Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৪ শ্রাবণ ১৪২৭, রবিবার ০৯ আগস্ট ২০২০, ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে হঠাৎ কেন গাত্রদাহ?


৩০ জুলাই ২০২০ বৃহস্পতিবার, ১০:৪৬  পিএম

শাহিদুল হাসান খোকন

বহুমাত্রিক.কম


ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে হঠাৎ কেন গাত্রদাহ?

বাংলাদেশ ও ভারতের শীর্ষ নেতৃত্ব যখন দুই দেশের মৈত্রীকে ইতিহাসের সর্বোচ্চ অবস্থায় দাবি করে আসছেন, ঠিক তখনই একটি পক্ষ এই সম্পর্ক বিষয়ক দূরভিসন্ধিমূলক প্রচারণায় নেমেছেন। কেউ গণমাধ্যমে মনগড়া রিপোর্ট আবার কেউ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা ইচ্ছে তাই লিখে যাচ্ছেন।
কয়েকদিন আগে একটি পত্রিকা হঠাৎ করেই বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে বললেন, ভারতের ঢাকায় নিযুক্ত হাইকমিশনার রিভা গাঙ্গুলী দাসকে সাক্ষাৎ দিচ্ছেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি লিখলেন, এই খবর পেয়েছেন ভারতীয় গণমাধ্যম থেকে। পরের দিন ভারতীয় একটি গণমাধ্যম সেই একই ধরনের খবর লিখল বাংলাদেশের সেই গণমাধ্যমকে সূত্র করে।

খবর নিয়ে জানা গেল ভারতের কোনো গণমাধ্যম এমন খবর বাংলাদেশের পত্রিকায় প্রকাশের আগে প্রকাশ করেনি। বাংলাদেশের ঐ গণমাধ্যমেও ভারতীয় কোনো মিডিয়ার নাম লেখেনি। স্বাভাবিক কারণেই ভারতের শীর্ষ কূটনৈতিক সংবাদদাতারা সূত্র খুঁজতে পাগল অবস্থা। যেহেতু আমি ভারতের শীর্ষ গণমাধ্যম পরিবারের সাথে কাজ করি সেহেতু আমার গণমাধ্যম সহ দিল্লির শীর্ষ স্থানীয় গণমাধ্যমের কূটনৈতিক সংবাদদাতারা একের পর এক ফোন করে যাচ্ছিলেন এ খবরের সত্যতা নিশ্চিত হবার জন্য। প্রথমে কথা বললাম ঢাকার ভারতীয় কূটনৈতিকদের সাথে। তারা জানালেন এটি একটি প্রোপাগান্ডা। হাইকমিশন এমন কোনো সাক্ষাতের জন্য অনুরোধ করেননি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্র গুলো থেকেও নিশ্চিত হওয়া গেল ভারতীয় দূতের পক্ষ থেকেও এমন কোনো অনুরোধ সেখানে যায়নি।

গত ৪ মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা করোনার কারণে ঢাকায় নিযুক্ত কোনো দূতাবাস প্রধান বা কর্মকর্তার সাথে সাক্ষাৎ দেননি। তাহলে কোথা থেকে এলো এই খবর? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এ নিয়ে বেজায় সরব। ভারত বিদ্বেষী গোষ্টী বেজায় খুঁজি ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ভেঙ্গে গেছে শুনে। ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের ঐ গণমাধ্যমের নাম লিখলেও বাংলাদেশের গণমাধ্যমটি এনিয়ে কোনো ব্যাখা দিলেন না। একটি উড়ো খবর মানুষের মাঝে ছড়িয়ে দিল বিভ্রান্তি।

ইকোনোমিক টাইমসসহ কয়েকটি গণমাধ্যম খবরটি বাংলাদেশ সরকার প্রত্যাখান করেছে বলে একটি খবর প্রকাশ করে ২৯ জুলাই। এর মধ্য দিয়ে সেই প্রোপাগান্ডার আগুণে পানি ঢালা হলেও আবার সেই একই গণমাধ্যমটি প্রকাশ করল আরেকটি দূরভিসন্ধিমূলক প্রতিবেদন। ভারত বাংলাদেশকে ১০ টি “পুরাতন” রেল ইঞ্জিন দিয়েছে- এমন একটি খবর প্রকাশ করে আবার উস্কে দেওয়া হলো ভারত বিরোধীদের।

গেল সোমবার পূর্বপ্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ভারত সরকারের পক্ষ থেকে ৫/৬ বছরের পুরান ১০ টি ইঞ্জিন বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করে ভারতীয় রেল কতৃপক্ষ। বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যমে খবর আসে ঈদ উপলক্ষে বাংলাদেশকে এই উপহার দিল ভারত। অনেক গণমাধ্যম এর প্রেক্ষাপট উল্লেখ করেও খবর করল।

