Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭, মঙ্গলবার ২৬ মে ২০২০, ৯:২৩ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনা সমাচার ও ঘরে থাকা


৩০ মার্চ ২০২০ সোমবার, ০৬:৫৯  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


করোনা সমাচার ও ঘরে থাকা

২০১৯ সালের ডিসেম্বর থেকে করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাব চীন থেকে শুরু হয়েছে। চীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে করোনার প্রথম আক্রমণ শুরু হয়। গবেষণায় অনেক ধরনের করোনা ভাইরাসের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। কিন্তু নভেল করোনা ভাইরাসের মতো ক্ষতিকর আর কোনটিই নয়।

নভেল মানে রাজকীয় এবং করোনা হলো মুকুট। ভাইরাসটির অনুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে যে ছবিটি দেখা যায় তার আকার-আকৃতি রাজমুকুটের মতো বলে একে নভেল করোনা ভাইরাস বা n-Corona Virus হিসেবে নামাকরণ করা হয়েছে। আর ২০১৯ সালে এ ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব হয়েছে এবং এর প্রভাবে অতি ছোঁয়াচে রোগ (Disease) সৃষ্টি হয়েছে বলে এ ভাইরাস এবং এর প্রভাবে সংঘটিত রোগটির নামাকরণ করা হয়েছে- (Corona) এবং ২০১৯ এর ১৯ সম্মিলনে n-Corona Virus Disease 2019 মিলে সংক্ষিপ্তভাবে Covid-19।

সেই গণচীনের হুবেই প্রদেশের উহান থেকে শুরু হয়ে সারা চীনেই ছড়িয়ে পড়েছিল করোনাভাইরাস। এরপর একে একে এক দেশ, দুই দেশ, তিন দেশ, চার দেশ- এমন করতে করতে এখন প্রায় বিশ্বের প্রায় দুশোর মতো অঞ্চল ও দেশেই তা ছড়িয়ে পড়েছে।

এখানে কিছু পরিসংখ্যান তুলে ধরছি। বিশ্বের আক্রান্ত দেশ প্রায় দুশো, আক্রান্ত মানুষ প্রায় সাতলক্ষ, মৃতের সংখ্যা প্রায় পঁয়ত্রিশ হাজার, সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন প্রায় দেড়লক্ষ। দেশ হিসেবে চীনকে দিয়ে শুরু হলেও এখন বেশ কয়েকটি দেশ চীনকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।

প্রায় একশো কোটি জনসংখ্যার দেশ চীনের আক্রমণ এখন কমে নতুন আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা প্রায় শূন্যের কোটায়। কিন্তু চীনের তুলনায় জনসংখ্যা অনেক কম এবং আরো উন্নত অনেক দেশ হওয়া সত্ত্বেও ইতালি, স্পেন, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান, যুক্তরাজ্য প্রভৃতি দেশ অনেকাংশে চীনের ভয়াবহতাকেও হার মানিয়েছে। এসব পরিসংখ্যান প্রতি মুহূর্তেই পরিবর্তনশীল। যেকোন কারণে একটি মৃত্যুও কাম্য নয়, কিন্তু তার পরেও বলা যায় সর্বশেষ পরিসংখ্যানে আক্রান্তদের মধ্যে মৃতের হার ৫.৫%।

তখন থেকে বিভিন্ন গণমাধ্যম, ব্যাপকভাবে বিষয়টি প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। এর মাধ্যমে কোন কোন দেশ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিয়েছেন, আবার কোন কোন দেশ হয়তো ভাবতেও পারেনি এর প্রাদুর্ভাব এতা ভয়াবহ হতে পারে। আমি যেহেতু বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে লেখালেখি করি এবং এ বিষয়টি নিয়েও যথারীতি লেখার পরিকল্পনা করেছিলাম। নজর রাখছিলাম কোথা থেকে শুরু করবো। কিন্তু এটি ধারাবাহিকভাবে এমনভাবে বিশ^ময় ছড়িয়ে যাচ্ছিল যে প্রতিমুহূর্তেই এর রং পাল্টাতে থাকল। একসময় বলা হচ্ছিল এ ভাইরাস বয়স্কদেরকে বেশি আক্রমণ করছে কিন্তু যতই দিন যাচ্ছে রকম পরিবর্তন করছে। এখন তা সব বয়সের মানুষকেই আক্রমণ করছে বলে জানা গেছে।

