Bahumatrik Logo
২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪২৩, শনিবার ১০ ডিসেম্বর ২০১৬, ৮:৩৫ অপরাহ্ণ

বেগম রোকেয়ার দর্শন ও নারী আন্দোলন


২৪ জুন ২০১৪ মঙ্গলবার, ১০:০০  এএম

তারাপদ আচার্য্য, উপদেষ্টা সম্পাদক

বহুমাত্রিক.কম


বেগম রোকেয়ার দর্শন ও নারী আন্দোলন

ঢাকা: একটি জাতি, দেশ তথা বিশ্ব কখনোই স্বাবলম্বী হতে পারে না নারীকে হিসেবের খাতা থেকে বাদ দিয়ে। উন্নতির প্রথম সোপান হল মিলেমিশে কাজ করা। একতাবদ্ধ হয়ে কাজ করা। মিলেমিশে কাজ করা বলতে আমি বুঝাতে চাচ্ছি- নারী পুরুষ উভয়কেই। আমরা সম্প্রতি উন্নত দেশগুলোর দিকে তাকালে দেখতে পাই সেখানে নারী পুরুষের ভেদাভেদ নেই বললেই চলে।

তারা নারীকে যথার্থ মূল্যায়ন করছেন। অদূর ভবিষ্যতে দেখা যাবে নারী আর পুরুষের ভেতরে কোন তফাৎ থাকবে না। তখনই একটি জাতি যাবে উন্নতির চরম শিখরে, দেশ পৌঁছাবে যথাযথ মর্যাদায়, বিশ্ব হবে স্বাবলম্বী। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশ তথা বিশ্বের উন্নতি কামনায় কখনোই আমরা পুরুষকে কিংবা নারীকে বাদ দিতে পারি না।

উন্নয়নশীল আর আর স্বল্পোন্নত দেশগুলোতে কুসংস্কারের বিপরীতে উন্নত দেশগুলো শিক্ষা নিয়েছে ইতিহাস থেকে, নারীপুরুষে সৃষ্টি করেনি বিভেদ। তাই তারা আজ শীর্ষে। স্বল্পোন্নত আর উন্নয়নশীল দেশের মানুষ আবেগকে প্রশ্রয় দিয়ে বিবেককে বিসর্জন দেয়। যার পরিণাম দারিদ্র্য। আমাদের দেশের মানুষ আজও অসুখ-বিসুখ হলে ঝাড় ফুঁক করে, পানিপড়া খায়, নদীর ভাঙ্গন ঠেকাতে হুজুরের নানা কেরামতির অপেক্ষায় থাকে, মা আপন সন্তানকে জবাই করে অলৌকিক শক্তি লাভের আশায়।

একবার ভাবুনতো আমরা কতখানি কুসংস্কার পেরিয়ে সভ্যজগতের আলোতে পৌঁছেছি? সত্যি কথা বলতে কি, আমরা আজও পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া কিছু অযৌক্তিক বদ্ধমূল ধারণা আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছি। আমাদের পূর্বপুরুষেরা কখনোই নারীকে মানুষ হিসেবে ভাবতে পারেননি। ভেবেছেন ভোগ্যবস্তু হিসেবে, চিহ্নিত করেছেন “সন্তান উৎপাদনের যন্ত্র” হিসেবে।

আমরা যদি ইতিহাসের দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাব যে, বেগম রোকেয়ার জন্ম রাস সুন্দরীর সত্তর বছর পরে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে এবং বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে সমাজের মহিলাদের যে শোচনীয় অবস্থা ছিল, বেগম রোকেয়া তার চমৎকার বর্ণনা দিয়েছেন। কেবল স্ত্রীশিক্ষার তীব্র বিরোধিতা এবং কঠোর অবরোধ প্রথার নয়, সবকিছুতেই পুরুষের তুলনায় সমাজে মহিলাদের অধিকার কত কম ছিল, তার বিবরণ ও বিশ্লেষণ পাই তাঁর লেখা থেকে। সেই সঙ্গে লক্ষ্য করি তিনি মেয়েদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য কীভাবে অন্তহীন প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াই করার আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু বেগম রোকেয়ার জন্মের এক দশক আগে রাসসুন্দরী দেবী যখন তাঁর অত্মজীবনী লেখেন, তখন তিনি বলেছিলেন যে, সমাজে মেয়েদের স্থান তাঁর বাল্যকালের তুলনায় অনেকটা উন্নত হয়েছিল। তাঁর বিবেচনায়, মেয়েদের লেখাপড়ার ব্যাপারে সমাজের মনোভাবে বিরোধিতা নাকি আর লক্ষ্য করা যাচ্ছিল না। তাহলে বিশ্বাস করবো কার কথা, রাসসুন্দরী নাকি বেগম রোকেয়ার?

