Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২০ চৈত্র ১৪২৬, শনিবার ০৪ এপ্রিল ২০২০, ৮:২৮ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

বিশেষ সম্পাদকীয়

বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু: একটি পর্যালোচনা


২১ মার্চ ২০২০ শনিবার, ১১:০৭  পিএম

শওকত আলী বেনু

বহুমাত্রিক.কম


বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু: একটি পর্যালোচনা

সকল নবাবজাদাদের এবার বন্দি করুন। নইলে বুঝবো আপনাদের রিপোর্টে গণ্ডগোল আছে।

ওনার বয়স ছিল পঁচাত্তর। চলে গেলেন তিনি। সৃষ্টি করে গেলেন ইতিহাস। ইতিহাস তো বটেই। সংবাদ সম্মেলনে ঘোষণা হয়ে এলেন তিনি জন সম্মুখে: করোনায় বাংলাদেশে প্রথম মৃত্যু। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়লো বিশ্ব মিডিয়াতেও।

নিছক এই মৃত্যুর সংবাদটি দেয়াই আমার উদ্দেশ্য নয়।কিছু বিষয় নিয়ে খটকা লেগেছে। তাই চুপ থাকতে পারছি না। পত্রিকায় এই নিয়ে বিশদ কোনো তথ্যও নেই। থাকার কথাও নয়। চলুন একটু খতিয়ে দেখি। আমি মৃত মানুষটির নাম প্রকাশ করছিনা। করার প্রয়োজনও নেই। পিতা অসুস্থ জেনে আদুরে দুই মেয়েই এসেছিলেন বিদেশ থেকে বাবাকে দেখতে।থাকতেন আমেরিকায়। বাবা পূর্ব থেকেই ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা ও হৃদরোগে ভুগছিলেন।বয়স ৭৫।

তখনও ওই দেশটায় এতটা বিপদ (COVID-19) নেমে আসেনি। আমেরিকা থেকে দুই বোন গেলেন ভারত।কিছুদিন থাকলেন। সেখান থেকে ফিরলেন নিজ দেশে।২৯ ফেব্রুয়ারী। দুই জনের একজন ঢাকায় এসে কিছুটা অসুস্থ্য বোধ করেছিলেন বটে।যাকে আমরা বলি ঠান্ডা লাগা। তেমন কিছু নয়। সিরিয়াস কোনো symptom চোখে পড়েনি। মাত্র সাত দিন থেকে তাঁরা চলেও যান।ঘুরাফেরা করনেনি। যাবার পূর্বে দুই জনই পরিপূর্ণভাবে সুস্থ ছিলেন।

মেয়েরা চলে যাওয়ার দুই দিন পর তাঁদের বাবাকে ১০ মার্চ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।শ্বাস কষ্ট বেড়েছে। তিনি ডায়াবেটিক, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি সমস্যা ও হৃদরোগে ভুগছিলেন। যাইহোক সমস্যা গুরুতর হওয়াতে তাঁকে পরবর্তীতে আইসিইউতে নিতে হয়। এরই মধ্যে সপ্তা খানেক চলে যায়।চিকিৎসা চলে। ১৭ ই মার্চ জানা যায় মানুষটির কোভিড-১৯ পরীক্ষার ফলাফল পজিটিভ। ১৮ ই মার্চ পরিবারকে জানানো হয় তিনি করোনা ভাইরাস এ ১২:৩০ মিনিটে মারা যান।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ১৮ ই মার্চ বুধবার বিকেলে নিয়মিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এই তথ্য জানিয়ে দেন।করোনায় বাংলাদেশে প্রথম মৃত্যু। তিনি আরো জানান, মারা যাওয়া ব্যক্তি বিদেশ ফেরত নন, তবে বিদেশ থেকে আসা এক আত্মীয়ের মাধ্যমে তিনি সংক্রমিত হয়েছিলেন। সংক্রমণের পর তিনি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। সবই ঠিক আছে। তবু উদ্বেগ থেকে যায়।

উদ্বেগের বিষয় কোনটি? মার্চ মাসের ১৭ তারিখ।ওইদিনই প্রথম জানা গেলো মানুষটি করোনায় আক্রান্ত। ১০-১৭ তারিখ এই সাত দিন তো আর কেউ জানতো না এই ভয়ঙ্কর বিষয়টি।

সূত্রমতে, নার্সদের সাথে পরিবারের আরো তিনজন ছিলেন যারা কোনো প্রকার পূর্ব প্রস্তুতি ছাড়াই মানুষটির খেদমত করেছেন। খাইয়েছেন। ম্যাসেজ করেছেন। ১৭ তারিখের পর শুরু হয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তৎপরতা। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজন সম্পৃক্ত সকলের খোঁজ খবর নিয়ে self-isolation এ পাঠিয়েছেন। মৃত ব্যক্তির স্ত্রী ও self-isolation এ আছেন। যতদূর না গেছে সবাই এখনো ভালোই আছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লোকজন নিয়মিত খোঁজ খবর নিচ্ছেন।

