Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৯ চৈত্র ১৪২৭, সোমবার ১২ এপ্রিল ২০২১, ৬:০০ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

পরিবর্তিত জলবায়ুর অভিঘাত হিটশক, সমাধান বিজ্ঞানেই: ড. তোফাজ্জল


০৮ এপ্রিল ২০২১ বৃহস্পতিবার, ০৩:১৬  এএম

বিশেষ প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


পরিবর্তিত জলবায়ুর অভিঘাত হিটশক, সমাধান বিজ্ঞানেই: ড. তোফাজ্জল

দেশের বিভিন্ন জেলায় সম্প্রতি বয়ে যাওয়া তীব্র তাপদাহে (হিটশক) বোরো ফসলের ব্যাপক ক্ষতিকে ‘বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বিশিষ্ট জীববিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. তোফাজ্জল ইসলাম বলেছেন, এর সমাধানে খুঁজতে হবে বিজ্ঞানের কাছেই।

এখন পর্যন্ত দেশের ৬ জেলার অন্তত ৪৮ হাজার হেক্টর বোরো আবাদি জমি কবলিত হওয়ায় উদ্বেগ ক্রমেই বাড়ছে। করোনাকালে জনস্বাস্থ্য সংকটের মাঝেই নতুন এই সংকটকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই জানিয়ে খ্যাতিমান এই বিজ্ঞানী সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিয়ে দ্রুত সুসমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বশেমুরকৃবি) ইনস্টিটিউট অব বায়ো-টেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিয়ারিং (আইবিজিই)’র প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক ড. এম তোফাজ্জল ইসলাম বুধবার বহুমাত্রিক.কম-কে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এই দাবি জানান। 

অধ্যাপক ইসলাম বলেন, ‘দেশের অব্যাহত এগিয়ে যাওয়ার অন্যতম প্রধান নিয়ামক আমাদের কৃষি উৎপাদনে ঈর্ষণীয় সাফল্য। কিন্তু পরিবর্তিত জলবায়ুর অভিঘাতে আমাদের অব্যাহত এগিয়ে যাওয়া কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাও যে নিরাপদ নয়-বোরো ফসলে হিটশকের ছোবলই তা প্রমাণ দিচ্ছে।’

‘গবেষণা তথ্য বলছে, দেশে বিচ্ছিন্নভাবে ধান আবাদে হিটশকে এধরণের ফসলহানির ঘটনা ঘটলেও ব্যাপকভাবে এই ক্ষতির চিত্র এবারই প্রথম। বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব যে এ অঞ্চলেও আছড়ে পড়ছে, বোরো ক্ষেতে সাম্প্রতিক এই বিপর্যয় তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের এই অভিঘাত আমাদের সৃষ্ট নয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় আমাদের উচিত বৈশ্বিক সহযোগিতা নিয়ে এই বিপর্যয় মোকাবেলা করা’-যোগ করেন তোফাজ্জল ইসলাম। 

কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থার ইতিহাস ঘেটে বহির্বিশ্বের উদাহরণ টেনে জাপানের হোক্কাইডো বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এই গবেষক বলেন, ‘১৯৭৮ ও ২০২০ সালের প্রকাশিত দুটি আলাদা গবেষণাপত্রে দেখা যাচ্ছে বিশ্ব ধান উৎপাদনে এধরণে হিটশকের ছোবল আগেও মোকাবেলা করেছে। একজন বিজ্ঞান গবেষক হিসেবে দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, দেশে সম্প্রতি পুষ্পায়ন পর্বে বোরো ক্ষেতে যে বিপর্যয় ঘটে গেল তার সমাধান আমাদের বিজ্ঞান গবেষণাতেই খুঁজতে হবে।’ 

আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী tandfonline.com-তে মুদ্রিত গবেষণাপত্রে স্থান পায় জাপানে টাইফুনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে চিটায় রূপান্তরিত ধান ক্ষেতের এই ছবিটি। 

