Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১২ আশ্বিন ১৪২৭, রবিবার ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ৬:১৬ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনাকালের জীবন কড়চা


৩১ আগস্ট ২০২০ সোমবার, ১২:০৪  এএম

প্রকৌশলী মোহাম্মদ আলী

বহুমাত্রিক.কম


করোনাকালের জীবন কড়চা

গত বছরের অক্টোবরে স্ত্রী কানাডায় গিয়েছেন মেয়ের কাছে, সন্তান সম্ভবা কন্যার পাশে থাকবেন। ফেরার কথা ডিসেম্বরে, অবশেষে বাস্তবতার নীরিখে এ বছরের ফেব্রুয়ারিতে। নাতিনের মুখ দর্শন ও স্ত্রীকে আনতে ফেব্রুয়ারির শেষ সপ্তাহে কানাডার গুয়েল্ফ সিটিতে গিয়ে হাজির। মেয়ে নাজিয়া নওরীন গুয়েল্ফ বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএস করছে। তিন সপ্তাহের সফরে ১৫ মার্চ দেশে ফেরার সিডিউল।

মার্চের প্রথম সপ্তাহেই বাংলাদেশে করোনার প্রাদুর্ভাব শুরু হয়ে গেছে। সময়মতো কানাডা থেকে বিদায় নিয়েছি ১৪ মার্চ। দুবাই হয়ে রাত ১০ টা ৩০ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ। দুবাই এয়ারপোর্টে, প্লেনে সবার মুখেই মাস্ক, আমাদেরও। ইমিগ্রেশন লাইনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছে যদি ক্যাম্পে পাঠিয়ে দেয়! না তা হয়নি, পরীক্ষা করে বলে দিয়েছেন বাসায় ১৪ দিন কোয়ারেন্টাইনে থাকবেন, শুকরিয়া। রোমেন, মাসুম এয়ারপোর্ট থেকে এনে সবকিছু স্যানিটাইজেশন করে বাসায় উঠালেন। কোয়ারেন্টাইন শুরু হলো ১৬ মার্চ সকাল হতে। কোথাও বের হয়নি ৩০ মার্চ পর্যন্ত।

ইতিমধ্যে ১৮ মার্চ প্রথম করোনা রোগী মারা যাওয়ায় এবং আক্রান্তদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকার সারাদেশে লকডাউন ঘোষণা দিয়েছে। পাবলিক ট্রান্সপোর্ট, শপিং মল, অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ, ব্যাংক বন্ধ। কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান পর্যায়ক্রমে খোলা থাকবে। লকডাউন বৃদ্ধি করতে করতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হলো। আমাদের `আপনালয়` বাসভবন কে সম্পূর্ণ লকডাউনের আওতায় আনা হলো। No entry, No departure/Out. অস্থায়ী গৃহকর্মীদের আপাততঃ বিদায়। জীবনযাত্রা চলবে কি করে? শুরু হল বিকল্প ব্যবস্থা। ভ্যান হতে প্রতিদিনের তরকারি, বাসার সামনের দোকান হতে প্রয়োজনীয় মনোহারী দ্রব্যাদি গ্রহণ। Sadagar. com হতে ও অনলাইনে ক্রয় শুরু হলো। বাজারের মুরগি দোকানদারকে ফোনে মুরগির অর্ডার দিলে সরবরাহ করে। মাসুম মাঝেমধ্যে আড়াইহাজারের বিশনন্দী হতে তাজা মাছ সংগ্রহ করে, ভাগ পাই। খাবারের সাপ্লাই চেইন বন্ধ হয়নি।

ছাদে ফল-ফুলের বাগান। বিয়াই সাহেব, ছেলের শশুর অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা জনাব হাবিবুল্লাহ নিয়মিত সকাল-বিকাল স্বপ্রণোদিত হয়ে বাগানের পরিচর্যা করেন। প্রয়োজনীয় সরঞ্জামাদি, মালামাল সবই জোগাড় করেন নিজে। আমরা অন্য বাসিন্দারা খুব বেশি খোঁজখবর নিতে পারিনা। লকডাউন অবস্থায় সবারই ছাদে আগমন ঘটে সকাল-বিকাল। একটু হালকা শরীরচর্চা, গায়ে রোদ লাগানো চলছে। বিকালে হৈ-হুল্লোড় একটু বেশি, সব বাচ্চারা এসে মজা করে, গাছে পানি দেয়, ইচ্ছেমত চেচামেচি করে। আমরা দুজন আবারো আসি ছাদে রাতের খাবারের পর। উঁচু আকাশে হালকা মেঘের ভেলা, মৃদুমন্দ বাতাস, হাসনাহেনার সুবাস, জোসনা থাকলে উপরিপাওনা,সবকিছু মিলিয়ে সময় কাটে একান্তে, ফিরে যাই ঘরে, শান্তির নীড়ে।

