Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১৯ আষাঢ় ১৪২৭, শনিবার ০৪ জুলাই ২০২০, ৭:৫৮ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

আওয়ামী লীগের ২১তম সম্মেলন: আবারো শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদের


২১ ডিসেম্বর ২০১৯ শনিবার, ১০:৫৩  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


আওয়ামী লীগের ২১তম সম্মেলন: আবারো শেখ হাসিনা-ওবায়দুল কাদের

ঢাকা : আওয়ামীলীগ যে জনগণের দল, তৃণমূলের দল, প্রকৃত কর্মীদের দল, প্রকৃত নেতাদের দল সর্বোপরি রাজনৈতিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র তা আবারো ২১তম জাতীয় সম্মেলনের মাধ্যমে আরো একবার প্রমাণিত হলো।

প্রতিবারের জাতীয় কাউন্সিলের ন্যায় এবারো পূর্ব ঘোষিত অনেক চমক লক্ষ্য করা গেছে। কারণ অন্যান্য সময়ের মতো এবারো কথা উঠেছিল শেখ হাসিনাই হচ্ছেন একটানা নবম বারের মতো সভাপতি এবং ওবায়দুল কাদেরই হচ্ছেন একটানা দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক। আসলে হয়েছেও তাই। এখন পর্যন্ত প্রেসিডিয়ামে নতুন তিনজন যথা- শাজাহান খান, জাহাঙ্গীর কবির নানক ও আবদুর রহমান এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদে নতুন দুইজন যথা- ড. হাছান মাহমুদ ও কৃষিবিদ আফম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং সাংগঠনিক সম্পাদক পদে একজন যথা মির্জা আজম যুক্ত হয়েছেন। বেশিরভাগ পদেই পূর্বের ব্যক্তিই বহাল রয়েছেন। তবে পরিবর্তন ঘটেছে দপ্তর সম্পাদক ও প্রচার সম্পাদক পদেও।

ওবায়দুল কাদের এবারে দ্বিতীয়বারের মতো সাধারণ সম্পাদক হওয়াতে আওয়ামীলীগের কাউন্সিলরা তো খুশি হয়েছেনই, সেই সাথে সারাদেশের রাজনৈতিক এবং অরাজনৈতিক আাওয়ামী পরিবারের লক্ষ-কোটি মানুষ খুশি হয়েছেন। খুশি হয়েছেন অন্য রাজনৈতিক দল এবং সাধারণ মানুষও। কারণ বাংলাদেশের মানুষ এখন অনেক রাজনীতি সচেতন। কাজেই সবাই চান রাজনীতি যেন থাকে রাজনীতিবিদদের কাছেই। এবারে অন্যান্য চমকের সাথে রয়েছে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে দুইজন অর্থাৎ জাহাঙ্গীর কবীর নানক ও আবদুর রহমানকে করা হয়েছে সভাপতি ম-লীর সদস্য। সেখানে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে যুক্ত হয়েছেন আগের পরপর দুই কমিটির সফল সাংগঠনিক সম্পাদক বিশিষ্ট সংগঠক কৃষিবিদ অফম বাহাউদ্দিন নাছিম এবং তথ্য ও প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ। তবে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য সংখ্যা ৪১ থেকে বাড়িয়ে ৫১ করা হয়েছে। যেসব পদে এখনো কাউকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি সেগুলো নিশ্চয়ই দ্রুততম সময়ের পূরণ করা হবে বলে জানা যায়।

সভাপতি পদে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার মনোনয়নের বিষয়টি একপ্রকার নিশ্চিত থাকলেও আওয়ামীলীগের মতো বড় দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ সাধারণ সম্পাদক পদটি নিয়ে সবসময়েই একটু বেশি অলোচনা থাকে। এবারেও তার ব্যতিক্রম ছিলনা। প্রায় ডজন খানেক গুরুত্বপূর্ণ নেতার নাম এ তালিকায় থাকলেও তিনচার জনের নাম বেশ জোরেসোরেই শোনা যাচ্ছিল। তার মধ্য থেকেই আবারো এ পদে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হলেন ওবায়দুল কাদের। বিগতদিনে তিনি একজন কঠোর পরিশ্রমী নেতার পরিচয় দিয়েছেন। তাছাড়া এবার আরো শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলে সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়- তিনি পুরাদস্তুর আগাগোড়া একজন ফুলটাইম রাজনীতিক। রাজনীতি ছাড়া তাঁর আর কোন ব্যবসা-বাণিজ্য নেই। ওবায়দুল কাদের তাঁর স্কুল ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়ন। তিনি নোয়াখালী জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বড় রাজপুর গ্রামে ১৯৫২ সালের ১ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহন করেন।

