Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৪ ভাদ্র ১৪২৬, মঙ্গলবার ২০ আগস্ট ২০১৯, ৯:৪০ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অর্জন যুগান্তকারী


২০ অক্টোবর ২০১৮ শনিবার, ০২:৫৪  পিএম

ড. মো. হুমায়ুন কবীর

বহুমাত্রিক.কম


স্বাস্থ্যসেবায় বাংলাদেশের অর্জন যুগান্তকারী

ঢাকা : বিশ্বের অনেক উন্নত দেশে স্বাস্থ্যসেবা একটি গুরুত্ব বিষয়। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ছিল ‘ওবামা কেয়ার’ নামের স্বাস্থ্যসেবা যা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে অনেক মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকলেও মানব কল্যাণে তারা তা গ্রহণ করেছিল।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দেশে স্বাস্থ্যসেবার এমন এমন অনেক প্রকল্প, প্রোগ্রাম, কার্যক্রম থাকে। জানা যায় বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু ছাড়া কার্যকরভাবে এমন কোন কর্মসূচি না থাকলেও শেখ হাসিনার ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের সরকারের আমলে তার কিছুটা গোড়াপত্তন করা হয়।

আমাদের স্মরণে থাকার কথা সেই কমিউনিটি হেল্থ কমপ্লেক্স স্থাপনের বিষয়টি। বাংলাদেশের গ্রামে-গঞ্জে দেশের প্রত্যন্ত এলাকার গণমানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি ইউনিয়নে কমপক্ষে একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করে সেখানে ডাক্তার, নার্সসহ প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য সহকারি নিয়োগ করে মানুষের দোরগোড়ায় স্থাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া। তখন প্রাথমিকভাবে সারাদেশে প্রায় ৬ হাজার এর অধিক সংখ্যক কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছিলেন।

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য ২০০১ সালের পর শেখ হাসিনার সরকারের ধারাবাহিকতা না থাকায় মানব সেবার মতো এমন একটি মহান ব্রতমূলক কাজের আর কার্যকর কোন অগ্রগতি হয়নি। উপরন্তু সেগুলোতে প্রদত্ত জনবল এখানে-ওখানে বদলী করে পুরো কল্যাণমূলক কাজটিতে অকল্যাণে পরিণত করা হয়েছিল। অথচ কিছুদিন পূর্বেও আমরা আমাদের গ্রামাঞ্চলে রোগ নির্ণয়ে, চিকিৎসায় ঝারফুঁক কিংবা হাতুরে ডাক্তারের উপর নির্ভর করতে দেখেছি। সামান্য সর্দি-জ্বরেও কেমন করে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষগুলো অসহায় হয়ে যেতো তা আমাদের কারো অজানা নয়।

এ প্রসঙ্গে আমার নিজের একটি অভিজ্ঞতা শেয়ার না করলেই নয়। ২০০৫ সালে হঠাৎ আমার গ্রামের বাড়িতে আমার বাবা ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত হন। আমাকে খবর দেওয়ার আগেই গ্রামের তথাকথিত শিক্ষিত আত্মীয়স্বজনের পরামর্শে ঝারফুঁক শুরু করে দিয়েছিল। পরে আমি জানার পর তৎক্ষণাৎ তাঁকে হাসপাতালে স্থানান্তর করার পরামর্শ দিলে তবু এক প্রকার জোর প্রয়োগ করে তা করতে হয়েছিল। অর্থাৎ তখনো গ্রামীণ প্রান্তিক পর্যায়ে যেকোন রোগ সম্পর্কে মান্দাতা ধ্যান-ধারণা পোষণ করতে দেখা গেছে। কারণ তাদেরকে এসব বিষয়ে সুপরামর্শ দেওয়ার মতো কেউ ছিলনা। এখনো এসব অন্ধকারাচ্ছন্ন চিন্তা চেতনা থেকে পুরোপুরি পরিত্রাণ না পেলেও পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি লাভ করছে। আর তা সম্ভব হচ্ছে এসব স্বাস্থ্য সচেতনতা কর্মসূচি মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানোর জন্যই।

কিন্তু পরবর্তীতে আবার ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের পর পূর্বে ৬ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিককে তো কার্যকরভাবে চালু করা হয়েছেই। উপরন্তু আরো নতুন নতুন কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কারণ নাগরিকের অন্যতম মৌলিক চাহিদা হলো সবার জন্য চিকিৎসার ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে নিশ্চিত করা। সেটার উপলব্ধি থেকেই ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত সময়ে কমিউনিটি ক্লিনিকের মাধ্যমে ৬২ কোটি ৫৭ লাখ সুবিধাবঞ্চিত রোগী ওষুধ ও স্বাস্থ্য সুবিধা গ্রহণ করেছেন।

