Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৩০ বৈশাখ ১৪২৮, বৃহস্পতিবার ১৩ মে ২০২১, ১১:১৯ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

প্রিন্স ফিলিপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ছয় অনুষঙ্গ


১৭ এপ্রিল ২০২১ শনিবার, ০৪:৫৯  পিএম

বহুমাত্রিক ডেস্ক


প্রিন্স ফিলিপের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ছয় অনুষঙ্গ

শনিবার বিকালে ডিউক অব এডিনবারার শেষকৃত্যের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নেয়া হয়ে গেছে। কারা কারা সেখানে অংশ নিচ্ছেন, কখন কি ঘটবে এর বাইরেও এই আয়োজনে অভিনব অনেক কিছুই রয়েছে। রাজকীয় কর্মকাণ্ড যারা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করেন না, তাদের বোঝার সুবিধার জন্য ডিউকের অন্তোষ্টিক্রিয়ার কিছু বৈশিষ্ট্যের ব্যাখ্যা এখানে দেয়া হলো।

প্রিন্স ফিলিপের ল্যান্ড রোভার

এটি একটি শক্ত বাহন, যা মূলত ব্রিটিশ সেনাবাহিনী ব্যবহার করে থাকে। তবে ডিউক নিজে বহু দশক ধরে তার প্রিয় এই গাড়িটি ব্যবহার করেছেন। সুতরাং যখন শেষকৃত্যের পরিকল্পনা করা হয়, তখন এই ল্যান্ড রোভার গাড়িটিরও সেখানে স্থান করে দেয়া ছাড়া বিকল্প কিছু ছিল না।

ল্যান্ড রোভার ডিফেন্ডার টিডিফাইভ ওয়ান থার্টি মডেলের এই গাড়িটি ১৬ বছর ধরে পরিবর্তন-পরিমার্জন করে ব্যবহার করেছেন ডিউক। ২০০৩ সালে কোম্পানির সোলিহল কারখানায় এই গাড়িটি তৈরি করা হয়েছিল। সেই বছর ডিউকের বয়স ছিল ৮২ বছর, যখন প্রথম তিনি গাড়িটি নিজের পছন্দ মতো সাজাতে শুরু করেন। গাড়িটিতে সর্বশেষ পরিবর্তন আনেন ২০১৯ সালে, যখন তার বয়স ৯৮ বছর।

ডিউকের অনুরোধে এই বাহনটিকে সামরিক বাহিনীর মতো সবুজ রঙ করা হয়। তিনি গাড়িটির ওপরের সামনের অংশটিকে তার কফিন বহন করার মতো করে নতুনভাবে নকশা করেন। এর আগে রাজকীয় যেসব অন্তোষ্টিক্রিয়া হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা করলে, শোকগম্ভীর এই শেষ যাত্রায় সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের দিকে এগিয়ে যাওয়া ভারী এই বাহনটিকে ব্যতিক্রমী মনে হতে পারে।

বছর জুড়ে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, নিজের বর্ণাঢ্য অন্তোষ্টিক্রিয়ার বিষয়ে আলোচনা করতে গিয়ে প্রিন্স ফিলিপ নাকি একবার রানিকে মজা করে বলেছিলেন, ‘আমাকে একটা ল্যান্ড রোভার গাড়ির পেছনে ঢুকিয়ে উইন্ডসরের দিকে চালিয়ে নিয়ে যেও।’

যদিও কোভিডের কড়াকড়ির কারণে সেন্ট্রাল লন্ডন থেকে উইন্ডসরের দিকে কোন শোকযাত্রা হবে না। ডিউক আগে থেকেই উইন্ডসরে শায়িত আছেন, তবে তার শেষ ইচ্ছার কিছু অংশ অন্তত পূর্ণ হতে যাচ্ছে।

সরকারি বেন্টলি

যদিও রাজকীয় পরিবারের অনেক সদস্য ল্যান্ড রোভারের পেছনে হেঁটে যাবেন, তবে রানি যাবেন বেশ আলাদা ধরনের একটি বাহনে- বেন্টলি স্টেট লিমোজিন। এই গাড়িটি ২০০২ সালে সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে রানিকে উপহার দেয়া হয়েছিল - যা সাধারণভাবে স্টেট বেন্টলি নামে পরিচিত।

