Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৯ বৈশাখ ১৪২৮, বুধবার ১২ মে ২০২১, ৫:৫২ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

গ্রামকে শহর করা কঠিন কাজ নয় আবার কঠিনও


১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২১ শুক্রবার, ০৭:৩৭  এএম

মোশাররফ হোসেন মুসা

বহুমাত্রিক.কম


গ্রামকে শহর করা কঠিন কাজ নয় আবার কঠিনও

প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি ডিএসসিসি`র এক কোর্স সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে বলেছেন- “প্রতিটি গ্রামই এক একটি শহরে রুপান্তরিত হবে। আমি বিশ্বাস করি, এটা কোনো কঠিন কাজ নয়” (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ২৯ জানুয়ারি ২০২১)। উল্লেখ্য, অতীত যুগে মানুষ কৃষি আবাদকে কেন্দ্র করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে। তাদের স্থায়ী বসবাসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে গ্রাম।

তখনকার নগর রাষ্ট্রও কৃষির বাইরে ছিল না। জাতি রাষ্ট্র গঠিত হওয়ার পর, বিশেষ করে শিল্প বিপ্লবের পর শিল্প-কারখানা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন নগর গড়ে ওঠে। কৃষি পেশার বাইরের লোকেরা নগরে বসবাস করতো। বলা যায়, গ্রাম ও শহর গড়ে ওঠার পিছনে রাষ্ট্রের তেমন কোনো পরিকল্পনা ছিল না। বর্তমানে গ্রাম ও শহর উভয়ের বেলাতেই পরিকল্পনা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী হলেন দেশের নির্বাহী। তিনি যদি ইচ্ছে করেন বিষয়টি কঠিন কাজ নয়, তাহলে খুবই আশার কথা। যদিও পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন করা সহজসাধ্য নয়।

এদেশের অধিকাংশ মানুষের ধারণা শহর মানে ঢাকার মতো ইট পাথরের জঞ্জাল। তাদের ধারণায় আরও রয়েছে, কৃষিকে বাদ দিয়েই নগর (পৌরসভার সংজ্ঞায় সেরকম কথাই লেখা আছে)। সরকার গ্রামের উন্নয়নের জন্য প্রতি বছর কোনো না কোনো প্রকল্প নিচ্ছে, নতুন নতুন রাস্তা-ঘাট ও ব্রীজ-কালভার্ট নির্মাণ করছে। গ্রামের মানুষের আর্থিক সক্ষমতা বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা পাকা বাড়িঘর নির্মাণ করছে। সব মিলিয়ে ত্রিশ বছর আগের গ্রামটি পুর্বের মতো নেই। মজার বিষয় হলো সকলেই নগরীয় সুযোগ-সুবিধা চায়, আবার নগর ছেড়ে কেউ গ্রামেও যেতে চান না; অথচ `গ্রাম গেল, গ্রাম গেল` বলে তারা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে থাকেন।

রাজনীতিক, চাকুরিজীবী, গবেষক থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষেরা পর্যন্ত দীর্ঘকালের লালিত গ্রামীণ মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছেন না। অথচ প্রতিবছর নগরীয় ইউনিটের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের পর মাত্র ৫৫/৫৬ টি পৌরসভা ছিল, বর্তমানে সেগুলো বৃদ্ধি পেয়ে ৩৬৫টি নগরীয় ইউনিট (পৌরসভা, সিটি কর্পোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডসহ ) হয়েছে । যদি এ ধারাও বজায় থাকে, তাহলে আগামী ২০৫০ সালের আগে পরে প্রায় শতভাগ মানুষ নগরবাসী হয়ে যাবে( সরকার ৮ম পঞ্চম বার্ষিকী পরিকল্পনায় ২০৪১ সালের মধ্যে ৮০% লোক নগরবাসী হয়ে যাওয়ার কথা বলেছে) । কিন্তু সেটা হবে অপরিকল্পিত নগরায়ন। অপরিকল্পিত নগরায়ন ঠেকানোর জন্য তথা-কৃষিজমি ও পরিবেশ রক্ষার জন্য সরকার ইতোমধ্যে নির্দিষ্ট বিধিমালা জারী করেছে।

এ বিষয়ে উপজেলাতে ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোতে নির্দিষ্ট কমিটি গঠন করার কথা বলা হয়েছে। কমিটিগুলোতে নির্বাচিত প্রতিনিধি সহ ইঞ্জিনিয়ার, প্ল্যানার, আর্কিটেকচারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবে কমিটির কার্যাবলী কাগুজে-কলমে সীমাবদ্ধ। অসাধু ব্যক্তিরা কৃষি জমিকে অকৃষি জমি দেখিয়ে সেখানে শিল্পকারখানা নির্মাণ করছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিরাও পরিকল্পিত রাস্তাঘাট নির্মাণে কোনো আন্তরিকতা দেখাচ্ছেন না। সেক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর একার পক্ষে গ্রামগুলোকে পরিকল্পিত নগরে পরিণত করা সহজসাধ্য ব্যাপার নয়। জাতীয় সরকারের অধীনে স্থানীয় সরকারগুলো স্থানীয় সমস্যাদি সমাধানে কাজ করে।

