Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
১৫ কার্তিক ১৪২৭, শুক্রবার ৩০ অক্টোবর ২০২০, ৭:৪০ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

পুলিশের পিটুনিতে কলেজ ছাত্রের দুটি কিডনিই অকেজো


০৮ জুন ২০২০ সোমবার, ১১:৪১  পিএম

কাজী রকিবুল ইসলাম, নিজস্ব প্রতিবেদক

বহুমাত্রিক.কম


পুলিশের পিটুনিতে কলেজ ছাত্রের দুটি কিডনিই অকেজো

যশোর : যশোরে পিছু ধাওয়া করে আটক এবং পুলিশের শারীরিক নির্যাতনে ইমরান হোসেন নামে এক কলেজ ছাত্রের দুটি কিডনি অকেজো হয়ে যাওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। গুরুতর অবস্থায় যশোরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। তার অবস্থা আশংকাজনক বলে জানিয়েছেন চিকিৎসক। ইমরান হোসেন (২১) যশোর সদর উপজেলার শাহাবাজপুর গ্রামের নিকার আলীর ছেলে।

এদিকে বিষয়টি নিয়ে যশোর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ আশরাফ হোসেনের স্মরনাপন্ন হলে তিনি জানিয়েছেন, বিষয়টি আমি শুনেছি, গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে। পুলিশের কেউ এ নির্যাতনে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ইমরান হোসেন জানিয়েছেন, তিনি যশোর সদর উপজেলার কাজী নজরুল ইসলাম ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। গত বুধবার সন্ধ্যার দিকে তিনি সলুয়া বাজার এলাকা থেকে নিজ বাড়ি ফিরছিলেন। এসময় তার সাথে একই এলাকার অপর একটি ছেলে ছিল। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ^বিদ্যালয়ের সামনে আমবটতলা নামক স্থানে পৌঁছালে স্থানীয় সাজিয়ালি ক্যাম্পের পুলিশ সদস্যরা তাদের গতিরোধ করে। এরপর সাথে থাকা ছেলেটির ব্যাগ তল্লাশি শুরু করে। এ দৃশ্য দেখে ভয়ে তিনি (ইমরান) দৌড় দিলে পুলিশ ধাওয়া করে এবং আটক করে তাকে বেধড়ক মারপিট করে।

সেখানে তিনি অজ্ঞান হয়ে গেলে তাকে আমবটতলার একটি ফার্মেসিতে নেয়া হয়। কিছুটা সেবা দেয়ার পর তার জ্ঞান ফেরে। তার আগে পুলিশ কৌশলে তার পকেটে গাঁজা দিয়ে আটকের কথা বলে। এরপর তার বাবাকে (ইমরানের) ফোন দিয়ে তাকে ছাড়তে ২৫ হাজার টাকা দাবি করা হয়। পরে ৬ হাজার টাকা নিয়ে তারা ইমরানকে ছেড়ে দেয়। ছাড়ার সময় বলা হয় মারপিটের ঘটনা কাউকে বললে ফের রিমান্ডে নিয়ে মারপিট করা হবে বলে হুমকি দেয় পুলিশ।

ইমরান আরো বলেছেন, ‘ভয়ে আমি কাউকে কিছু বলিনি। তিনদিন পেটের ব্যাথায় মরে যেতে মনে হয়েছে। সহ্য করতে না পেরে মা-বাবাকে জানাই। এরপর আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পেটের মধ্যে সব ছিড়ে যাচ্ছে। আমারে কোন ওষুধ শান্তি দিতে পারছে না। আমি মনে হয় বাঁচবো না।’

ইমরানের মা বুলবুুলী বেগম বলেন, ‘এভাবে কেউ কাউকে নির্যাতন করতে পারে যে দুটি কিডনিই নষ্ট হয়ে যায়। ছেলেটারে শেষ করে ফেলেছে। ওর চিকিৎসা কিভাবে করাবো। বাঁচবে কি না জানি না। আমি এ ঘটনায় জড়িত পুলিশ সদস্যদের শাস্তি চাই। ইমরানের বাবা নিকার আলী বলেছেন, আমার ছেলেটা লেখাপাড়া করে। এলাকায় খোঁজ নিয়ে দেখেন কোন খারাপ কাজের সাথে নেই সে। অথচ তাকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হলো। ডাক্তার বলেছে তার অবস্থা খুব খারাপ। আমি জড়িত পুলিশ সদস্যদের বিচার চাই। প্রধানমন্ত্রীর কাছে ন্যায় বিচার ভিক্ষা চাই।

