Bahumatrik Multidimensional news service in Bangla & English
 
১১ আশ্বিন ১৪২৪, মঙ্গলবার ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭, ৫:০৩ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

ছেলেবেলার স্মৃতি লেখার কাজটা সহজ নয়: সৌমিত্র


১১ জুন ২০১৭ রবিবার, ০৯:১৩  এএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


ছেলেবেলার স্মৃতি লেখার কাজটা সহজ নয়: সৌমিত্র

ঢাকা : ছেলেবেলায় দেখতাম, কোনও একটা ডাঙা জমির কোনও একটা জায়গায় মাটি কাটা হয়েছে, কিন্তু যেখান থেকে মাটি কাটা হয়েছে, সেখানে মাঝে মাঝে পুরনো জায়গার এক একটা স্তূপ না কেটে সযত্নে চুড়ো করে রেখে দেওয়া আছে।

বেশ মজার দেখতে লাগত, মাটি কাটার গর্তের মধ্যে সেই চূড়াটুকুন তার এক হাত পরিমাণ জায়গায় সবুজ ঘাসকে এখনও শিরোধার্য করে রেখেছে। দাদুকে যখন জিজ্ঞেস করতাম ‘ওগুলো কী দাদু?’ সংক্ষিপ্ত উত্তর দিতেন ‘ওগুলো সাক্ষী।’ প্রশ্ন করতাম ‘কীসের সাক্ষী?’ দাদু বলতেন ‘কতটা মাটি কাটা হয়েছে ওই সাক্ষী দেখে বোঝা যায়।’

তখন দেখতে দেখতে মনে হত, ওই সাক্ষীগুলো যেন কাটা হয়ে যাওয়া সবুজ মাঠের স্মৃতিটাকে মাথায় করে রেখেছে। আমার ছোটবেলার স্মৃতির যদি সেই রকম কোনও সাক্ষী থাকত, তা হলে ছেলেবেলার স্মৃতি লেখার কাজটা সহজ হত।

বৈশাখের ভোরে যখন ঠান্ডা হাওয়া দিত তখন স্কুলে যেতে ভারী ভাল লাগত, তার আগের দিন রাতে হয়তো কালবৈশাখীর ঝড় আর বৃষ্টি হয়ে গিয়েছে। ঘুমের মধ্যে মা’র গলা শুনতে পেতাম, দাদাকে আর আমাকে ডাকছে, ‘সমি, পুলু উঠে পড়ো, ইস্কুল যেতে হবে।’ স্কুলে যাওয়ার পথে রান্নাঘর থেকে দু’ভাই দুটো বিরাট বিরাট কাঁসার গেলাস নিয়ে উঠোন পেরিয়ে বাড়ির পিছনের গোয়ালে গিয়ে দাঁড়াতাম। ওই ভোরেই গরু-দোয়া ফেনা-ওঠা গরম দুধে ভর্তি হয়ে যেত কাঁসার গেলাস, চোঁ-চোঁ করে খেয়ে স্কুলের দিকে এগোতাম।

এখন শুনি কাঁচা দুধ খেলে নাকি ইনফেকশন হয়, আমরা তো বছরের পর বছর খেয়েছি, কিস্যু হয়নি। এখনকার বাচ্চাদের যেমন আতুপুতু করে মানুষ করার চেষ্টা হয়, আমাদের ছেলেবেলায় তা হত না। আমরা গাছপালার মতো বড় হয়ে যেতাম।

চার্চের ঘণ্টা আর মসজিদের ভোরের আজানেও আমাদের সকাল হত। দূর থেকেই শোনা যেত, এত হট্টগোল তো ছিল না, তখন মাত্র পঁয়ত্রিশ হাজার লোকের বাস কৃষ্ণনগর শহরটায়।