সর্বশেষ প্রকাশিত পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, বর্তমানে সারাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে ইউনিয়ন পর্যায়ে ১৩ হাজার ৮৬১টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। আরো ১ হাজার ২৯টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের কাজ দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলছে। সব মিলিয়ে ১৪ হাজার ৮৯০টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্যসেবার কাজ শুরু করতে যাচ্ছে। এসব কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো স্বাস্থ্যসেবার পাশপাশি প্রাথমিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, চিকিৎসা ও পরামর্শ প্রদান করা হয়ে থাকে। এসব ক্লিনিক থেকে জ¦র, সর্দি, কাশি, কৃমি, পুষ্টি সমস্যার প্রতিকার, মা ও শিশু স্বাস্থ্য, কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যসেবাসহ সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচিতে সফলভাবে অংশ নিচ্ছে।

ক্লিনিকগুলো থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা, পরামর্শসহ ৩০ ধরনের ওষুধও বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে। আমরা অনুধাবন করতে পারি, প্রাথমিক স্বাস্থ্য সর্বসাধারণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া একটি দুরূহ ও কঠিন কাজ। এ অবস্থায় গ্রামীণ জনগণের নাগালে মানসম্মত প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলো এ সরকারের একটি যুগান্তকারী প্রবর্তন। আমরা সচেতনভাবে দেখতে পাচ্ছি সার্বিকভাবে স্বাস্থ্যসেবার প্রতিটি স্তরেই উন্নয়নের ছোঁয়া লেগেছে। একথা ঠিক যে তারপরও কিছু না কিছু ঘাটতি বা সমস্যা রয়েছে। যেকোন বিষয়ে একটি উদ্যোগ শুরু করাটাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এরপরে আস্তে আস্তে তার উৎকর্ষ সাধনের সুযোগ থাকে। এখন সরকারের তরফ থেকে তাই করা হচ্ছে।

সরকারের যে স্বাস্থ্যসেবায় সদিচ্ছা রয়েছে আমার দেখা তার আরেকটি বড় উদাহরণ হলো ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। সেখানে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতা চোখে পড়ার মতো। সরকারি হাসপাতালে এমন উদ্যোগ হয়তো এখন আরো অনেক স্থানেই থাকতে পারে যা পত্রিকান্তরে জানা যায়। তবে ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গণভাবে সব রোগী ভর্তি করা হয় না। যাদের ভর্তির প্রয়োজন নেই তাদেরকে প্রাথমিক চিকিৎসা, ব্যবস্থাপত্র এবং প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে বিদায় করে দেওয়া হয়। আর যাদের ভর্তি করা হয় তাদের চিকিৎসা যত ব্যয়বহুলই হোক না কেন তা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বহন করে থাকে। আমি শুনেছি দেশের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ^বিদ্যালয়সহ প্রত্যেকটি হাসপাতালেই এখন একই কাজ করা হচ্ছে।

আগেই বলেছি গ্রামীণ পর্যায়ে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার জন্য কিছু সমস্যা রয়েছে। সেখানে ডাক্তার, নার্স নিয়োগ দিলেও তারা তদবীর করে আবার অন্যত্র সুবিধাজনক স্থানে বদলী হয়ে চলে যায়। সেজন্য সরকার এখন আগে থেকেই পোস্টিং ঠিক করে ডাক্তার, নার্স নিয়োগের কথা ভাবছে। তাছাড়া বর্তমান শেখ হাসিনার সরকার প্রতিটি জেলায় মেডিক্যাল কলেজ, নার্সিং ইন্সটিটিউট এবং প্রত্যেক বিভাগে আলাদা আলাদা মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের ঘোষণা দিয়েছেন। যার বাস্তবায়নও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।

আমরা জানি, শেখ হাসিনার সরকার পরিবেশবান্ধব, কৃষিবান্ধব, তথ্যপ্রযুক্তি বান্ধব, ব্যবসা-বাণিজ্য বান্ধব, স্বাস্থ্যসেবা বান্ধব, সর্বোপরি সার্বিক উন্নয়ন বান্ধব। কাজেই আমরা দেখেছি দেশে যখনই আওয়ামীলীগের নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকে তখনই সুষম উন্নয়ন ঘটে। অন্যথায় তাঁর গৃহীত ভালো ভালো জনবান্ধব কর্মসূচি আর চালু রাখা হয় না। সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। কাজেই স্বাস্থ্যসেবায় গৃহীত এসব যুগান্তকারী পদক্ষেপসহ দেশের সার্বিক অগ্রগতির স্বার্থে বর্তমানে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকারের ধারবাহিকতা প্রয়োজন। আশাকরি বাংলার মানুষ এখন সেটি সহজেই বুঝবে এবং স্বাধীনতার সপক্ষের এ উন্নয়নকামী সরকারের ধারবাহিকতা রক্ষায় যা যা করণীয় তাই করবে।

লেখক: ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
email: [email protected]

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।