Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩ অগ্রাহায়ণ ১৪২৫, শনিবার ১৭ নভেম্বর ২০১৮, ১:২৯ অপরাহ্ণ
Globe-Uro

সংলাপ-ক্ষমতার স্বপ্ন ও ইতিহাসের পাঠ


০১ নভেম্বর ২০১৮ বৃহস্পতিবার, ০১:১৩  পিএম

ওমর ফারুক শামীম

বহুমাত্রিক.কম


সংলাপ-ক্ষমতার স্বপ্ন ও ইতিহাসের পাঠ
-ওমর ফারুক শামীম। ছবি : সংগৃহীত

রাজনীতি যদি হয় দেশ ও দশের কল্যাণে, তবেই সে রাজনীতি সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা লাভ করে। দেশে বিপুল জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল এখন নেই বললেই চলে। অধিকাংশ মানুষ বিভক্ত হয়ে আছে দুটি বড় দলে। আর কিছু রয়েছে তৃতীয় ও চতুর্থ সারির দলগুলোতে। স্বাধীনতার আগে এ দেশে এককভাবে তুমুল জনপ্রিয়তায় ছিল আওয়ামী লীগ। কিন্তু স্বাধীনতা লাভের পর বিভিন্ন কারণে সে জোয়ারেও ভাটা পড়ে। এরপর থেকে দুটি বড় দলের জনসমর্থন উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে প্রায় সমানতালেই এগিয়েছে। তৃতীয় ও চতুর্থ সারির দলগুলো বড় দলের সঙ্গে জোট বেঁধে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে।

বড় দুই দলের কোনোটিই জনপ্রিয়তায় তুঙ্গে উঠতে পারেনি। এর কারণ দুই দলের কিছু নেতার রাজনৈতিক হটকারিতা। দেশের মানুষ এসব নেতার ওপর বিরক্তও বটে। এদের কেউ কেউ সাধারণ মানুষের কাছে ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছেন। এসবের পাশাপাশি রাজনীতিতে দূরদর্শিতার অভাবও একটি বড় কারণ। ফলে দেশ-দশের কল্যাণের যে রাজনীতি, সেটি অপূর্ণই থেকে গেছে। জোটবদ্ধ রাজনীতিতেও একই অবস্থা। ওয়ান-ইলিভেনের (এক-এগারো) আগে ও পরে দুটি সংসদ নির্বাচনে দুই জোটকেই (৪ দলীয় জোট ও ১৪ দলীয় জোট) দেশের ভোটাররা বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় নির্বাচিত করেছিলেন। কিন্তু সহনশীলতা আর উদার রাজনীতির অভাবে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, বিকাশ হয়নি গণতন্ত্রের।

২০০১-এর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চারদলীয় জোট সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করেছিল। কিন্তু নেতৃত্বে দূরদর্শিতার অভাবে সর্বত্র বিস্তৃত হয় রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার। এর প্রভাব পড়েছিল তৃণমূলেও। জঙ্গিবাদের উত্থানেও ক্ষমতাসীনদের হাত ছিল বলে মনে করা হয়। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে একের পর এক অভিযুক্ত হন জোটের নেতৃত্বদানকারী বিএনপি নেতারা। এরপর ২০০৬ সালের ২৭ অক্টোবর চারদলীয় জোটের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ার একদিনের মাথায় ২৮ অক্টোবর পল্টন মোড়ে লগি-বৈঠার মিছিল থেকে ঘটে যায় রাজনৈতিক ইতিহাসের বর্বর ঘটনা। মানুষ মানুষকে নির্দয়ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে। সেই হানাহানির ঘটনার জের ধরে তৈরি হয় আরেক ইতিহাস ‘ওয়ান-ইলেভেন’। এরপর সেনাসমর্থিত ফখরুদ্দীন সরকার দুই বছর পর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন।

