Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২২ অগ্রাহায়ণ ১৪২৬, শুক্রবার ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯, ১২:৫২ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক: রুখে দাঁড়াতে হবে


১৪ মে ২০১৯ মঙ্গলবার, ০২:৩৮  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


দুধেও ক্ষতিকর রাসায়নিক: রুখে দাঁড়াতে হবে

দুধ একটি আদর্শ খাবার। কারণ দুধের মধ্যে সবগুলো পুষ্টি উপাদান বিদ্যমান থাকায় তা সব মানুষের উপাদেয় খাবার হিসেবে পরিগণিত। আমরা জানি রোগীর পথ্য থেকে শুরু করে শিশু, নবজাতক, আবালবৃদ্ধবনিতা সবার প্রিয় খাবার হলো দুধ। কেক, রুটি, বিস্কুট, শিশুখাদ্যসহ যেকোন ধরনের বেকারি আইটেম ও পিঠা, সেমাই, পায়েসসহ গৃহস্থালী মুখরোচক খাবার তৈরী করা হয়। অথচ এত গুরুত্বপূর্ণ একটি পানীয়ের সাথে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া খুবই ভয়ঙ্কর একটি বিষয় হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি আরো বেশি ভাবিয়ে তুলেছে যখন সম্প্রতি রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশ থেকে ৯৬টি দুধের নমুনা থেকে প্রাপ্ত তথ্য জেনে। সেখানে ৯৬টি নমুনার মধ্যে ৯৩টিতেই মাত্রাতিরিক্ত ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। 

খাদ্যে ভেজাল বিষয়টি এখন অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক। তা নিয়ে মাঝে-মধ্যে অভিযান চালানো হয়। তবে সেটি নির্দিষ্ট কোন সময়ে সীমাবদ্ধ থাকা সমীচীন নয়। সরকারের তরফ থেকে বিএসটিআই কিংবা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের মতো সংস্থা সৃষ্টি করে দেওয়া রয়েছে। তারা সারাবছরই খাদ্যে ভেজাল বিষয়ে তৎপরতা চালানোর কথা। কিন্তু তাদেরকে দেখা যায় বছরের বিশেষ বিশেষ সময়ে সীমিত আকারে ভ্রাম্যমান আদালত কিংবা অভিযান পরিচালনা করে কিছু সময়ের জন্য জেল জরিমানা ও আলামত জব্দ ইত্যাদি কার্যক্রম গ্রহণ করছে। রমজান মাস তার মধ্যে অন্যতম। রমজান মাস এলেই চোখে পড়ার মতো কিছু তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়।

আর এবারের রমজান মাসের আগে এবং রমজান মাসে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। যেখানে ৫২টি নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর ভেজালের কারণে মহামান্য হাইকোর্ট এসব বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সকলের উপর নাখোশ হয়ে বিভিন্ন গণমুখী নির্দেশনা দিয়েছেন। সেখানে দেশের অনেক নামী-দামী ব্রান্ডের কোম্পানির পণ্যও রয়েছে। এগুলো পত্রিকান্তরে এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। আশাকরি এতে ভোক্তাদের মধ্যে কিছুটা হলেও সচেতনতা বৃদ্ধি পাবে। অথচ আমরা যদি সামগ্রিকভাবে দেখি তাহলে কিসে ভেজাল নেই সেটা বের করাই কঠিন হয়ে পড়বে। উদাহরণস্বরূপ ধান-চাল, আটা-ময়দা, তেল-চিনি, মসলা, মাছ-মাংস, শাক-সবজি, ফল-মূল, তরি-তরকারি ইত্যাদি ইত্যাদি।

এগুলো নিয়ে পত্র-পত্রিকায় ও অন্যান্য গণমাধ্যমে নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়ে আসছে। কিন্তু দুধে এত ব্যাপকভাবে ক্ষতিকর রাসায়নিকের উপস্থিতি সত্যিই আশঙ্কাজনকভাবে একটি আতঙ্কের বিষয়। উল্লেখিত কাাঁচা তরল দুধে ৯৬টির মধ্যে ৯৩টি নমুনাতেই সীসা, এন্টিবায়োটিক, অনুজীবসহ অসহনীয় মাত্রার আরো নানা ধরনের ভারী ও ক্ষতিকর ধাতু পাওয়া গেছে। প্যাকেটজাত দুধে ৩১টি নমুনার মধ্যে ১৮টিতেই ভেজাল পাওয়া গেছে। এছাড়া দুধ ও দইয়ে উচ্চ মাত্রার বিভিন্ন রাসায়নিক পাওয়া গেছে। বিভিন্ন কোম্পানির দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যে ভেজাল ও রাসায়নিক মেশানোর সঙ্গে জড়িতদের নাম চেয়েছিল খোদ হাইকোর্ট। কারণ এর আগে ১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ তারিখে অন্যান্য পণ্যেও সাথে দুধে ভেজাল বিষয়ে একটি প্রতিবেদন চেয়েছিল কোর্ট।

