Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১০ কার্তিক ১৪২৭, রবিবার ২৫ অক্টোবর ২০২০, ১১:১৪ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনাকালের কোরবানি এবং গরীবের ঈদ অর্থনীতি


৩০ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার, ০৮:২৬  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


করোনাকালের কোরবানি এবং গরীবের ঈদ অর্থনীতি

করোনার ভয়াবহতা ও মহামারির জন্য সারাবিশ্বের স্বাভাবিক সবকিছুই এখন অস্বাভাবিক। তারইমধ্যে মে মাসে নজিরবিহীন ও অন্যরকমভাবে পালিত হয়ে গেল করোনাকালের ঈদুল ফিতর। আগস্টের পহেলা তারিখেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের আরেকটি নজিরবিহীন ঈদুল আজহা। নজিরবিহীন বলছি তার কারণ- এমনতর ঈদ উদযাপন আগে কখন হয়েছিল তা শুধু ইতিহাসই বলতে পারবে। এবারের রোজা পালিত হয়েছে নজিরবিহীনভাবে এবং রোজার ঈদও পালিত হয়েছে সেভাবেই। কারণ ঈদে গতানুগতিক যা আনন্দধারা বহমান থাকে তার বেশিরভাগই ছিল অনুপস্থিত। মানুষজন একে অপরের বাড়িতে বেড়াতে যায়নি। শহর থেকে গ্রামে এবং গ্রাম থেকে শহরে অন্যসময় ঈদে মানুষের যে ঢল থাকতো তার কোনটাই তেমন পরিলক্ষিত হয়নি। সীমিত আকারে চলাফেরা করেছে কিছু মানুষ। সেটাও আবার স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই করতে হয়েছে।

এবারের কোরবানির ঈদও তেমনি হবে বলে ইতোমধ্যে সরকার থেকেই ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। কারণ রোজার ঈদের আগে গ্রার্মেন্টস ও অন্যান্য কিছু শিল্প কলকারখানা সীমিত আকারে চালু রাখতে হয়েছিল বলে কিছু কিছু মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়েই চলে গিয়ে করোনার প্রাদুর্ভাব কিছুটা হলেও বাড়িয়ে তুলেছিল। সেজন্য এবারে সরকার আগে থেকেই সতর্ক অবস্থানে থেকে কোরবানি ঈদের ছুটি তিনদিন থেকে বাড়ায়নি। উপরন্তু গণপরিবহনও ঈদের সময়ে সীমিত আকারে চালু রেখেছে, যাতে কোন অবস্থাতেই রাস্তায় মানুষের ঢল না নামে। তবে কোরবানির প্রাণি পরিবহন, কোরবানির সাথে সম্পর্কিত অন্যান্য সকলকিছু পরিবহনের জন্য পরিবহন ব্যবস্থাসমূহ উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। কোরবানি ঈদের আগে কোরবানির প্রাণি পরিবহনের জন্য, কোরবানির পরে বর্জ্য পরিবহন এবং প্রাণির চামড়া পরিবহনের জন্য পরিবহন ব্যবস্থা সচল রাখার কথা ঘোষণা দেওয়া হয়েছে সরকারের তরফ থেকে।

দেশের নাগরিকদের বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠান, বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বিশেষ বিশেষ দিবসের আনন্দ অনুষ্ঠান হরহামেশাই উদযাপিত হয়ে থাকে। সেসব প্রত্যেকটি দিবসকে কেন্দ্র করে আলাদা আলাদা অর্থনীতি জড়িত থাকে। তেমনি রয়েছে হিন্দু ধর্মীয় দুর্গাপূজার জন্য পূজার অর্থনীতি। খ্রিস্টান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য রয়েছে বড়দিনের অর্থনীতি। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের জন্য যেমন বৌদ্ধ পূর্ণিমার অর্থনীতি। তেমনি মুসলমানদের দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় অনুষ্ঠান ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহায় রয়েছে আলাদা আলাদা ঈদ অর্থনীতি। এসব অর্থনীতির সাথে সকল পর্যায়ের লোকেদের জন্য থাকে অংশগ্রহণ ও সুযোগ সুবিধা। আর এসব উৎসব বিভিন্ন ধর্মের লোকজন আলাদা আলাদাভাবে পালন করলেও উপভোগ কিন্তু করেন সকল ধর্মের মানুষই। যেমন বলা হয়ে থাকে, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। বাংলাদেশের নিরীখে সত্যিই এটি একটি বাস্তবধর্মী স্লোগান।