তাহলেও উদ্বেগ কেন? আমরা যদি ধরেই নেই আমেরিকা ফেরত কন্যাদের মাধ্যমেই এটি ছড়িয়ে থাকে তাহলে সেটিই উদ্বেগের বিষয়।

কারণ, দুই বোনের কোনো সিরিয়াস symptom ছিল না । যা ছিল তা সম্পূর্ণভাবেই উপেক্ষা করার মতো। অধিকিন্তু দুই জনকেই আমেরিকা থেকে বের হওয়ার সময় পরীক্ষা করা হয়। বাংলাদেশেও এয়ারপোর্ট স্ক্রিনিং হয়েছে।।আমেরিকা গিয়েও পরীক্ষা করা হয়েছে। তাঁদের এখনো কোনো পজিটিভ রেজাল্ট আসেনি। কোনো symptom ও ধরা পড়েনি। ২৯ শে ফেব্রুয়ারী এরা দেশে আসে। ৮ ই মার্চ চলে যায়।

এখানে দুটো বিষয়

এক- যদি ওদের দুই বোনের কারো করোনা (corona) না হয়ে থাকে তাহলে ওদের বাবা করোনায় মারা যায়নি। পুরোনো রোগেই মারা গিয়েছে। এই ক্ষেত্রে, রেজাল্ট সঠিক কিনা সেই নিয়ে সন্দেহ থাকতেই পারে।

দুই- অথবা হ্যাঁ, করোনায়ই মারা গেছে। তাহলে ওই দুই বোনের মধ্যে কারো না কারো নিশ্চয়ই করোনা ভাইরাস ছিল। যদি থেকেই থাকে ধরা পড়েনি কেন?

এবার আসি সেই কথায়। এই ভাইরাসটি অত্যন্ত অদ্ভুত চরিত্র বৈশিষ্টের। অর্থাৎ করোনায় আক্রান্ত লক্ষণবিহীন লোকেরাও এই সংক্রমণ ঘটাতে পারে। যা সম্প্রতি গবেষণায় পাওয়া গেছে। এই বিষয়টি (২ নম্বর পয়েন্ট) একটু খোলসা করে বলা দরকার।যা বাংলাদেশের জন্যে এই মুহূর্তে অধিক গুরুত্বপূর্ণ।

যাদের ইতিমধ্যে জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্টের মতো লক্ষণগুলি দেখা দিয়েছে , ধরে নেয়া হয়, ভাইরাসটি মূলত এমন ব্যক্তিদের দ্বারাই ছড়িয়ে পড়ে। গবেষকরা বলছেন, যদি চরিত্রটা এমন হয় তবে তো সুসংবাদ। এই ক্ষেত্রে, সুস্পষ্টভাবে অসুস্থ লোকদের চিহ্নিত করার সুযোগ পাওয়া যায় এবং সময়মতো বিচ্ছিন্নও (isolation) করা যায়।ট্রিটমেন্টও করা যায়। ফলে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করা আরও সহজ হয়।
কিন্তু ভয়ানক যেটি, গবেষণায় দেখা গেছে, ভাইরাসটি অত্যন্ত অদ্ভুত চরিত্র বৈশিষ্টের। বেশ রহস্যময়ী। সেটা আবার কী?

সম্প্রতি, আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস এ দেখা গেছে কমপক্ষে ৮২ টি ক্ষেত্রে করোনভাইরাস ক্লাস্টার শুরু হয়েছিল যাদের কখনো লক্ষণ দেখায়নি। এবং অর্ধ ডজনেরও বেশি গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, লক্ষণবিহীন লোকেরাও এই সংক্রমণ ঘটিয়ে যাচ্ছে ক্রমাগত। যদিও, গবেষকরা বলেছেন, এটি ভাইরাসের সংক্রমণে উল্লেখযোগ্য কারণ নয়।

ফিরে আসছি পূর্বের কথায়। সত্যিই যদি তাই হয়, তাহলে এই ক্ষেত্রেও এমনটা ঘটেছে। মেয়ে থেকে তাঁদের বাবাকে আক্রমণ করেছে।

এবার, লক্ষণবিহীন আক্রান্ত ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতে হবে। মানে হলো, বিদেশ ফেরত সকল মানুষকে বন্ধি করতে হবে। তাঁদের লক্ষণ (Symptom) থাকুক বা না থাকুক। সবশেষে বলি, সকল নবাবজাদাদের এবার বন্দি করুন। নইলে বুঝবো আপনাদের রিপোর্টে গণ্ডগোল আছে। আমাদের রোগতত্ব বিভাগ বিষয়টি ভেবে দেখতে পারে।

লন্ডন, যুক্তরাজ্য।। ২০ মার্চ ২০২০

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।