ফাইল ছবি
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকা মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস ট্রেন তিনটি আবার চালুর জোরদার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। দুই দেশের রেল কর্তৃপক্ষের দুই দিনব্যাপী বার্ষিক আন্তসরকার রেলওয়ে বৈঠকে (আইজিআরএম) এ সিদ্ধান্ত আসতে পারে বলে রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
মঙ্গলবার ঢাকায় রেল ভবনে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে।
শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও উভয় দেশের ভিসা সংক্রান্ত কড়াকড়ির কারণে এই আন্তদেশীয় ট্রেনগুলোর চলাচল এতদিন বন্ধ ছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার গঠনের পর দুই দেশই ভিসা দেওয়ার প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে স্বাভাবিক করতে শুরু করায় এবং দুই পক্ষের রেল কর্তৃপক্ষই ট্রেন চালুর বিষয়ে আগ্রহ দেখানোয় আগামী মাস (অক্টোবর) থেকে ট্রেনগুলো পুনরায় চালুর প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দুই দেশের পররাষ্ট্র, স্বরাষ্ট্রসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করছে।
আজ বৈঠকে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত থাকবেন। এর আগের বৈঠকটি গত বছরের ২০ থেকে ২২ জানুয়ারি ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
এবারের বৈঠকে কেবল পুরোনো তিনটি ট্রেন চালুই নয়, বরং দুই দেশের রেল যোগাযোগের পরিধি ও পরিচালনব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তনের একাধিক নতুন প্রস্তাব উত্থাপন করবে বাংলাদেশ। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো রাজশাহী থেকে কলকাতার পথে নতুন যাত্রীবাহী আরেকটি ট্রেন চালুর প্রস্তাব। এতদিন যমুনা সেতু হয়ে চলাচল করা ঢাকা-কলকাতা রুটের মৈত্রী এক্সপ্রেস ট্রেনটি রুট পরিবর্তন করে এবার পদ্মা সেতু হয়ে পরিচালনা করার কথা বলবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।
পাশাপাশি সব ট্রেন এখন দিনে চলাচল করলেও রাতের বেলায় যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনার প্রস্তাব এবং যাত্রীবাহী কোচের সঙ্গে অতিরিক্ত এক বা দুটি পার্সেল পরিবহনের কোচ যুক্ত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
যাত্রীবাহী ট্রেনের পাশাপাশি এবারের বৈঠকের একটি বড় অংশজুড়ে থাকছে দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনব্যবস্থার সম্প্রসারণ। বাংলাদেশ বর্তমানে দর্শনা-গেদে, পেট্রাপোল-বেনাপোল ও রহনপুর-সিংহাবাদ রুটে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তের সীমিত সময়ের পরিবর্তে দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করার প্রস্তাব দিতে যাচ্ছে।
এ ছাড়া প্রশাসনিক কিছু জটিলতা দূর করতে রুটভিত্তিক ভিসার বর্তমান নিয়মের পরিবর্তন চেয়ে অন্য ধরনের ভিসাব্যবস্থার দাবি তুলবে বাংলাদেশ রেল কর্তৃপক্ষ, যাতে বিমানে ভারতে প্রবেশ করে যাত্রীরা ট্রেন বা সড়কপথে ফিরতে পারেন।
পাশাপাশি ভারতীয় রেলের কাছে বাংলাদেশের বকেয়া অর্থ পরিশোধের বিষয় এবং ভারত থেকে আসা যেসব ওয়াগনের নিয়মিত বড় ধরনের রক্ষণাবেক্ষণ বা পিরিয়ডিক ওভারহোলিংয়ের (পিওএইচ) সময় পার হয়ে গেছে, সেগুলোর সুরাহা নিয়েও আলোচনা হবে। যৌথভাবে পরিচালিত এসব ট্রেন থেকে দূরত্বের অনুপাতে আয় বণ্টন হয়, যেখানে বাংলাদেশের ভেতর দূরত্ব বেশি। এতে বাংলাদেশ রেলওয়ে বেশি হিস্যা পেয়ে থাকে।
বৈঠকে দুই দেশের রেলের সার্বিক উন্নয়ন ও প্রকল্প নিয়েও আলোচনা হবে। ভারতীয় সরকারের ঋণে বর্তমানে রেলে চলমান প্রকল্পগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ঢাকার কমলাপুর থেকে গাজীপুরের জয়দেবপুর পর্যন্ত দুটি নতুন রেললাইন নির্মাণকাজ, যা আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। এখন কাজ শুরু হলেও এর গতি বেশ ধীর। এ ছাড়া কিছু প্রকল্পে অর্থায়ন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সরে যাওয়ার বিষয়টি এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তাদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির বিষয়টিও বৈঠকে স্থান পাবে।
দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে ঢাকা-কলকাতা, খুলনা-কলকাতা ও ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ির সরাসরি রেল যোগাযোগ বন্ধ থাকায় সাধারণ ভ্রমণকারীরা অনেক ভোগান্তিতে ছিলেন। তাই আজকের এই বৈঠকে ট্রেন চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সমঝোতা বা সিদ্ধান্ত আসে কি না, তার ওপরই নির্ভর করছে সাধারণ যাত্রীদের আগামী দিনের যাতায়াত পরিকল্পনা।




