Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৪ শ্রাবণ ১৪২৭, রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০, ১২:১৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনা বিভীষিকা ও আমাদের দায়


০৭ জুলাই ২০২০ মঙ্গলবার, ১২:৪৯  এএম

মাকামে মাহমুদ চৌধুরী

বহুমাত্রিক.কম


করোনা বিভীষিকা ও আমাদের দায়

আলো আঁধারীর রঙ তুলিতে মোহ গ্রস্থ্য ক্যানভাস-
কতই না স্বপ্নীল ছিল
আজ এই বিভীষিকাময় লগ্ন আমাকে তীব্র বিষে আচ্ছন্ন করে দেয়।
প্রতিদিন ঘুম ভেঙ্গেই আতঙ্কে বিছানায় উঠে বসি
অনঙ্গ শূন্যতা আমায় নিশ্চিত ছুঁড়ে দেয় কারাগারে
প্রভু করো আমায় ক্ষমা  
অন্ধকার নয়, আমাকে সূর্য্যের মুখোমুখী দাঁড় করো। (প্রভু আমায় ক্ষমা করো- এইচ বি রিতা)

গত ৮ই মার্চ স্বাভাবিক একটি দিনের মত হাঁটছিলাম ক্যাম্পাসের কোন এক পথ ধরে। ঘুরে ফিরে দেখাছিলাম ক্যাম্পাসের অনিন্দ সুন্দর প্রকৃতিকে। ঘাস গুলো কত বড় হয়েছে, পানির অভাবে কতক ফুলের পাপড়ি সংকুচিত হয়েছে, লেকের পানিতে মাছের খেলা করা, অসংখ্য সাড়ি বদ্ধ গাছের ভিড়ে পাখিদের আনাগোনা, সব মিলিয়ে দিনটিতে কোন কমতি ছিল না। হঠাৎ আমার এক বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া খবরে প্রকৃতি যেন ক্ষণেই নিমজ্জিত হলো সাদা কালো অন্ধকারে। দিগন্ত বিস্তৃত আকাশ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসলো। আকাশের নীল রঙ হারিয়ে গেলো কালো কালো ভাঙ্গা মেঘের ভিড়ে। সেই কালো মেঘের ভিড় কাটিয়ে নিজেকে সামাল দিতে পারলেও কানের মধ্যে প্রবেশ করলো ভয়ংকর একটি কথা-বাংলাদেশে আজ দুই জন করোনা রোগী সনাক্ত হয়েছে।

করোনা আক্রান্তের খবর শোনার পড়েও থেকে গেলাম আরও কিছুদিন প্রিয় ক্যাম্পাসে। কিন্তু হঠাৎ একদিন দেখলাম সবাই ছুটছে করোনার আতঙ্ক থেকে মুক্তি পেতে তার পরিবারের কাছে। তাদের অনুসরণ করে আমিও ফিরে আসলাম আমার প্রিয় বাবা মায়ের পাশে। সেই থেকে কাটছে দিন প্রাণহীন এই ছোট ঘরটিতে। তিন মাসেরও বেশি সময় আজ গৃহ বন্দি। জানিনা আরও কতদিন এভাবে ঘরে বসে থাকতে হবে। দিন যত যাচ্ছে প্রাণ শক্তিই যেন নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। জেলের কয়েদিরা বছরের পর পর তিন দেয়ালে আবদ্ধ সেই ছোট বাক্সের মধ্যে কিভাবে কাটায় করোনা আজ তাই উপলব্ধি দিচ্ছে। তবে আমাদের এ বন্দি দশায় তাদের সাথে একটি বিশেষ মিল রয়েছে, কিভাবে? তারা যেমন তাদের খারাপ কৃত-কর্মের জন্য জেলে বন্দি হন তেমনি প্রকৃতির উপর নির্যাতনের কারনে মিলেছে আজ আমাদের ঘরে বন্দি হওয়ার পুরষ্কার। প্রকৃতির এই দীর্ঘদিনের রাগ, অভিমান, ক্ষোভের কখন যে অবসান হবে তা বলা দুষ্কর।

প্রতিনিয়ত প্রকৃতিকে করেছি আমরা ক্ষতিগ্রস্ত। করেছি পানি দুষণ, বায়ু দূষণ এবং নানা দুষণে পরিশ্রান্ত। পৃথিবীকে এত নির্মমভাবে যদি অত্যাচার করা না হতো সে হয়তো তার ক্রোধ আরো কিছু দিনের জন্যে দমিয়ে রাখতে পারতো। কিন্তু আমাদের দমহীন আপোষহীন অত্যাচারে পৃথিবী আজ ক্লান্ত, শ্রান্ত, বিপর্যস্ত। বিজ্ঞানের উৎকর্ষতার বেগে আবেগহীন হয়ে পৃথিবীকে করেছি ক্ষত বিক্ষত, সৃষ্টি করে দিয়েছি পৃথিবীতে এক ভয়াল রোগে আক্রান্ত। যে রোগ শুধু তৈরি করেই হয়নি আমরা ক্ষান্ত, বাড়িয়েছি তার তাপমাত্রা অকল্পনীয় এর মতো। যেই তাপমাত্রার বিষ বাষ্পে পৃথিবীর আজ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত। যে ভয়াল করোনা ভাইরাস আজ আঘাত করছে মানুষের চিন্তা চেতনা চেতনা, ধ্যান-ধারনাকে। চোখ রাঙ্গিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে সেই চেতনা, ধারণা, জ্ঞানের ক্ষতিকর দিক বিদিককে যার বিনিময়ে উপহার দিয়েছি ক্ষতিই শুধু পৃথিবীকে।

