Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৫ শ্রাবণ ১৪২৬, রবিবার ২১ জুলাই ২০১৯, ৬:৫০ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

মাগুরছড়া ট্রাজেডি: ২২ বছরেও শুকায়নি ক্ষত-মেলেনি ক্ষতিপূরণ


১৪ জুন ২০১৯ শুক্রবার, ০৫:৩২  পিএম

নূরুল মোহাইমীন মিল্টন, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


মাগুরছড়া ট্রাজেডি: ২২ বছরেও শুকায়নি ক্ষত-মেলেনি ক্ষতিপূরণ

মৌলভীবাজার: শুক্রবার, ১৪ জুন পূর্ণ হলো মাগুরছড়া গ্যাস কূপ বিস্ফোরণের ২২ বছর পূর্তি। ১৯৯৭ সনের ১৪ জুন মধ্য রাত ১টায় কমলগঞ্জ উপজেলার মাগুরছড়া গ্যাস কূপে মার্কিন অক্সিডেন্টাল কোম্পানির ড্রিলিং চলাকালে ভয়াবহ বিষ্ফোরণে বন, পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, রেল ও সড়কপথ, পানজুম, বিদ্যুৎ লাইনসহ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

বন ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি দীর্ঘ ২২ বছরেও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। অক্সিডেন্টাল ক্ষয়ক্ষতির আংশিক পরিশোধ করলেও বন বিভাগ কোন ক্ষতিপুরণ পায়নি। দিবসটি পালন উপলক্ষে এবং ক্ষতিপূরণ আদায়ে স্থানীয় বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে মাগুরছড়ায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ অনুষ্ঠিত হচ্ছে।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, লাউয়াছড়া ফরেষ্ট বিটের অভ্যন্তরে মাগুরছড়া এলাকায় ১৯৮৪-৮৬ ও ১৯৯৪ সালের দায়িত্ব পায় যুক্তরাষ্ট্রের তেল গ্যাস উত্তোলনকারী অক্সিডেন্টাল কোম্পানী। দায়িত্ব গ্রহণের পর অক্সিডেন্টাল গ্যাস ফিল্ডের ড্রিলিং কাজের জন্য সাবলিজ প্রদান করে ডিউটেক নামের জার্মান কোম্পানীর কাছে। ১৪ নম্বর ব্লকের মাগুরছড়াস্থ মৌলভীবাজার-১ গ্যাসকূপ খননকালে বিষ্ফোরণে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ৬৯৫ হেক্টর বনাঞ্চলের পরিবেশের জীববৈচিত্র্য, রেল ও সড়কপথ, ফুলবাড়ি চা বাগান, খাসিয়া পুঞ্জির বাড়িঘর ও পান জুম, পিডিবির ৩৩ হাজার বিদ্যূৎ লাইনের। পরোক্ষভাবে ২৮টি চা বাগান সহ ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়। এছাড়া ২শ’ বিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুড়ে নষ্ট হয়, যার বাজার মূল্য দাঁড়ায় ৫০ কোটি ডলার।

মাগুরছড়ার সাথেই লাউয়াছড়া জীববৈচিত্র্য সমৃদ্ধ বনে শত বছর ধরে বৃক্ষ লতাগুল্ম বেড়ে উঠা বিচিত্র বহু বর্ণের বন্য অর্কিড, পরগাছার নিবিড় সান্নিধ্যে মায়ামৃগ, ভাল্লুক, উল্লুক, মুখপোড়া হনুমান, চশমা পড়া বানর, চিতাবাঘ, মথুরা, বুনোমুরগী, ধানেশ, অজগর, দাঁড়াস, কেউটে, সুতানলী, ব্যাঙ গিরকিট, তক্ষক, পেঁচা আর নাম না জানা হাজারো কীটপতঙ্গ যার একটি বৃহদ অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় ১৯৯৭ সনে মাগুরছড়া দুর্ঘটনার দাবানলে। পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ফলে লতাম, গুল্ম, বহু উদ্ভিদ এবং বিভিন্ন কীট-পতঙ্গ ও ছোট প্রাণী হারিয়ে যাওয়ায় এখন পর্যন্ত বড় বড় প্রাণীগুলোকে খাবার সংকটে ভুগতে হচ্ছে।