বেগম রোকেয়া উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন যে, মেয়েরা অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করে স্বাবলম্বী হতে না পারলে সত্যিকার অর্থে কখনোই স্বাধীন হতে পারবে না তারা। সে জন্যে তিনি তাদের অর্থনৈতিক ভূমিকার উপর খুব জোর দিয়েছেন। এখানটাতে তাঁর পূর্ববর্তী মহিলাদের সঙ্গে মিল নেই। বেগম রোকেয়ার আগের মহিলারা লেখাপড়া শিখে আরও ভাল স্ত্রী হবার প্রতি যতটা ঝোঁক দিয়েছেন, তাদের স্বাধীনতার দিকে ততটা নজর দেননি।

বেগম রোকেয়ার সঙ্গে আগেকার নারী প্রগতির পথিকৃৎদের আর একটি পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। তারা নারীদের উন্নতির কথা বললেও নারী এবং পুরুষের একেবারে সমান অধিকারের কথা বলেননি। বলেননি, স্বামী প্রভু নন, তাঁর জীবনসঙ্গী মাত্র।
বর্তমানে যাকে নারীবাদ বলা হয়, মূল কথাটা প্রোলেটারিয়েটদের মত নারীদের একটা নির্যাতিত এবং শোষিত শ্রেণী হিসেবে গণ্য করা। এই শতাব্দীর একেবারে গোড়াতে, তারমানে প্রায় এক শতাব্দী আগে লিখলেও তিনি স্পষ্ট করে বলেছেন, পুরুষরা কীভাবে কতগুলো সনাতন ভূমিকার সঙ্গে নারীদের শনাক্ত করে এবং অলৌকিকত্বের দোহাই দিয়ে ধর্মীয় বিধান রচনার মাধ্যমে নারীদের চিরকাল শোষণ করে এসেছেন।

বেগম রোকেয়ার মধ্যে সেই শোষিত শ্রেণী সচেতনতা লক্ষ্য করি। যতদুর জানি, তাঁর আগে অন্য কোন বাঙালি মহিলা এবং ভারতীয় মহিলা এমন স্পষ্ট করে এই শ্রেণী শোষণের কথা বলেননি। সে দিক দিয়ে বেগম রোকেয়াই প্রথম বাঙালি ফেমিনিষ্ট এবং সত্যি বলতে কি, তাঁর প্রায় এক শতাব্দী পরেও, তিনি যে সচেতনতার মাত্রা তাঁর রচনার মাধ্যমে ব্যক্ত করেছেন, বাঙালি মহিলারা তার থেকে বেশি দূরে এগিয়ে যেতে পারেননি।

কোন আধুনিক পরিবারের মেয়ে বেগম রোকেয়া ছিলেন না। ১৮৮০ সালে রংপুর জেলার পায়রাবন্দ গ্রামে বেগম রোকেয়ার জন্ম হয়। তাঁর পিতার নাম ছিল জহির উদ্দিন মোহাম্মদ আবু আলী সাবের। তিনি ছিলেন জমিদার। বেগম রোকেয়ার ছিলেন দুই ভাই ইবরাহিম সাবের ও খলিল সাবের। তিন বোনের মধ্যে করিমুন্নেসা (১৮৫৫-১৯২৬) বেগম রোকেয়া ও হোমায়রা। সময় ও কালের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর লেখা থেকেই তাঁর বাড়ির পরিবেশের কথা তুলে ধরছি-