সে নির্বাচনে চারদলীয় জোটের প্রধান শরিক বিএনপি ৩৩ দশমিক ২ শতাংশ ভোট পেয়ে মাত্র ৩০টি আসনে জয়লাভ করে। জোটের অন্য শরিকরা মাত্র তিনটি আসনে জয় পায়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ৪৯ শতাংশ ভোট পেয়ে ২৩০টি আসনে জয়ী হয়। তাদের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় মহাজোট ২৬৩ আসন নিয়ে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সরকার গঠন করে। এরপর থেকে ভোটের মাঠে ফল বিপর্যয়ের কারণে রাজনীতিতে কোণঠাসা হয়ে পড়ে বিএনপি ও তার শরিকরা। বিশ্লেষকরা চারদলীয় জোটের ওই বিপর্যয়কে নেতৃত্বে অদূরদর্শিতা, জঙ্গিবাদ, ক্ষমতার অপব্যবহার আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নকেই মূল কারণ বলে চিহ্নিত করেন।

এদিকে ১৪ দলীয় মহাজোট সরকার ক্ষমতায় বসেই পালাক্রমে দেশের বড় বড় খাতে সংস্কার শুরু করে। বিপুল উন্নয়নযজ্ঞে দেশের চিত্র পাল্টে দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অনেক ক্ষেত্রেই উন্নয়নের এ সাফল্য দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এরপর ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মহাজোট সরকার টানা দ্বিতীয় মেয়াদে আবারো ক্ষমতাসীন হয়। নির্বাচনকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। পেট্রোল বোমায় হতাহতের ঘটনা তখন রাজনৈতিক অস্থিরতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। নৃশংস এসব ঘটনায় বিএনপি-জামায়াতকে দায়ী করে প্রশাসন। মামলার ডালি চেপে বসে তাদের ওপর।

৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশে-বিদেশে নানান প্রশ্ন ওঠে। কিন্তু দেশের শিল্প, বাণিজ্য, অবকাঠামো, অর্থনীতিসহ বিভিন্ন খাতে অগ্রগতির সূচক উজ্জ্বল হয়ে ওঠায় মহাজোট সরকারের প্রতি নমনীয় ভাব পোষণ করে সর্বমহল। তবে প্রশ্নের মুখে পড়ে ‘গণতন্ত্র’র ইস্যু। জাতীয় সংসদে, নির্বাহী বিভাগে, জনপ্রশাসনে এবং তৃণমূল পর্যায়েও তাদের ক্ষমতার একক আধিপত্য বিস্তৃতি লাভ করে। বিপর্যস্ত বিএনপি ও তার প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীকে জঙ্গি ইস্যু, যুদ্ধাপরাধ, দুর্নীতির মামলা আর রাজনীতির ঘূর্ণিপাকে একের পর এক পর্যুদস্ত করে মহাজোট সরকার। এ ছাড়া নেতৃত্ব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও বিএনপির অভ্যন্তরে নানান সংকীর্ণতায় তৈরি হয় বিশৃঙ্খলা। দেশজুড়ে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জনসমর্থন থাকলেও দমন-পীড়নের মুখে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব সঙ্কটে পড়ে বিএনপি। একইভাবে নেতৃত্ব সঙ্কট চারদলীয় জোটকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক সম্পর্কেও পেছনে ফেলে দেয়। পিছিয়ে পড়ার আরো একটি বড় কারণ জঙ্গি তকমা। নেতৃত্বে বিশৃঙ্খলা আর ক্ষমতাসীনদের চাপে দিশাহারা হয়ে পড়েন নেতাকর্মীরা। নির্যাতন এড়াতে স্থান পরিবর্তন করে তারা অভিবাসী হয়ে পড়েন— এ জেলা থেকে সে জেলায়, এ নগর থেকে সে নগরে। আবার কিছু নেতাকর্মী সরকারি দলে যোগ দিয়ে গা বাঁচায়।

