Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১০ চৈত্র ১৪২৫, সোমবার ২৫ মার্চ ২০১৯, ১:৪১ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

‘প্রতিভার বিকাশের চেয়ে বিনাশটাই হচ্ছে বেশি’


০৪ মার্চ ২০১৯ সোমবার, ০১:২২  পিএম

আশরাফুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


‘প্রতিভার বিকাশের চেয়ে বিনাশটাই হচ্ছে বেশি’

সংবাদপত্রে পেশাদারিত্ব ও নৈতিকতার সংকট প্রকট হয়ে উঠছে উল্লেখ করে কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক পদ্মনাভ অধিকারী বলেছেন, বর্তমানে বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় প্রতিভার বিকাশের চেয়ে বিনাশটাই বেশি হচ্ছে। গণমাধ্যম সম্পাদকদের দলীয় লেজুড়বৃত্তি ও বৈষয়িক আকাঙ্খাই এর জন্য দায়ী বলে মনে করেন তিনি। একইসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মৌলিক গবেষণা বাড়ছে না বলেও আক্ষেপ জানিয়েছেন তিনি।

সম্প্রতি যশোহর শহরের কেশবলাল রোডে সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ‘কারুকাজ’ এ বহুমাত্রিক.কম-কে প্রদত্ত এক একান্ত সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানান পদ্মনাভ অধিকারী। ১৯৫৮ সালে যশোহরের বকচরে জন্ম নেওয়া নিভৃতচারী এই কবি ও গবেষক চার দশক ধরে তাঁর লেখনি চালিয়ে যাচ্ছেন। সমাজের অসাম্য ও অসঙ্গতিকে তুলে ধরে মানবিক স্বদেশ গড়ার প্রত্যয়ে এ পর্যন্ত কবিতা, গল্প, প্রবন্ধ, গবেষণাসহ প্রায় ৬শ’ লেখা প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে।

সাহিত্যচর্চার স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন খুলনার মোহনা সাহিত্য ও সমাজ কল্যাণ সংগঠনের সম্মাননা (২০০৩), সিরাজগঞ্জের ক্যাপ্টেন মনসুর আলী সাহিত্য পরিষদ কর্তৃক আজীবন সম্মাননা(২০১২)।
রূপায়ন সম্প্রদায় সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদ ও বিদ্রোহী সাহিত্য পরিষদের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা তিনি। সম্পৃক্ত আছেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত গবেষণা ফাউণ্ডেশনসহ বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের সঙ্গে।

কবি পদ্মনাভ অধিকারীর সঙ্গে কথা বলেছেন বহুমাত্রিক.কম এর প্রধান সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম। সাক্ষাৎকারের চুম্বকাংশ এখানে প্রকাশিত হচ্ছে-

বহুমাত্রিক.কম: সাহিত্যচর্চা-গবেষণায় যুক্ত হলেন কিভাবে?

পদ্মনাভ অধিকারী: ১৯৭৬ সালে সেজোভাই সুসাহিত্যিক ডা. মধুসূদন অধিকারীর কাছেই আমার সাহিত্যচর্চার হাতেখড়ি। সেখান থেকে লেখালেখির শুরু। পরবর্তীতে ১৯৮২ সালে স্বর্ণশিষ সাহিত্য-গবেষণা পরিষদের সঙ্গে যুক্ত হই। এর প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক হচ্ছেন এ বি এম আশরাফুজ্জামান। এর কাজ হচ্ছে ব্রিটিশের সময়ের যশোর, অর্থাৎ বৃহত্তর যশোরের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি, সমাজসেবা, ক্রীড়া-এগুলোর ওপর গবেষণা ও তথ্যানুসন্ধান করা।

এ পর্যন্ত যাঁরা এবিষয়ে অবদান রেখে আসছেন সেগুলোকে ধরে রাখা গ্রন্থাকারে। যাতে এই গ্রন্থটা ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আকরগ্রন্থ হিসেবে কাজে লাগে। যাঁরা গবেষণা করবেন তাদের কাজে লাগবে। আমরা কাজ করেছি বাংলা সাহিত্যে যশোহরের অবদান, বাংলাসাহিত্যে যশোহরের লোককবি, বাংলাসাহিত্যে যশোহরের ঐতিহ্য প্রভৃতি বিষয়ে।

এখন আমরা সমগ্র বাংলাদেশে বিভাগে ও জেলা পর্যায়ে গিয়ে গিয়ে কাজ করছি, চার বছর ধরে তথ্য সংগ্রহ করেছি। বাংলাদেশে রাজনীতি, সমাজসেবা ও চিকিৎসায় যাঁরা অবদান রেখেছেন, পাশাপাশি আঞ্চলিক গবেষণায় যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাদের জীবন ও কর্মের ওপর এই গ্রন্থ।

বহুমাত্রিক.কম: আপনার জীবনের যে অন্বেষণ বা সাধনা তা পুরোপুরি সাহিত্য ও গবেষণায় সমর্পিত। কখন থেকে আপনি স্থির করলেন, জীবনের এই লক্ষ্য?

