Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৬ আশ্বিন ১৪২৬, শনিবার ২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ৭:১৯ অপরাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

সড়ক নাকি মৃত্যু ফাঁদ


২২ এপ্রিল ২০১৯ সোমবার, ০১:০৯  এএম

ইনামুল আসিফ লতিফী

বহুমাত্রিক.কম


সড়ক নাকি মৃত্যু ফাঁদ

২০০৮ সালের কথা, ক্লাস এইটে পড়ি তখন, কিশোর হয়ে ওঠার বয়স, খেলাধুলা- ব্যান্ডের গানের মত ব্যাপারগুলোয় তখন তীব্র আগ্রহ জন্মাচ্ছে। হঠাৎ খবরের কাগজে দেখি ব্ল্যাক ব্যান্ডের সদস্যরা সড়ক দুর্ঘটনার কবলে পরেছেন, তখন এখনকার মত ফেসবুক বা ইন্টারনেট আমার কাছে সহজলভ্য ছিল না, অনেক খোঁজ খবর নিয়ে জানতে পারি ব্ল্যাকের সাউন্ড ইঞ্জিনিয়ার ইমরান আহমেদ চৌধুরী মুবিন নিহত হন এবং বেজ গিটারিষ্ট মিরাজ ও ড্রামার টনি আহত হন।

ভালই ধাক্কা খেয়েছিলাম, এর আগে কেন জানি সড়ক নামক মৃত্যু ফাঁদের ধারণা তেমন ছিল না। এব্যাপারে সবচেয়ে বড় ধাক্কাটা খাই এরপর, ২০১১ সালে যখন খবরের পত্রিকাগুলোর শিরোনাম হয় সড়ক দুর্ঘটনায় প্রখ্যাত পরিচালক ও প্রযোজক তারেক মাসুদ ও বিশিষ্ট চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীর নিহত হন। ব্যাপারগুলা এখন যেভাবে বলতে পারছি তখন আমার জন্য ব্যাপারটা মোটেও এরকম ছিল না, ভেতরটা দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল।

বিশাল জনসংখ্যা নিয়ে আয়তনে ছোটখাটো একটা দেশ আমাদের, এই দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা শুনলে শরীর আঁতকে ওঠে। সড়ক ও দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউট (এআরআই), বুয়েট বলছে, ১৯৯৮ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৪৫ হাজার ৯৪০ জন (২১ অক্টোবর ২০১৮, দৈনিক প্রথম আলো), ভাবা যায় কি, যে এটা প্রাচীনকালের কোনো মহামারী রোগের পরিসংখ্যান না, এটা আমাদের দেশের এক যুগের চেয়ে কিছু বেশি সময়ের সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত মানুষেড় সংখ্যা।

সাম্প্রতিক আরেকটু তথ্য দেই, ২০১৭ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ৩ হাজার ৬৭২ জন (২১ অক্টোবর ২০১৮, দৈনিক প্রথম আলো)। ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৪ হাজার ৪৩৯ জন (৩০ জানুয়ারি ২০১৯, দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন)। চলতি বছর অর্থাৎ ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের শেষ পর্যন্ত, এই তিন মাসেই সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে ১ হাজার ২১২ জন (০২ এপ্রিল ২০১৯, দৈনিক প্রথম আলো)। মনে প্রশ্ন আসে, একি সড়ক নাকি মৃত্যু ফাঁদ?

আমরা নিরাপদ সড়ক চাই, সড়কে মৃত্যুর মিছিল চাই না। আমরা খুব সহজেই সড়ক দুর্ঘটনার জন্য প্রশাসন আর সরকারকে দোষারোপ করে ফেলি। কিন্তু, আমরা নিজেরা কতটুকু আন্তরিক? ফুটপাতের উপর দিয়ে মোটর বাইক তুলে দেওয়া আমাদের দেশের অনেকেই নিজের নাগরিক অধিকার মনে করেন। ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং প্রশিক্ষণ ছাড়াই মোটর বাইক আর গাড়ি চালানো তো এক শ্রেণির মানুষের কাছে স্মার্টনেসের বিষয়। ফুটওভার ব্রিজ আর জেব্রা ক্রসিং ভুলে অনেকেই আবার সড়ক বিভাজন টপকিয়ে রাস্তার মাঝে দিয়ে দৌড় দেন, কানে হেডফোন বা মোবাইলে কথা বলতে বলতে রাস্তা পার হওয়া মানুষের সংখ্যাও কম নয়।

