট ২০২০, ৯:১৮ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

বায়োটেকনোলজিস্টদের ভুমিকা, ডিএনএ দিবস ও কোভিড-১৯


২৬ এপ্রিল ২০২০ রবিবার, ০৭:৩৪  পিএম

ডঃ মুশতাক ইবনে আয়ূব, ডঃ আদনান মান্নান, ডঃ এসএম মাহবুবুর রশিদ, ইখতিয়ার জাহিদ, মোঃ আরিফ খান ও মাহমুদা কবির শাওন

বহুমাত্রিক.কম


বায়োটেকনোলজিস্টদের ভুমিকা, ডিএনএ দিবস ও কোভিড-১৯

দিনটি ছিল ২৫শে এপ্রিল, ১৯৫৩। জেমস ওয়াটসন এবং ফ্রান্সিস ক্রিক নামক দুজন তরুণ বিজ্ঞানী প্রকাশ করলেন বিজ্ঞান জগতে তোলপাড় করা একটি আবিষ্কার- মানুষসহ প্রায় সকল জীবের জীবন রহস্য ধারনকারী ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি যৌগের গাঠনিক বিন্যাস।

জীবকোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত এ যৌগটির নাম ডিএনএ তথা ডিঅক্সি রাইবো নিউক্লিক এসিড। ওয়াটসন এবং ক্রিকের এ আবিষ্কার পরবর্তীতে বিজ্ঞানীদের বুঝতে সাহায্য করে কি করে প্রায় সকল জীবের “জীবন থেকে মৃত্যু” পর্যন্ত সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয় এই ডিএনএ-ধারনকৃত তথ্যের মাধ্যমে।

ডিএনএ যৌগটি বিভিন্ন ধরনের তথ্যে লুকায়িত থাকে জীবের জীবন রহস্য যা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা চেষ্টা করে যাচ্ছেন ডিএনএর গাঠনিক বিন্যাস আবিষ্কারের পর থেকেই। এরই ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞানীরা হাত বাড়িয়েছেন আমাদের তথা মানুষের জীবন রহস্য জানার জন্য এবং এই কাজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ ছিল মানবকোষে থাকা সকল ডিএনএ যৌগের নকশা (জিনোম সিকোয়েন্স) জানা। ২০টি দেশের প্রথিতযশা বিজ্ঞানীদের যৌথ প্রচেষ্টায় ১৩ বছরের গবেষণার পর অবশেষে ২০০৩ সালে প্রকাশিত হয় প্রায় সম্পূর্ন মানব জিনোম সিকোয়েন্স। এবং দিনটি ছিল আবারো ২৫শে এপ্রিল। তাই দিনটির তাৎপর্যকে সম্মান জানাতে ২০১৩ সাল থেকে ২৫শে এপ্রিলকে ঘোষনা করা হয়েছে আন্তর্জাতিক ডিএনএ দিবস হিসেবে যা পালন করছে বিশ্বের প্রতিটি দেশ।

বর্তমান প্রেক্ষিতে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বাস্থ্য সমস্যা হচ্ছে কোভিড-১৯। জিন প্রকৌশল ও জীবপ্রযুক্তির শিক্ষার্থী ও গবেষক হিসেবে আমাদের বড় রকমের একটি দায়িত্ব রয়েছে এই সমস্যা মোকাবেলায়। সেটা গবেষণার ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি সাধারণ মানুষের ভেতরে এ সংক্রান্ত তথ্য প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধির জন্যও দরকার। জীবপ্রযু্ক্তির শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা প্রথম বর্ষ থেকেই মলিকুলার বায়োলজির বেশ গভীরে যাবার যাত্রা শুরু করি যা ক্রমাগত বাড়তে থাক। আমরা বিভিন্ন রকম আধুনিক যন্ত্রপাতি ও কৌশলের সাথে পরিচিত হই এবং আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাধ্যের মধ্যে এগুলো হাতেকলমে ব্যবহার করারও সুযোগ পাই।