দূর্ঘটনার দুই বছরের মধ্যে ফুলবাড়ি চা বাগানের ক্ষতিগ্রস্ত টি প্ল্যান্টেশন এলাকার ক্ষতিপূরণ, খাসিয়া পুঞ্জির ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ২ কোটি ৫ লাখ টাকা দাবির মধ্যে ৫০ লাখ টাকা ও বাস মালিক সমিতিকে ২৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। ২০০৮ সালে মাগুরছড়া ও লাউয়াছড়ায় শেভরন ত্রিমাত্রিক ভূতাত্ত্বিক জরিপ কাজ সম্পন্নকালে বিভিন্ন এলাকার ব্যাপক ক্ষতি হয়।

বন বিভাগের হিসাবমতে প্রত্যক্ষ ক্ষতি ৩২ দশমিক ৫৩ কোটি এবং অন্যান্য ক্ষতি মিলিয়ে মোট ১৭৬ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা। এই সময়ে পরিবেশ মন্ত্রণালয় পুরো হিসাব মিলিয়ে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬০৯ কোটি টাকা নিরূপণ করে অক্সিডেন্টালের কাছে দাবি জানায়। দুর্ঘটনার সময়ে তৎকালীন অওয়ামীলীগ সরকারের খনিজ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাহফুজুল ইসলামকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করার পর কমিটি ১৯৯৭ সালের ৩০ জুলাই মন্ত্রণালয়ে রিপোর্ট পেশ করেছিল। তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী অক্সিডেন্টালের দায়ীত্বহীনতাকেই দায়ী করা হয়।

মাগুরছড়া খাসিয়া পুঞ্জির মন্ত্রী জিডিসন প্রধান সুচিয়ান বলেন, এ ঘটনার মধ্যদিয়ে প্রাকৃতিক বনের যে কি পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে তা কেউ বুঝতে পারবে না। আমরা যারা এই বনে বসবাস করছি তা বুঝতে পারছি। সিলেট বিভাগীয় বন্যপ্রাণী বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বনের ১৭৭ কোটি টাকার ক্ষতি নিরূপন করে দেয়া হলে এ পর্যন্ত কিছুই পাওয়া যায়নি।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, মাগুরছড়া দুর্ঘটনায় শুধু পরিবেশের ক্ষতি হয়েছে ৬শ’ কোটি টাকা। ১৯৯৯ সালের আগষ্ট মাসে অক্সিডেন্টাল মাগুরছড়া গ্যাসকূপসহ তাদের ব্যবসা মার্কিনের অন্য কোম্পানী ইউনিকলের কাছে হস্তান্তর করে। ইউনিকল দায়িত্ব নেয়ার পর ক্ষতিপূরন বিষয়ে টালবাহানা শুরু করে। ২০০৮ সনের ত্রি-মাত্রিক ভূ-ত্বাত্তিক জরিপ অনুয়ায়ী কমলগঞ্জের পাত্রখোলা চা বাগান থেকে দেওড়াছড়া চা বাগান এলাকা পর্যন্ত ৯৫ শতাংশ, লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এলাকায় ৫ শতাংশ এলাকায় গ্যাস রয়েছে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির দেয়া এক রিপোর্টে জানা যায়, লাউয়াছড়া রিজার্ভ ফরেস্টের ৮৭ দশমিক ৫০ একর এলাকা গ্যাসের আগুনে ক্ষতি হয়। সম্পূর্ণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় ২০ দশমিক ৫০ একর এলাকা। ক্ষতির পরিমান ৫ কোটি টাকা। একইভাবে ৪১ দশমিক ৫০ একরের ২২ দশমিক ৮২৫ ঘনফুট গাছ-গাছালিরও আংশিক ক্ষতি ধরা হয়। সব মিলিয়ে পুড়ে যাওয়া গ্যাস, ক্ষতিগ্রস্থ বন ও পরিবেশের ক্ষয়ক্ষতি আদায়ে মার্কিন কোম্পানী সমূহের টাল বাহানায় মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণের ২২ বছরে ৩ কোম্পানির হাত বদলের মধ্য দিয়ে এখনও শেভরন পার্শ্ববর্তী স্থান থেকে গ্যাস উত্তোলন করলেও পুুরো ক্ষতিপূরণ আদায়ে কোন পদক্ষেপ আজও গৃহীত হয়নি।

বন্যপ্রাণি ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় বন কর্মকর্তা আবু মুসা সামসুল মোহিত চৌধুরী বলেন, মাগুরছড়া গ্যাসকূপ বিস্ফোরণে ক্ষতিপূরণ আদায় হয়নি। বন ও পরিবেশের এই ক্ষতিপূরণ আদায় হওয়া আমাদেরও দাবি।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।