Bahumatrik | বহুমাত্রিক

সরকার নিবন্ধিত বিশেষায়িত অনলাইন গণমাধ্যম

শ্রাবণ ৮ ১৪৩১, বুধবার ২৪ জুলাই ২০২৪

মহামিলনের বারতা এনেছে যে উৎসব

আশরাফুল ইসলাম

প্রকাশিত: ০০:১৩, ৯ মে ২০২৩

আপডেট: ১৫:৪২, ৯ মে ২০২৩

প্রিন্ট:

মহামিলনের বারতা এনেছে যে উৎসব

-আশরাফুল ইসলাম। ছবি: আইসিএনএসআই আর্কাইভ

‘৬৩ দিন লাহোর জেলে অনশন করে শহীদের মৃত্যুকে বরণ করেন বাংলার বিপ্লবী যতীন দাস। হাওড়া স্টেশন থেকে শহীদ যতীন দাসের মরদেহ নিজ কাঁধে বহন করে কেওড়াতলা মহাশ্মশানে নিয়ে যান বাংলার অবিসংবাদিত বিপ্লবী নেতা সুভাষচন্দ্র বসু।  রাস্তার দুই পাশে হাজারো জনতা সেই শবযাত্রায় শামিল হয়েছিল। ক্ষোভে উত্তাল হয়ে উঠেছিল গোটা দেশ। তবু তুমি কি বলতে চাইছো বিপ্লবীদের প্রতি দেশের জনগণের সমর্থন নেই?’ মঞ্চনাটক ‘ট্রায়াল অব সূর্যসেন’-এ মাস্টারদা সূর্যসেনের চরিত্রে শক্তিমান অভিনেতা নাদের চৌধুরীর এ সংলাপ কেবলই কানে বেজে উঠছে।  তিন দিনের এক মহাউৎসব শেষে দিল্লি থেকে কলকাতার দীর্ঘ ট্রেনযাত্রায় ফেরার পথে ১৯৩০ সালের ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামে ইতিহাসের অবিস্মরণীয় সেই অধ্যায় যেন কল্পনায় ফের মূর্ত হয়ে ওঠে। 

সহযোদ্ধাদের উদ্দেশে ফাঁসির আগে বিপ্লবী বীর মাস্টারদার শেষ বার্তা- ‘জালালাবাদ পাহাড়ের যুদ্ধ, ধলঘাটের যুদ্ধের স্মৃতি ভুলো না...হৃদয়ের মণিকোঠায় রেখো’ কিংবা ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির মাস্টারদাকে সামরিক অভিবাদনের দৃশ্য কেবলই চোখের সামনে ভাসছে। পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ বিতাড়নের অংশ হিসেবে চট্টগ্রাম যুববিদ্রোহের পর কেটে গেছে ৯ দশকেরও বেশি সময়। খন্ডিত হয়ে গেছে বিপ্লবীদের স্বপ্নের সেই স্বদেশ। মূলধারার ইতিহাস চর্চাতেও ব্রাত্য করে রাখা হয়েছে স্বাধীনতা সংগ্রামের এ অবিস্মরণীয় আখ্যান। তবে এ জাতীয় কর্তব্যকে আপন স্কন্ধে তুলে নিয়ে বাংলাদেশের নাট্যকর্মীরা ভারতের রাজধানী দিল্লির বুকে দিল্লিবাসীর সামনে মেলে ধরলেন ভুলে যাওয়া সেই ইতিহাস।

বাংলা নববর্ষের উৎসব আবহে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের স্মরণের এ প্রচেষ্টা দাগ কেটেছে বহু মানুষের মনে। তরুণদের কাছে আত্মগৌরবের এ ইতিহাস পরোক্ষ প্রবর্তনা দিয়েছে, ফিরিয়ে নিয়ে গেছে অখন্ড স্বদেশের মুক্তির ভাবনায় এবং এ ভাবনায় আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের জনগণের বিদ্যমান সৌহার্দ্য ও মৈত্রীকে যেন আরও নিবিড় করে তুলল। প্রাদেশিকতার বাধা-ব্যবধান ঘুচিয়ে শেকড়ের অবিচ্ছেদ্য এক চেতনায় অবগাহন করিয়েছে এ উৎসব।  তিন দিনের সেই উৎসবের পর্দা নামলেও জনগণের মহামিলনের সুর আরও মধুর পঙ্ক্তিতে যেন বাঁধা পড়ছে।

