Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৭ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, বৃহস্পতিবার ২১ নভেম্বর ২০১৯, ৩:০১ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

চিঠির পুরানো ভাজে


২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯ বুধবার, ০১:১৪  পিএম

একেএম গোলাম কাওসার

বহুমাত্রিক.কম


চিঠির পুরানো ভাজে

রাজীব ট্রাংকের মধ্যে কিছু পুরানো ছবি খুজতেছিল। ছবিগুলো ওর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মুহুর্তের, বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। ছবিগুলো লেমিনেটিং করা আছে। রাজীব ছবিগুলো এস্তোনিয়ায় নিজের সঙ্গে করে নিয়ে যাবে। ও এস্তোনিয়ান ইনিভার্সিটি অব লাইফ সায়েন্সে এগ্রি ফুড বিজনেস ম্যানেজমেন্টে মার্টার্স প্রোগ্রামে ভর্তির সুযোগ পেয়েছে, অক্টোবর থেকে ক্লাস শুরু। কাল দিন পরেই ফ্লাইট। ব্যাগ গোছানো চলছে। ছোটবোন, মা আর প্রিয়তম স্ত্রী খুব সাহায্য করছে। বিয়ের বয়স বেশীদিন হয় নাই। গত সপ্তাহে ওরা প্রথম বিবাহ বার্ষিকী পালন করেছে। পরিবারের সবার মন খারাপ। তারপরও ওকে বিদায় দিতে হবে, উচ্চ শিক্ষার হাতছানি এসেছে।

রাজীব স্মৃতিস্বরুপ পারিবারিক কিছু ছবির সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকটা ছবি নিবে। ছবিগুলো খুজতেই একটা পুরানো মানিব্যাগের দিকে ওর চোখ যায়। হাতে নিয়ে দেখে সেই পুরানো মানিব্যাগ যেটা চাঁদনী উপহার দিয়েছিল। সাথে সাথে ওর মনে হলো মানিব্যাগের ভিতরে একটা চিঠিও থাকার কথা। একটু খুজতেই মানিব্যাগের মিনি পকেটে চিঠিটি পাওয়া গেলো। লালচে রং ধারন করেছে, বহু দিনের পুরানো তো। এটি ছিল ওর জীবনের প্রথম প্রেমের চিঠি। যে চিঠির উত্তর কখনোই দেয়া হয় নাই। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার চিঠিটি পড়তো। আবার খুব যত্নে রেখে দিত মানিব্যাগের মিনি পকেটে।