সেখান থেকেই জানলাম, গত বছর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যখন ভারত সফর করেন তখন তিনি ভারতের রেল সেবার প্রশংসা করে বাংলাদেশ রেলওয়ের অপ্রতুলতার কথা উল্লেখ করেন। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ও রেল কতৃপক্ষ উপহার স্বরুপ বাংলাদেশকে ২০টি রেল ইঞ্জিন দেবার প্রতিশ্রুতি দেন। সেই প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবেই ঈদকে সামনে রেখে ভারত সরকার সোমবার ১০টি রেল ইঞ্জিন দেয় বাংলাদেশকে।

সবাই সংবাদটিকে পজেটিভ ট্রিটমেন্ট করলেও ঐ গণমাধ্যম হঠাৎ করেই সামনে তুলে আনে “পুরাতন ইঞ্জিনেরর বিষয়টি। খবরটি চোখে পড়ার পর খুবই মর্মাহত হলাম। তাহলে ভারত বন্ধুত্বের নামে এমন একটা “প্রতারণা” করল? দূতাবাসে খবর নিয়ে যা জানলাম- তাতে আরো বেশি দু:খ পেলাম এটা জেনে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ধারক দাবিদার গণমাধ্যমটি আর তার প্রো-ইন্ডিয়ানখ্যাত সম্পাদকের উদ্দেশ্যমূলক ভারত বিরোধীতার গল্প শুনে।

সকালেই ফোন করলাম দিল্লির এক কূটনৈতিককে। তিনি বললেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতবছর দিল্লি সফরকালে রেলের উন্নয়নে ভারত সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন। সে সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ২০ টি ব্যবহৃত রেল ইঞ্জিন উপহারের প্রতিশ্রুতি দেন। ভারতের পক্ষ থেকে বলা হয় এসব ইঞ্জিন ৫/৬ বছরের ব্যবহৃত হলেও বাংলাদেশ তা ২০/২৫ বছর ব্যবহার করতে পারবেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যে পেতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সে অনুযায়ী ঈদকে সামনে রেখে বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরুপ এই ১০ টি ইঞ্জিন পাঠানো হয়েছে। যার মধ্যে আর্থিক লেনদের কোনো বিষয় নেই, স্রেফ উপহার। কূটনীতিকের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই করতে ফোন করি প্রেসক্লাব অব ইন্ডিয়ার সাবেক প্রেসিডেন্ট গৌতম লাহিড়ীকে। যিনি বাংলাদেশ ও ভারতের গণমাধ্যমের সাথে দীর্ঘদিন ধরে সম্পৃক্ত রয়েছেন।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর দিল্লি সফরের সময় পুরো সফরটি যিনি কভার করেছিলেন। তিনি কূটনীতিকের বক্তব্যের সত্যতা স্বীকার করে দিলেন আরো তথ্য। এই ইঞ্জিনগুলো বাংলাদেশে আসার আগে বাংলাদেশ রেলওয়ের ইঞ্জিনিয়াররা সেখানে গিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে তার পর বাংলাদেশে আনার সম্মতি দিয়েছিলেন।

দুই রাষ্ট্রের প্রধান থেকে শুরু করে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিদের সামনে ঘটে যাওয়া একটা বিষয়কে নিয়ে তাহলে কেন দূরভিসন্ধিমূলক এই প্রচারণা? কেন বন্ধুপ্রতীম দুটি দেশের জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াতে হঠাৎ তারা ব্যস্ত হয়ে উঠলেন? নেপথ্যের সে কথা যা শুনলাম তা জনসম্মূখে এনে কাউকে বড় ছোট করতে চাই না। কারণ একজন প্রো ইন্ডিয়ান মাইন্ডের সম্পাদক (যিনি ভারতের নামেই এদেশে মোটাতাজা হয়েছেন বলে পরিচিত সর্বমহলে) হঠাৎ করে কেন ভারত বিরোধী হয়ে উঠলেন সেটা যে কারোই অনুমেয়। কেন তিনি তার মিডিয়ায় এসব দূরভিসন্ধিমূলক প্রচারণায় নামলেন তাও দ্রুত বেরিয়ে আসবে।

আমি শুধু জাতির জনক কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বলতে চাই, যে গোষ্ঠিটি ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আপনার সরকারের সাথে ভারতের সুসম্পর্ক বিনষ্ট করতে কাজ করেছিল সেই গোষ্ঠিটি আবার সক্রিয় কী না- সেটা এখন দ্রুত দেখার বিষয়। ঐ সময় বাংলাদেশের কিছু সংখ্যালঘু নেতা ভারত গিয়ে পাগল হয়ে গেল আপনার সরকারের বিরুদ্ধে হিন্দু নির্যাতনের কল্পকাহিনী নিয়ে।

ভারতকে তারা বুঝাল বিএনপি বা তাদের মিত্ররা ক্ষমতায় এলেও আপনার সরকারের চেয়ে তারা নিরাপদ থাকবে। বাংলাদেশের ডানপন্থী মিডিয়াগুলো সেগুলো ফলাও করে প্রচার করা শুরু করল। হামলে পড়ল ভারতীয় মিডিয়াও। কিন্তু সরকার থেকে আপনার চলে যাওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরা, এদেশের সংখ্যালঘুরা টের পেয়েছিল তখনকার সেই চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে আওয়ামী লীগ ও ভারতের তৎকালীন সরকার কি ভুল করেছিল!