ছেলেবেলায় হিন্দু মুসলমান খ্রিস্টান সকলকেই দেখতাম সকলের উৎসবে যোগ দিতে। আমরা যেমন বড়দিনে যেতাম, ঈদের সময় মুসলমান কাকা-জ্যাঠাদের বাড়ি খেতে যেতাম, জগদ্ধাত্রী পুজোয় তেমনই মুসলমান গাড়োয়ানরা এসে ঢাকের সঙ্গে নাচত। মুসলমান বা খ্রিস্টানরা বিজয়ার পর দেখা করতে এলে বড়দের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতাম, সে রকমই নির্দেশ ছিল বাবা-মা’র।

পথ হাঁটাতে যে কী আনন্দ ছিল, সেটা টের পেতাম বেশ খানিকটা দূরে স্কুলের পথটা হেঁটে যেতে। যাওয়ার পথে যে আমবাগানটা পড়ত, তাতে আগের রাতের ঝড়বৃষ্টিতে কাঁচা আম পড়ে থাকত, প্যান্টের পকেটে যতগুলো ধরে, ভরে নিয়ে প্যান্টের মধ্যে গোঁজা শার্টটাকে টেনে বের করে তার পকেট দুটোও ভরে নিতাম। স্কুলে মেয়েদের কাছে কুড়োনো আম আরও অনেক বেশি থাকত, কারণ ফ্রকের সামনেটা কোঁচড়ের মতো করে ওরা তাতে ভরে নিত। আর নুন মরিচ ঠিক জোগাড় হয়ে যেত কাঁচা আমের জন্য।

অভিনয় আবৃত্তিতে ছোটদের উৎসাহ দেওয়া হত তখন থেকেই, বাবা এবং দাদু আমাদের এ সব শেখাতেনও। বড়রা অভিনয় নিয়ে গল্পগুজব করতেন বাড়িতে। বাবা তাঁর ছাত্রাবস্থা থেকেই অভিনয় করতেন। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের শহর তো কৃষ্ণনগর, কয়েকটি শখের নাট্যদলও ছিল শহরে, আমার দাদু এই রকম একটা দলের সক্রিয় সভাপতি ছিলেন।

বাড়ির উঠোনে তক্তপোশ দিয়ে স্টেজ বানিয়ে বিছানার চাদর দিয়ে পরদা ও উইংস তৈরি করে রবীন্দ্রনাথের ‘মুকুট’ বা সে রকম ছোটদের উপযোগী নাটক করতাম। রাংতা কেটে কিংবা জামাকাপড় সেলাই করে দিয়ে মা-ও আমাদের সাহায্য করতেন।

অভিনয়ের ভালবাসার মতো আর-একটা ভালবাসার জাগরণও হয়েছিল ওই ছেলেবেলাতে। তা হল দেশকে ভালবাসা। আমার দাদু হাওড়া বোমার মামলায় জেল খেটেছিলেন, বাবা জেল খেটেছিলেন আইন অমান্য অসহযোগ আন্দোলনের সময়, এ সব গল্প স্মৃতির ঊষালগ্ন থেকেই শুনে আসছি।

দাদু ছিলেন ভাইদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট, তাঁদের ছিল একান্নবর্তী বিরাট পরিবার। পরিবারের মেয়েদের বিয়ের পরেও বাপের বাড়ি ছেড়ে যেতে হত না, দাদুর যিনি বড়দিদি তিনিও বাপের বাড়িতেই থাকতেন, তিনি কবিতা লিখতেন সেই যুগে। তাঁর ছেলে জ্যোতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন দাদুর সমবয়সি ও বন্ধু, স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে যিনি ‘বাঘা যতীন’ বলে বিখ্যাত। বর্গীয় ‘জ’ বদলে তাঁর নামের বানান কী ভাবে অন্ত্যস্থ ‘য’ হয়েছিল সেটা এখন মনে নেই।

তবে অসামান্য এই মানুষটির অসাধারণ জীবনের নানা কাহিনি কিংবা ঘটনা, মহত্ত্বের নানান নিদর্শন শুনতে শুনতে বড় হয়েছি, আজও সে সব আমার স্মৃতিতে অম্লান।