এ ভাইরাসটি কাকে আক্রমণ করবে আর কাকে করবে না এমন কোন নিয়ম মানছে না। বাদ যাচ্ছে না স্বাস্থ্যকর্মী, চিকিৎসক, মন্ত্রী-মিনিস্টার, রাজা-বাদশা, ধনি-দরিদ্র, বৃদ্ধ-যুবক-শিশু, নারী-পুরুষ কেউই। আক্রান্ত হয়েছেন ব্রিটেনের প্রিন্স চার্লস, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন এবং তাঁর স্বাস্থ্যমন্ত্রী। স্বেচ্ছায় হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল এবং কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো ও তাঁর স্ত্রী। এমন আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যাবে যা মুক্ত ও অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে এখন সবার মুখে মুখে।

করোনা ভাইরাস সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ গণমাধ্যমে মাঝে-মধ্যে কিছু গুজবের কথাও শুনতে হচ্ছে। সরকারি কিংবা বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য ছাড়া এর কোনটাই সঠিক নয় এবং তা বিশ্বাস করার কোন ভিত্তি নেই। তবে একটি বিষয় খুব পরিষ্কারভাবে বলা যেতে পারে, আর তা হল বাংলাদেশে করোনার প্রভাব ও এর বিস্তার সম্পর্কে। চীন আমাদের বাংলাদেশ থেকে খুবই কাছের একটি দেশ।

তারপরও এখন পর্যন্ত করোনা আক্রান্তের সংখ্যা পঞ্চাশ পেরোয়নি যা আমাদের জন্য আল্লাহর রহমত ছাড়া আর কিছুই না। তবে এক্ষেত্রে সরকারের পূর্ব প্রস্তুতি, নাগরিক সচেতনতামূলক কার্যক্রম, আঞ্চলিক আবহাওয়াগত বৈশিষ্ঠ্য- এগুলো অন্যতম কারণ হতে পারে। সেজন্য হয়তো দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশ যেমন- ভারত, শ্রীলংকা, নেপাল, ভুটান, পাকিস্তান ইত্যাদি দেশে আক্রমণের ভয়াবহাতা এখনো এতটা প্রকট হয়নি। অথচ বাংলাদেশের জনসংখ্যা ষোলো কোটি, আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের জনসংখ্যা একশো ত্রিশ কোটি। জনসংখ্যার অনপাতে আক্রান্ত হলে কেমন ভয়াবহ পরিস্থিতি হতে পারে।

তবে এ অঞ্চলে আক্রান্ত কম হয়েছে তা নিয়ে আত্মতুষ্টিতে বসে থাকলে চলবে না। কারণ বিশেষজ্ঞগণ এবং বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থাসহ আরো অনেকের ভবিষ্যদ্বাণী এমনও শোনা গেছে যে, করোনা ভাইরাসটি যেহেতু ক্ষণে ক্ষণে তার রূপ পাল্টাচ্ছে সেজন্য তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথেই এর প্রভাব বিস্তারের সম্পর্ক- এটি সবসময় ঠিক থাকছেনা। কাজেই এক্ষণই আরো সতর্ক ও সচেতন না হলে এতদাঞ্চলের সত্তরভাগ মানুষের এ রোগে সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর কীভাবে সচেতন ও সতর্ক হওয়া যায় সে বিষয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ইলেক্ট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়া খুললেই তা পাওয়া যাচ্ছে।

বাংলাদেশে প্রথম সংক্রমণ ধরা পড়ে ৮ মার্চ ২০২০ তারিখে। এরপর সতর্কতামূলক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে পরিস্থিতি পর্যালোচনায় ১৭ মার্চ থেকে ৩১ মার্চ ২০২০ পর্যন্ত প্রথম পর্যায়ে সকল ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল সরকার থেকে। পরবর্তীতে পরিস্থিতির ভয়াবহতা অবলোকনে সেটি বাড়িয়ে ইতোমধ্যে ৯ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত করা হয়েছে। এরমধ্যে দেশের জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ সার্ভিসসমূহ সীমিত আকারে চালু রেখে ৪ এপ্রিল ২০২০ পর্যন্ত দেশকে অঘোষিত লকডাউনে রাখা হয়েছে। তারমধ্যে আগে থেকে ঠিক করা মজিব জন্মশতবর্ষের গুরুত্বপূর্ণ সকল কর্মসূচিসহ স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে মহান স্বাধীনতা দিবসের সকল কর্মসূচি বাতিল করা হয়।