গাড়িটির পেছনের দরজার নকশা এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে রানি গাড়ি থেকে নামার আগে সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন, যার ফলে রাজকীয় সফরের সময় রানি যথাযথ মর্যাদার সঙ্গে গাড়ি থেকে নামতে পারেন। বেন্টলির তথ্য অনুযায়ী, দুই বছর ধরে গাড়িটি নির্মাণের সময় রানি এবং ডিউক নিয়মিতভাবে নির্দেশনা দিয়েছেন।

বুলেট-প্রুফ এবং বায়ু চলাচল নিয়ন্ত্রিত এই গাড়িটি চালক ও যাত্রীদের সুরক্ষায় সক্ষম। গাড়ির পেছনের দিকে অস্বচ্ছ প্যানেল রয়েছে, যা প্রয়োজনে যাত্রীদের গোপনীয়তা দিতে পারবে। গাড়ির বাইরের অংশটি রাজকীয় রক্তবর্ণ রঙ এবং কালো রঙে আঁকা হয়েছে, পাশে নিচের দিকে লাল ফিতে রয়েছে।

এই লিমোজিন গাড়িটি ঘণ্টায় ১৩০ মাইল বেগে (২০৯ কিলোমিটার) চলতে সক্ষম। গাড়ির চাকার টায়ারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে যাতে পাঙ্কচারের ঝুঁকি কমাতে পারে। যদিও শনিবার উইন্ডসর ক্যাসেলে এই গাড়িটিকে হাঁটার গতিতে মাত্র কয়েকশো গজ অতিক্রম করতে হবে।

রাজকীয় ভল্ট

ডিউককে উইন্ডসরের সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের নীচে রাজকীয় ভল্টের ভেতরে সমাহিত করা হবে, সেখানেই অন্তোষ্টিক্রিয়ার কার্যক্রম সম্পন্ন করা হবে। তার কফিন যখন রাজকীয় ভল্টের ভেতরে নামানো হবে তখন ডিউকের ইচ্ছা অনুযায়ী সশস্ত্র শ্রদ্ধা জানানো হবে।

চ্যাপেলের বিভিন্ন অংশে ৪৪ জন রাজকীয় ব্যক্তিত্বের কবর রয়েছে, যাদের মধ্যে রয়েছেন অষ্টম হেনরি, যিনি ১৫৪৭ সালে মারা গিয়েছিলেন। সেখানে আরও রয়েছেন, প্রথম চার্লস, যাকে ১৬৪৯ সালে শিরশ্ছেদ করা হয়েছিল, অষ্টাদশ থেকে বিংশ শতাব্দীর রাজা তৃতীয় জর্জ, চতুর্থ জর্জ এবং পঞ্চম জর্জ।

২০০২ সালে ৭১ বছর বয়সে মারা যাওয়া রানির ছোট বোন প্রিন্সেস মার্গারেটের মৃতদেহ দাহ করা হয়েছিল, সেই ছাইও প্রথমে রাজকীয় ভল্টে রাখা হয়েছে। তবে কয়েক সপ্তাহ পর তা রাজা চতুর্থ জর্জ মেমোরিয়াল চ্যাপেলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়- যখন তার মা, কুইন মাদার মারা যান এবং তার স্বামী রাজা চতুর্থ জর্জের পাশে কবর দেয়া হয়।

তবে প্রিন্স ফিলিপের আত্মীয়স্বজনের মধ্যে শুধুমাত্র প্রিন্সেস মার্গারেটই এমন নন, যাকে প্রথমে কবর দেয়ার পরে আবার সরিয়ে নেয়া হয়েছে। প্রিন্স ফিলিপের মা, ১৯৬৯ সালে মারা যাওয়া প্রিন্সেস এলিসের মরদেহ রাজকীয় ভল্টে কবর দেয়া হলেও ১৯৮৮ সালে তার দেহাবশেষ জেরুজালেমে সরিয়ে নেয়া হয়। কারণ তিনি বেঁচে থাকার সময় এই অনবরোধ করে গিয়েছিলেন। রাজকীয় ভল্ট, যেখানে অষ্টম হেনরি, প্রথম চার্লস, বিংশ শতাব্দীর রাজা তৃতীয় জর্জ, চতুর্থ জর্জ এবং পঞ্চম জর্জের কবর রয়েছে। 

