Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
১০ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ১২:৩৪ পূর্বাহ্ণ
Globe-Uro

দুঃশাসনে পিষ্ট যে জাতিসত্তা


১১ সেপ্টেম্বর ২০১৭ সোমবার, ১০:৪২  এএম

ওমর ফারুক শামীম

বহুমাত্রিক.কম


দুঃশাসনে পিষ্ট যে জাতিসত্তা
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা : উত্তরে কাঁটাতার দক্ষিণে ধ্বংসলীলা। এ দুইয়ের মাঝে চরম অনিশ্চয়তায় আরাকান থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গারা। গত শতাব্দীর চল্লিশের দশক থেকে রোহিঙ্গাদের বাস্তুচ্যুত করা শুরু। দফায় দফায় এ বিতাড়নের লক্ষ্য রোহিঙ্গাশূন্য আরাকান। এ নিয়ে চরম বিপাকে বঙ্গদেশ-বাংলাদেশ-বাঙালিরাও।

যোজন-যোজন দূরের ইতিহাস নয়, সেদিনের মোগল সাম্রাজ্য থেকে বর্তমান পর্যন্ত ইতিহাসের স্মৃতি খুলে তাকালেই সব দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

সর্বশেষ বাংলাদেশ অভিমুখে এ রোহিঙ্গাস্রোতের শুরু গত ২৫ আগস্ট। গত ১৬ দিনে হত্যা, নির্যাতনের মুখে পৈতৃক ভিটেমাটি ছেড়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে পৌনে তিন লাখ রোহিঙ্গা। এ তথ্য জাতিসংঘের। বেসরকারি হিসাবে এ সংখ্যা আরো বেশি।

গত ক’দিনে টেকনাফ সড়ক ধরে লাখো রোহিঙ্গা নর-নারীর বাংলাদেশে ঢুকার দৃশ্য স্মৃতিকাতর করে বাঙালিদের। হাজারো মানুষের এ স্রোত ছিল একাত্তরের সেপ্টেম্বরে। যশোর রোড ধরে ভারত অভিমুখে। এ নিয়ে কবিতা লেখা হয়েছে ‘সেপ্টেম্বর অন যশোর রোড।’ এ কবিতা নিয়ে পরবর্তীতে চলচ্চিত্রও হয়েছে। পাকিস্তানি হানাদারদের হত্যা, নির্যাতনের মুখে ভিটেমাটি ছেড়ে দেশান্তরী হয়েছিল লাখো বাঙালি। ওই মহাবিপর্যয়ের সময় আমাদের আশ্রয় দিয়েছিল প্রতিবেশী ভারত। অপরাধ ছিল বাঙালি জনগোষ্ঠীর। স্বাধীনতা চাওয়া। নয় মাসের সশস্ত্রযুদ্ধে কাক্সিক্ষত সেই স্বাধীনতা অর্জন করেছে বাঙালি।

রোহিঙ্গারা স্বাধীনতা চায় না। ওরা বাঁচার অধিকার চায় তাদের জন্মভ‚মি আরাকানে। কিন্তু সেটাও হওয়ার নয়। আগে দেয়নি মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। একই আচরণ এখন করছেন মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক নেত্রী অং সান সু চি। সামরিক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াইয়ের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য শান্তিতে নোবেল পুরস্কারেও ভ‚ষিত হন এ নেত্রী।

১৯৭১ থেকে ২০১৭। গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডারের হিসাবে ৪৭ বছর। মানব ইতিহাসে নতুন করে লেখা হলো মিয়ানমার শাসকদের বর্বরতা। জাতিসংঘের হিসাবে এক হাজারের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে গত কয়েক দিনে। হত্যা আর ধর্ষণের পাশাপাশি জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে হাজারো বাড়িঘর। সাবেক যুগোশ্লাভিয়ার গণহত্যার পর রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বর্বরতায় হতবাক বিশ্ব।
মিয়ানমার সৈন্যদের বর্বরতার শিকার হয়ে জীবন বাঁচাতে রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিচ্ছে বাংলাদেশে। মানবিক কারণে এ জনস্রোতকে বাধা দেয়নি বাংলাদেশ। নির্যাতিত এ রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়িয়েছে এ দেশের মানুষও।