গত ১১ বছরে আপনার উন্নয়ন, আপনার ক্যারিশমাটিক নেতৃত্ব যখন বিরোধী ষড়যন্ত্রকারীদের বিষ দাঁত ভেঙ্গে দিয়েছে তখন ঘর থেকে কাউকে দাড় করিয়ে দেওয়া হচ্ছে নাতো? প্রধানমন্ত্রী আমার শংকা হয়। কিছু মানুষের ব্যক্তিগত পাওয়া-না পাওয়ার বেদনায় দুটি বন্ধুপ্রতীম দেশের সুসম্পর্ক হঠাৎ করে বিতর্কিত করা হচ্ছে নাতো? নতুন করে বাংলাদেশে ২০০১ আগের সরকারের সময়ের সেরকম কোনো চক্র সক্রিয় হল কী না সেটা বের করা খুব দরকার।

পাদটিকা: গতকাল রাতে আমার এক সাংবাদিক বড় ভাই ফোন করেছিলেন। তিনি ফোনে বললেন- যখন একজন হিন্দু সম্পাদক ভারতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করল তুুমি মিয়া সে সময়ও ভারতের দালালি করেছো! বড় ভাইকে বললাম- মুক্তিযুদ্ধের সময় সংখ্যায় কম হলেও এদেশে হিন্দু রাজাকার ছিল। তারা তখন সমাজে প্রভাবশালী ও শিক্ষিত ছিলেন।

আমার পরিবারের কেউ তখন কোনো হিন্দু রাজাকারকে দেখে রাজাকারের খাতায় নাম লেখাননি। বঙ্গবন্ধুর ডাকে দেশ মাতৃকার মুক্তির সংগ্রামে একাত্মতা প্রকাশ করেছেন। ভারতে আশ্রয় নিয়ে পরিবারের অযোদ্ধা সদস্যরা খেয়ে পড়ে বেচে থেকেছেন দীর্ঘ ৮ মাস। জন্মের পর সে গল্প শুনেই বড় হয়েছি। বাড়ির দেওয়ালে বঙ্গবন্ধুর পাশে ইন্দিরা গান্ধীর ছবি টাঙ্গানো পরিবারে আমার জন্ম। যখন বুঝতে শিখেছি, তখন জেনেছি ৭১ এ ভারতের বন্ধুত্বের গল্প।

পরিবারের সেই শিক্ষা থেকেই বাংলাদেশ-ভারত বন্ধুত্বের চেতনা বয়ে বেড়াচ্ছি। প্রথমত আমি মনে করি বাংলাদেশটা আমার মা, আমি বাংলাদেশের দালাল। দ্বিতীয়ত ভারত আমার মাসী, আমি মায়ের পরে মাসীকেই ভালোবাসি। মাকে ভালোবাসার পর যতটুকু ভালোবাসা থাকে তা মাসীকেই দেই। এতে যদি কেউ ভারতের দালাল আমায় বলে তাতে আমার আপত্তি নেই। বড় ভাইকে এও বললাম যে, বাংলাদেশের স্বার্থে ভারতের পক্ষে কথা বলার একটি লোকও যদি থাকে তবে সেটা আমি!

তবে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের মানুষের আস্থার একমাত্র ঠিকানা জাতির জনক বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও এই নীতিতে আমার পাশে থাকবেন। আলোচিত মাগুরা উপ নির্বাচনের সেই স্কুল বয়সে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে আমার ছুঁয়ে দেখার সুযোগ হয়েছিল। মাথায় হাত রেখে তিনি যখন দোয়া করেছিলেন তখন উনাকে কথা দিয়েছিলাম, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের যুদ্ধে যতদিন তিনি ধরণীতে থাকবেন ততদিন পাশে থাকব।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নপূরণ, তার কন্যাদের ভালো রাখতে, দেশের মানুষকে ভালো রাখতে, দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখতে, ধর্ম নিরপেক্ষতাকে সমুন্নত রাখতে বাংলাদেশের মানুষের ভারতের সাথে সুসম্পর্ক রাখার কি কোনো বিকল্প আছে? বড় ভাই আমার এ প্রশ্নের কোনো উত্তর দেন নি!


লেখক : ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক কেন্দ্রের পরিচালক

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।