কোভিড-১৯ এর ফ্রন্টলাইনের যোদ্ধা অর্ধশতাধিক বায়োটেকনোলজিস্ট

পুরো বাংলাদেশে কভিড-১৯ সনাক্তকরন ল্যাবে কাজ করছে অর্ধশতাধিক জীবপ্রযুক্তিবিদ। আইসিডিডিআরবি, আইদেশি, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, বিআইটিআইডি চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ সহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ৫০ জনেরও অধিক শিক্ষার্থী ও স্নাতকগন। কোন রকম স্বাস্থ্যবীমা কিংবা আর্থিক প্রণোদনা ছাড়াই বাংলাদেশকে ভালোবেসে এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন আমাদের জীবপ্রযুক্তিবিদ প্রিয় যোদ্ধারা।

কোভিড-১৯ গবেষণায় দেশের বায়োটেকনলজিস্টরা ও তাদের প্রাপ্তি

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন বায়োটেকনোলজি বিভাগ থেকে আটটি গবেষণামূলক কর্মকান্ড সমাপ্ত হয়েছে কভিড-১৯ নিয়ে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালে তাদের কাজ জমা দিয়েছেন বা প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ডঃ আবু আশফাকুর সজীব এর করোনা এর সাথে বিভিন্ন প্রতিষেধক এর প্রতিক্রিয়া নিয়ে, ডঃ মুশতাক ইবনে আয়ূব এর দুটি গবেষণা কর্ম- স্পাইক প্রোটিনের জিনগত গঠন ও ভিন্নতা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ আদনান মান্নান ও মাহবুব হাসানের গবেষণা দলের একটি গবেষণা কর্ম, সম্ভাব্য টিকার প্রস্তাবনা নিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাহমুদুল হাসান ও তাদের দলের দুইটি গবেষণা প্রকল্প, টিকা নিয়ে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ কাদেরি কিবরিয়া ও তার দলের একটি প্রকল্প, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের  অধ্যাপক ডঃ জাকির হোসেন করোনা নিয়ে সচেতনতার প্রকোপ নিয়ে এবং বিভিন্ন প্রতিবন্ধক নিয়ে দুইটি গবেষণা কর্ম সম্পাদন করেছেন।

সরকারের কাছে আবেদন ও গণমাধ্যমে গবেষণার ও এই মুহূর্তের করণীয়

প্রথম আলো,ডেইলি স্টার, বাংলা ট্রিবিউন, ঢাকা ট্রিবিউন, আজাদি, সুপ্রভাত বাংলাদেশসহ বিভিন্ন পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় কেন জিনোম সিকুয়েন্স গুরুত্বপূর্ণ, কি কি গবেষণা প্রয়োজন এবং  এই মুহূর্তের করনীয় বিভিন্ন প্রস্তাবনা তুলে ধরেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়েয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের শিক্ষক ও গবেষকেরা।   

সমাজের পাশে, ডিজিটাল সচেতনতা সৃষ্টি এবং উদ্ভাবনে বায়োটেকনোলজিস্টরা :
হ্যান্ড সানিটাইজার বানানো, স্বাস্থ্য সুরক্ষার পিপিই চিকিৎসক ও নার্সদের কাছে পৌঁছে দেয়া সহ বিভিন্ন কর্মকান্ডে যুক্ত আছে জীপ্রযুক্তিবিদেরা। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষুদে গবেষকেরা কভিড-১৯ পরিস্থিতি জানার জন্য উদ্ভাবন করেছে এপস।

দেশের বাইরে থাকা জীপ্রযুক্তিবিদ রাশেদুল ইসলাম রনি এবং নেটওয়ার্ক অব ইয়ং বায়োটেকনোলজিস্ট বাংলাদেশ নিয়মিত কভিড-১৯ এর বিভিন্ন বিষয়ের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা তুলে ধরছে অনলাইনে বিভিন্ন মাধ্যমে।