বাংলাদেশের জন্য শরণার্থীদের এ ভার বহন করা বেশ কঠিন। পরিস্থিতি উত্তরণে দরকার আন্তর্জাতিক সহায়তা। কার্যকর ক‚টনৈতিক উদ্যোগ নেওয়া বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কলকাতার বাংলাভাষিরা বাঙালি নয় ভারতীয়, আর রোহিঙ্গারা বাঙালি তবে বাংলাদেশি নয়, আবার এখন আরাকানিও নয়, তাহলে তারা কোন দেশের নাগরিক?

তৎকালীন ব্রহ্মদেশ-বার্মা বা বর্তমান মিয়ানমারের সরকারপ্রধান সু চি ও সেদেশের সেনাবাহিনী রোহিঙ্গাদের নতুন করে বাঙালি আখ্যায়িত করে দমন-পীড়ন আর হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। হত্যা, ধর্ষণ আর নির্যাতনের বিভীষিকায় বাংলাদেশে আসতে বাধ্য করছে রোহিঙ্গাদের।

রোহিঙ্গারা বাঙালি একথা মিথ্যে নয়, তবে তারা স্বাধীন আরাকানে শতাব্দীর পর শতাব্দী পার করেছে। তারা আরাকান আকিয়াবের ভ‚মিপুত্র। আরাকানের মাটিতে মিশে আছে তাদের কৃষ্টি, সংস্কৃতি আর ইতিহাসের বর্ণিল ঐতিহ্য। ষড়যন্ত্রের বিষবাষ্পে আজ তাদের নাগরিক অধিকার হরণ করা হচ্ছে! এটি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল এবং আশ্চর্যের বিষয়!

সু চি ও তার দল আরাকানের ভূগর্ভের মূল্যবান সম্পদ ভাগাভাগির প্ররোচনায় ঐতিহাসিক সত্যকে আজ অস্বীকার করছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশই হলো ধারাবাহিকভাবে রোহিঙ্গা নিধন!

এ উপমহাদেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সর্বপ্রথম যে ক’টি এলাকায় স্বাধীন মুসলিম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়; আরাকান তার মধ্যে অন্যতম। রোহিঙ্গারা সেই আরাকানি মুসলমানের বংশধর। সে যুগের বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি আলাওল-আরাকান রাজসভায় অমাত্য (মন্ত্রী) হিসেবে স্থান পান। তিনি পদ্মাবতী, সয়ফুলমুলুক ও বদিউজ্জামানসহ আরো বেশকিছু কাব্যগ্রন্থ লিখেছেন।

ষোড়শ শতাব্দীর আগে আরাকান, আকিয়াব, চট্টগ্রাম কুমিল্লা ও নোয়াখালী অঞ্চল তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের অধীনেই ছিল। ড. লুসিয়ান বার্ণোর লেখায়ও উপস্থাপন হয়েছে পর্তুগিজ টোম-গ্রাই এর এই অঞ্চল নিয়ে বর্ণনার কথা। সেসব ঐতিহাসিক লেখায়ও একই তথ্য পাওয়া যায়।

১৪৩০ সালে আরাকানে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম শাসন দুইশ বছরেরও অধিককাল স্থায়ী হয়। ১৬৩১ সাল থেকে ১৬৩৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষে অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। এরপর মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে। ১৬৬০ সালে আরাকান রাজা থান্দথুধম্মা নিজ রাজ্যে আশ্রিত মোগল সম্রাট শাহজাদা সুজাকে সপরিবারে হত্যা করে। এরপর শুরু হয় মুসলমানের ওপর তার অমানবিক অত্যাচার আর দমন-নিপীড়ন। সাড়ে তিনশ বছর ধরে মুসলমানদের দুর্বিষহ অবস্থায়ই কাটাতে হয়। আরাকানে যা এখনো চলছে।

