ফাইল ছবি
বৈশ্বিক শান্তি সূচক (গ্লোবাল পিস ইনডেক্স বা জিপিআই) ২০২৬ অনুযায়ী দক্ষিণ এশিয়ায় চতুর্থ শান্তিপূর্ণ দেশের স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। শান্তি বজায় রাখার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এই অঞ্চলে প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে।
গত মঙ্গলবার অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ইনস্টিটিউট ফর ইকোনমিকস অ্যান্ড পিস’ (আইইপি) এই সূচক প্রকাশ করে। এবারের সূচকে বাংলাদেশের শান্তির স্তরকে ‘মাঝারি’ বা মিডিয়াম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের ১৬৩টি দেশ ও অঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭তম। ৫ পয়েন্টের মধ্যে বাংলাদেশের সার্বিক স্কোর ২ দশমিক ২২৬। সূচকে যে দেশের স্কোর যত কম, সেই দেশ তত বেশি শান্তিপূর্ণ।
আইইপির জিপিআইয়ের এটি ২০তম সংস্করণ। বিশ্বের মোট জনসংখ্যার ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ এই সূচকের আওতায় এসেছে। মূলত তিনটি মূল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে এই শান্তি সূচক তৈরি করা হয়। এগুলো হলো সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা, চলমান অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্ব এবং সামরিকীকরণ। এই তিন ক্ষেত্রে ২৩টি সূচক মূল্যায়ন করা হয়েছে। এই মূল্যায়নে বাংলাদেশ সামাজিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষা খাতে ২ দশমিক ৫৭৯, চলমান দ্বন্দ্ব খাতে ২ দশমিক ২৩৭ এবং সামরিকীকরণ খাতে ১ দশমিক ৬১৫ স্কোর পেয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ায় বরাবরের মতোই সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশ হিসেবে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে ভুটান। বৈশ্বিক তালিকায় দেশটির অবস্থান ১৬তম। এই অঞ্চলের মধ্যে একমাত্র ভুটানই ‘উচ্চ’ শান্তির দেশ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, বৈশ্বিক তালিকায় তাদের অবস্থান ৬৭তম। এরপরেই ১১১তম অবস্থান নিয়ে তৃতীয় স্থানে রয়েছে নেপাল। অন্যদিকে চলমান দ্বন্দ্বের সূচকে অবনতি হওয়ায় ভারত এই অঞ্চলে পঞ্চম এবং বৈশ্বিক তালিকায় ১২৭তম অবস্থানে নেমে গেছে। ভারতকে ‘নিম্ন’ শান্তির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ছাড়া পাকিস্তান ১৫২তম এবং আফগানিস্তান ১৫৭তম স্থান নিয়ে এই অঞ্চলের সবচেয়ে অশান্ত দেশ হিসেবে তালিকায় রয়েছে।
প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলেই শান্তির সবচেয়ে বড় অবনতি ঘটেছে। এই অঞ্চলে শান্তির মাত্রা গড়ে ২ দশমিক ৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। মূলত চলমান দ্বন্দ্বের কারণে পরিস্থিতি বেশি খারাপ হয়েছে, যা ৭ দশমিক ১ শতাংশ পর্যন্ত অবনতি দেখিয়েছে। এটি এই অঞ্চলের ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা এবং আন্তসীমান্ত উত্তেজনাকে স্পষ্ট করে।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে টানা ১৯ বছরের মতো আইসল্যান্ড পৃথিবীর সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ দেশের শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। শীর্ষ পাঁচের বাকি দেশগুলো হলো নিউজিল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, স্লোভেনিয়া এবং আয়ারল্যান্ড। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্ব তালিকায় সবচেয়ে অশান্ত দেশ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে রাশিয়া। রাশিয়ার পর সবচেয়ে কম শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায় রয়েছে সুদান, গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গো, ইউক্রেন ও ইসরায়েল।
প্রতিবেদনের তথ্যমতে, গত এক বছরে বিশ্বব্যাপী শান্তির মাত্রা শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ কমেছে। এটি বিশ্ব শান্তির ক্ষেত্রে টানা ১২তম বার্ষিক অবনতি। জরিপ করা ১৬৩টি দেশের মধ্যে ৯৯টি দেশে শান্তির পরিস্থিতি খারাপ হয়েছে, আর বিপরীতে উন্নতি হয়েছে মাত্র ৬২টি দেশে।
এই শান্তি সূচকে বাংলাদেশ নিয়ে বিশেষ অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ইরান ও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান দ্বন্দ্বের কারণে বাংলাদেশের ওপর নেতিবাচক প্রভাবের আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মূলত রপ্তানিনির্ভর এবং জ্বালানি আমদানিকারক দেশ হওয়ায় এই ঝুঁকিতে রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে এলএনজি বা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে চাহিদা কমে যাওয়ার মতো অর্থনৈতিক ধাক্কা আসতে পারে। বাংলাদেশ জ্বালানি আমদানি নির্ভরতা, খাদ্য নিরাপত্তা এবং পরিবেশগত হুমকিতে উচ্চ ঝুঁকিতে থাকলেও দেশটির আর্থিক বা রাজস্ব ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম।
আইইপি সতর্ক করেছে, যদি হরমুজ প্রণালিতে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত বা ব্যাঘাত ঘটে, তবে চরম পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের জ্বালানি আমদানি ব্যয় দেশের জিডিপির ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে। এমন চরম সংকটে প্রথম বছরেই বৈশ্বিক জিডিপি শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে। এর ফলে দক্ষিণ এশিয়ার জ্বালানি ও খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোই সবচেয়ে মারাত্মক অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়বে।