বলছিলাম ভারতের রাজধানী দিল্লিতে সদ্য সমাপ্ত বাংলা বর্ষবরণ উৎসবের কথা। ঢাকা থেকে শুরু হওয়া ‘নেতাজি-বঙ্গবন্ধু জনচেতনা যাত্রা’র সমাপনী আয়োজনকে ঘিরে তিন দিনের এ উৎসব স্বীকৃতি পেয়েছে ভারত সরকারের ‘আজাদীকা অমৃৎ মহোৎসব’ এর অংশ হিসেবে। বাংলা নববর্ষের চিরায়ত উৎসব আবহে মুক্তিসংগ্রামের এ অভিন্ন চেতনাকে যুক্ত করার প্রথম প্রয়াসটি নেয়- ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর নেতাজি সুভাষ আইডিওলজি (আইসিএনএসআই) ও বহুমাত্রিক.কম। ২০২১ সালের ২ ডিসেম্বর ঢাকার বঙ্গবন্ধু ভবন প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছিল যে জনচেতনা যাত্রা; তারই সমাপনী আয়োজন পূর্ণতা পেল তিন দিনের বাংলা বর্ষবরণ উৎসবের মধ্য দিয়ে। ‘মুক্তির অভিন্ন চেতনায় সম্প্রীতির ঐকতান’ স্লোগানে আয়োজকদের এ ভাবনাকে পূর্ণতা দেয় বাংলাদেশ-ভারত ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরিষদ।

মুক্তিসংগ্রামে বাঙালির এগিয়ে থাকার সুপ্রাচীন ঐতিহ্যের কথা স্মরণ করেই হয়তো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কলকাতায় মহাজাতি সদনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে বলিষ্ঠ কণ্ঠে উচ্চারণ করেছিলেন- ‘জাগ্রত চিত্তকে আহ্বান করি, যার সংস্কারমুক্ত উদার আতিথ্যে মনুষ্যত্বের সর্বাঙ্গীণ কল্যাণ চিরসত্যতা লাভ করুক। সেই সঙ্গে এই কথা যোগ করা হোক, বাঙালির বাহু ভারতের বাহুকে বল দিক। বাঙালির বাণী ভারতের বাণীতে সত্য করুক।’

অন্যদিকে, ভারতের স্বাধীনতার বরপুত্র, মুক্তিসংগ্রামের অধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সিঙ্গাপুর থেকে স্বদেশের পূর্ণ স্বরাজ ও ব্রিটিশ শাসনকে নির্মূল করতে যে ‘ভারত অভিযান’ করেছিলেন, সেখানে রবীন্দ্রনাথের প্রিয় দেশনায়ক ‘দিল্লি চলো’ আহ্বানে সহযোদ্ধাদের উদীপ্ত করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা দেব।’

নেতাজির আজাদ হিন্দ ফৌজের দুঃসাহসিক অভিযানের উত্তাপে সন্ত্রস্ত ব্রিটিশ রাজশক্তির বিনাশ হলেও নব্য ঔপনিবেশিক শক্তি পাকিস্তানের জন্ম নতুন পরাধীনতার শৃঙ্খলে বাঙালির চিরকালের সংগ্রাম চেতনাকে চ্যালেঞ্জ জানায়। শেকড়ে প্রোথিত সেই সংগ্রাম চেতনার ভূমি থেকেই জেগে ওঠেন একজন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যাঁর নিরন্তর সংগ্রাম প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে। ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য এ পরম্পরাকে সাংস্কৃতিক মাধ্যমে যুক্ত করে বাংলাদেশ-ভারত ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরিষদ মঞ্চনাটক, সংগীত, গীতিনাট্য, পুঁথিপাঠ আর আবৃত্তির বৈচিত্র্যে ভরিয়ে এক অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসবের পরিকল্পনা নেয়।