প্রযুক্তি আর প্রবৃদ্ধিতে বর্তমান উঠতি পরাশক্তি চীন আর ভারতের প্ররোচনায় মিয়ানমার এই রোহিঙ্গা নিধনের জঘন্য কাজটি করছে বলে সংবাদ ও তথ্য বিশ্লেষণে অনুমিত হয়। ইনস্টিটিউট অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজ অব দ্য রাশিয়ান একাডেমি অব সায়েন্সেস-এর সেন্টার ফর সাউথ ইস্ট এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া এবং ওশেনিয়াবিষয়ক পরিচালক দিমিত্রি মোসিয়াকভ। আরাকান ও রোহিঙ্গা বিষয়ে মোসিয়াকভের গবেষণা ও তথ্য অনুযায়ী, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থিতিশীলতাকে নষ্ট করতে শতাব্দী ধরে চলা এ সংঘাতকে ব্যবহার করেছে আন্তর্জাতিক খেলুড়েরা।

রাখাইন রাজ্যের উপকূলীয় এলাকায় হাইড্রোকার্বনের বিপুল রিজার্ভের দিকে দৃষ্টি রয়েছে তাদের। মোসিয়াকভ বলেন, মিয়ানমারের সাবেক সেনাশাসক থান শুয়ের নামে প্রচুর সংখ্যক গ্যাসক্ষেত্র রয়েছে। ২০০৪ সালে রাখাইনে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সম্পদের সন্ধান পাওয়ার পর সেখানে চীনের দৃষ্টি পড়ে। ২০১৩ সাল নাগাদ তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য পাইপলাইন নির্মাণের কাজ শেষ করে দেশটি। একই লোভে প্রতিবেশী ভারতও বর্তমান মিয়ানমারের তোষামোদিতে রোহিঙ্গা বিরোধী নৃশংসতায় পাশে দাঁড়িয়েছে।

উন্নয়ন আর সমৃদ্ধিতে এগিয়ে যাওয়া বাংলাদেশ যেমনটা সাম্রাজ্যবাদিদের চক্ষুশূল, তেমনি বঙ্গীয় তটে বুক উঁচু করে দাঁড়ানো বাংলা এখন প্রতিবেশী প্রভুদেরও ঈর্ষার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দৃশ্যত হিংস্রতায় লাখ লাখ রোহিঙ্গার প্রবেশ ঘটিয়ে বাংলার বুকে আবারো জগদ্বল পাথর চাপানো হলো।
মাদক আর জঙ্গিবাদের ক্ষতদেহে দাঁড়িয়ে থাকা বাংলার না জানি কোমর ভেঙে যায়!

দক্ষিণের ধ্বংসলীলার তান্ডব যদি বাংলাকে দুমড়েমুচড়ে উত্তরে গড়িয়ে নেয়? যদি কাঁটাতারের বাঁধন ছিঁড়ে নেতাজীর অবিভক্ত বাংলার স্বপ্ন পূরণ হয়? তা হলে আমরা স্বাধীনতাকে খুঁজব কোথায়? এসব ভাবনার উত্তর খুঁজি নিরন্তর।

রোহিঙ্গারা স্বাধীন ছিল, পরাধীন হয়েছে, আবার স্বাধীন হতে চায়। তাদের অধিকার স্বাধিকার কোনোটিই নেই। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে অধিকারবঞ্চিত এ জনগোষ্ঠী নির্যাতন আর নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে এখন স্বাধীনতার পিপাসায় কাতর। বিশ্ববিবেক ওদের স্বাধীনতা দিন, প্রতিবেশীরাও সহযোগিতা করুন। ওরাও মানুষ।

লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও গবেষক।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

সংবাদ বিশ্লেষণ -এর সর্বশেষ

Hairtrade