পদ্মনাভ অধিকারী: দেখুন আমি যখন ১৯৮২ সালে স্বর্ণশিষ সাহিত্য ও গবেষণা পরিষদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হই, এর আগে আমাদের নিজস্ব যে সাহিত্য ও গবেষণা বিভাগ রূপায়ন সম্প্রদায় সাহিত্য ও গবেষণা সংসদের সঙ্গে আমি ও আমার দাদা ডা. মধুসূদন অধিকারী প্রতিষ্ঠাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত হই। তখন আমরা অনুভব করলাম-আমরা যাঁরা এই কাজে সম্পৃক্ত হয়েছি-আমরা যদি ঘরসংসার করি তবে এই কাজটা করা সম্ভব না। এই কাজ করতে গেলে ঘর থেকে বের হতে হয়..রাতদিন ঠিক থাকে না, টাকা-পয়সারও সেরকম হিসেব নেই..। ঘর সংসার করতে গেলে তো দায়িত্ব থাকে, সেই দায়িত্ব পালন করা সম্ভব না। এ কারণে আমরা সবাই, যাঁরা আমরা এ কাজে জড়িত কেউই বিয়ে থা করি নাই। আশরাফুজ্জামান ভাই করেননি, ফকু ভাই আমাদের থেকে ১৫-২০ বছরের বড়, তিনিও করেননি। নিবেদিত হতে না পারলে কাজ হয় না, আর সংসার করলে তা সম্ভব নয়। এ কাজ করতে গেলে ঘর ঠেকানো সম্ভব নয়।

বহুমাত্রিক.কম: আপনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক। আপনি এসবের মধ্যে কী অন্বেষণ করতে চান?

পদ্মনাভ অধিকারী: সত্যিকারর্থে আমাদের দেশের মানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের যা কিছু অসঙ্গতি তার বিরুদ্ধে লেখালেখিটাই আমার লক্ষ্য। আমি দেশকে বুঝি, রাষ্ট্রকে বুঝি; আমি কোনো ধর্ম-কোনো গোত্র, কোনো রাজনীতি-দল বুঝি না। যাঁরাই ক্ষমতায় বসুক না কেন আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু তাদের দ্বারা যদি এই দেশ, এই জাতি, এই সমাজ ক্ষমতিগ্রস্ত হয়-এটি আমি মানতে রাজি নই কোনো অবস্থাতেই। এ কারণেই আমি সব ধরণের অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লিখি।

বহুমাত্রিক.কম: যে অঞ্চলে আপনার জন্ম, বেড়ে উঠা, সেটি অত্যন্ত সম্বৃদ্ধ একটি জনপদ। বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্য-রাজনীতির বিষয়ে। যশোহরকে আপনি কিভাবে দেখেন, কিভাবে বর্ণনা করবেন?

পদ্মনাভ অধিকারী: রাজনীতি ও সংস্কৃতির সুতিকাগার বলা হয় যশোহরকে। ব্রিটিশ সময়ে যশোহরের যে ইতিহাস-ঐতিহ্যের কথা জানি, এখন কিন্তু আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। কারণ আমরা সেই আন্তরিকতার সঙ্গে আর কাজ করছি না। আমরা আমাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে এগিয়ে নিতে পারছি না। তার পেছনে কিছু কারণ আছে। ব্রিটিশ সময়ে দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে দেশটা যখন ভাগ হয় তখন এখানকার প্রতিষ্ঠিত যাঁরা ছিলেন, পৃষ্ঠপোষকতা করতেন-রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন, তাঁরা ভারতে চলে গেছেন। অনেক লোক আসছেন। শুধু তাই না, এই যশোহরে অন্যান্য বিভাগের লোকরা এসে নিবাস গড়েছেন। বিধায় ঐক্যটা এখানে কম।