কংগ্রেসের কোনও কাজে সুভাষচন্দ্র বসু এক বার কৃষ্ণনগরে এসে আমাদের বাড়িতে কিছু ক্ষণ বিশ্রাম করেছিলেন, আর কর্মীদের সঙ্গে মিটিং করেছিলেন। চিনেমাটির যে চায়ের কাপ-ডিশ-কেটলিতে তাঁকে চা দেওয়া হয়েছিল, সেগুলি তার পর থেকে আর ব্যবহার করা হত না, সযত্নে রক্ষা করতেন মা। সেই সময় বাবার অটোগ্রাফ খাতায় সুভাষচন্দ্র যে সই করেছিলেন তা দেখে বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠত ছেলেবেলায়।

বাঘা যতীন বা সুভাষচন্দ্রের মতো আরও অনেক বিরাট মাপের মানুষের পায়ের ধুলোতেই পবিত্র হয়ে উঠত আমাদের বাড়ি। তাঁদের গল্পের পাশাপাশি চোখের সামনে জ্ঞানোদয়ের সময় থেকে এমন এক জনকে পেয়েছিলাম, যিনি যৌবনে বিপ্লবের অগ্নিপথ মাড়িয়ে এসেছেন। কেরুদাদু, ওটা ডাকনাম, ভাল নাম নিবারণ মজুমদার।

গ্রামসুবাদে আত্মীয়তার সূত্রে কিশোর বয়সে কৃষ্ণনগরে এসে আমাদের পরিবারের ছত্রছায়ায় বসবাস করতে-করতে বিপ্লবী যতীন্দ্রনাথ আর দাদুর সংস্রবে বিপ্লবী আন্দোলনে মিশে যান। নিজের এমন সব কীর্তির কথা মুখে মিষ্টি হাসি নিয়ে বলতেন, যার মধ্যে এতটুকু গৌরবের দাবি থাকত না, অথচ এক কথায় তা ছিল রোমহর্ষক। কৃষ্ণনগর থেকে শান্তিপুর রানাঘাট নবদ্বীপ বেলডাঙা বহরমপুর মিষ্টির বাঁক কাঁধে নিয়ে হেঁটে যেতেন, সেই মিষ্টির হাঁড়ির তলায় রাংঝাল করা আর একটা খোপ থাকত, তাতে মসার পিস্তল। তাঁর শান্ত গ্রাম্য চেহারা

দেখে ইংরেজের পুলিশ সন্দেহ করত না। অস্ত্র পৌঁছে যেত বিপ্লবীদের কাছে।

এমন কোনও কোনও বিপর্যয়ের স্মৃতিও আছে যা থেকে পালানো যায় না, তেমনই একটা স্মৃতি মনের মধ্যে অনপনেয় হয়ে রয়ে গিয়েছে। পঞ্চাশের (১৩৫০) মন্বন্তর, ১৯৪৩, বিশ্বযুদ্ধ চলছে, কৃষ্ণনগরের মতো ছোট্ট মফস্‌সল শহরে স্বভাবতই তার আঁচ এসে লেগেছিল।

বাড়িতে বড়রা রোজই জিনিসপত্রের দাম বাড়া নিয়ে উৎকণ্ঠায় আলোচনা করতেন, চালের দাম শুনতাম বাড়তে বাড়তে চল্লিশ টাকা মণ হয়েছে। গ্রাম থেকে নিরন্ন মানুষরা একটু ভাতের জন্যে শহরে চলে আসত। আমাদের কৃষ্ণনগরের রাস্তাতে চামড়ায় ঢাকা কঙ্কালের ছত্রভঙ্গ দলগুলোকে ঘুরে বেড়াতে দেখতাম। তাদের বিশেষ করে দেখতে পেতাম হেঁশেলে রান্না শেষ হলে, দুপুরে খাওয়ার সময়। তারা বুঝে গিয়েছিল, ভাত দেবার ক্ষমতা বেশির ভাগ মধ্যবিত্ত গৃহস্থের নেই, তাই তারা ফ্যান চাইত... একটু ফ্যান দেবে মা, একটু ফ্যান দাও-না মা...

