Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৪ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, রবিবার ১৮ নভেম্বর ২০১৮, ৮:২২ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

মৌলভীবাজারে বহুমুখি সংকটে চা শিল্প, ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা


০৫ নভেম্বর ২০১৮ সোমবার, ০১:৪১  পিএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


মৌলভীবাজারে বহুমুখি সংকটে চা শিল্প, ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা
ছবি : বহুমাত্রিক.কম

মৌলভীবাজার : চা বাগান কর্তৃপক্ষ সরকারের কাছ থেকে লিজ নিয়ে আবাদ করছেন চা। লিজে চায়ের চাষাবাদকৃত ভূমিতে প্রতি বছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্লান্টেশন বৃদ্ধি করার কথা থাকলেও সেটি খুবই মন্থর। চা বাগানের সেকশন সমুহ থেকে ব্যাপক হারে পুরাতন ও মূল্যবান ছায়াবৃক্ষ পাচার, সেকশন সমুহে চায়ের পরিবর্তে রাবার চাষাবাদ, টিলা কাটা, ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন, পাতি উত্তোলনে হাতের বদলে লোহার যন্ত্র ব্যবহার, রাতের আঁধারে সেকশন থেকে চা পাতি পাচারের কারণে চা শিল্পের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সেইসঙ্গে শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি প্রদান না করা, নানা প্রতিকূল কার্যক্রম ছাড়াও বেকারত্ব বৃদ্ধি, মশা ও পোকার মাকড়ের আক্রমণ থেকে রক্ষায় ব্যাপকহারে কীটনাশক ও রাসায়নিক সার প্রয়োগ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে টপসয়েল, ড্রেনেজ ও রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত করাও অনিশ্চয়তায় ফেলেছে এই শিল্পকে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সরকারি, বিভিন্ন কোম্পানি ও ব্যক্তি মালিকানাধীন মৌলভীবাজার জেলায় ৯২টি চা বাগান রয়েছে। চায়ের চাষাবাদের জন্য সরকারের কাছ থেকে লিজ নেয়া ভূমিতে প্রতি বছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে নতুনভাবে প্লান্টেশন বৃদ্ধি করার কথা। তবে চা বাগান সমুহে সে হারে প্লান্টেশন বৃদ্ধি পাচ্ছে না। চা বাগান সমুহে রাবার চাষাবাদের কথা না থাকলেও জেলার বিভিন্ন চা বাগানে রাবার চাষাবাদ চলছে। ফলে সেসব এলাকায় চায়ের উৎপাদনে ধ্বস নামছে।

কমলগঞ্জের ব্যক্তি মালিকানাধীন শ্রীগোবিন্দপুর চা বাগানে এক সাথে ৪০ হাজার ঘনফুট গাছ কাটার জন্য এক বছরের পারমিট নিয়েছে কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে। এই পারমিটের বদৌলতে গত এক বছরেরও অধিক সময় ধরে হাজার হাজার বৃহদাকার গাছ নিধন হচ্ছে। চা বাগানের পাহাড়ি ও সমতল উঁচু নিচু টিলায় হাজার হাজার ছায়াবৃক্ষ চা গাছে ছায়ার যোগান দিচ্ছে। ম্যানেজমেন্টের অসাদু ব্যক্তি, চা বাগান ও বস্তির একটি সিন্ডিকেট চক্র কড়ই, আকাশিসহ নানা প্রজাতির পুরাতন গাছ গাছালি কেটে পাচার করছে। কোন কোন বাগানের কর্তৃপক্ষ পুলিশ প্রশাসনকে অবহিত করেও তা রোধ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রাকৃতিক দুর্যোগকালীন সময়ে অনাবৃষ্টিতে চা গাছ মারা যায়। আবার অতিবৃষ্টিজনিত কারনে মাটির ক্ষয় ছাড়াও চা গাছে মশা, মাকড়সার ব্যাপক প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। এ কারনে চায়ের উৎপাদনে প্রভাব পড়ছে। তাছাড়া মাটির উর্বরতাও বিনষ্ট হয়ে পড়ছে।