নিরবচ্ছিন্ন কিট ও রাসায়নিক দ্রব্যাদি সরবরাহ

দেশের দশটি কোভিড-১৯ সনাক্তকরন কেন্দ্রে লকডাউন উপেক্ষা করে কিট, রাসায়নিক দ্রব্য ও গবেষণা সহায়ক উপাদান পৌঁছে দিচ্ছে জীবপ্রযুক্তিবিদদের নেতৃত্বে তৈরি সংস্থা বায়োটেক কনসার্ন। পাশাপাশি পরামর্শ ও সহায়তা দিচ্ছে ইনভেন্ট টেকনোলজিস সহ জীবপ্রযুক্তি সংশ্লিষ্ট অন্যান্য কোম্পানি।

প্রবাসী বায়োটেকনোলজিস্টগণ আমাদের গর্ব 

দেশের জীবপ্রযুক্তিবিদেরা নিজেদের প্রমাণ করেছে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে। এমআইটি, হার্ভার্ড, ক্যাম্ব্রিজ, স্ট্যানফোর্ড, ম্যাক্স প্লাঙ্ক ইন্সটিটিউট, এফডিএ, এনআইএইচ, ইউনিভার্সিটি অফ ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়া এর মত বিশ্বে নেতৃত্ব দেয়া প্রতিষ্ঠানগুলোতে আছে আমাদের দেশের বায়োটেক গ্রাজুয়েটগন এবং পাশে দাড়িয়েছে বিভিন্ন গবেষণায়।

আমাদের প্রস্তাবনাঃ

-দেশে এই মুহুর্তে অক্সফোর্ড, ম্যানচেস্টার, ইম্পেরিয়াল কলেজ লন্ডন, ইতালির আইসিজিইবি, অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন, কার্টিন বিশ্ববিদ্যালয়, মনাস বিশ্ববিদ্যালয়, জাপানের টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় সহ খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান থেকে গবেষণার অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বায়োটেকনোলজিস্টরা আছেন। তাদের জন্য জিনোম সিকুয়েন্সিং সহ বিভিন্ন গবেষনার পথ উন্মুক্ত করা ও পর্যাপ্ত সহযোগিতার ব্যবস্থা করা।

-কোভিড-১৯ এর জাতীয় নীতিনির্ধারক পরিষদে জীবপ্রযুক্তি সংক্রান্ত কর্মকান্ডে বায়োটেকনোলজি গবেষণায় অভিজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা। এক্ষেত্রে প্রাণরসায়ন ও মাইক্রোবায়োলজি গ্রাজুয়েটদেরও অন্তর্ভুক্ত করাও প্রয়োজন।

-ডায়াগনস্টিক কার্যক্রম আরও ত্রুটিহীন করার জন্য বায়োটেকনোলজিস্টদের অন্তর্ভুক্তি।

-বাংলাদেশে গবেষণা ও শিক্ষকতার ক্ষেত্রগুলোতে বায়োটেকনোলজিস্টদের সুনির্দিষ্ট ভাবে অন্তর্ভুক্তি।

নেটওয়ার্ক অব ইয়ং বায়োটেকনোলজিস্ট বাংলাদেশ এর পরিচালকগণ
 
-ডঃ মুশতাক ইবনে আয়ূব, শিক্ষক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
-ডঃ আদনান মান্নান, শিক্ষক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি-চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।  
-ডঃ এসএম মাহবুবুর রশিদ, শিক্ষক, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
-ইখতিয়ার জাহিদ, লাইফ সায়েন্স হেড-বায়োটেক কনসার্ন।

-মোঃ আরিফ খান, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং শিক্ষক, বায়োটেকনোলজি  এন্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং-ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ (ইউডা) ।

-মাহমুদা কবির শাওন, সিওও এবং শিক্ষার্থী, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।