দৈনিক পত্রিকা রাখার নতুন বিড়ম্বনা শুরু হয়েছে ক`দিন ধরে। সব ফ্লাটের পত্রিকা বাদ দিয়ে দিয়েছে আমাকে ছাড়া। পত্রিকার মাধ্যমে নাকি লকডাউন ভবনে করোনা ভাইরাস ছড়াবে। স্বাধীনতা পূর্বকালীন সময় হতে আব্বা দৈনিক ইত্তেফাক রাখেন তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নারায়ণগঞ্জে। সপ্তাহের শেষ দিনে বাড়ি আসার পথে লঞ্চে বসে বসে যে সংখ্যাটি পড়েন, বাড়িতে আনলে আমরা পড়ি। সুদীর্ঘকাল ইত্তেফাক আমাদের ছেড়ে যায়নি, আমরাও ছাড়িনি। মা নিয়মিত প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পত্রিকা পড়ে সময় কাটান, আমিও। মে`র শেষের দিকে প্রবল জনমতের চাপে ইত্তেফাককে আপাততঃ ভবনের ভেতর ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। অন্যরা স্বস্তিতে, আমরা অস্বস্তিতে ভুগছি।

নোটের মাধ্যমেও নাকি করোনা ভাইরাস ঢুকে যাবে, ফেরিওয়ালাদের কাছ থেকে। সরাসরি আর্থিক লেনদেন করলে তো নোটের বিনিময় প্রয়োজন, ইতিমধ্যে সমাধান ও বের হয়ে গেছে। স্বচ্ছ প্লাস্টিকের বক্সে নোট রাখা হবে। কেয়ারটেকার বিনিময় করে অবশিষ্ট নোট ওখানে রাখবে। আমরা মাঝেমধ্যে অধিকতর বড় নোট প্রতিস্থাপিত করবো। নিচতলায় সাবান, পানির পর্যাপ্ত ব্যবস্থা আছে, কেয়ারটেকার ঘন ঘন হাত ধুবে, স্যানিটাইজেশন করবে।

অনেক সময় হোম ডেলিভারি আসলে দুই তিন দিন নিচেই রাখা হয়। ভেতর থেকে যেহেতু কেউ বাইরে যায়না, সাততলার খালি ফ্ল্যাটে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়ার ব্যবস্থা হল নির্ধারিত সময়ে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় এবং তাদের নিজস্ব কারখানায় উৎপাদন বিঘ্নিত হওয়ায় মে মাসে ভাড়াটিয়া অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সমস্যাদি উল্লেখ করে তল্পিতল্পাসহ চলে গেছেন গ্রামের বাড়ি আড়াইহাজারে। মাসুম ৭ তলার এক কক্ষে ভারচুয়াল কার্যালয় বসিয়েছে। সারাদিন মিটিং কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করে রবির বিভিন্ন এজেন্সি ও গ্রুপের কার্যক্রমে। মা আর শাশুড়ি সময়মতো খালি জায়গায় হাঁটাহাঁটি করতে যান।

বাজারে গিয়ে মৌসুমী ফল কেনা যাবে না। আম লিচু হোম ডেলিভারি দিচ্ছে sadagar.com সরাসরি রাজশাহীর বাগান হতে। আত্মীয়-স্বজনদের বাসায় ও যাচ্ছে। আমরা `আপনালয়` ভবনের বাসিন্দারা ভাগাভাগি করে সদ্ব্যবহার করছি। ভাগ্নি আফরোজার স্বামী নওগাঁ হতে আম পাঠিয়েছে কোরিয়ারে। রোমেন তার বিশ্ববিদ্যালয় সোর্সের মাধ্যমে ও রাজশাহী হতে আম আনিয়েছে। ফল-ফলাদির ঘাটতি নেই, কার্বোহাইড্রেট, প্রোটিন আমিষ কোন কিছুরই অভাব নেই, শুকরিয়া। মহান আল্লাহতালার উপর পূর্ণ আস্থা রেখেই দিন যাপিত হচ্ছে।এরই মধ্যে পবিত্র রমজান শুরু হয়ে গেছে। তারাবি যার যার ঘরে। ছেলে, ছেলে-বউ, নাতনিসহ ইফতারি আমাদের ঘরে। আগের মতোই সাধ্যমত আইটেম, রুচি স্বাদের প্রতি লক্ষ্য রেখে নতুনত্ব আসে । করোনার রমজান এক সময় অতিক্রান্ত হয়। টিভিতে ঈদুল ফিতরের গান। রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ...। মাঠে নামাজ হবে না। মসজিদে চারটি জামাত হবে।