করোনার ভ্যাকসিন তৈরির ট্রায়াল যেখানে আজ প্রানীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ, সেখানে করোনা ভাইরাসের নিজস্ব হিউম্যান ট্রায়ালে পৃথিবীর আজ বিপর্যস্ত। সবকিছুই ধীরে ধীরে পালটে যাচ্ছে। দিনের বেলার আলোতে করোনার ভয়কে দমানো গেলেও রাত্রির ভয়াবহ অন্ধকার করোনাকে করে তুলে আবারও জীবন্ত। যার ভয় মস্তিষ্কের মধ্যে আঘাত করে চিরায়ত। শুধু মস্তিষ্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে হয় না সে শান্ত, ছড়িয়ে পড়তেই থাকে গলা হয়ে হৃৎপিন্ড পর্যন্ত। আর সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে গোটা শিরা উপশিরায়। যার ভয় প্রতি ক্ষণে ক্ষণে জানান দেয় কালকের দিনটি পর্যন্ত বেঁচে থাকবো তো? সামান্য বিপদেও যে মানুষ অন্যেকে বাঁচাতে ঝাপিয়ে পড়তো আজ পরিস্থিতি এমন, নিজের আত্মীয় স্বজনরাই ছেড়ে যাচ্ছে আক্রান্তকে যেখানে সেখানে ফেলে অসহায়ের মতো।   

এই তো কিছুদিন আগের কথা। কতই না সুন্দর ছিল দিন গুলো। দিন যত গড়াচ্ছে ভোরের সুর্যের আভার রূপালি কিরণে সকাল হতেই রাতের স্বপ্নের মতো বিলীন হয়ে যাচ্ছে সময়গুলো। দিনগুলি মোর সোনার খাঁচায় রইলো না, সে যে মোর নানা রঙের দিন গুলি। দিন-রাতের এই মিলন মেলার কোন এক সময়ে, সোনালি সময় গুলো সমুদ্রের ঢেঊ এর মতো আচড়ে পড়ছে বুকের কোন এক কোনে, যে ঢেঊয়ের উওলা হাওয়ায় বন্দি শিকল ছিন্ন ভিন্ন করে বেড়িয়ে পড়তে ইচ্ছে করছে বাইরে, তবে এক অজানা ভয় থামিয়ে দিচ্ছে শারীরিকভাবে দরজার সেই চৌকাঠ না পেরুতে। করোনার এই ভয়াল অন্ধকারে বিলীন হয়ে যাচ্ছে জীবনের কত মহামূল্যবান সময়। জীবনের এই কালবেলায় ভাইরাসের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত সোনালী সময়গুলো কখনো ধরা দিবে না আর আমাদের হাতে। কতই না নির্যাতন করেছি আমরা এই প্রকৃতিকে। সহে গেছে সে সব অত্যাচার অগোচরে। এবার জেগেছে উঠে প্রতিশোধের হিংসায়, কখন যাবে কার প্রাণ আজ তার সংশয়। ভাইরাসের আঘাত করছে মানুষকে বিপর্যস্ত, প্রকাশ পাচ্ছেন ধীরে ধীরে প্রকৃতির উপর কাছে মানুষদের অসহায়ত্ব।

বিজ্ঞানীদের প্রাণপণ চেষ্টার ফসল ভ্যাকসিন দিয়ে পৃথিবীর ব্যথিত শরীর যাতে আবার ভালো হয়ে যায়, করোনা ভাইরাস কে যাতে সমূলে নিশ্চিহ্ন করা যায়, সৃষ্টিকর্তার কাছে একটাই প্রার্থণা, সেই অপেক্ষার অবসান হোক। পৃথিবী ফিরে আসুক তার আপণ রূপ, লাবণ্যে, বিকশিত হোক আপন মহিমায়। তবে ভাইরাসের এই ভয়াল পরিস্থিতিতেও যাদের কথা না বললেই নয় তারা হলো আমাদের গরীব দুঃখী খেটে খাওয়া শ্রমজীবী শ্রেণীর মানুষ। দেশের উন্নতির মেরুদন্ড তাদের উপরই, নির্ভর করে আমাদের সমাজের গতিশীলতা। তাদের উন্নতিতেই দেশের উন্নতি। তাদের বাদ দিয়ে জাতি কখনো মাথা উঁচু করে দাঁড়তে পারবে না। এই মহামারিতে তাদের দরকার বিত্ত্ববানদের থেকে  একটুখানি সহানুভূতি ও ভালোবাসা। কবি বলেছেন-

‘ভালোবাসায় ভুবন করে জয়
সখ্যে তাহার অশ্রুজলে শত্রু মিত্র হয়-
সে যে সৃজন পরিচয়।‘(ভালোবাসার জয়-যতীন্দ্রমোহন বাগচী)

তাই এই মহামারি পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতির স্বার্থের কথা ভেবে আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে ভালোবাসা ও সহানুভূতির হাত বাড়িয়ে দিয়ে তাদের কল্যাণে সরকার ও বিত্তবানেরা এগিয়ে আসুক এই কামনায়।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।