যে অবিসংবাদিত নেতা একদিন এই বলে আশীর্বাদ করেন যে, ‘আমি তোমাদের আমার সুভাষকে দিচ্ছি, তোমরা সব পাবে’ সেই দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের নামাঙ্কিক রাজধানী দিল্লির বুকে চিত্তরঞ্জন পার্ককে এ মহাউৎসবের স্থান হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। সিআর পার্কে স্বাধীনতা সংগ্রামী ও বাগ্মী, অবিভক্ত বাংলা তথা ভারতের গৌরব বিপিনচন্দ্র পাল ট্রাস্ট মিলনায়তনে তিন দিনের এ উৎসব তার প্রকৃত চরিত্র নিয়ে আবির্ভূত হতে সক্ষম হয় ‘ট্রায়াল অব সূর্যসেন’ নাটক মঞ্চস্থ করার মধ্য দিয়ে। ঢাকা পদাতিকের অনন্য এ পরিবেশনার সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গীতিনাট্য ‘বসন্ত’ মঞ্চে নিয়ে আসে দিল্লির স্থানীয় সংগঠন রবি গীতিকা। আমরা জানি ঠিক কী প্রেক্ষাপটে রবীন্দ্রনাথ ‘বসন্ত’ গীতিনাটক উৎসর্গ করেছিলেন তার প্রিয় কবি কারারুদ্ধ নজরুলকে নিবেদন করে।

আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে কারারুদ্ধ অনশনরত নজরুলকে রবীন্দ্রনাথের এ আশীর্বাদ যেন ভারতের মুক্তিসংগ্রামে বৈপ্লবিক প্রচেষ্টাকে আরও প্রাণ এনে দিয়েছিল। খ্যাতিমান শিল্পী লিলি ইসলামের সুমধুর কণ্ঠেও উচ্চকিত হয় দেশপর্যায়েরই গান। আয়োজকদের ভাবনা ও মূল সুরকে অকুণ্ঠ সমর্থন জানিয়ে বাংলাদেশের অগ্রগণ্য নৃত্যগুরু শর্মিলা ব্যানার্জি ও তার নৃত্যন্দনের অসাধারণ পরিবেশনাতেও ছিল দেশপ্রেমের বারতা। দিল্লির স্থানীয় সংগঠন ‘সপ্তক’ উৎসবে যোগ দেয় বাঙালির ঐতিহ্যিক পরম্পরার জয়গান নিয়ে, ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, আমরা...’

তিন দিনের আনুষ্ঠানিকতায় যোগ দিয়ে যে বিশিষ্টজনরা তাদের অনন্য কথামালায় অভিন্ন সুরের ঐকতান তুলেছেন তা না উল্লেখ করলে উৎসবের বড় অংশকে খর্ব করা হবে। বিশিষ্ট বক্তাগণ এ আয়োজনের ভাবনাকে এই বলে চিত্রিত করেছেন যে, বাংলাদেশ ও ভারতের কূটনৈতিক এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের বহু রকমের সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের মধ্যকার ঐতিহাসিক সম্প্রীতিকে আরও নিবিড় করার কার্যকর প্রয়াস এ উৎসব।  

ঢাকা থেকে প্রায় ৪০ জনের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলের জনচেতনা যাত্রায় পুরোভাগে থেকে পৌরহিত্য করেন বরেণ্য অর্থনীতিবিদ, রবীন্দ্র গবেষক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর অধ্যাপক ড. আতিউর রহমান। গেল ১৪-১৬ এপ্রিল ২০২৩ দিল্লিতে অনুষ্ঠিত জনচেতনা যাত্রার তিন দিনব্যাপী সমাপনী অনুষ্ঠানমালায় যোগ দিয়ে দুই দেশের বিশিষ্ট অতিথিরা এ আয়োজনকে করোনাকালের অভিঘাতের পর দিল্লিতে বাংলা সংস্কৃতি, ইতিহাস আর ঐতিহ্যকে তুলে ধরার সবচেয়ে বড় প্রচেষ্টা হিসিবে চিত্রিত করেন।