তাঁর শিক্ষক বাবা মোশাররফ হোসেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে বঙ্গবন্ধুর সহপাঠি ও সহযোদ্ধা ছিলেন। তাঁর মা ফজিলাতুন্নেছা সুগৃহিনী এবং স্ত্রী ইসরাতুন্নেছা একজন আইনজীবী।

শিক্ষাজীবন শুরু হয় নিজ এলাকা থেকেই। তিনি বসুরহাট হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এসএসসি এবং নোয়াখালী সরকারি কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএসসি পাশ করার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হন। সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্মানসহ স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায় থেকেই তিনি বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ছাত্রলীগের রাজনীতিতে যুক্ত হন, সেই রাজনৈতিক ধারাবহিকতায় তিনি এখানো সক্রিয় রয়েছেন।

বঙ্গবন্ধুর ডাকে ’৬৬’র ৬ দফা ’৬৯-এর গণঅভ্যূত্থানে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন তিনি। তিনি সব সময়ই তরুণ প্রজন্মের একজন হিরোয়িক নেতা ছিলেন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তিনি কোম্পানীগঞ্জ থানার মুজিব বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ নেতৃত্ব দেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের ঘটনার পর তিনি আড়াই বছর কারাবন্দি ছিলেন। তারপর ছাত্রলীগে তাঁর পূর্ব অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে কারাগারে রেখেই বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। সে সভাপতির দায়িত্বও তিনি পরপর দুই মেয়াদ পালন করেন।

তারপর থেকে তিনি আওয়ামীলাগের হয়ে ছাত্রলীগের মুরুব্বী হিসেবে কাজ করেন আওয়ামীলীগ দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার নির্দেশে। ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদে তিনি নোয়াখালী-৫ আসন থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়ে তৎকালীন সরকারের যুব, ক্রীড়া ও সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী হিসেবে তিনি তার সফল দায়িত্বকাল শেষ করেন। তখনো তিনি হয়ে উঠেন যুবসমাজের পছন্দের পাত্র এবং মধ্যমণি। তিনি ২০০০-২০০২ মেয়াদে আওয়ামীলীগের শিক্ষা ও সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক এবং ২০০২-২০০৯ মেয়াদে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বপালন করেন। এরপর ২০০৭ সালে তৎকালীন কথিত সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করলে ৯ মার্চ ২০০৭ তারিখে গ্রেফতার হয়ে ১৭ মাস ২৬ দিন কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসবাস করেন। তারপর তিনি ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সেই ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় অন্যান্যদের সাথে মারাত্মকভাবে আহত হন।
২০০৯ সালে তিনি আওয়ালীগের দলীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলটির নীতি নির্ধারণী ফোরাম অর্থাৎ প্রেসিডিয়াম মেম্বার নির্বাচিত হন।