এখনো চারদলীয় জোটের অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন জেলায় অভিবাসী হয়ে জীবন পার করছেন। এদের অনেকেই হামলা মামলার ভারে নিজ এলাকায় গিয়ে স্বদম্ভে দাঁড়াতে পারছেন না। এমন বাস্তবতায় বিএনপি অবশেষে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে ছাড়াই ড. কামালের নেতৃত্বে ঐক্যফ্রন্টে এসে সমবেত হলেন। একইভাবে ঐক্যফ্রন্টে এসেছেন অনেক ছোট দলের বড় নেতারা। অন্য যেসব দল ঐক্যফ্রন্টে যুক্ত হয়েছেন, এসব দলের সমর্থকদের অবস্থাও অভিবাসী বিএনপি নেতাকর্মীদের মতোই। ঐক্যফ্রন্টের এই নির্বাচনী মোর্চা আওয়ামী রাজনীতির বিচক্ষণতার মুখে কতটা সফল হবে, তা-ই এখন দেখার বিষয়।

এদিকে সংলাপের আহ্বানে সাড়া দেওয়াকেও বিজয় মনে করছেন ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের কেউ কেউ। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী তো বলেই ফেলেছেন— ‘চাইলাম চা করাবেন ডিনার, আমাদের কপাল খুলে গেছে, দেশবাসীর কপালও খুলে গেছে।’ ঐক্যফ্রন্টের সংলাপের চিঠি আর প্রধানমন্ত্রীর সাড়া দেওয়াকে ফ্রন্ট নেতারা মনে করছেন ‘মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি’র মতো অবস্থা। আবার ফ্রন্টের বাইরের অনেকে বলছেন— সংলাপ হবে ক্ষমতা ভাগাভাগির। তবে যে যা-ই বলুক, দেশবাসী আশা করে সংলাপ থেকে একটি শান্তিপূর্ণ নির্বাচন প্রক্রিয়ার শুরু হবে।

অন্যদিকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সুবাদে মহাজোট সরকার দেশে-বিদেশে প্রশংসা কুড়ালেও রাজনৈতিক বিপর্যয়ে পড়া দলগুলোর প্রতি সহনশীলতা দেখায়নি। মহাজোটের টানা ১০ বছরের ক্ষমতাকালীন চারদলীয় জোটের অধিকাংশ রাজনৈতিক কর্মসূচি সফল হতে পারেনি। তারা এসবের জন্য সরকারি দল ও প্রশাসনের বিরুদ্ধে বরাবরই বাধা সৃষ্টির অভিযোগ করে এসেছেন। তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চায় বার বার বাধাগ্রস্ত হওয়ার কারণে প্রশ্নের মুখে পড়ে ‘গণতন্ত্র’। সরকারের বেশি বেশি উন্নয়ন বিশ্বে রোল মডেল হলেও গণতন্ত্র বিকাশে বাধার বিষয়টিও নতুন নজির স্থাপন করেছে বলে মনে করছেন অনেকে। এর পাশাপাশি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সংকুচিত করার মতো ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন-২০১৮’ করে সরকার গণমাধ্যম ও সুশীল সমাজের বিরাগভাজন হওয়ার পথে রয়েছে।

রাজনৈতিক বোদ্ধা ও বিশ্লেষকরা সরকারের এই নীতিকে ‘বেশি উন্নয়ন ও কম গণতন্ত্রে’র নীতি বলে মনে করছেন। গণতান্ত্রিক দেশে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হওয়ার কথা বলছেন ক্ষমতার বাইরে থাকা রাজনৈতিক দলগুলো। আবার ব্যাংকিং খাত, পুঁজিবাজার, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং গণপরিবহনের নৈরাজ্য নিয়ে সমালোচনায় মুখর বিরোধী দলসহ কমবেশি মানুষ। যে কারণে সারা দেশের ভোটারদের মধ্যে আলোচনায় নতুন মাত্রা পেয়েছে ‘ঐক্যফ্রন্ট’। গণমাধ্যমের সংবাদে দেখা যায়, নির্বাচনকে ঘিরে গঠিত ঐক্যফ্রন্টকে নিয়ে আলোচনা-সমালোচনায় মাতোয়ারা রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা। সংবিধানপ্রণেতা, আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্ব, আইনবিদ ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বকে সামনে রেখে ক্ষমতার স্বপ্ন দেখছে বিএনপি ও তাদের সমমনা দলগুলো।