নমুনা পরীক্ষার পর জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানা যায়, গরুর খোলা তরল কাঁচা দুধে অনুজীবের সহনীয় মাত্রা ৪ থাকার কথা থাকলেও পাওয়া গেছে ৭ দশমিক ৬৬ পর্যন্ত। আলফাটক্সিনের সহনীয় মাত্রা ০ দশমিক ৫ হলেও পাওয়া গেছে ০ দশমিক ৯৯৬ পর্যন্ত। টেট্রাসাইক্লিনের মাত্রা ১০০ পর্যন্ত সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ৬৭১ দশমিক ১৩ পর্যন্ত, সিপ্রোফ্লক্সাসিনের মাত্রা ১০০ পর্যন্ত সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ১৪৮ দশমিক ৩৬ পর্যন্ত। কীটনাশকের মাত্রা ৫ সহনীয় হলেও পাওয়া গেছে ৯ দশমিক ৫০ থেকে ১৬ দশমিক ২০। প্যাকেটজাত দুধের ক্ষেত্রে টেট্রাসাইক্লিনের সহনীয় মাত্রা ১০০ হলেও দেশীয় প্যাকেটজাত দুধে পাওয়া গেছে ১৮৭ দশমিক ৫৮ পর্যন্ত। আমদানি করা প্যাকেটজাত দুধে পাওয়া গেছে এ উপাদানের মাত্রা ৭১৭ দশমিক ৮২ পর্যন্ত পাওয়া গেছে। আর অলফাটক্সিনের সহনীয় মাত্রা ০ দশমিক ৫ হলেও পাওয়া গেছে ১ দশমিক ৯৩ পর্যন্ত। এ থেকেই ভয়াবহতা অনুমেয়।

দুধে ভেজাল তো আছেই। তারউপর আবার শোনা যাচ্ছে পুরোপুরি ক্ষতিকর ক্যামিক্যাল ব্যবহার করে নতুন দুধ নাকি তৈরী করা হয়। সেক্ষেত্রে দুধের ছানার পানির সাথে আটা-ময়দার গুড়া, চক পাউডার, গুড়োদুধ মিশ্রিত করে সাথে আরো ফরমালিনসহ অন্যান্য রাসায়নিক দ্রব্য দিয়ে তৈরী করা হয় এ দুধ। এমনভাবে মিশ্রনটি তৈরী করা যেখানে ল্যাকটোমিটারেও নাকি তা ধরা পড়েনা। তাহলে বুঝাই যাচ্ছে, আমরা কি খেয়ে বেঁচে আছি! শুনেছি অসাধু গোয়ালারা দুধে পানি মেশায়, কিংবা দুধে কনডেন্সড মিল্ক মেশায় আবার ভেজাল দুধকে ঘন করার জন্য ভাগারের ময়লা পানি মেশায়। এ সকল কিছুকে ছাড়িয়ে গেছে নতুন দুধ তৈরী করা।

তবে সবকিছু যে কৃত্রিম উপায়ে হয় তাই নয়, কিছু পরিবেশগত এবং উদ্ভিদ-প্রাণিকুলের ফুড চেইনের মাধ্যমেও দুধে কিছু ভারী ধাতুর অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়। কারণ গরু যে ঘাস খায় সেখানে ভেজাল, পানিতে ভেজাল, লবণে ভেজাল, বাজারজাত প্রস্তুতকৃত গো-খাদ্যে ভেজাল, গরু মোটাতাজাকরণে ব্যবহূত হয় ক্ষতিকর এন্টিবায়োটিক, মুরগীতে ভেজাল, ডিমে ভেজাল, মাছে ভেজাল, সকল পণ্যে ভেজাল। কাজেই এসকল ভেজালের ক্ষতিকর প্রভাব কোন না কোনভাবে গুরুতে পড়ছে। সেইসাথে পড়ছে গোমাংস ও দুধের উপরও। আর চূড়ান্ত্ভাবে তো তা মানুষ নামক গিনিপিগের শরীরের উপরই ভর করছে।

আর তাই এখন পেটের পীড়াসহ ক্যান্সারের মতো মারণব্যাধি ছড়িয়ে পড়ছে মানুষের শরীরে। শোনা যায় এখন নাকি হাসপাতালে ভর্তিকৃত শিশুদের বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় এন্টিবায়োটিক কাজ করছে না। বিষয়টি আসলেই শুধু ভয়ের নয়, আতঙ্কেরও। কাজেই সময় এসেছে রুখে দাঁড়াবার। মহামান্য হাইকোর্ট থেকেও এসব বিষয়ে ছাড় না দেওয়ার জন্য রীতিমতো আদেশ জারি করা হয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট সকলের দায়িত্বশীল হওয়ার এখনই সময়। তা না হলে একটি জাতি পঙ্গু হয়ে যাবে।

লেখক: কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, email: [email protected] 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।