বাগানের আনাচে কানাচে টিলাভূমি কেটে ফেলা হচ্ছে। চা বাগানের ভেতর দিয়ে পাহাড়ি বিভিন্ন ছড়া ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকলেও এসব ছড়ার নানা স্থান থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন করা হচ্ছে। শমশেরনগর, আলীনগর, চাতলাপুরসহ বিভিন্ন বাগান থেকে দুষ্কৃতিকারী সংঘবদ্ধ চক্র প্রতি রাতে ট্রাক যোগে কাঁচা চা পাতা পাচার করছে। চা বাগানের পাহারাদাররা প্রতিরোধের চেষ্টা করলে দুষ্কৃতিকারীরা তাদের ধাওয়া করে ও মারপিট করে। শমশেরনগর চা বাগান ব্যবস্থাপক মো. জাকির হোসেন গত ২১ জুলাই কমলগঞ্জ থানায় এ ধরণের একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করেন।

সম্প্রতি পাতি উত্তোলনে ব্যবহৃত যন্ত্র ‘কাঁচি’ নিয়েও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। মৌলভীবাজারের চা বাগান থেকে আগে পাতি উত্তোলন হতো হাতের আঙ্গুল দিয়ে। হাতের আঙ্গুলে পাতি উত্তোলনের ফলে গাছে দ্রুত কঁচি পাতি গজাতো। লোহা জাতীয় দা, কাঁচি ব্যবহারে গাছে কঁচি পাতি গজাতে বিলম্ব হলেও এখন নারী শ্রমিকদের পাতি উত্তোলনের যন্ত্র হচ্ছে ‘কাঁচি’ দিয়ে।

ন্যাশনাল টি কোম্পানি (এনটিসি) এর একজন ব্যবস্থাপক বলেন, সবক’টি বাগান থেকে গাছ চুরি হওয়ায় এই শিল্পই বিপর্যয়ের মুখে পড়তে যাচ্ছে। এর সাথে চা গাছেরও ক্ষতি হচ্ছে। রাতে শ্রমিকরা সেকশনে গরু চরানোর কারনেও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিল্প। ফলে উৎপাদনে ধ্বস নামছে, পরিবেশের ক্ষতি বয়ে আনছে এবং সর্ব্বোপরি চা শিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের অনাগত ভবিষ্যতের দিকে ধাবিত করছে। তিনি আরও বলেন, কুরমা, মাধবপুর চা বাগান ও ডানকান ব্রাদার্স এর চা বাগান থেকে ব্যাপক হারে গাছ চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ অনেকের সাথে কথা বলেও কোন সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।

মৌলভীবাজারের একটি প্রাইভেট চা বাগানের প্রাক্তন মালিক এম.এ.কাইয়ুম বলেন, অদূর ভবিষ্যতে চা বাগান আর থাকবে বলে মনে হয় না। গাছ চুরি করার ফলে সেকসনগুলো বৃক্ষশুন্য হচ্ছে। যেখানে হাত দিয়ে পাতি উত্তোলন করার কথা এখন হাতের বদলে সচরাচর কাঁচি দিয়ে নারী শ্রমিকরা পাতি উত্তোলন করছেন। ফলে গাছে নতুন কঁচি পাতি গজাতে বেশ সময় লাগে।

মৌলভীবাজার চা শ্রমিক সংঘের আহ্বায়ক রাজদেও কৈরী, শমশেরনগর চা বাগানের ইউপি সদস্য সীতারাম বীন বলেন, শ্রমিকদের স্বল্প মজুরিতে সংসার চালানো কষ্টসাধ্য হয়ে উঠছে। ভালো উৎপাদনের জন্য বাজার দরের সাথে সঙ্গতি রেখে মজুরি বৃদ্ধি এবং বাগানে বেকারত্ব দূর করা সম্ভব না হলে সমস্যা বৃদ্ধি পাবে।

মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মোঃ তোফায়েল ইসলাম এই প্রতিবেদককে বলেন, চা বাগানে প্রতি বছর ২ দশমিক ৫ শতাংশ হারে প্লান্টেশন বৃদ্ধির বিষয়ে আমাদের পক্ষ থেকে যথাসাধ্য খোঁজখবর নেয়ার চেষ্টা করা হয়। তবে নতুন করে চা বাগানের কোথাও রাবার লাগানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।