সাম্রাজ্য বিস্তারকারী দেশগুলোর ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায়, সেসব দেশে জাতীয় সরকার নির্মাণের ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকারের ব্যাপক ভুমিকা ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাধীনতা লাভকারী দেশগুলো নিজেদের মতো করে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলে। আমরাও মহান মুক্তিযুদ্ধের পর যে সংবিধান রচনা করি তাতে স্থানীয় প্রশাসনিক ইউনিটগুলোকে নিজস্ব বাজেট তৈরির মাধ্যমে স্থানীয় কাজ করার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, কোনো সরকারই স্বাধীন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে আন্তরিকতার পরিচয় দেন নি।

অতীতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা যতটুকু কার্যকর ছিল, বর্তমানে দলীয় প্রতীকে নির্বাচন চালু হওয়ায় ততটুকুও এখন আর অবশিষ্ট নেই। নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নিজেদেরকে স্থানীয় প্রতিনিধি মনে না করে দলীয় প্রতিনিধি মনে করেন। কেউ কেউ চেয়ারম্যান-মেয়র পদটি জাতীয় প্রতিনিধি (এমপি) হওয়ার জন্য সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করছেন। কতিপয় বিশেষজ্ঞ দলীয় প্রতীকে নির্বাচনের পক্ষে পরামর্শ দিয়ে বলেন যে, উন্নত বিশ্বে এ ব্যবস্থা বহুদিন আগে থেকেই চালু আছে। কিন্তু তারা ভেবে দেখেন না যে, সেখানকার শাসন ব্যবস্থা `নিচ থেকে উপরমুখী`(বটম-আপ) হওয়ায় জনগণ স্থানীয় কাজকে আসল কাজ মনে করে; যেহেতু স্থানীয় কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সমাধা হলেই জাতীয় সমৃদ্ধি আসে।

এ দেশে সেরকম ব্যবস্থা গড়ে না ওঠায় জনগণ নাগরিক শ্রেণীতে উন্নীত হতে পারছে না। একই কারণে তারা কৃষি জমি রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, খাল-বিল-নদী দুষণ প্রতিরোধ করা ইত্যাদি কাজে আন্তরিকতার পরিচয় দিচ্ছে না। সেজন্য প্রতিটি গ্রামকে পরিকল্পিত নগরে পরিণত করার জন্য এবং প্রতিটি নগরকে পরিবেশ বান্ধব করার জন্য `স্বাধীন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা` গড়ে তুলতে হবে।

এ অবস্থায় দুই প্রকারের সরকার ব্যবস্থা তথা- কেন্দ্রীয় সরকার ব্যবস্থা ও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রতিটি স্থানীয় ইউনিটের সঙ্গে `সরকার` শব্দটি যুক্ত করে স্থানীয় ইউনিটগুলোকে প্রজাতান্ত্রিক রূপ দিতে হবে( যেমন- ইউনিয়ন সরকার, নগর সরকার, জেলা সরকার ইত্যাদি)। ২০৫০ সালের মধ্যে গ্রামীণ ইউনিটগুলো বিলুপ্ত হয়ে নগরীয় ইউনিটে রূপান্তরিত হবে। তখন জেলা সরকারের অধীনে নগর সরকারগুলো পরিচালিত হবে (এ বিষয়ে নিউইয়র্ক প্রবাসী আবু তালেব `গণস্বপ্নঃ২০৫০` নামক রূপরেখায় সুন্দর প্রস্তাব দিয়েছেন)।

আদিতে নগর রাষ্ট্রে দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে তোলা হতো রাজাকে রক্ষা করার জন্য। দুর্গের পতন মানে রাজার পতন। আধুনিক সরকার ব্যবস্থায় উন্নয়ন কাজে জনগণের অংশগ্রহণের সুযোগ থাকায় জনগণ নিজেকে সরকারের অংশ মনে করে। বাংলাদেশে এককেন্দ্রিক সরকার ব্যবস্থা তথা, ঢাকামুখী সরকার ব্যবস্থা বহাল থাকায় জনগণ সরকারকে দুরবর্তী ও বায়বীয় প্রতিষ্ঠান মনে করে। এ ব্যবস্থা অক্ষুন্ন রেখে গ্রামকে পরিকল্পিত শহর হিসেবে গড়ে তোলা কিভাবে সম্ভব- তা ভেবে দেখা জরুরি।

লেখকঃ গণতন্ত্রায়ন ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার বিষয়ে গবেষক
ই-মেইল: [email protected]
পাবনা রোড, ঈশ্বরদী, পাবনা 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।