রাজনৈতিক বোদ্ধাদের অনেকেই বলছেন, এবারের নির্বাচন হতে পারে উন্নয়ন প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন। ক্ষমতাসীন মহাজোট সরকার অনেক ত্রুটি-বিচ্যুতির পাশাপাশি দেশে বিপুল উন্নয়ন কাজ করেছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনে যারা আরো বেশি উন্নয়ন এবং গণতন্ত্র বিকাশের বিশ্বাসযোগ্য পরিকল্পনা ভোটারদের কাছে দৃশ্যমান করতে পারবেন, তারাই ক্ষমতার স্বপ্ন দেখতে পারেন। ভোটারদের অনেকে বলছেন, দেশে গত দশ বছরে যে উন্নয়ন হয়েছে তা অভাবনীয়। তবে বিরোধী দলগুলোকে দমন-পীড়নে সরকার যে পদ্ধতি অনুসরণ করেছে, তা গণতন্ত্র বিকাশের অন্তরায়। দেশের মানুষ যেমনি উন্নয়ন চায়, তেমনি গণতান্ত্রিক অধিকারও সমুন্নত রাখতে চায়। গণতন্ত্রকে সমুন্নত রেখে যে উন্নয়ন হবে, দেশবাসী সেই রাজনীতির ধারাতেই শামিল হবে।

তবে দেরিতে হলেও রাজনীতিতে আশার আলো সঞ্চার হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বরাবর সংলাপের আহ্বান জানিয়ে ঐক্যফ্রন্টের পাঠানো চিঠির সাড়া দিয়েছেন সরকার। সেই চিঠিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ ও গণতন্ত্রের চেতনা সমুন্নত রাখতে একাদশ সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ও সুন্দর প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করতে সংলাপের প্রয়োজন অনুভব করে আহ্বান জানিয়েছে ঐক্যফ্রন্ট।

দেশবাসী মনে করছেন, চিঠিতে আলোচনার বিষয়গুলোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বিচক্ষণ প্রধানমন্ত্রী সাড়া দিয়েছেন। আজ (বৃহস্পতিবার) সন্ধ্যায় গণভবনে বহুল প্রত্যাশিত সেই সংলাপ অনুষ্ঠিত হবে। দেশবাসী মনে করছেন, সংলাপ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে দূরত্ব কমে আসবে, ভুল বোঝাবুঝির অবসান হবে। অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় আগামী নির্বাচন সম্পন্ন হবে। আমরা মনে করি— যারা বুদ্ধিবৃত্তিক রাজনীতি চর্চা করবেন, দেশের উন্নয়নে বেশি বেশি মনোনিবেশ করবেন, ভোটারদের কাছে গ্রহণযোগ্য পরিকল্পনা তুলে ধরবেন- তারাই বিজয়ী হয়ে দেশের সেবা করবেন।

তবে এ কথা মনে রাখতে হবে যে— ক্ষমতাসীন হয়ে দুর্নীতি, প্রতিশোধপরায়ণতা, নৃশংসতা আর ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডকে এ দেশের মানুষ ঘৃণা করে। যারাই এ পথে হেঁটেছেন তাদের পরিণতি কী হয়েছে, তা ইতিহাসই সাক্ষ্য দেয়।

লেখক : সাংবাদিক ও বিশ্লেষক

[email protected]  

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।