বিশেষজ্ঞ আলোচকদের অতিভাষণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে সংস্কৃতি বিনিময়ের নাগরিক প্রচেষ্টাকে অত্যন্ত কার্যকর এক পন্থা হিসেবে তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ ও ভারতের মতো ভ্রাতৃপ্রতিম দেশে আরও নিবিড় নাগরিক যোগাযোগ প্রয়োজন বলে বক্তারা উল্লেখ করেন। তাদের মত, অভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্পদের যথাযথ চর্চা ও প্রয়োগে দুই দেশই লাভবান হতে পারে। জনচেতনা যাত্রার সমাপনী অনুষ্ঠানমালার উল্লেখ করে বরেণ্য গবেষক ড. আতিউর রহমান আবেগসিক্ত কণ্ঠে বলে ওঠেন, ‘রবীন্দ্রনাথ যেমন আপনাদের সম্পদ তেমনি আমাদেরও। একইভাবে নেতাজি, মাস্টারদা, নজরুল, জীবনানন্দসহ বহু মনীষী আপনাদেরও সম্পদ এবং আমাদেরও সম্পদ। এ অভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্পদের প্রায়োগিক প্রচেষ্টা বহু বাধা-বিপত্তিকে পেছনে ঠেলে আমাদের দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্ককে মধুর থেকে মধুরতর করে তুলবে।’

সিলেটের হবিগঞ্জের পৈল (পইল) গ্রামে জন্ম নেওয়া প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব বিপিনচন্দ্র পালের আরেক যোগ্য উত্তরসূরি ড. বিবেক দেবরায়। একই গ্রামে কৃতী পুরুষ বিশ্বের খ্যাতিমান অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও অনুবাদক ড. দেবরায়কেও উৎসবের অতিথি রূপে পেয়েছিল আয়োজকরা। বর্তমানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর ইকোনমিক অ্যাডভাইজরি কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিবেক দেবরায় আয়োজনে যোগ দিয়ে ফিরে গিয়েছিলেন তার অতীতে। শেকড়ের রোমন্থনে বাষ্পরুদ্ধ এ অর্থনীতিবিদ বাংলা ও বাঙালির ঐতিহ্যকে নবপ্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার উদাত্ত আহ্বান জানান। ইতিহাস ও ঐতিহ্যিক পরম্পরার লালন ও নাগরিক বিনিময় না থাকলে সরকারি পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও যে দুর্বল হয়ে পড়ে তা জ্যেষ্ঠ এ অর্থনীতিবিদের কণ্ঠে যথার্থই উঠে আসে।

দিল্লিতে বাংলাদেশ হাইকমিশনের ডেপুটি হাইকমিশনার নুরুল ইসলাম ও মিনিস্টার (কনস্যুলার) সেলিম মো. জাহাঙ্গীরের উপস্থিতি আয়োজনকে ঋদ্ধ করেছিল। এ দুই কূটনীতিক আগামীতে এ ধরনের সাংস্কৃতিক প্রচেষ্টায় হাইকমিশনের পাশে থাকার কথা বলেন। হাইকমিশনের মিনিস্টার (প্রেস) শাবান মাহমুদ তার নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে এ উৎসবকে বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন রচনার এক মাইলফলক আয়োজন হিসেবে বর্ণনা করেন।  তার মতে, মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে চিরকালের বন্ধনে আবদ্ধ বাংলাদেশ তার গভীরতা পরিমাপের জন্য অভিন্ন সংস্কৃতির যুগপৎ চর্চা অত্যন্ত জরুরি।

আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির সমকালীন জটিল সমীকরণে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নানা ক্ষেত্রে যে নতুন চ্যালেঞ্জ প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের সবখানে বিরাজমান, সেখানে বাংলাদেশ ও ভারতের সবচেয়ে বিশ্বস্ত জায়গা হচ্ছে আমাদের অভিন্ন ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য ড. দেলোয়ার হোসেন এ প্রসঙ্গকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার জন্য সংশ্লিষ্টদের তাগিদ দেন। বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের যে চিরকালীন ভিত্তি গড়ে গেছেন সেই পরম্পরাকে অটুট রাখতে সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।