“আমাদের এ অরণ্যবেষ্টিত বাড়ীর তুলনা কোথায়? সাড়ে তিনশত বিঘা লাখেরাজ জমির মাঝখানে কেবল আমাদের এই সুবৃহৎ বাটি। বাড়ীর চতুর্দিকে ঘোর বন, তাহাতে বাঘ, শূকর, শৃগাল- সবই আছে। আমাদের এখানে ঘড়ি নাই, সেজন্য আমাদের কোন কাজ আটকায় না। প্রভাতে আমরা ঘুঘু, বউ কথা কও, ও খুকি ও খুকি, চোখ গেল, প্রভৃতি পাখীর আলাপে শয্যা ত্যাগ করি। সন্ধ্যাকালে শৃগালের ‘হুয়া হুয়া ক্যা হুয়া’ শব্দ শুনিয়া বুঝিতে পারি, মাগরিবের নামাজের সময় হইয়াছে। রাত্রিকালে কুরুয়া পাখীর কা-আক কা-আক-কু’ ডাক শুনিয়া বুঝিতে পারি, এখন রাত্রি তিনটা। আমাদের শৈশব জীবন পল্লীগ্রামের নিবিড় অরণ্যের পরম সুখে অতিবাহিত হইয়াছে।”

মুসলমান পরিবারের কোন মেয়ের পক্ষে তখন পর্দা ভেঙ্গে বিদ্যালয়ে যাবার প্রশ্ন ছিল অবান্তর। এই পর্দাপ্রথা কত কঠোর ছিল বেগম রোকেয়ার নিজের জবানি থেকেই তার পরিচয় পাওয়া যায়- বাড়িতে কোন স্বল্প পরিচিত মহিলা বেড়াতে এলেও, পাঁচ বছরের বেগম রোকেয়াকে পর্দা পড়তে হত। বাইরের মহিলারা বেড়াতে এলে ক’দিন প্রাণপণ প্রায় অনাহারে কখনো চিলেকোঠায়, কখনো সিঁিড়র নিচে, কখনো দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকেছেন তিনি। প্রায় সমবয়সী দু’বছরের হালিম কখনও যদি তাঁকে একটু দুধ এনে দিতেন, তাহলে সেটাই হত তাঁর একমাত্র পথ্য।

মুসলমান মেয়েদের লেখাপড়ায় আর একটা মস্ত বড় বাধা ছিল এই যে, তখনো তাদের লেখাপড়ার কোন স্কুল ছিল না।
বেগম রোকেয়ার বিয়ে হয় সে যুগের তুলনায় বেশ পরিণত বয়সে- ষোল বছরে। (একটা অসমর্থিত সূত্র অনুযায়ী আঠারো বছরে) কিন্তু পাত্রটি ছিল বিলেত ফেরত এক অবাঙালি দোজবরে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। আপাতদৃষ্টিতে যতটা দুর্ভাগ্যজনক মনে হচ্ছে, বাস্তবে বিয়েটা বেগম রোকেয়ার জন্য তেমন শোচনীয় ছিল না বরং বিয়েই হঠাৎ বেগম রোকেয়াকে মুক্তি দেয় পৈতৃক পরিবারের সংকীর্ণ গণ্ডি থেকে, যেখানে তাঁর সত্যিকার অর্থে কোন স্বাধীনতা ছিল না।

পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত সাখাওয়াত হোসেন নারীমুক্তির আদর্শ প্রত্যক্ষ করেন। প্রাচীনপন্থী, অশিক্ষিত প্রথম পক্ষের স্ত্রীকে হয়তো তিনি এই নবলব্ধ আদর্শে দীক্ষা দিতে ব্যর্থ হন। অপর পক্ষে, বেগম রোকেয়াকে তিনি পেয়েছিলেন উৎসুক এবং আগ্রহী শিষ্যা হিসেবে। মতিচুর-এর (দ্বিতীয় খণ্ড) উৎসর্গে করিমুন্নেসাকে উদ্দেশ্য করে বেগম রোকেয়া লিখেন- তিনিই তাঁকে বর্ণপরিচয় পড়তে শিখিয়েছিলেন। ভাগলপুরে উর্দুভাষী পরিবারের স্ত্রী হিসেবে চৌদ্দ বছর এবং কলকাতায় উর্দু স্কুলের পরিচালিকা হিসেবে নিরন্তর উর্দু বলেও তিনি যে বাংলা ভাষার চর্চা বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছেন, সে কেবল করিমুন্নেসার অনুপ্রেরণা ও আর্শীবাদে।
পদ্মরাগ উপন্যাসটি তিনি উৎসর্গ করেন ইবরাহিম সাবেরকে। এতে তিনি বলেন- পিতা, গুরু ইত্যাদি কেমন তিনি জানেননি, জেনেছেন কেবল ভাইকে এবং সেই ভাই-ই তাঁকে আপন হাতে গড়ে তুলেছেন। কিন্তু এই দুই উক্তি সত্ত্বেও, মনে হয়, তাঁর উচ্চ শিক্ষিত এবং হেশীল স্বামীই অনুক্ষণ তাঁকে লেখাপড়া করতে উৎসাহ দেন।