রমজানের ঈদের যেমন রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক দিক তেমনি কোরবানির ঈদেও রয়েছে আলাদা গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি। আর মুসলিম ধর্মমতে এসব অর্থনীতির একটি বড় মূলনীতি হলো ধনি-গরীব একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য হলেও একাকার হয়ে যাওয়া। রমজানের ঈদে যেমন ইফতার বিতরণ, ফিতরা বিতরণ, জাকাত বিতরণ ইত্যাদির মাধ্যমে গরীব ও নিন্ম আয়ের অস্বচ্ছল ব্যক্তিবর্গ সাময়িক সময়ে কিছু অর্থ হাতে পেয়ে তাদের পারিবারিক চাহিদা মেটাতে পারে। তেমনি অনেকে নতুন নতুন পোষাক-পরিচ্ছদ দান করলে সেটি সেসব ব্যক্তিবর্গ অনায়াসে ব্যবহার করতে পারে। ঠিক তেমনি কোরবানির ঈদে কোরবানির তিনভাগের একভাগ মাংস, চামড়ার মূল্যের অর্থের পুরোটা ও অন্যান্য দান-অনুদান ইত্যাদি অস্বচ্ছল ও নি¤œ আয়ের পরিবার পরিজনের জন্য একটি বাড়তি পাওনা যা ধর্মমতে তাদের হক। অনেক নিঃস্ব, গরীব-দুঃখী পরিবার সারাবছর অপেক্ষা করে থাকে যে কখন রমজানের ঈদ কিংবা কোরবানির ঈদ আসবে এবং সেসময় বাড়তি কিছু আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতা পাবে।

এ করোনাকালে গরীব-দুঃখী মানুষের আরো বেশি বেশি কষ্ট যাচ্ছে। কারণ অনেকে বাইরে বের হতে পারছে না। যে যেকাজ করে দুপয়সা আয় করতো, এখন তা সবই বন্ধ রয়েছে। অথবা করলেও তা সীমিত আকারে করতে হচ্ছে, যা দ্বারা তাদের কাঙ্খিত চাহিদা পূরণ হচ্ছে না। মিল কলকারখানা যথাযথভাবে চালু না থাকার কারণে অনেকে তাদের কর্ম ও চাকুরি হারিয়েছে। অনেকের কমে গেছে আয়-ইনকাম। কাজেই তাদেরকে তাকিয়ে থাকতে হচ্ছে, হয় সরকারি ত্রাণের উপর, না হয় অন্য কারো সাহায্যের উপর। কিন্তু ঈদের সাথে যেসব চলমান অর্থনীতির যোগসূত্র থাকার কথা সেগুলো সকিভাবে কাজে না আসলে সেসব ব্যক্তিদের দুঃখ ঘোচানের তেমন কোন সুযোগ দেখা যাবেনা।

স্বভাবিক সময়ের স্বাভাবিক ঈদ হলে যেভাবে গরীব মানুষজন সাহায্য সহযোগিতা পেতেন, কিন্তু এখন অস্বাভাবিক ঈদের সময়ে ভঙ্গুর অর্থনীতির কারণে হয়তো তারা আর সেভাবে সহযোগিতা নাও পেতে পারেন। কারণ আমাদের দেশে করোনা পরিস্থিতির প্রায় পাঁচ মাস চলমান হলেও এখনো পর্যন্ত তেমন কোন স্থিতিশীলতা দেখা যাচ্ছে না। তাই মানুষ সীমিত আকারে কোরবানি করার কথা ভাবছে। আগে যারা যতবড় কোরবানি করতেন এখন তারা আর সেরকম ভাবছেন না। কোন রকমে যাতে ধর্মীয় ওয়াজিবটুকু পালন হয় সেটুকুই করার চেষ্টা করছেন। কারণ ইতোমধ্যেই আমরা লক্ষ্য করেছি মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের পাঁচস্তম্ভের একটি হজ্জ হলেও খোদ সৌদি আরবেই হজ্জকে সীমিত মানুষের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। সেজন্য আমাদের দেশের শুধু ধর্মীয় অনুশাসনকে সমুন্নত রাখতে হয়তো অনেকে কোরবানি করবেন। তাতে অবশ্যই গরীব মানুষ বঞ্চিত হবে।

তবে এক্ষেত্রে বিত্তশালীদের একটু মনখুলে উদার হতে হবে। কারণ করোনাজনিত কারণে অনেক কিছুই বন্ধ থাকার জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে খরচ অনেকাংশে কমে গেছে। অনেকে বিলাসবহুল গাড়ি চালান, অনেকে বড় বড় একাধিক কোরবানি করতেন, অনেকের স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ রয়েছে। তারা যদি তাদের সেসব কল্পিত খরচের আংশিক হলেও সেসব গরীব মানুষকে দান করার ব্রত নেন, তাতে অনক মানুষ একটু ভালভাবে দুমুঠো খেযেপড়ে বাঁচতে পারবে। আমরা যেকোন বিষয়ে শুধু অনেকসময় সরকারকে দোষারোপ করি। সকলেই সরকারের ত্রাণ কিংবা সাহয্যের উপর ভরসা করে বসে থাকি। কিন্তু সরকারেরও অনেক সীমাবদ্ধতা থাকে। তাছাড়া এবার করোনার সাথে আবার বন্যাও একটি অন্যতম দুর্যোগ হিসেবে দেখা দিয়েছে। সরকারকে এর সবই সাধ্যমত সামলাতে হচ্ছে। সেজন্য আসুন না এবার আমরাও হতদরিদ্র এসব মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াই। চেষ্টা করি তাদেরকেও আমাদের মতো করে ঈদের আনন্দে সামিল করতে পারি কিনা। ইচ্ছা থাকলেই উপায় হয়- ইনশাল্লাহ।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected] 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।