চিঠিটি দিয়েছিল চাঁদনী। চাঁদনী রাজীবের জীবনের এক অতি গুরুত্বপূর্ণ অতীত। ওরা একে অপরকে খুব ভালোবাসতো। চাঁদনী ছিল রাজীবের শক্তি, সাহস ও প্রেরণার উৎস। রাজীব বলতো, চাঁদনীকে দেখলেই কিংবা কথা বললেই ও শক্তি পায়, সকল ক্লান্তি দূর হয়। যে মেয়ে সারাদিন টিউশনি করে, পারিবারিক দায়িত্ব পালন করেও ভালো রেজাল্ট করতে পারে, সে অবশ্যই প্রেরণা। দুজনার মধ্যে বোঝাপড়াটা খুব ভালো ছিল। চাঁদনী প্রায়শই রাজীবকে বলতো, আমি তোমাকে পুরাটাই পড়তে পারি, তুমি আমার কোন কথায় কি ভাবতে পারো, তুমি আমার কোন কথায় কি উত্তর দিবে, কোন কথায় তুমি কষ্ট পাবে, কোন কথায় তোমার ভালো লাগবে-সব আমি জানি। রাজীবও চাঁদনীর মুখের দিকে তাকালে সব বুঝতে পারতো, চাঁদনীর মন ভালো কি খারাপ, সে কি কোন কিছু গোপন করছে বা বলতে চাইছে না- সব। সবই ঠিকঠাক ছিল, কিন্তু একসাথে থাকা হয় নাই ওদের। ওদের মধ্যে ধর্মের অদৃশ্য দেয়াল ছিল, যে দেয়াল ওরা কেউ ভাঙ্গতে পারে নাই। অনেকবার ভাঙ্গার চেষ্টা করেও পারে নাই । দুজনার সুখের জন্য দুই পরিবারের অনেকগুলা মানুষকে ওরা কষ্ট দিতে চায় নাই। বিদেশে গিয়ে একসাথে থাকারও পরিকল্পনা ছিল ওদের। সব পরিকল্পনা কি আর আলোর মুখ দেখে? চাওয়া আর প্রাপ্তি মিলে যাওয়া কি এতোই সহজ? দুইজন দুদিকে চলে গেছে। ভিন্ন ভিন্ন সংসার হয়েছে ওদের। দুজনেই ভালো আছে। একসাথে থাকা হয় নাই ঠিকই, কিন্তু ভালোবাসা কমে নাই। এখনো ওরা পর¯পরকে ভালোবাসে। ভালোবাসলেই কি পেতে হবে? না পেয়ে মনে হয় ভালোই হয়েছে। পেলে হয়তো ভালোবাসাটা কমে যেতো। যে কোন জিনিস পাওয়ার পর তার মূল্য কমে যায়। না পাওয়ার কষ্ট থেকেই হয়তো আজও ভালোবেসে যেতে পারছে।

চিঠিপ্রাপ্তির দিনটি ছিল ২০০০ সালের ২৫ সেপ্টেম্বরের দুপুর ১.১৫ কি ১.৩০ টা। ওই দিন সকাল থেকেই রাজীব-চাঁদনীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিলনায়তনে স্টেজে নাচের রিহার্সেলে ব্যস্ত ছিল। রিহার্সেলটা হচ্ছে ২৬ সেপ্টেম্বরের অনুষ্ঠানকে ঘিরে। অনুষ্ঠানে ওদের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ থেকে পাশকৃত প্রাক্তন গ্রাজুয়েটরা আসবে। অনুষ্ঠানে দুইটি অংশ থাকবে। প্রথম অংশে থাকবে আলোচনা সভা যেখানে প্রাক্তনরা তাদের সফলতার গল্প শোনাবে যা বর্তমানদের জন্য অনুপ্রেরণা হবে। দ্বিতীয় অংশে থাকবে সাংস্কৃতিক আচার। প্রায় এক সপ্তাহ যাবৎ অংশগ্রহণকারী সকল ছাত্র-ছাত্রিরা ক্লাসরুমে রিহার্সেল করেছে। পরদিন যেহেতু মূল অনুষ্ঠান মিলনায়তনে হবে, সেজন্য মিলনায়তনের স্টেজে রিহার্সেল করে নিজেদের অবস্থান ঠিক করে নিতেছে। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকে এটা ওদের দ্বিতীয় অনুষদীয় অনুষ্ঠান। আর একবছর পরই অনার্স শেষ। তাই রাজীব-চাঁদনীসহ ওদের ব্যাচের প্রায় সবাই স্বতঃস্ফুর্ত অংশগ্রহণ করছে। চাঁদনী একটা দেশাত্ববোধক গান "মাঠের সবুজ থেকে সূর্যের লাল, বাংলাদেশের বুক এতোই বিশাল"-এ প্রায় বিশজনের সাথে কোরাস কোরিওগ্রাফি করছে। চাঁদনীদের কোরিওগ্রাফিতে নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়া ভালোই হয়েছে। সাংস্কৃতিক পর্ব এই দেশাত্ববোধক গান দিয়েই শুরু হবে। আর রাজীব একটা আসামীয় গান "উখা উখা সিরিসের নিচে চায় গাচ, মোর গয়রাম তুলিছে কাঁচা কাঁচা পাত"-এ চার জনের সাথে কোরাস কোরিওগ্রাফি করছে। এদের কোরিওগ্রাফিটাও ভালোই মিলেছে।