তিনি বলেন, ‘জাপান যেহেতেু এই ধরণের বিপর্যয় ইতিপূর্বে মোকাবেলা করেছে, তাই আমাদের কর্তব্য হবে তাদের স্থানীয় দূতের সঙ্গে আলোচনা করে সেদেশের অভিজ্ঞতাকে গ্রহণ করা এবং আমাদের সংকটে তা কাজে লাগানো। স্থায়ী সমাধানে সহনশীল জাত উদ্ভাবনের দিকেই যেতে হবে; আমাদের জিনব্যাংকে রক্ষিত বিপুল জাতবৈচিত্র্য এক্ষেত্রে সমাধানসূত্র খুলে দিতে পারে।’   

বাংলাদেশের খাদ্য নিরাপত্তায় এই ধরণের বিপর্যয় কী সংকট তৈরি করছে-এমন প্রশ্নে ড. তোফাজ্জল বলেন, ‘বৈশ্বিক মহামারীর কালে খাদ্য নিরাপত্তায় আমাদের অনেকবেশি নজর দিতে হবে। প্রধান খাদ্যশস্য ধান উৎপাদনের প্রধান মৌসুমে এই বিপর্যয়কে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। র‌্যাপিড অ্যাকশনে যেতে হবে আমাদের। দেশি-বিদেশি বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত ভার্চুয়াল সম্মেলন জরুরিভিত্তিতে করা উচিত। সেইসঙ্গে প্রতিবেশি দেশসমূহের সঙ্গেও সহযোগিতা বিনিময় দরকার, কারণ  এই বিপর্যয়ের ঢেউ থেকে প্রতিবেশি অঞ্চলও বাদ যাবে না।’

ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়ানো উচিত

সম্প্রতি বয়ে যাওয়া হিটশকে বোরো ফসলের ব্যাপক বিপর্যয়ে নিঃস্ব হয়ে গেছেন অসংখ্য কৃষক। বছরের প্রধান ফসল হারিয়ে সেসব কৃষক পরিবারগুলো কেবল খাদ্য সংকটেই পড়বে না, তাদের অর্থনৈতিক সংকটও তীব্র হবে। এই বাস্তবতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগকে জরুরি ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াবার দাবি জানিয়েছেন অধ্যাপক তোফাজ্জল ইসলাম। 

তিনি বলেন, ‘একটি মানবিক ইস্যু বিবেচনা করে সরকারের উচিত দ্রুত প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করা। কারণ এই কৃষকরা পরবর্তীতে ফসল উৎপাদন করতে পারলেই আমরা শহরের মানুষেরা খেতে পারব। কৃষকরা বাঁচলেই খাদ্য উৎপাদন প্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন হবে। তাই এবিষয়ে পদক্ষেপের দাবি জানাচ্ছি।’

ময়মনসিংহের ত্রিশালে হিটশকে কপাল পুড়েছে দুই সহস্রাধিক কৃষকের । ছবি: বহুমাত্রিক.কম

উল্লেখ্য, গত রোববার (৪ এপ্রিল) নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওর এলাকা এবং গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, রাজশাহী ও ময়মনসিংহের বিভিন্ন বয়ে যাওয়া হিটশকে বোরো আবাদের ন্যূনতম ৫ শতাংশ (ধানগাছ) মরে গেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা এ ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরে তথ্যমতে, এই হিটশকে অন্তত ৪৮ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা আবাদি জমির র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ৪ এপ্রিল সন্ধ্যায় দেশজুড়ে কালবৈশাখীর ঝড়ের সঙ্গে অতিরিক্ত গরম বাতাস বয়ে যায়। পরদিন ধানক্ষেত ঝলসে যাওয়া দেখে কৃষকের মাথায় হাত পড়ে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ঘুরে দেখেছেন কৃষি সচিবসহ সম্প্রসারণ বিভাগ এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি দল। 

ত্রিশালে হিটশকে কপাল পুড়েছে দুই সহস্রাধিক কৃষকের

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।