পুরো বিশ^ই করোনা মোকাবেলায় একই ব্যবস্থা গ্রহণ করার ফলে কার্যত সারাবিশ^ই এখন অচল হয়ে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞগণের মতে বাংলাদেশের জন্য আগামী দুই সপ্তাহ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাময়িক লকডউনের জন্য দেশ বিদেশের সকল মানুষ এখন একাকার হয়ে যার যার গ্রামের বাড়িতে অবস্থান নিয়েছেন। তারা সেখানে গিয়ে সামজিকভাবে মেলামেশা করছেন। যদিও সেনাবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতায় কিছুটা গণজমায়েত কমেছে, কিন্তু সেটি শুধু হাট-বাজার জাতীয় স্থানে সীমাবদ্ধ রয়েছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। বাদবাকী সকল মানুষকে লকডউনের আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না। কাজেই দেখা যাচ্ছে সম্প্রতি বিদেশ ফেরত মানুষ যদি বাড়ি, পাড়া-প্রতিবেশির সাথে মেশার জন্য যদি করোনা প্রাদুর্ভাবের কারণ হয়। তাহলে একই কারণ নিহিত রয়েছে যারা শহর থেকে গ্রামে পাড়ি জমালেন। কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তারা কাদের সংস্পর্শে এসেছেন সেগুলো বের করা খুবই কঠিন। আর যেহেতু কারো শরীরে করোনা আক্রমণ থাকলে তা দুইসপ্তাহ সময়ের মধ্যে প্রকাশ পায়, তাই সামনের দুইসপ্তাহ আমাদের কমিউিনিটি ট্রান্সমিশন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কাজেই এ সময়টা ঘরে থাকার বিকল্প নাই। সেক্ষেত্রে নিজে নিজের জায়গায় সচেতন না হলে সেনাবাহিনী, পুলিশ, র‌্যাব দিয়ে সচেতন করে আর যাই হোক রোগ সংক্রমণ রোধ করা যাবে না। কারণ সরকার কিংবা কর্তৃপক্ষ ছুটি দিয়েছে বিনোদনের জন্য নয়, পরিস্থিতির ভয়াবহতা বিবেচনায় ঘরে থাকার জন্য। ধরে নিন না, এ সময় এটাই আপনার কাজ। ফেসবুক খুললেই দেখা যায় কোন হাসপাতাল থেকে বলছেন, আপনার জন্য আমরা হাসপাতালে- দেশের জন্য আপনি ঘরে থাকুন। আবার ব্যাংক থেকে বলছেন, আপনার জন্য আমরা ব্যাংকে- দেশের জন্য আপনি ঘরে থাকুন। সত্যিই কী মহানুভবতা!

আমরা সম্মিলিত প্রচেষ্টায়, কলেরা মহামারি, ম্যালেরিয়া মহামারি, প্লেগ মহামারি, জিকা ভাইরাস মহামারি, সাম্প্রতিক ডেঙ্গু মহামারিসহ আরো অনেক মহামারি রোগকে মোকাবেলা করতে পেরেছি। তবে সেগুলোর সাথে এটার একটা বেসিক পার্থক্য রয়েছে। এর আগে কোন রোগই গোটা বিশ্বময় এমনভাবে প্রদার্ভাব ঘটাতে পারেনি। এত অল্প সময়ে এত বেশি ক্ষয়ক্ষতি করতে পারেনি। কাজেই করোনাকে মোকাবেলা করার জন্য যেসব স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে সেগুলো মেনে চললে অবশ্যই এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়া সম্ভব যা চীন ইতোমধ্যে দেখিয়ে দিয়েছে।

পরিশেষে বলতে হয় আতঙ্কিত না হয়ে কিংবা কোন ধরনের গুজবে কান না দিয়ে শুধুমাত্র যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মাধ্যমে করোনা ভাইরাসকে এবারের মতো বিদায় করা সম্ভব। ভাইরাসটি নতুন আবিষ্কৃত হওয়ায় ও প্রাদুর্ভাব ছড়ানোতে এখন পর্যন্ত এর পুরো টিকা কিংবা নিরাময়ের ঔষধ আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি। তবে কাজ চলছে। আশার কথা হলো জ্ঞান-বিজ্ঞানে সমৃদ্ধ এ ডিজিটাল বিশ্বে নিশ্চয়ই এ থেকে প্ররিত্রাণের জন্য একটি সুখবর আসবে আগামী দিনে। আমরা আগামীতে তেমন একটি সুখবরের অপেক্ষাতেই রইলাম। আর এখন এ নোভেল করোনা ভাইরাস-২০১৯ অর্থাৎ হ-ঈড়ারফ-১৯ ঠেকানোর জন্য আমাদেরকে ঘরে বসে থেকে সঠিক স্বাস্থ্যবিধি মানার কোন বিকল্প নেই।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।