‘বাজল তোমার আলোর বেণু’ গানটি কখন হবে, তার জন্যই ঘুম তাড়িয়ে জেগে থাকতাম বাল্যে কৈশোরে। ওই একটি মাত্র গান যে অমন করে শরতের আবাহন হয়ে উঠতে পারে, তা চিনিয়েছিল বেতারস্পন্দন। রেডিয়ো সেট তখন বাড়ির একটা অলংকার, অহংকারও বটে। আধো ঘুম আধো জাগার মধ্যে শুনতাম ‘জাগো দুর্গা জাগো দশপ্রহরণধারিণী’-র মতো চমৎকার সব গান, গানগুলোর সঙ্গে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের খোলা ও সুর-লাগানো গলায় ভাষ্য এবং চণ্ডীপাঠ। রাত থাকতে উঠে ঘুমে-জাগরণে মেশা ভোরে ওই প্রোগ্রাম শুনতে-শুনতেই যেন দুর্গোৎসবের শুরু হত। তবে সে উৎসব যতটা না পূজার ছিল, তার থেকে বেশি ছিল শরতের।

শীতকালে, অ্যানুয়াল পরীক্ষা হয়ে গিয়েছে বলে নাম ডেকে স্কুল ছুটি হয়ে যেত। বাড়ি না এসে খেয়াঘাটে গিয়ে মাঝিকে অনেক অনুনয়-বিনয় করে পারানির পয়সা না দিয়ে ও পারে চলে যেতাম দু’এক জন বন্ধু মিলে। ও পারটা পুরোপুরি গ্রাম, খেত-খামারে ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে ছোলার খেত থেকে কয়েক গোছা চুরি করে আবার নৌকোয় উঠে এ পারে পালিয়ে আসতাম। পিছনে ছুটতে ছুটতে আসা খেতের মালিক ও পারের ঘাটে দাঁড়িয়ে যে গাল পাড়ত, তা এ পার অবধি শোনা যেত। শীতের দুপুরে সেই কাঁচা ছোলার স্বাদ এখনও যেন মুখে লেগে।

শীতকালে সকালবেলায় পুরনো বই, যেগুলো নতুন সিলেবাসের সঙ্গে মিলত, সেগুলো এপাড়া-ওপাড়ায় ঘুরে ঘুরে জোগাড় করতে হত। নতুন ক্লাসে ওঠার পর নতুন বইয়ের সিলেবাস পেতাম বটে, বইগুলো সব নতুন কেনা হত না। সেকেন্ড-হ্যান্ড বই, আগের বছর যারা ওই ক্লাস থেকে পাস করে গিয়েছে, খুঁজে পেতে অর্ধেক দামে কিনতে হত তাদের কাছ থেকে। শুধু খেয়াল রাখতে হত, বইগুলো ‘ঘিয়েভাজা’ অর্থাৎ অতি-ব্যবহারে জীর্ণ হয়ে গিয়েছে কি না। দাদা বলে ডাকি এমন কোনও আগের ক্লাসের ছেলের বাড়িতে হয়তো গিয়েছি বই খুঁজতে, তাদের বাড়িতে মাটির উঠোন, শিরশিরে ঠান্ডা উঠত ওই মাটি থেকে পায়ে। আজও যখন শীতের দিনে খালি পায়ে শুটিং করতে যাই, দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, এখনও যেন সেই ঠান্ডাটা টের পাই।

তবে বাড়িতেই ওপরের ক্লাসের দাদা থাকলে নতুন বই পাওয়ার সম্ভাবনাটা এমনিতেই অনেকটা কমে যায়, ফলে দাদার ছোট-হয়ে-যাওয়া জামাজুতোর সঙ্গে আগের ক্লাসের বইয়ের উত্তরাধিকারও বহন করতে হয়েছে আমাকে।

ইস্কুলের পড়াশোনায় যার জ্বর আসত, সেই আমার মতো ফাঁকিবাজ ছেলের বই ভালবাসাও শুরু হয়েছিল বাড়িতে। দাদু উকিল ছিলেন, বাবাও ওকালতি করেই জীবন শুরু করেছিলেন। কিন্তু বাড়িতে আইনের বইয়ের চেয়ে সাহিত্যের বই অনেক, অনেক বেশি ছিল। সেই সবের মধ্যে বাবা-মা’র প্রাইজ পাওয়া বইও ছিল।