রাজীব ২৫ সেপ্টেম্বরের সেই ব্যস্ত দুপুরে রিহার্সেলের ফাকে ক্ষণিক বিশ্রাম নিচ্ছিল, এমন সময় চাঁদনী রাজীবকে ডাকল একটুখানি মিলনায়তনের বাহিরে কথা বলবে বলে। চাঁদনীর ডাকার ভঙ্গি খুব অদ্ভুত, কখনো রাজীবের নাম ধরে ডাকতো না। ওর নাকি নাম ধরে ডাকতে ভালো লাগে না। "ওই" করে ডাকতো সবসময়। এতে অবশ্য সমস্যাও হতো বেশ। রাজীবের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সময় লাগতো চাঁদনীর। নিজে যখন পারতো না, তখন বন্ধুদের বলতো, ওকে একটু ডেকে দাও। যা হোক রাজীব চাঁদনীর ডাক পেয়ে ক্লান্ত ভঙ্গীতে বাহিরে যেতে থাকলো। আর ভাবতে থাকলো কি এমন জরুরী কথা যে বাহিরে গিয়ে বলতে হবে? ভিতরেও তো বলতে পারতো। দুজনার মধ্যে ভাব-ভালোবাসাটা তখনও কেবল শুরুর দিকে। পর¯পরের প্রতি অধিকার খাটানো এতোটা প্রবল হয় নাই। এখনও দুজন ভাবছে, কি করবে, এগুবে না পিছাবে, ধর্মের বাঁধা কিভাবে টপকাবে?

চাঁদনী মিলনায়তনের মূল গেট থেকে একটু সরে পিছন ফিরে দাড়িয়ে ছিল। সেদিন সে পড়েছিল গোলাপী রংয়ের একটা থ্রি-পিস। গোলাপী রংয়ে ওকে খুব সুন্দর দেখায়। রাজীব সাধারণত একটু আধুনিক ঘরানার মেয়ে পছন্দ করে। টপ-জিন্স পরা মেয়ে ওর খুব পছন্দ। কিন্তু চাঁদনীর প্রতি দিনে দিনে মায়া বাড়ছে, ওর সবকিছুই ভালো লাগতে শুরু করেছে। চাঁদনীর দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গি দেখে বুঝা যাচ্ছিল ও আসলেই গুরুত্বপূর্ণ কিছু বলবে। রাজীব খুব আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, সিরিয়াস কিছু বলবা নাকি, বলো? চাঁদনী গম্ভীর ভাব নিয়ে থাকার চেষ্ঠা করল কিন্তু পারল না। অবশ্য রাজীবের সাথে সবসময়ই তাই হয়। ও যে কোন সিরিয়াস কথা খুব হালকাভাবে নেয়। আর সিরিয়াস কথা নিয়ে এমনভাবে ফাজলামি করে যে হাসি পায় আবার মাঝেমধ্যে মেজাজও গরম হয়। ওকে আবেগের কথা বলে লাভ হয় না, একটা অট্ট হাসি দিয়ে সব উড়ায়ে দেয়। আজকে যেহেতু ব্যপারটা খুব গুরুত্বপূর্ণ, তাই কোন ধরনের ঝুকি না নিয়ে চাঁদনী বলল, সে মুখে বলতে পারবে না, লিখে দিবে। বলেই ব্যাগে হাত ঢুকাতে ঢুকাতে আরেকটু দূরে গেলো। রাজীব দেখতে পাচ্ছিল, চাঁদনী ব্যাগ থেকে একটা কলম বের করল। একটা খাতাও বের করল। খাতা-কলম সবসময়ই ওর ব্যাগে থাকে, লেখাপড়ায় মনোযোগী ছাত্রী বলে কথা। মিলনায়তনের দেয়ালে খাতাটা ঠেস দিয়ে কিছু একটা লিখল। লেখা শেষ করে পৃষ্ঠাটা ছিড়ল। তারপর লাজুক ভঙ্গিতে ধীরে ধীরে আসল। রাজীবের হাতে চিঠিটা দিয়ে বলল, এখন পড়বে না, হলে গিয়ে পড়বে, পড়ার পর কালকে উত্তর চিঠিতে লিখে দিবে। রাজীব কি আর কথা শোনার ছেলে? কোন অনুরোধের তোয়াক্কা না করে, আরে কি এমন সিরিরাস জিনিস এখনই পড়ি- বলতে বলতে চিঠিটা খুলে পড়া শুরু করল। খুব