শিল্প-সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক অনেক কমে গেছে। আমরা এখানে ‘বিদ্রোহী’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করি প্রতি বছর। এটি বের করতে আমাদের অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়। অনেকের কাছে যাই, সহযোগিতার হাত বাড়ানোর লোক এক দু’জন পাওয়া যায়। এই যশোহরে বহু শিল্পপতি আছেন হাজার কোটি টাকার মালিক, তারা আমাদের সহযোগিতার হাত বাড়ান না। এই সমস্ত কারণে আমরা পেছাচ্ছি। এখানে যে কয়টি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আছে, অনেক ছেলেমেয়ে যাচ্ছে-আসছে; গান শিখছে, তবলা শিখছে, নাচ শিখছে কিন্তু ‘থোড় বড়ি খাড়া: খাড়া বড়ি থোড়’ এরকম একটা পরিস্থিতি। তার কারণ যে কয়েকজন শিক্ষক এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষকতা করেন, এখানে প্রতিযোগিতা-প্রতিদ্বন্ধিতা নেই বললেই চলে। যেকারণে কোনো কোয়ালিটি বা কোয়ান্টিটি বের হচ্ছে না-যাঁরা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিনিধিত্ব করতে পারে। তাই আমরা অনেক পিছিয়ে গেছি। আর রাজনীতিতে দল বদলের যে একটি বাজে প্রথা শুরু হয়েছে, এ কারণে আরও পেছাচ্ছি। সবচে বড় কথা হচ্ছে যে রাজনীতি আগে হতো জনসাধারণের জন্য, দেশের জন্য।

এখন টাকা দিয়ে নমিনেশন নিয়ে একবার এমপি-মিনিস্টার হয়, সে আগে তার আখের গোছায়। দেশ জাতির কথা ভাবে না। উন্নয়নের কথাও ভাবে না। আর আদর্শ তো নেই বললেই চলে। তার কারণ হচ্ছে আমরা ব্রিটিশ সময়ে বা তারও আগে থেকে দেখে আসছি, একজন রাজনীতিক দেশের জন্য-মানুষের জন্য নিবেদিত থাকতেন। তারা আদর্শকে ধারণ করে স্বদেশের ইতিহাস-ঐতিহ্যকে লালন করতেন। বর্তমানে যে আওয়ামীলীগ করছেন, আগামীতে তাকেই দেখছি বিএনপি করছেন। তারপরে দেখছি তাদেরই একজন আবার জাতীয় পার্টি করছেন। রাজনীতিতে নীতির এইযে স্খলন, এই স্খলনের কারণেই আমাদের যতো সমস্যা।

বহুমাত্রিক.কম: সমকালীন সাহিত্যচর্চা বা গবেষণাকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করবেন? এটি কী একধরণের স্থবির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে-

পদ্মনাভ অধিকারী: যদি আমরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দিকে তাকাই, দেখবো যাঁরা গবেষণা করে সনদ নিয়ে এসে চাকুরিতে যোগ দিয়েছেন-তারা কিন্তু কোনো গবেষণা করছেন না। এ কারণেই বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এতো পেছনে। আন্তর্জাতিকভাবে আগে বলা হতো প্রাচ্যের অক্সফোর্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সেই বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষকরা আগের মতো গবেষণা করেন না। দু’চার জন যাঁরা এখনো কাজ করছেন, সেটাও যদি লক্ষ্য করি দেখবো ব্যক্তিগত স্বার্থের জন্যই করছেন।

আমরা যদি পেছনের দিকে তাকাই দেখবো ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছেলেমেয়েদের শিক্ষার উন্নয়নের জন্য অনেক গ্রন্থের অনুবাদ করে দিয়েছেন। আমরা এখানো পড়ে সম্বৃদ্ধ হই। তৎকালীন সময়ের লেখাপড়ার সঙ্গে বর্তমান লেখাপড়ার অনেক পার্থক্য দেখবো। তার মানে এই নয় যে, একদম কিছু হচ্ছে না। তবে যেমন হওয়ার কথা ছিল তেমন হচ্ছে না। দরকার ১০০ ভাগ, হচ্ছে ১৫-২০ ভাগ। আমি মনেকরি এই ব্যাপারে ব্যক্তিস্বার্থকে গুরুত্ব না দিয়ে দেশ এবং জাতির কথা ভেবে যদি এগিয়ে আসেন বোদ্ধারা তবে আমাদের সাহিত্য ও গবেষণা আরও এগুতে পারে।