২০০৯ সালে নবম জাতীয় সংসদে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে দলকে সুসংগঠিত করার জন্য তিনি প্রথম দিকে মন্ত্রীত্বের দায়িত্ব না নিয়ে কিছু সময়ে দলকে গুছিয়ে ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর তিনি ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদে তৃতীয় বারের মতো সাংসদ হয়ে অন্তর্বর্তীকালীন এবং পরবর্তী নতুন সরকারে ২০১৪ সালের ১২ জানুয়ারি আবারো দ্বিতীয় বারের মতো যোগাযোগমন্ত্রী হিসেবেই তাঁর দায়িত্ব বহাল থকে। তাঁর নিয়ন্ত্রণাধীন পূর্বেকার যোগাযোগ মন্ত্রণালয়টিই এখন পরিবর্তিত হিসেবে ‘সড়ক যোগাযোগ ও সেতু মন্ত্রণালয়’ হিসেবে পরিচিত। ২০১৯ সালের নির্বাচনে গঠিত সরকারেও তিনি একই পদে বহাল রয়েছেন। পদ্মা সেতু নির্মাণে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি একসময় জনপ্রিয় দৈনিক বাংলার বাণীতে সহকারি সম্পাদক হিসেবে সাংবাদিকতার পাশাপাশি লেখালেখির সাথে যুক্ত থেকে ৯টি বই বের করেছেন।

তিনি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ার পর সম্মেলন প্যান্ডেলজুড়ে মুহুর্মুহু ধ্বনিতে উদ্ভাসিত হয়েছে সম্মেলনস্থল। অভিনন্দনের ঝড় উঠেছে ভার্চুয়াল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে। এর একটিই কারণ তিনি এখন তৃণমূল থেকে উঠে আসা একজন নেতা। সভাপতি শেখ হাসিনা নিজেও সম্মেলনের ঘোষণামঞ্চে একথা উল্লেখ করেছেন। কাজেই তাঁর নেতৃত্বে সত্যিকারের তৃণমূলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মূল্যায়ন পাবেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে কোথাও কোন ব্যর্থতার কথা শোনা যায়নি। তিনি সরকারের মন্ত্রীসভায় অন্যতম সফল একজন মন্ত্রী। দেশের বর্তমান ও আগামীর স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণে রয়েছে তাঁর প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। দেশের সড়ক যোগাযোগের ক্ষেত্রে, সেখানে শৃঙ্খলা সৃষ্টিতে তিনি অত্যন্ত সততা ও দক্ষতার সাথে প্রত্যেকটি কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করে চলেছেন।

তিনি দলের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হওয়ায় ইতোমধ্যে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ বন্ধুপ্রতিম অনেক রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। তিনি অভিনন্দন পাচ্ছেন বিদেশি বন্ধুরাষ্ট্রের রাজনীতিকদের কাছ থেকেও। ইতিপূর্বে সদ্য প্রয়াত সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামসহ ইতিপূর্বে শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে যাঁরা সাধারণ সম্পদাকের দায়িত্বে ছিলেন- আব্দুর রাজ্জাক, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, জিল্লুর রহমান, আবদুল জলিল প্রমুখ সবাই ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত থাকলেও একেবারে ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতিদের মধ্যে তিনিই প্রথম বাংলাদেশ আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক হলেন।

তাঁর সাথে সভাপতি শেখ হাসিনাসহ সভাপতিম-লীতে নতুন যে তিনজন এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নতুন দুজনসহ যাঁদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে, তাঁদের সকলকে নিয়ে আগামী দিনে দল ও দেশের জন্য কাজ করবেন তিনি এ বিশ্বাস সবার আছে। কাজেই বর্তমানে দেশের উন্নয়ন ধারাকে সমুন্নত রেখে সামনের মিশন ও ভিশনগুলোকে অর্জন করাই এখন সামনের বড় চ্যালেঞ্জ। এ কমিটি আওয়ামীলীগ ও দেশের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পালন করবেন। তারমধ্যে রয়েছে মুজির বর্ষ, মুজিব জন্ম শতবার্ষিকী, বাংলাদেশের স্বাধীনতার অর্ধশত বার্ষিকী। এ চ্যালেঞ্জে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে ওবায়দুল কাদের বর্তমান নবনিযুক্ত কমিটিকে নিয়ে সামনের দিকেই এগিয়ে গিয়ে উন্নয়ন ও গণতন্ত্র সমুন্নত রাখবেন। আমরা তাঁর সাফল্য কামনা করি। জয়তু শেখ হাসিনা, জয়তু ওবায়দুল কাদের, জয়তু কমিটির সকল পদধারীবৃন্দ।

লেখক:  ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়email: [email protected]

 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।