অবাক কান্ড, চিঠিটার মধ্যে একটি মাত্র বাক্য লেখা- 

আমি যদি সব ছেড়ে তোমার কাছে চলে আসি, তুমি কি আমায় গ্রহণ করবে?  চাঁদনীর এক বাক্যের চিঠি পড়ে রাজীবের মাথায় যেন বাজ পড়ল। কানে যেন কিছুই শুনছে না, কালা হয়ে গেছে, মুখ দিয়েও কথা বের হচ্ছে না, বোবা হয়ে গেছে। প্রচন্ড অসহায় লাগছে ওর, মনে হচ্ছে হাত-পায়ে কোন শক্তি নাই। চিঠি থেকে কোনরকম মাথা উঠায়ে চাঁদনীর দিকে তাকাতেই দেখে, চাঁদনীর চোখ দিয়ে পানি পরছে, চাঁদনী কাঁদছে। রাজীব অসহায়ের মতো শুধু জিজ্ঞেস করে, তুমি কি পারবে চাঁদনী সব ছেড়ে আমার কাছে আসতে, তুমি তো পরিবারের বড়। চাঁদনী প্রচন্ড রাগে চিৎকার দিয়ে বলে ওঠে, তুমি জাস্ট বল, ইয়েস অর নো? রাজীব কিছুই বলতে পারে না, মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। চাঁদনী কোন উত্তর না পেয়ে দ্রুত হলের দিকে হাটা দেয়। রাজীব চাঁদনীর চলার পথের দিকে তাকিয়ে থাকে, চাঁদনী অনবরত ওড়না দিয়ে চোখ মুচছে। রাজীবের তাকিয়ে থাকা ছাড়া বিশেষ কিছু করার নাই, সে জানে, চাঁদনী কখনোই সব ছেড়ে চলে আসতে পারবে না, এটা তার সাময়িক আবেগ।

হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে স্ত্রী বলল, এরকম খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছো কেনো, খাবে এসো। রাজীব যেন সম্বন ফিরে পেল। ইতস্তত হয়ে উত্তর দিল, যাও আসছি। রাজীব খেয়াল করল, সে আসলেই খাম্বার মতো দাঁড়িয়ে আছে। চিঠির কথা ভাবতে ভাবতে কখন যে সেই ২৫ সেপ্টেম্বরে হারিয়ে গিয়েছিল, বুঝতেই পারে নাই। সে তো এখন বাস করছে বর্তমানে, ২০১৯ সালের ১লা সেপ্টেম্বরের সন্ধারাতে। রাজীব চিঠিটি আবারো খুব যতেœ মানিব্যাগের মিনি পকেটে ভরে ট্রাংক বন্ধে করে দিল। ট্রাংক বন্ধ করে রাজীব বুঝি তার স্মৃতিগুলোকে বন্ধ করতে চাইল।

পাশের ঘর থেকে ডাক আসছে "ওই`` খেতে আসো। রাজীব চমকে ওঠে, "ওই`` বলে কে ডাকে? চাঁদনী? না, কেউ ডাকে নাই। রাজীব কি এখনো অতীতেই আছে?

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।