গতির নেশায় পাগল হয়ে অনেকে রাস্তায় লেখা সর্বোচ্চ গতিসীমার বোর্ড দেখেও গতি কমান না। আগে নিজেকে বদলাতে হবে, দায়িত্ব শুধু সরকার, প্রশাসন আর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনের সাধারণ ছাত্রগুলোর না। আমার, আপনার, সবার।সড়ক দুর্ঘটনা কোনো প্রাকৃতিক দূর্যোগ নয়,এ যেন মানুষ্য সৃষ্ট নতুন কোনো এক দূর্যোগ। এই দূর্যোগ মানুষ কিভাবে সৃষ্টি করে তার কিছু উদাহরণ দেইঃ বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালনা, বিপদজনক ওভারটেকিং, রাস্তা-ঘাটের নির্মাণ ক্রটি, ফিটনেস বিহীন যানবাহন, যাত্রী ও পথচারীদের অসতর্কতা, চলন্ত অবস্থায় মোবাইল বা হেড ফোন ব্যবহার, মাদক সেবন করে যানবাহন চালানো, রেলক্রসিংয়ে যানবাহন উঠে পরা, রাস্তায় ফুটপাত না থাকা বা ফুটপাত বেদখলে থাকায় রাস্তার মাঝ পথে পথচারীদের যাতায়াত, যানবাহনে অতি পণ্য বা যাত্রী বহন এবং সড়কে ছোট যানবাহনের সংখ্যা বাড়ায় দুর্ঘটনা বাড়ছে। এছাড়াও সারা দেশে রয়েছে ভয়ঙ্কর ৩৮৯টি ব্ল্যাক স্পট বা ভয়ংকর দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকা (১২ ফেব্রুয়ারি ২০১৭, দৈনিক মানবজমিন)।

এখন বড় প্রশ্ন হচ্ছে, এই মৃত্যু ফাঁদ প্রতিরোধে সরকার ও প্রশাসনের করণীয় কি? প্রথমেই আমি মনে করি, বড় শহরগুলোতে যে মালিক-চালকের চুক্তি ভিত্তিক বাস চালানো হয়, তা বন্ধ করার জন্য কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।মহাসড়ক থেকে নিরাপদ দূরত্বে গ্রাম্য বাজার বসানোর ব্যবস্থা করা। হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি, হাইওয়ে পুলিশকে স্পিড মিটার ব্যবহার করার মাধ্যমে সর্বোচ্চ গতিসীমা পার করা এবং বিপদজনকভাবে ওভারটেকিং করা যানবাহনগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষনিক শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। মাদক সেবন করে এবং মোবাইল কথা বলা অবস্থায় যানবাহন যাতে চালকরা না চালাতে পারেন তা প্রশাসন ও সড়ক শ্রমিক ইউনিয়নের যৌথ উদ্যোগে নিশ্চিত করতে হবে।

ব্ল্যাক স্পট বা ভয়ংকর দুর্ঘটনা প্রবণ এলাকাগুলোর যে বিপদজনক বাঁক আছে তা দ্রুততার সাথে ঠিক করা নিশ্চিত করতে হবে সড়ক ও জনপদ বিভাগের মাধ্যমে।সড়ক বিভাজন টপকিয়ে এবং মোবাইল ফোন ব্যবহার করে রাস্তা পার হওয়া মানুষদের আইনের আওতায় আনা উচিত জরিমানার মাধমে, এতে করে সচেতনতা বাড়বে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করবে সরকার, প্রশাসন এবং সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন কর্তৃক পরিবহন শ্রমিকদের মাঝে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে। আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, প্রয়োজনে মৃত্যুদণ্ডের মত কঠোর শাস্তির আইন পাশ করা যেতে পারে।

আমরা কেউই চাই না অকালে আমাদের প্রিয়জনদের হারাতে। আমরা চাই না খবরের কাগজ খুলেই সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের খবর দেখতে। আমরা নিরাপদ সড়ক চাই, সড়কের নামে মৃত্যু ফাঁদ চাই না। 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ব্যবসায় প্রশাসন বিভাগ,
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।