বহুমাত্রিক.কম: আমরা জানি যে, সাহিত্য হচ্ছে সত্যভাষণ। সাহিত্যের মধ্য দিয়ে মানুষ তার অভিপ্রায়কে সত্যভাষণকে তুলে ধরবে, তুলে ধরবে সমাজের বৈষম্য-অনাচারকে। যুগ যুগ ধরে সাহিত্য এই বার্তাই আমাদের দিয়ে আসছে। কিন্তু সমকালীন সাহিত্য চিরায়ত এই আবেদনকে তুলে ধরতে পারছে না। বাংলা সাহিত্যের বহু কালজয়ী গ্রন্থ প্রকাশকালে বাজেয়াপ্ত হয়েছিল। বর্তমানে এই উদাহরণ নেই বললেই চলে। তার মানে কী সাহিত্যিকরা আপোষ করছেন?

পদ্মনাভ অধিকারী: লক্ষ্য করলে দেখবো বর্তমানে প্রতি সপ্তাহে বা মাসে দৈনিকের যে সাময়িকীগুলো বেরুচ্ছে তাতে দেশের লেখকদের লেখা তেমন গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। বিদেশি লেখকদের অনুবাদটাই আসছে। সেই অনুবাদগুলোও যে কোন পর্যায়ের কাজ বলা মুশকিল। বলা মুশকিল একারণে বলছি-তার মানটার কথা। যাঁরা করছেন তারা কতখানি সেই ভাষা বোঝেন? আমরা দেখছি ব্যক্তিগত স্বার্থ চরিতার্থ করতে ব্যস্ত সবাই। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, আমরা তাদের কাছ থেকে যেন আনুকূল্য পাই, সেইমতো করে আমরা লেখালেখি করি। প্রকৃতঅর্থে যে কথা বললাম যে আমি অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লিখি। যে সরকার, যে দল থাকুন না কেন, আমার কিছু যায় আসে না। আমি দেশ বুঝি-জাতি বুঝি, সময়কে বুঝি, আমার সমাজকে বুঝি-সেই চিন্তাভাবনার লেখক-লেখা আমরা পাচ্ছি না।

বহুমাত্রিক.কম: সব কিছু তো মানুষের জন্য, সমাজ-সভ্যতার জন্য। তাহলে মানুষের কষ্ট, মানুষের দুঃখ দুর্দশা, হাহাকার সেভাবে কেন চিত্রায়িত হচ্ছে না সাহিত্যে?

পদ্মনাভ অধিকারী: তেমন হচ্ছে না। একদম হচ্ছে না বলা যাবে না। শতভাগের মাঝে দু’চারভাগ হচ্ছে। এটি ধরার মধ্যে পড়ে না। আবার সেটাকে গুরুত্ব দিয়ে সেইভাবে প্রচার-প্রসারও হচ্ছে না। আমাদের মধ্যে একটি মানসিকতা গড়ে উঠেছে, ‘কী দরকার এসব করার-আমার সুবিধাটা পেলেই হলো’। অলিখিতভাবে আত্মসমর্পণ বা ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থের মানসিকতার কারণেই আমাদের সাহিত্য সেভাবে সৃষ্টি হচ্ছে না।

বহুমাত্রিক.কম: আপনি বিগত তিন-চার দশক ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত। সে সম্পর্কে যদি কিছু বলেন-

পদ্মনাভ অধিকারী: যখন আমি বুঝি এই বিষয়ে আমার কিছু করা প্রয়োজন তখনই আমি কাজটা করি। গতানুগতিকভাবে অনেকে অনেক কাজ করছেন আর্থিক আনুকূল্য পেয়ে। যেমন আমি ইশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জীবন ও কর্র্মের ওপর কাজ করেছি। ফররুখ আহমেদ, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, লালন শাহ’র ওপর কাজ করেছি। আমি স্বপ্রণোদিত হয়েই কাজগুলো করেছি, আমাকে কেউ উৎসাহিত করেনি। আগামী যখন আমার মনে হবে এই কাজটি করার দরকার-আমি করবো। আমার চিন্তা ভাবনাটাই এরকম। আমি কোনো ফরমায়েশি কাজ করতে চাই না।

বহুমাত্রিক.কম: যদ্দূর জানি, আপনি অনেকগুলো সাময়িকপত্র সম্পাদনার সঙ্গেও যুক্ত। একসময় এই সাময়িকপত্র ও আঞ্চলিক সংবাদপত্রগুলো উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিলো। যশোহরের ঝিকরগাছার অমৃতবাজার থেকে অমৃতবাজার পত্রিকার উদ্ভব হয়েছিল, পরবর্তীতে এটি উপমহাদেশের সংবাদপত্রের চরিত্রকে বদলে দিয়েছিল। এবং ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনেও ভূমিকা রেখেছিলো। এখনকার সাময়িকপত্র ও আঞ্চলিক সংবাদপত্র সেই ভূমিকা কেন রাখতে পারছে না?

