Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩০ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, শনিবার ১৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ১১:০৬ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

শিক্ষকের মর্যাদা ও প্রধানমন্ত্রীর বিনয়


০৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৮ রবিবার, ০১:৫৩  এএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


শিক্ষকের মর্যাদা ও প্রধানমন্ত্রীর বিনয়
ছবি : ফাইল ছবি

বাঙালির ঐতিহ্যের সারথী হিসেবে প্রতি ইংরেজি বছরের ভাষার মাসখ্যাত ফেব্রুয়ারিতে মাসব্যাপী বাংলা একাডেমির বইমেলা শুরু হয়। ঐতিহ্য এবং রীতি অনুযায়ী তা ১লা ফেব্রুয়ারিতে শুরু হয়ে আসছে। তারই ধারাবাহিকতায় এ দিনে দেশের সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তা উদ্বোধন করে থাকেন। এবারেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ১লা ফেব্রুয়ারি ২০১৮ তারিখে বিকাল বেলায় তিনি প্রধান অতিথি হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করলেন বাঙালির প্রাণের সে মেলা। সেখানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অতিথিবৃন্দ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন দেশবরণ্যে বুদ্ধিজীবীসহ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অনেক গুণী ব্যক্তিবর্গ।

একুশ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে মেলা উদ্বোধন করেন। এখানে একটি কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা দরকার। বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মেলা উদ্বোধন করলেও তিনি শুধু যে একজন প্রধানমন্ত্রী হিসেবেই এখানে আসেন তা কিন্তু নয়। বরং আমরা দেখেছি মেলায় আসলে তিনি একজন সাধারণ পাঠক ও দর্শনার্থীর মতো হয়ে যান। নিজেই বইয়ের স্টলে স্টলে ঘুরে পছন্দসই বই কিনেন। কারণ তিনি নিজেও একজন সাহিত্য অনুরাগী, সৃজনশীল লেখক ও অনবদ্য পাঠক।

ছাত্রজীবনে আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের একজন কৃতি শিক্ষার্থী ছিলেন। সেই হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষকবৃন্দ সকলেই তাঁর সরাসরি শিক্ষক। তাঁদের মধ্যে জীবন্ত কিংবদন্তি হলেন প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলাম, প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান প্রমুখ। প্রফেসর ড. রফিকুল ইসলাম হলেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও নজরুল ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যন এবং বাংলা একাডেমির সভাপতি হলেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন সাহিত্যিক, ভাষাবিদ, গবেষক প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান। তিনি বইমেলা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেছেন। তিনি দীর্ঘদিন প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি বর্তমানে একই বিভাগের ইমেরিটাস অধ্যাপক।

প্রধানমন্ত্রীর সাথে তাঁর শিক্ষকগণের কীরূপ সম্পর্ক তা প্রায়শই দেশবাসী প্রত্যক্ষ করে থাকেন। তিনি সর্বদাই তাঁর গুণী শিক্ষকগণের কদর ও যথাযোগ্য মর্যাদার আসন প্রদান করে থাকেন। সেটি মাঝে-মধ্যেই বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লক্ষ্য করা যায়। সর্বশেষ বইমেলা ২০১৮ উদ্বোধনকালে দেশবাসী সেটি আরো একবার প্রত্যক্ষ করলো। সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর কোন অনুষ্ঠান থাকলে সেখানে লালগালিচা প্রদান করা হয়ে থাকে। বইমেলা উদ্বোধনী মঞ্চে উঠা-নামার পথেও লালগালিচা দেওয়া ছিল। কিন্তু তিনি সেই লালগালিচা ব্যবহার করেননি। কারণ পাশে ছিলেন তাঁর শিক্ষক এবং উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের সভাপতি ইমেরিটাস প্রফেসর ড. আনিসুজ্জামান। তিনি তাঁর সফরসঙ্গীদের ছেড়ে শিক্ষকের মর্যাদা সম্মানে লালগালিচা ছেড়ে সেখানে তিনি লালগালিচার পশে দিয়ে গিয়েছেন। আর শিক্ষককে নিয়েছেন লালগালিচার উপর দিয়ে।

শিক্ষকের মর্যাদার প্রতি সম্মান দেখিয়ে একাজটি করার পর এমন একটি ছবি সেখানে উপস্থিত থাকা আওয়ামীলীগ দলীয় সাংসদ জনাব জগলুল হায়দারের ফেসবুক পেজে পোস্টিং দেওয়া হয়। তারপর তা মুহুর্তে ভাইরাল হয়ে যায়। এর আগেও একাধিক অনুষ্ঠানে তাঁর শিক্ষকের জন্য প্রধানমন্ত্রী কিংবা প্রধান অতিথির জন্য বরাদ্দকৃত আসন ছেড়ে দেওয়ার বহু নজির তিনিই সৃষ্টি করেছেন। তিনি শুধু তাঁর আচরণে নন, কথা বার্তাতেও সর্বদা এ বিষয়টির প্রমাণ দিয়ে থাকেন।