সাখাওয়াত হোসেন উর্দুভাষী ছিলেন, আনুসাঙ্গিক বাংলা হয়তো সামান্যই জানতেন। তবে তিনি হুগলিতে লেখাপড়া করেছেন এবং ক’বছর বাংলাদেশে চাকুরিও করেছেন। সেই সুবাদে তিনি মৌখিক বাংলা হয়তো জানতেন। কিন্তু তাঁর বাড়িতে বাংলা বলা হত না। স্বামীর বাড়িতে বেগম রোকেয়া যে কখনো বাংলা বলার সুযোগ পাননি, নিজেই তা বলেছেন “মতিচুরে”। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেন তবু তাঁকে বাংলা লিখতে এবং তা পত্রিকায় প্রকাশ করতে উৎসাহিত করেন, এ অনুমান সমীচীন। অন্তত ঝঁষঃধহধদং উৎবধস পড়ে সাখাওয়াত হোসেন যে উৎসাহিত হন, বেগম রোকেয়ায় তা উল্লেখিত আছে।

সাখাওয়াত হোসেনের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর বেগম রোকেয়া নারীশিক্ষা বিস্তারের স্বপ্ন ও পরিকল্পনা বাস্তবায়িত করার লক্ষ্যে ভাগলপুরে মুসলিম বালিকা বিদ্যালয়ের কাজ শুরু করেন। কিন্তু সাখাওয়াত হোসেনের প্রথম পক্ষের কন্যা ও জামাতার অপ্রীতিকর আচরণের জন্য তিনি ভাগলপুর ত্যাগ করতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ১৯১১ খ্রীস্টাব্দের ১৬ মার্চ কোলকাতার ১৩নং ওয়ালিউল্লাহ লেনের ছোট একটি বাড়িতে দ্বিতীয়বার মুসলিম বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ স্কুলের নাম রাখা হয় “সাখওয়াত মেমোরিয়াল গার্লস স্কুল”। এরপর থেকে বেগম রোকেয়া তাঁর সমস্ত শক্তি, উদ্যোম, অর্থ ও সময় নিঃস্বার্থভাবে নিয়োজিত করেন স্কুলটিকে একটি আদর্শ মুসলিম বিদ্যালয় রূপে গড়ে তোলার প্রয়াসে।

বেগম রোকেয়া বিশ্বাস করতেন যে, নারী শিক্ষার প্রসারই অধঃপতিত নারী সমাজকে উন্নত করার প্রধান উপায়। তাই নারীশিক্ষা বিস্তারের জন্যে তিনি দুই দশকের অধিক কাল নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। নারীশিক্ষা বিস্তার আন্দোলনে তাঁর কঠোর আত্মত্যাগের ফলে বাঙালি মুসলিম সমাজে নারীশিক্ষা প্রসারের প্রচেষ্টার সফলতা তাঁর জীবনকালেই পরিলক্ষিত হয়।

নারী কল্যাণ কামনায় নিবেদিত প্রাণ বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন ১৯৩২ খ্রীস্টাব্দের ৯ ডিসেম্বর শুক্রবার অকস্মাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এর বছর খানেক পূর্ব হতেই তাঁর শরীর খুব দুর্বল হয়ে পড়ে; এছাড়া পেটের অসুখ ও কিডনীর গোলমালও দেখা দেয়। মৃত্যুর কিছুদিন আগ তিনি তাঁর কোন প্রিয়তমা ছাত্রীকে বড় করুণভাবে বলেছিলেন-

“মা, সময় বুঝি হইয়া আসিল। মরণের বোধহয় আর বেশি দেরী নাই। আল্লাহর রহমতে জীবনের সকল আশা- আকাঙক্ষা পূর্ণ হইয়াছে। এইবার ছুটি নিতে হয়। সত্য সত্যই জীবনের কুন্দকুসুম যেদিন ঝরিয়া পড়িবে সেদিন আমার শেষ বিশ্রাম স্থান রচনা করিও আমার প্রাণের এই তাজমহলের একপাশে। কবরে শুইয়া শুইয়াও যেন আমি আমার মেয়েদের কলকোলাহল শুনতে পাই”।

Tarapadaতারাপদ আচার্য্য: উপদেষ্টা সম্পাদক, বহুমাত্রিক.কম ও কলাম লেখক

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।