গার্টার কিং অব আর্মস

ডিউকের কফিন রাজকীয় ভল্টে নামানোর পর গার্টার কিং অব আর্মস - যিনি রাজা বা রানিকে পতাকা, অনুষ্ঠানাদি ও প্রতীক ব্যবহার সম্পর্কে পরামর্শ দিয়ে থাকেন - তিনি ডিউক অব এডিনবারার ‘শৈলী ও পদবি’ ঘোষণা করবেন।

এর মানে হলো, তিনি ডিউকের পুরো পদবি পড়ে শোনাবেন, যা ১৩৩ অক্ষর লম্বা। সেই সঙ্গে থাকবে তার অন্যান্য দায়-দায়িত্বের বর্ণনা, যেমন আর্ল অব মেরিওনেথ এবং ব্যারন গ্রিনিচ। সেই সঙ্গে তাকে সম্বোধন করার ধরনও তুলে ধরবেন- যেমন ডিউক অব এডিনবারাকে ডাকা হতো `ইয়োর রয়্যাল হাইনেস` অথবা `হিজ রয়্যাল হাইনেস`।

অর্ডার অব গার্টার থেকে নাম বেছে নেবেন গার্টার কিং অব আর্মস, যা কিং আর্থার এবং নাইটস অব রাউন্ড টেবিল থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অষ্টম এডওয়ার্ডের সময় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবে গার্টার কিং অব আর্মসের বেতন ভাতা ঠিক রাজপুত্রদের মতো নয়।

বর্তমান দায়িত্বশীল ব্যক্তি থমাস উডকক আনুষ্ঠানিকভাবে বেতন পান বছরে ৪৯.০৭ পাউন্ড। প্রথমে বেশ বড় অংকের বেতন নির্ধারণ করেছিলেন রাজা প্রথম জেমস, তবে ১৮৩০ সালের দিকে রাজা চতুর্থ উইলিয়াম তা কমিয়ে দেন।

দ্য ব্রিলিয়ান্ট স্টার অব জান্জিবার এবং অন্যান্য মেডেল

সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের বেদিতে নয়টি কুশন থাকবে, সেখানে ডিউকের পাওয়া পদক এবং অলঙ্কার প্রদর্শন করা হবে। নিজের অন্তোষ্টিক্রিয়ার বিস্তারিত পরিকল্পনা করার সময় তিনি এসব পদক বাছাই করে দিয়ে গেছেন।

রাজদণ্ড, অর্ডার অফ দি ব্রিলিয়ান্ট স্টার অব জান্জিবার, দি ব্রুনেই এস্টিমড ফ্যামিলি অর্ডার, দ্যা সিঙ্গাপুর অর্ডার অফ দারজাহ উতামা তেমাসেকওয়ের- এসব কুশনে মাছের তার দিয়ে সেলাই করা থাকবে।

ধারণা করা হয় যে, ডিউক ৫০টির বেশি দেশ থেকে পদক ও উপাধি পেয়েছেন। চ্যাপেলের বেদিতে তার সবগুলো প্রদর্শন করার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। সেন্ট জর্জেস চ্যাপেলের বেদিতে নয়টি কুশন থাকবে, সেখানে ডিউকের পাওয়া পদক এবং অলঙ্কার প্রদর্শন করা হবে।

পেজেস, সাজভৃত্য এবং সুরক্ষা

রাজকীয় পরিবারের সদস্যরা আস্তে আস্তে কফিন অনুসরণ করবেন, যাদের মধ্যে থাকবেন রানির চার সন্তান, ডিউক অব কেমব্রিজ এবং ডিউক অব সাসেক্স। ডিউকের পারিবারিক অন্য সদস্যরা তাদের পেছনে থাকবেন, যাদের মধ্যে রয়েছেন উইন্ডসর প্রাসাদের ঘনিষ্ঠ ভৃত্যরা, যারা তাদের ব্যক্তিগত কক্ষে কাজ করেছেন, তাদের খাবার এবং পানি দিয়েছেন।

একজন ব্যক্তিগত সুরক্ষা কর্মকর্তা এবং ডিউকের ব্যক্তিগত সচিব, ব্রিগেডিয়ার বেকওয়েল - যিনি এক দশকের বেশি সময় ধরে তার ডান হাত হিসাবে কাজ করেছেন- তিনিও এই শোক মিছিলে থাকবেন।

বিবিসি বাংলা’র সৌজন্যে 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।