এ প্রসঙ্গে শিক্ষকের মর্যাদা নিয়ে বাদশা আলমগীরের সেই বিখ্যাত বিনয় আমরা সকলেই জানি। কারণ বাদশা আলমগীরের কুমারকে যে শিক্ষক পড়াতেন, সেই কুমার তাঁর শিক্ষককে ওযু করার জন্য চরণে পানি ঢেলে দিচ্ছিলেন। তখন হুজুর বারণ করেছিলেন এমন ভয়ে যদি বাদশা দেখে সেই শিক্ষককে শাস্তি দেন। কিন্তু পরে বরং বাদশা কুমারকেই দায়ী করলেন কেন শুধু তার হুজুরের চরণে পানি ঢালছে। কেন চরণে হাত লাগিয়ে ধুয়ে দিচ্ছেনা। এটিই তো বাদশা আলমগীরের শিক্ষকের প্রতি মর্যাদা ও বিনয়। সেজন্যই কবি তার কবিতার ভাষায় গেয়ে উঠলেন, ‘আজ থেকে চির উন্নত হলো শিক্ষা গুরুর শির, সত্যই তুমি মহান উদার বাদশা আলমগীর’।

একটি দেশের প্রধানমন্ত্রী তাঁর ক্ষমতা ও অবস্থানকে তোয়াক্কা না করে যেভাবে বারবার তাঁর শিক্ষকের প্রতি সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন করে চলেছেন সেখানে নিশ্চয়ই সকলের শিক্ষণীয় কিছু থাকতে পারে। এমন বিনয় আজকাল আর অনেকের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায় না। কারণ আমরা হয়তো সবকিছুই নিজের উচ্চতা দিয়ে বিচার করি যা কখনই বিধাতার সৃষ্টির সেরা জীব মানুষকে বিনয়ী করে না। আবার এমন অনেক মানুষ রয়েছে যাদের বিনয় তাঁর চারপাশের সকলকে মুগ্ধ করে।

একজন শিক্ষক তিনি হতে পারেন প্রাইমারি স্কুলের, হাই স্কুলের, কলেজের কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের। সেসব সম্মানিত শিক্ষকগণের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে আমরা যত বড়ই হই না কেন আমাদের শিক্ষাগুরুদের সম্মান করতে হবে। এ বিষয়ে আমার জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনয়ী উপাচার্য প্রফেসর ড. এএইচএম মোস্তাফিজুর রহমান একটি গুরুত্বপূর্ণ উক্তি করে থাকেন যা আমাকে খুবই আকৃষ্ট করে। সেটি হলো সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষই তাঁর শিক্ষক তুল্য। কারণ সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রত্যেকটি মানুষের কাছ থেকেই কিছু না কিছু শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। দেখা গেছে একজন নাপিত যেভাবে চুল কাটে কিংবা একজন আইরনম্যান যেভাবে ইস্ত্রি করে সেভাবে ইচ্ছা করলেও আমরা তা পারবনা। তার মানে হলো তারাও এসব কাজের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষক তুল্য।

তবে একটি কথা ঠিক যে সমাজে সব ছাত্রও যেমন একরকম নয় তেমনি সব শিক্ষকও একরকম নয়। এখন অনেক শিক্ষক তাঁদের স্বার্থের দ্বন্দ্বে দলাদলিতে জড়িয়ে বিতর্কিত হয়ে পড়ছেন। অনেকে আবার ক্লাসের বাইরে কোচিং বাণিজ্যসহ অনৈতিক আয়ের দিকে ঝুঁকে পড়ে মূল পেশা শিক্ষকতার নীতি নৈতিকতা জলাঞ্জলি দিতে দ্বিধা করছেন না। অপরদিকে দীর্ঘদিন বেতন-ভাতা না পেয়ে শিক্ষকগণও ন্যয্য দাবী আদায়ের জন্য অনেক সময় আন্দোলন করতে হয়। কিন্তু তার পরেও শিক্ষক-ছাত্র সবাই সমাজেরই জীব। মনুষ্য সমাজের কলুষ থেকে সরাসরি মুক্ত হওয়া খুবই কঠিন কাজ। শিক্ষক তো শিক্ষকই। সমাজে, দেশে তাঁদের অবদান অসামান্য। কাজেই তাঁদের শুধু ভালোবাসা এবং মর্যাদাই প্রাপ্য। কোন ঘৃনা নয়। আর আমাদের বিনয়ী প্রধানমন্ত্রী তাঁর শিক্ষককে মর্যাদা দিয়ে জাতিকে সেটিই আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন কেমনে বিনয়ী হতে হয়। নিশ্চয়ই এটি অনুকরণীয় ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত হতে পারে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected] 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।