এই আয়োজন অনন্য মাত্রা পায় দিল্লিতে বসবাসরত কয়েকজন খ্যাতিমান বাঙালিদের অংশগ্রহণকে ঘিরে। কেবল অংশগ্রহণই নয়, তাদের ঐকান্তিক সহযোগিতা উৎসবের সার্বজনীন গ্রহণযোগ্যতাকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে যায়। বাংলাদেশে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া ভারতের হাই কমিশনার ও পরবর্তীতে বিদেশ মন্ত্রকের সচিবের দায়িত্ব থেকে অবসরে নেওয়া রিভা গাঙ্গুলী দাশ উৎসবের সমাপনী আয়োজনে যোগ দিয়ে তাঁর বাংলাদেশে দায়িত্ব পালনের স্মৃতি রোমমন্থন করেন। বর্তমানে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন মেমোরিয়াল ট্রাস্ট এর সভাপতি কুটনীতিক রিভা গাঙ্গুলী বাংলাদেশ ও ভারতের সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের ওপর গুরাত্বরোপ করে এই ধরণের প্রচেষ্টাকে অব্যাহত রাখার তাগিদ দেন। 

কয়েক দশক ধরে ভারতের জাতীয় পরিমণ্ডলে সাংবাদিকতায় বাঙালির গৌরবকে উচ্চকিত করা প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ার প্রাক্তন সভাপতি গৌতম লাহিড়ী তিন দিনব্যাপি এই উৎসবে এক অভিভাবকের ছায়া দিয়ে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলকে বরণ করে নেন। পুরো আয়োজনজুড়ে তাঁর ঐকান্তিক সহযোগিতা আয়োজনকে নির্বিঘ্ন ও সফল করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। সর্বভারতীয় স্তরের গণমাধ্যমে উৎসবকে নিয়ে যে প্রচুর খবর বেরোয়-সেটি একজন গৌতম লাহিড়ীর কল্যাণেই। সমাপনী ও উদ্বোধনী আয়োজনের বক্তা হিসেবে তাঁর প্রদত্ত অতিভাষণে সর্বভারতীয়স্তরে বাঙালির আত্মগৌরবের মহিমাই কেবল প্রতিধ্বনিত হয়নি, আগামী দিনের কর্তব্যও নির্দেশিত হয়। বাংলাদেশের শীর্ষ গণমাধ্যমে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকবার কারণে এখানকার আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ক্রমঃঅগ্রসরমান অবস্থার অনুপুঙ্খ বিবরণও উচ্চারিত হয় সমান গুরুত্বের সঙ্গে। 

নেতাজী-বঙ্গবন্ধু জনচেতনা যাত্রা, ভারত এর পক্ষ থেকে তরুণ ইতিহাস গবেষক বোধিসত্ত্ব তরফদার, মৃন্ময় ব্যানার্জী, সুপ্রিয় মুখার্জীসহ বহু ইতিহাস অনুরাগীর উপস্থিতি আয়োজনকে বাঙালির এক মিলনমেলায় পরিণত করে। মৃন্ময় ব্যানার্জীর বাংলার বিপ্লবীদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত নিয়ে নির্মিত ডকুমেন্টারি হৃদয় ছুঁয়ে যায় উপস্থিত দর্শনার্থীদের।    

বিশিষ্ট বক্তাগণ তাদের অতিভাষণে উল্লেখ করেন, ভারতের বর্তমান সরকারের ‘নেইবারহুড ফার্স্ট’ পলিসিতে বাংলাদেশকে যে গুরুত্ব দিয়ে ভাবা হচ্ছে জনগণের কাছে সেই বার্তা যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়ার উত্তম-মাধ্যমও হচ্ছে সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক কর্মসূচি। সেই আহ্বানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে আমরাও বলতে চাই, আগামীতে দুই দেশেরই বহু নাগরিক সংগঠন এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে এগিয়ে আসুক, প্রগতির পরম্পরাকে এগিয়ে নিয়ে যাক।

লেখক : ইতিহাস গবেষক ও সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ-ভারত ইতিহাস ও ঐতিহ্য পরিষদ

ই-মেইল : [email protected]

Walton Refrigerator Freezer
Walton Refrigerator Freezer