Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১১ অগ্রাহায়ণ ১৪২৭, বুধবার ২৫ নভেম্বর ২০২০, ৫:১১ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

জর্ডানে বাংলাদেশি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন, কর্মবিরতি, আতঙ্ক


১৭ নভেম্বর ২০২০ মঙ্গলবার, ১০:৩৩  এএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


জর্ডানে বাংলাদেশি পোশাক শ্রমিকদের আন্দোলন, কর্মবিরতি, আতঙ্ক

প্রায় সপ্তাহ খানেক ধরে জর্ডানের রামথা শহরে একটি কারখানায় বাংলাদেশি পোশাক শ্রমিকেরা বেতন বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলন ও ধর্মঘট করছেন। শ্রমিকদের অভিযোগ এখন তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর হুমকি দেয়া হচ্ছে। বিবিসি বাংলার কাছে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন জর্ডানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান।

তিনি জানান, শহরটির আল হাসান শিল্প এলাকায় অবস্থিত ক্ল্যাসিক ফ্যাশন অ্যাপারেলে এই আন্দোলন চলার সময় কিছু ভাঙচুরের ঘটনা ঘটছে।জর্ডানে বাংলাদেশ থেকে পুরুষ শ্রমিক নেবার ব্যাপারে আগ্রহ কম। কারণ তাদের বিরুদ্ধে এর আগে ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল।

এছাড়া একটি ডাস্টবিনে একজন বাংলাদেশি নারী অভিবাসীর মরদেহ পাওয়া গেছে যা নিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। পোশাক শ্রমিকেরা তাকে নিজেদের একজন দাবি করে এ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।আম্মানে বাংলাদেশ দূতাবাস জানিয়েছে, এই ঘটনায় কোনো বাংলাদেশি আটক হননি, তবে ঘটনা সামাল দিতে সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল।

দেশটির সবচেয়ে বড় তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান ক্ল্যাসিক ফ্যাশন অ্যাপারেল। কারখানার শ্রমিকদের বেশির ভাগ নেয়া হয়েছে বাংলাদেশ থেকে। কোম্পানিটির ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী সেখানে তিরিশ হাজারের মতো শ্রমিক রয়েছে।

দেশটিতে মানবাধিকার ও আইনি সহায়তা দেয় এমন একটি সংস্থা তামকিন ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস বলছে, এই শ্রমিকদের অর্ধেকের বেশি বাংলাদেশি নারী শ্রমিক।দূতাবাসের তথ্যমতে জর্ডানে আনুমানিক ৭০ হাজারের মতো বাংলাদেশি শ্রমিক রয়েছে যার অর্ধেকের বেশি পোশাক শ্রমিক।

বাংলাদেশের ঝিনাইদহ জেলা থেকে যাওয়া এক শ্রমিক বছরখানেক হল ক্ল্যাসিক ফ্যাশন অ্যাপারেল মেশিন অপারেটর হিসেবে কাজ করছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই শ্রমিক বিবিসিকে বলেন, ‘এখানে ফ্যাক্টরির ম্যানেজার ও সুপারভাইজারদের বেতন বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের বেতন না বাড়ানোর কারণে আমরা আন্দোলনে যাই। আমাদের সঙ্গে সকল শ্রমিক যোগ দিয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘দুইদিন আগে রাত এগারোটার দিকে কয়েকটি গাড়িতে এসে লোকজন আমাদের হোস্টেল থেকে একটা মেয়েকে তুলে নিয়ে গেছে। আর একটা মেয়ে ব্যাংকে গিয়ে আর ফেরেনি। এখন আমরা খুব ভয়ের মধ্যে আছি।’ তবে তিনি নিশ্চিত করে বলতে পারেননি যে কারা তাকে তুলে নিয়ে গেছে।

কিশোরগঞ্জ থেকে যাওয়া একজন শ্রমিক বলছেন, ‘আমরা আর বিক্ষোভ করছি না। কিন্তু আমরা কাজে যাচ্ছি না। আজকে ফ্যাক্টরির কর্তৃপক্ষ আমাদের বলেছে, যারা যারা কাজ করতে চাও তারা কাল সকাল থেকে শুরু করো আর যারা কাজ শুরু করবে না তাদের দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হবে। আমাদের এখানে অবস্থা খুবই খারাপ। এই আন্দোলন আসলে করোনা টেস্ট আর বেতন বাড়ানো এই দুইটা দাবিতে।’