আপনালয়ের বাসিন্দারা ছাদে নামাজ পড়বো ঠিক হলো। রোদ্রকরোজ্জ্বল স্নিগ্ধ সকালে আমরা ১১ জন ছাদে জামাতে ঈদ-উল-ফিতরের ওয়াজিব নামাজ আদায় করলাম। অদ্ভুত এক অনুভূতি, এমনটি করতে হবে কখনো কল্পনাতেও আসেনি। ঈদ উৎসবের খানা পিনা শুরু হবে সকালে আমাদের বাসা হতে, সকলে আমন্ত্রিত। চলবে দিনভর সকল বাসায়। বাচ্চারা মোটেও নিরাশ হয়নি, তাদের পছন্দনীয় বিভিন্ন আইটেম পেয়ে আনন্দিত। করোনা তাদেরকে ঈদে নিরানন্দ করতে পারিনি।

প্রতিদিন সকালে সারাদিনের কর্ম পন্থা নির্ধারণ করি। N8 প্রজেক্ট-এর প্রজেক্ট ম্যানেজার প্রকৌশলী আরাফাত ফরিদপুরের ভাঙ্গায় অবস্থান করে সাইটের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে । নারায়ণগঞ্জ অফিসার্স ফোরাম, ঢাকাস্থ আড়াইহাজার সমিতি, আত্মীয় স্বজন, গ্রামের করোনার অবস্থা ইত্যাদি জানা। বাসার বুকসেলফগুলো শতশত বই-পুস্তকে ঠাসা, সময় কাটে নি এরকম কখনো হয় নি। এবাদত-বন্দেগি, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গ দেয়া, গল্পগুজবে দিন কাবার। ছেলে, বৌমা তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভার্চুয়াল ক্লাস নেয়। নাতনি রায়নাও তার স্কুলের ভার্চুয়াল ক্লাসে যোগদান করে ক্লান্ত। ঘরে লবণ গরম-পানির গড়গড়া, মশলা মিশ্রিত গরম পানির ভাপ নেয়া, মশলা চা, রং চা ইত্যাদি সেবন চলছেই।

ঢাকাস্থ আড়াইহাজার উপজেলা চাকরিজীবী সমবায় সমিতি লিমিটেডের পক্ষ হতে করোনা ক্রাইসিস ফান্ড সংগ্রহ করে ত্রাণ বিতরণ করার পরিকল্পনা করা হলো। সম্পাদক আশরাফ সহ সকল পরিচালক, ঊর্ধ্বতন সাবেক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ শুরু হলো। লকডাউন অবস্থায় কাজটি কঠিন, কিভাবে অর্থ জোগাড় হবে। ঠিক হলো আমি বিকাশ একাউন্ট খুলব সেখানে অর্থ জমা হবে। এসএমএস ও ব্যক্তিগত টেলিফোনে অনুরোধ যাচ্ছে। সভাপতি হিসেবে ইতিপূর্বে যাদের সাথে টেলিফোনে যোগাযোগ হয়নি করোনায় তাদের সাথে সরাসরি কথা বলার সুযোগ হয়েছে। মানবতার কল্যাণে সদস্যদের পক্ষ হতে বিপুল সাড়া। রেজিস্টার তৈরি করে বিকাশের অর্থ, তারিখ, সদস্য নং ও পরিমাণ উল্লেখ করে তালিকাভুক্ত করছি। আনন্দ অনুভব করছি এ ধরনের মহান কাজে সম্পৃক্ত হয়ে। সকাল হতে রাত অবধি ক্লান্তিহীন প্রচেষ্টা।

লকডাউনের মেয়াদ ৩১মে’র পর আর বাড়ায়নি। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১ জুন হতে গণপরিবহন চলবে। সীমিত সময়ের জন্য শপিংমলগুলো খুলবে। অফিস, কারখানায় কাজ চলবে। জীবন-জীবিকার তাগিদে বাঁচার লড়াইয়ে করোনাকে জয় করে বিধি-বিধান মেনে চলাচল করতে হবে। গণপরিবহনের নীতিমালা নির্ধারণ করা হয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকবে। আমাদের ভবনের বাসিন্দাদের মধ্যে বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে, প্রায় আড়াই মাস গৃহবন্দি। আরেক অধ্যায়ের সূচনা হলো, লকডাউন ব্রেক।

লেখক: রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রাক্তন  কর্মকর্তা

ঢাকা, ৩০ আগস্ট ২০২০ 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।