পদ্মনাভ অধিকারী: যদি বলি এখন সেই অর্থে বাংলাদেশে সংবাদপত্র নেই, লোকে বলবে পাগল। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, দেশে এখন এতো সংবাদপত্র বেরিয়েছে যে একজন কালো টাকার মালিকও সংবাদপত্রের কর্ণধার। একজন ভূমিদস্যু, ব্যাংকের অর্থ আত্মসাৎকারীরও টেলিভিশন চ্যানেল বা সংবাদপত্র রয়েছে। এখন যাঁরা সাহিত্যপত্রিকা বের করছেন, তারা একটি উদ্দেশ্য নিয়ে করছে। তাদের বিবেচনা হচ্ছে-বিজ্ঞাপন আসবে। যে সাহিত্যের পাতার সম্পাদক সে বিজ্ঞাপন যোগান দিবে। কিভাবে যোগান দেবে সেটা তার দায়িত্ব! সেক্ষেত্রে সাহিত্য পাতার দায়িত্বে যে আছেন-তিনি সাহিত্যচর্চায় কতটা পটু সেটি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে না। যে কারণে ঢাকায় থাকা একজন তরুণ যার মালিকপক্ষের সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে, সে দায়িত্ব পেয়ে যাচ্ছেন।

যখন মালিক বলছে তোমার দায়িত্ব তুমি বের করে নাও-তখন সে কী করবে? যাঁরা পয়সা দিয়ে লেখা ছাপতে চায়, সে অলেখা হোক, অলেখক হোক-তাদেরকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ওই কাগজের সম্পাদক হিসেবে যাঁরা আছেন, বিশেষ করে সাহিত্য পাতার; তাঁরা তাদের বন্ধু-সমবয়সিদের প্রধান্য দেন বেশি। অর্থাৎ একজনকে পাঁকড়াও করে সুবিধাটা নিয়ে অলেখক হলেও তাদের লেখা প্রকাশের সুযোগ দিচ্ছে। মফস্বল থেকে যাঁরা লেখা পাঠাচ্ছেন, যাঁরা সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগ করলো না, তাদের লেখা ছাপানো হয় না বললেই চলে। সেই কারণে মফস্বল থেকে যাঁরা কাজ করছেন আন্তরিকতা দিয়ে, তাদের কর্ম দেশের মানুষের কাছে পৌছাচ্ছে না। শুধুমাত্র এই মতলববাজ সম্পাদকদের কারণে। তারা অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিভাবে হবে তা নিয়েই ব্যস্ত।

প্রতি সপ্তাহে দৈনিকগুলোর সাহিত্য পত্রিকা দেখলেই তা বোঝা যাবে। সে কারণেই বলছি, আমাদের দেশে প্রতিভার বিকাশের চেয়ে বিনাশটাই হচ্ছে বেশি। প্রতিভার বিকাশের কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রতি সপ্তাহে যেসব সাহিত্য পত্রিকা বের হয়, সেসব পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে- কী ধরণের লেখা বের হচ্ছে। যে লিখছে তার মান কোন পর্যায়ের; তারই ভিত্তিতে যদি আমরা নির্ণয় করি কোন লেখাগুলো মান সম্পন্ন। বছর শেষে এই লেখাগুলোকে যদি পুরষ্কৃত করা হয়, জাতীয় পর্যায়ে এনে সম্মাননা দিই, তবে তারা উৎসাহিত হন। আমি মনের তাগিদে লিখি, তা সত্ত্বেও যদি আমাকে সম্মানিত করা হয়, তবে উৎসাহিত হবো। আমাদের দেশে প্রতিভার বিকাশের কাজটি খুবই জরুরি।

বহুমাত্রিক.কম: আপনি লক্ষ্য করবেন, সমাজের সব ক্ষেত্রে মূল্যবোধের স্খলন। এর থেকে উত্তরণের পথ কী?