আমি যখন বেয়াড়াপনা করতাম, তখন শাসনের চেয়েও যেটাতে বেশি কাজ হত সেটা হল, একখানা বই দিয়ে আমাকে বসিয়ে দেওয়া।

কৃষ্ণনগর মফস্‌সল শহর, ছেলেবেলায় সেখান থেকে প্রায়ই বেড়াতে আসতাম কলকাতায়, কখনও পিসির বাড়ি, কখনও মাসির বাড়ি। সেখানেও দুরন্তপনা শুরু করলেই বড়রা হাতে একটা বই দিয়ে বসিয়ে দিতেন, আর আমিও বই হাতে পেলে তাতেই ডুব মারতাম। পিসির বাড়িতে যে বিশাল লাইব্রেরিটা, সেটা ছিল আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের, তিনি ছিলেন পিসেমশাইয়ের বাবা।

তাঁর লাইব্রেরির বুক-শেল্‌ফগুলোর গলিঘুঁজিতে আমরা লুকোচুরিও খেলতাম। খেলতে খেলতে কখন যে দলছুট হয়ে শেল্‌ফ থেকে বই টেনে নিয়ে দেখতে শুরু করতাম, তা নিজেও টের পেতাম না। অথচ বইগুলোর মর্মার্থ হৃদয়ঙ্গম করা দূরে থাক, ভাষার সরলার্থ করাই তখন অসাধ্য ছিল। তবু বইগুলো আমাকে টানত, বইয়ের লেখাও আমাকে টানত, আমার শিশুমনের কৌতূহল ওই হরফের অক্ষৌহিণীর মধ্যে অজানা রহস্যের সন্ধান করে বেড়াত। আর ছবিগুলো তো গিলতামই। অজানা জায়গা আর জীবনযাত্রার ছবি দেখে ভাবতাম কোথায় এই সব দেশ, কেমন করে সেখানে যাওয়া যায়। শারীরিক ভাবে যেখানে যেতে পারছি না, বইয়ের উড়ন্ত জাহাজ সেইখানে নিয়ে যেত মনকে।

পিসির বাড়ির লাইব্রেরিতে প্রচুর ইংরেজি বই দেখেছি, বাংলা বই তত দেখেছি বলে মনে পড়ে না। বাংলা বইয়ের সমারোহ ছিল মাসিদের বাড়িতে। এ বাড়ির যিনি কর্তা, তিনি ছিলেন সাহিত্যিক সৌরীন্দ্রমোহন মুখোপাধ্যায়, বেশির ভাগ সময়ই তিনি লিখতেন।

এক জন জলজ্যান্ত বই-লিখিয়েকে অত অল্প বয়সে দেখতে পাওয়াটা আমায় বই ও লেখালেখির জগৎকে ভালবাসতে শিখিয়েছিল।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে কোনও দিন দেখিনি। ছেলেবেলার স্মৃতিতে আমার নিজস্ব রবীন্দ্রনাথের যে ছবিটা সবচেয়ে উজ্জ্বল, সেটা তাঁর প্রয়াণের ছবি। কলকাতা থেকে সত্তর মাইল দূরের এক মফস্‌সল শহর কৃষ্ণনগরে তখন আমি ক্লাস ওয়ানের ছাত্র, কলকাতায় যে বিপুল বিহ্বল শোকযাত্রা হয়েছিল, সেখানে যাওয়ার কোনও সুযোগই ছিল না, প্রয়াণের স্মৃতিতে তাই রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ কোনও ছবি নেই। সেই ছ’বছর বয়সে রবি ঠাকুরের মহিমা সামান্য বোঝার ক্ষমতাও হয়নি।