বাংলাদেশি শ্রমিকদের এসব অভিযোগের ব্যাপারে ক্ল্যাসিক ফ্যাশন অ্যাপারেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চেয়ে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেছে বিবিসি বাংলা। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তাদের তরফ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

তামকিন ফর লিগ্যাল এইড অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক লিন্ডা আখলাস বিবিসিকে জানিয়েছেন, ‘এখানে পোশাক খাতে শ্রমিকদের বেতন একটি বড় সমস্যা। এই খাতের মজুরি জর্ডানে অন্য যেকোনো খাতের শ্রমিকদের চেয়ে কম। পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১১০ জর্ডানিয়ান দিনার। কিন্তু অন্য যেকোনো খাতে সর্বনিম্ন মজুরি ১৫০ দিনার।’

তিনি বলেন, ‘বেতন বাড়ানোর আন্দোলন শুরু হলে মালিক পক্ষ থেকে যুক্তি দেয়া হয়েছে যে যেহেতু শ্রমিকদের থাকা খাওয়ার সুবিধা দেয়া হচ্ছে তাই তারা বেতন বাড়িয়ে দিতে পারবে না। বিশেষ করে মহামারির সময়।’

লিন্ডা আখলাস আরো বলেন, ‘দেশটিতে শ্রমিকেরা যদি কোনো বিষয়ে প্রতিবাদ আয়োজন করতে চায় তাহলে শ্রম মন্ত্রণালয়কে দুই সপ্তাহ আগে নোটিশ পাঠাতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘আন্দোলনকারী শ্রমিকেরা সেরকম কোনো নোটিশ না দিয়েই শিল্প এলাকার বাইরে গিয়ে বিক্ষোভ করে। সম্ভবত শ্রম মন্ত্রণালয় এটিকে অবৈধ বিক্ষোভ মনে করতে পারে।’

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে দেশটিতে সপ্তাহে চারদিন নির্দিষ্ট কিছু সময় কারফিউ জারি রয়েছে। শ্রমিকেরা বিক্ষোভ শুরু করলে সেখানে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। বাংলাদেশি দূতাবাসের কর্মকর্তারা কারখানাটি বেশ কয়েকবার সফর করেছেন।

আম্মানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান জানিয়েছেন, দূতাবাস কর্মকর্তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলার পর যতটুকু বুঝতে পেরেছেন, বিচ্ছিন্ন কতগুলো ঘটনা পরপর ঘটেছে। যার সঙ্গে বেতন বৃদ্ধির আন্দোলনের কোনো সম্পর্ক না থাকলেও শ্রমিকদের বিষয়টি আতঙ্কিত করে তুলেছে।

তিনি বলেন, ‘প্রথমে একজন শ্রমিক করোনাভাইরাসে মারা গেছে কিন্তু এখানকার কর্তৃপক্ষ তার মরদেহ বাংলাদেশে ফেরত পাঠাতে চায়নি। এই রোগে মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মরদেহ জর্ডানেই কবর দেয়া হবে বলে নিয়ম করা হয়েছে। সেটা নিয়ে প্রথমে বাংলাদেশি মেয়েদের মধ্যে একটা অসন্তোষ শুরু হয়।’

তিনি আরো জানিয়েছেন, এরপর সবার জন্য করোনাভাইরাসের পরীক্ষা, আইসোলেশন ও চিকিৎসার দাবি তোলা হয়।

নাহিদা সোবহান বলেন, ‘পরে গিয়ে সেটা বেতন বৃদ্ধির আন্দোলন হয়ে ওঠে যা প্রথমে শুরু করেছিল এখানকার ভারতীয় শ্রমিকেরা। তার সঙ্গে বাংলাদেশিরা যুক্ত হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘গতকালই এখানে শ্রম মন্ত্রণালয়ে একটি মিটিং হয়েছে যাতে আমাদের প্রতিনিধি, কারখানার প্রতিনিধি এবং ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিনিধি ছিল। সেখানে কারখানার কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যে পরিমাণ বেতন বৃদ্ধি চাওয়া হয়েছে সেটি এই মুহূর্তে সম্ভব নয়, তবে প্রতি জানুয়ারিতে যে ইনক্রিমেন্ট দেয়া হয় সেটি এই নভেম্বরেই দিয়ে দেয়া হবে।’

তবে কর্মবিরতি এখনো অব্যাহত রয়েছে বলে অ্যাকটিভিস্টরা জানিয়েছেন।

-বিবিসি বাংলা

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।