পদ্মনাভ অধিকারী: সত্যিকারর্থে মানবিকতা, মানবীয় মূল্যবোধ-আমাদের মাঝে নেই বললেই চলে। কারণ হচ্ছে আমরা রাজনৈতিকভাবে আলাদা আলাদা গোত্রের লোক হয়ে যাচ্ছি। যখন যে গোত্রের মানুষ ক্ষমতায় আসছেন, তখন তাদেরই গুণগান করে আমরা সুযোগ-সুবিধাটা নিচ্ছি। এর বাইরে যাঁরা তারা নিগৃহীত হচ্ছেন। রাজনৈতিক সংকীর্ণতার কারণে।

বহুমাত্রিক.কম: কেবল কী রাজনৈতিক স্খলন-গণমাধ্যমগুলো কী মূল্যবোধ গঠনে কোনো ভূমিকা রাখছে?

পদ্মনাভ অধিকারী: সচেতনতা তৈরি কথা বলে যা দেখানো হচ্ছে, আমরা যাঁরা এটি গ্রহণ করবো-এখানে বোধের একটি পার্থক্য রয়েছে। আপনি যখন দেখলেন, একটি শিশু একজন বৃদ্ধকে রাস্তা পার করে দিচ্ছে, আপনি হাস্যকরভাবে নিতে পারেন। আমি কিন্তু সিরিয়াস ভাবে নিচ্ছি। শিশুটির মাঝে এতো মানবিক মূল্যবোধ আছে। সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য তার যে একটি ভূমিকা আছে, সেই ভূমিকাকে ধারণ করছে সে। এই যে দেখবার পার্থক্য, সেটি রয়েই গেছে। এজন্য ছোটবেলা থেকে ভিত্তি গড়ার কাজ করতে হবে। ছোটবেলা থেকে একজন শিশু যখন দেখছে শিক্ষক টাকা নিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হতে বাধ্য করছেন। তখন তারাও যেকোনো মূল্যে সার্টিফিকেট নিয়ে ওই শিক্ষকদেরই পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। এক্ষেত্রে অভিবাবকদের সঙ্গে রাষ্ট্রকেও এই অচলায়তনকে আইন করে বন্ধ করতে হবে।

বহুমাত্রিক.কম: আমরা বহু জাতি ধর্মের মানুষ একত্রে বাস করছি। আমরা বহু যুগ ধরে আত্মত্যাগ করতে শিখেছি। কিন্তু অনেক সংগ্রামের বিনিময়ে যে ভূখ- আমরা পেয়েছি, তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্রটা কী ধরে রাখতে পেরেছি?

পদ্মনাভ অধিকারী: এর উত্তরে এটিই বলতে পারি, যে উদ্দেশ্য নিয়ে আমরা স্বাধীনতা সংগ্রাম করেছিলাম-সেই স্বাধীনতার সুফল ঘরে ঘরে পৌছাতে পারিনি। এর জন্য অনেক প্রতিবন্ধকতা আছে। আমাদের ইংরেজিকে গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। কেউ বাংলায় পড়লে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা হয়।

বহুমাত্রিক.কম: সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান দেখছি আমরা-

পদ্মনাভ অধিকারী: আমরা মুখে বলছি সেক্যুলার। যদি সেক্যুলারই হতাম তবে বাংলাদেশ এখন যাঁরা ফান্ডামেন্টালিজম-এ বিশ্বাস করে তাদের নিয়ে দলভারী করে ক্ষমতায় যেতে চাইতাম না। এবং তাদের উত্তরোত্তর বিকাশের সুযোগ করে দিতাম না। আধিপত্য বজায় রাখার জন্য সাম্প্রদায়িক শক্তিকে নিজেদের করে নিচ্ছি। এটি লজ্জার।

বহুমাত্রিক.কম: জীবনের এই মধ্যগগনে পৌছে আপনার কী আকাঙ্খা আছে-

পদ্মনাভ অধিকারী: আমার নিজের কোনো আকাঙ্খা নেই, ব্যক্তিগত লাভ ক্ষতির কোনো আকাঙ্খা নেই। স্বপ্ন দেখি দেশটি এক অসাম্প্রদায়িক ও মানবীয় মূল্যবোধের দেশ হবে। আমাদের সন্তানেরা অসাম্প্রদায়িক ও মানবিক মূল্যবোধকে আদর্শ করবে এবং তারা সব সময় অসঙ্গতির বিরুদ্ধে লড়বে-এটা আমার চাওয়া।

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।