Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১৫ কার্তিক ১৪২৭, শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২০, ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

করোনাকালে হাওর পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা


১৯ সেপ্টেম্বর ২০২০ শনিবার, ১২:৩৬  এএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


করোনাকালে হাওর পর্যটনে নতুন সম্ভাবনা

আমরা জানি দেশের উত্তর পূর্বাঞ্চলের প্রায় ৭টি জেলার ৪৭টি উপজেলা নিয়ে হাওর এলাকা বিস্তৃত। এটি বাংলাদেশের একটি বিশেষ ভৌগোলিক অঞ্চল হলেও অর্থনীতিতে রয়েছে এর বিশেষ অবদান। এখানে সারাবছরে একটিই মাত্র ফসল হিসেবে বোরো ধানের আবাদ হয়ে থাকে। কাজেই এ অঞ্চলটিকে বোরো ধানের জন্য শস্যভাণ্ডার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়ে থাকে।

সেজন্য দেশের মোট বোরো ফসলের এক পঞ্চমাংশ ফসল এ অঞ্চলে চাষ ও উৎপাদিত হয়। যে কারণে প্রতিবছর নিরাপদে হাওরের ধান ফসল ঘরে উত্তোলন করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এটি দেশের মোট খাদ্য উৎপাদন ও খাদ্য নিরাপত্তার সাথে অঙ্গা-অঙ্গিভাবে জড়িত। সেখানে যে শুধু ধানই হয় তা নয়। সেখানে পানির মধ্যে বেঁচে থাকে হাজার রকমের দেশি প্রজাতির মাছ। পালিত হয় হাঁসের পাল। তাছাড়াও প্রাকৃতিকভাবে অতিথি পাখ-পাখালি তো রয়েছেই।

হাওরাঞ্চলের বোরোধান নিরাপদে উঠানোর জন্য একটি বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করা হয়ে থাকে, কারণ সেখানকার প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টিকে মাথায় রাখতে হয়। আমরা জানি প্রতিবছর অতিবৃষ্টি, বন্যা, খরার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হানা দিয়ে এসব বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতি করে থাকে প্রকৃতি। আবার প্রতিবছর বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল আর আগাম বন্যায় হাওরের বোরো ফসলেই শুধু নয় সেখানকার মাছ গাছ থেকে শুরু করে পশু পাখি ইত্যাদি প্রাকৃতিক সম্পদের কিছুনা কিছু বিনষ্ট হয়ে থাকে। এগুলো শুধু ক্ষতিই করে থাকে তা নয়। রয়েছে অনেক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত পরিবেশ যা পর্যটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এবারের করোনাকালে এটি পর্যটনপ্রেমী ভ্রমণপিপাসুদেরকে এসব ভিন্নমাত্রার প্রাকৃতিক ব্যাপকভাবে টানছে। নেত্রকোণা হাওর এলাকায় রয়েছে উচিতপুরসহ আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দর্শণীয় স্থান। তেমনিভাবে কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার বালিখোলা, চামড়াবন্দর, মিঠামইন, কামালপুর, তাড়াইল, নিকলি, কুলিয়ারচর, বাজিতপুর এসব এলাকায় একাধিক ভ্রমণ স্পট রয়েছে, যেখানে ইচ্ছে করলেই সহজে চলে যাওয়া যায়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের কল্যাণে টেলিভিশন ও বিভিন্ন অনলাইন মিডিয়াতে এসব এলাকায় বিভিন্ন পর্যটকের ধারণকৃত ভিডিও ও ছবি প্রকাশিত হওয়ার পর সেসব এলাকায় এখন ভ্রমণপিপাসু পর্যটকেেদর ভীড় বাড়ছে।

কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে যেতে হলে কিশোরগঞ্জ শহরের ভিতর দিয়ে করিমগঞ্জ রোডে ১০-১২ কিলোমিটার গেলেই একপাশে চামড়াবন্দর এবং অপরপাশে বালিখোলা নৌবন্দর। চামড়াবন্দর কিংবা বালিখোলা নৌবন্দর হতে ট্রলারে ঘণ্টাখানেক চড়লেই মিঠামইন, কামালপুর এলাকায় হাওরের জন্য নির্মিত বিশেষ ধরনের ‘অল ওয়েদার রাস্তা’ দেখতে পাওয়া যাবে।

এ রাস্তার বৈশিষ্ট হলো দু’ধারে দিগন্তজোড়া নয়নাভিরাম পানি আর পানির দৃশ্য দেখতে পাওয়া যায়। সেখানে গেলে এটা সাগর না হাওর তা আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়বে। অপরদিকে নিকলি, মানিকখালি, বাজিতপুর, ভৈরব ইত্যাদি জায়গা দিয়েও হাওরে প্রবেশ করা যায়। তাছাড়া ব্রাহ্মণবাড়ীয়া, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, সিলেট সেসব এলাকা দিয়েও আলাদা আলাদাভাবে সেখানকার হাওরে প্রবেশ করা যায়।

বর্তমান মৌসুমটাই হাওরে বেড়ানোর জন্য সবচেয়ে ভাল সময়। কারণ ডিসেম্বর মাস থেকে পানি কমে গিয়ে বোরো ধানের আবাদ শুরু হয়ে যায়। অপরদিকে বর্ষার শুরুতে কালবৈশাখীর ঝড়বৃষ্টি আচমকা আক্রমণ করতে পারে। এতে সেসময় নৌকাডুবির মতো দুর্ঘটনা নিত্যনৈমিত্তিক। তবে বর্ষা শেষ হয়ে গেলেও স্থায়ী কিছু হাওর রয়েছে সেগুলোতে পানি কখনো শুকায় না। বরং শীতে এসব হাওরে অতিথি পাখির আনাগোনা বৃদ্ধি পায়। বিশ্ব ঐতিহ্যে স্থান পাওয়া টাঙ্গুয়ার হাওর তাদের মধ্যে অন্যতম।

অন্যসময় এগুলো মানুষের দৃষ্টি এতটা কাড়তে না পারলেও করোনাকালে মানুষ ঘরে থেকে থেকে একগুয়ে হয়ে যাওয়ার কারণে দূরে কোথাও বেড়াতে না পেরে কাছাকাছি হাওরকেই ভ্রমণের তালিকায় স্থান দিচ্ছে। এসব এলাকা অনাদি-অনন্তকাল ধরে অবহেলিত ছিল। কিন্তু বর্তমানে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের নিজ এলাকা এসব অবহেলিত হাওরে হওয়ায় তিনিই প্রথম সেখানে উন্নয়নের কার্যক্রম শুরু করেছেন।

তিনি সেখানকার প্রতিটি বাড়িকে বিদ্যুতায়িত করেছেন, গড়ে তুলছেন বিরল অলওয়েদার সাবমারজিবল রাস্তা। এসব দেখার জন্যই মানুষের ভিড় দিনদিন বেড়েই চলেছে। একবার যেহেতু অবহেলিত সেসব এলকায় বর্তমান শেখ হাসিনার সরকারের হাতের ছোঁয়া পড়েছে- তা চলতেই থাকবে। আর এভাবেই হাওরাঞ্চলের গুরুত্ব দেশি বিদেশি পর্যটকদের নিকটও বাড়বে। আর পর্যটনের এ অবারিত দ্বার উম্মোচনের আশা জাগিয়েছে এ করোনাকাল।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়

email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।