অথচ সে দিনের অভিজ্ঞতাটা আজীবনের মতো দাগ রেখে গিয়েছে। সে দিন আমার জ্বর হয়েছে, স্কুলে যাইনি, আমার থেকে বছর দুয়েকের বড় দাদা সম্বিৎ সে দিন স্কুলে যেতে না যেতেই ফিরে এল, মা কারণ জিজ্ঞেস করায় দাদা বলল, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মারা গিয়েছেন, তাই হেডমাস্টারমশাই ইস্কুল ছুটি দিয়ে দিলেন।

দেখলাম আমার মা’র পৃথিবী যেন দুলে উঠল, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না, রেলিং ধরে আস্তে আস্তে বসে পড়লেন। এই প্রথম মা’র সেই বেদনার মধ্যে দিয়ে রবীন্দ্রনাথের বড় একটা পরিচয় আস্তে আস্তে আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠল। তিনি যদি একান্ত আপনজন না হবেন, তা হলে অনাত্মীয় অপরিচিত এক কবির মৃত্যুতে এক জন গৃহবধূ কেন এত শোকার্ত হয়ে পড়বেন? সেই দিন থেকে তিনি আমার কাছে পরিচিত আত্মীয়ের অধিক হতে শুরু করলেন।

আমার মা’র গলায় গান ছিল না। তবে মা লেখাপড়ায় ভাল ছিলেন, স্কুলের প্রাইজের বইতে আলমারি ভর্তি ছিল, অল্প বয়সেই বিয়ে হয়ে গিয়েছিল তাঁর। তার পর আমরা যখন এলাম, আমাদের ঘুম পাড়ানোর সময় গান গাইতে পারতেন না বলেই বোধহয় কবিতা শুনিয়ে ঘুম পাড়াতেন। স্মৃতি থেকে বলা সেই সব রবিঠাকুরের কবিতা ঘুম-জাগরণের সন্ধ্যাদেশ পেরিয়ে আমার জাগ্রত স্মৃতিতেও চিরজীবী হয়ে রয়ে গিয়েছে।

মা’র কাছ থেকে কবিতা শুনতে শুনতে কবিতা ভাললাগা বা তার ভিতরে বসবাসের ভিতটা নিজের অগোচরেই যেন গাঁথা হয়ে গিয়েছিল। ছেলেবেলার স্মৃতি হাতড়ে চললে এমনই হয়তো আরও কত মণিমানিক উঠে আসবে!

যে জলঙ্গী প্রমত্ত হয়ে উঠত বর্ষায়, সেই নদীর ধারেই দুর্গাপুজোর বিসর্জনের দিন শহরের যে দশ-বারোটা পুজো হত তার প্রতিমাগুলি ভাসান হতে আসত। দুটো নৌকার মধ্যে একটা পাটাতন রেখে জোড়া হত, তার ওপর প্রতিমা রেখে মাঝনদীতে নিয়ে যাওয়া হত। পুনরাগমনের মন্ত্র বলা হত।

দূরে নদীর বাঁকে যখন সূর্যদেব জলের মধ্যে ডুবতে আরম্ভ করতেন, তখন জোড় খুলে নৌকো দুটো দু’দিকে সরে যেত। জলের গভীরে নেমে যেত প্রতিমা। মাটি নিত জলের তলায়। নদীর পাড়ে সারা শহর বিজয়ার কোলাকুলি শুরু করত।

বিসর্জনের শোভাযাত্রা ঘাটে এসে পৌঁছনো মাত্র একটি নীলকণ্ঠ পাখিকে খাঁচা খুলে আকাশে উড়িয়ে দেওয়া হত। সেই পাখি নাকি উড়ে যাবে কৈলাসে, উমা ফিরছে এই খবর নিয়ে।

সেই নদী, সেই পারের নৌকো, মাঠ, জমি, মানুষজনের স্মৃতি আজও যেন ঘুমের মধ্যে মা’র গলার আওয়াজের মতো এসে ডাক দেয়। ধড়মড়িয়ে উঠে যে চলে যাব সেই দিকে, তা তো আর হয় না।

আনন্দবাজার পত্রিকা

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea
Intlestore

মুখোমুখি -এর সর্বশেষ

Hairtrade