ইমরানের চিকিৎসক যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কিডনী রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. উবায়দুল কাদির উজ্জল বলেন, ইমরানের দুটি কিডনির ফাংশন খুবই খারাপ। স্বাভাবিক অবস্থায় কিডনির ক্রিয়েটিনিন ১ দশমিক ৪ থাকার কথা কিন্তু ইমরানের তা ছিল ৮ দশমিক ৮। আজ (সোমবার) এটাও আরো বেড়েছে। দ্রুত তার ডায়ালোসিস শুরু করতে হবে এবং আজই সেটা করা হবে। তবে বলা যাচ্ছে না যে, সে রিকভারি করবে। তার অবস্থায় খুবই শংকটাপন্ন।

এলাকার একটি সূত্র জানিয়েছে, ইজিবাইকে করে ফেরার সময় পুলিশ ইমরানকে ধাওয়া করে। তখন ইমরান দৌড়ে শ্যামনগরের দিকে চলে যায়। সেখানে পিছু ধাওয়া করেন ক্যাম্পের এএসআই শমরেশ, এএসআই শাজদার রহমান, কনেস্টেবল আশরাফ ও ফারুক। তাকে ধরে বেধড়ক পিটানো হয়। একই সাথে পা দিয়ে পুরো শরীর মাড়িয়ে দেয়। ইমরান সহ্য করতে না পেরে পানিতে ঝাপ দেয়। কিন্তু আটক এড়াতে পারেনি। অজ্ঞান হয়ে পড়লে তাকে আমবটতলা পল্লী চিকিৎসক আলমগীর ডাক্তারের কাছে নেয়া হয়। সেখানে নেয়ার পর জ্ঞান ফিরলে তাকে সাজিয়ালি ক্যাম্পের নিয়ে যায়।

সূত্রটি জানিয়েছে, সংবাদ পেয়ে ইমরানের বাবা মা পুলিশের সাথে যোগাযোগ করে। একই সাথে মথুরাপুর গ্রামের ইউপি মেম্বার শাহজাহান আলীও যোগাযোগ করেন। দেনদরবার শেষে ঘুষ নিয়ে ইমরানকে ছেড়ে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে সাজিয়ালি পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ মুন্সি আনিচুর রহমান জানান, ঘটনার দিন সকালে তিনি জরুরি কাজে কোতয়ালি থানায় গিয়েছিলেন। সেখান থেকে রাত ১২টার দিকে ক্যাম্পে ফেরেন। এসে জানতে পারেন এএসআই শমরেশ সাহা, এএসআই সাজদার রহমান চার কনস্টেবল ওই কলেজ ছাত্রকে আটক করেছিলেন। কিন্তু ইমরান অসুস্থ হওয়ায় তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তার বাবাকে ডেকে ছেড়ে দেয়া হয়। তাকে ছাড়তে কোন টাকা পয়সার লেনদেন হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।

এ বিষয়ে এএসআই শমরেশ জানিয়েছেন, ‘ইমরান ইজিবাইকে করে ফিরছিল চৌগাছা থেকে। চেক পোস্টে দাড় করালে সে দৌড়ে পালিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পর ওই গ্রামের রফিকুল (পুলিশের সোর্স) সংবাদ দেয় যে পানিতে একটি ছেলে পড়ে আছে। পরে পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। তার পকেট থেকে ১০ গ্রাম গাঁজা উদ্ধার করা হয়েছে। তাকে কোন মারপিট করা হয়নি। মেম্বার সাহেবের অনুরোধে তাকে রাতে ছেড়ে দেয়া হয়। কোন টাকা পয়সা নেয়া হয়নি।’

এদিকে পুলিশ সুপার মোহাম্মাদ আশরাফ হোসেন দাবি করেছেন, ‘বিষয়টি জানার পর তিনি গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত শুরু করিয়েছেন। তাছাড়া ওই ছেলে অপরাধ কর্মকান্ডের সাথে জড়িত কি-না তাও খোঁজ নেয়া হচ্ছে। তবে পুলিশের কেউ এ নির্যাতনে জড়িত হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।

BRTA
Bay Leaf Premium Tea

অসঙ্গতি প্রতিদিন -এর সর্বশেষ