Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
৭ কার্তিক ১৪২৬, বুধবার ২৩ অক্টোবর ২০১৯, ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

ধূলিমলিন তবু ‘উন্নত শির’ ইতিহাসের মহানায়ক  


২০ মে ২০১৯ সোমবার, ০৪:০৯  এএম

আশরাফুল ইসলাম

বহুমাত্রিক.কম


ধূলিমলিন তবু ‘উন্নত শির’ ইতিহাসের মহানায়ক   

সাটুরিয়া(মানিকগঞ্জ) থেকে ফিরে: মানিকগঞ্জের ঐতিহাসিক এক জনপদ বালিয়াটি । শতাব্দি পেরিয়ে বিশাল রাজপ্রাসাদ সগৌরবে যেমন এ জনপদের ঐশ্বর্য জানান দিচ্ছে তেমনি এখানকার অধিবাসীদের কর্মনিষ্ট সংগ্রামী জীবন এই সম্বৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে যুগের পর যুগ। বহু বিদ্যায়তন-প্রশস্ত খেলার মাঠ, প্রবাহমান মায়াময়ী ছোট নদী, প্রকাণ্ড বৃক্ষের সারি, বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ আর হাসিভরা মুখের সেই সোনার মানুষেরা এই ঐশ্বর্যের আধার। শহর থেকে দূরগ্রামের এই মানুষদের মাঝে ইতিহাসের প্রতি দুর্নিবার আকর্ষণ। সামনে এগিয়ে যাওয়ার নব আহ্বানেও পেছনকে তারা ভোলেন না। রাজপ্রসাদের সঙ্গে তাই এ জনপদে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে ইতিহাসের এক মহানায়কের মূর্তি!

অখণ্ড ভারতবর্ষের বক্ষ বিদীর্ণ করে ১৯৪৭-এ ‘দেশভাগ’ নামক মর্মবেদনা আর হাহাকার নিয়ে বালিয়াটির অধিবাসীরা আজও পরম ভক্তিতে অবনত হন এক মহানায়কের সামনে। যিনি দু’শো বছরের পরাধীন ভারতের ত্রাতা দেশনায়ক  নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। খণ্ডিত ভারতে পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রে আরেক রক্তাক্ত সংগ্রামে জন্ম নেওয়া বাংলাদেশের নাগরিকরা যে নেতাজিকে ভোলেননি, বালিয়াটি তা স্পষ্ট জানান দিচ্ছে। বাংলাদেশের বহু জনপদে আজও নন্দিত নেতাজি, তাকে বন্দনার বহু ইতিহাস হয়ত রয়ে গেছে অজ্ঞাতেই।

মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটির তরুণ নেতাজি অনুরাগী আল আমিন খোঁজ দেন তার গ্রামে নেতাজির মূর্তির অস্তিত্ব । ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবণিতা এই মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে তাদের ভক্তি অর্পণ করেন। এই মূর্তি দর্শনে গত ১৮ মার্চ (২০১৯) সহকর্মী মাহেনূর মোস্তারিকে নিয়ে বালিয়াটি যাত্রা।

রাজধানী ঢাকা থেকে ৩৫ কিলোমিটারের পথ বালিয়াটি। সেখানে পৌছাতে পথে পড়ে ইতিহাসখ্যাত ধামরাই, একসময় যার নাম ছিলো ধর্মরাজিকা। জেলা মানিকগঞ্জ দু’দিক থেকে দুই বড় নদী পদ্মা-যমুনা বিধৌত অঞ্চল। বালিয়াটি মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার প্রত্যন্ত এক গ্রাম।  বিখ্যাত বালিয়াটি প্রাসাদ বা জমিদারবাড়ি দেখতে দেশ-বিদেশের ভ্রমণ পিপাসুরা এখানে ভিড় জমান। আঠারো শতকের মাঝামাঝি লবণ বণিক গোবিন্দ রাম সাহা এই প্রসাদের গোড়াপত্তন করেন। পরবর্তীকালে এর পরিসর ও শ্রী বৃদ্ধি করেন তাঁর উত্তরসূরিরা। 

ছোট নদী আলেকের তীরে গড়ে উঠা জনপদ বালিয়াটিতে আরও বহু ভগ্নপ্রসাদের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। নেতাজি মূর্তির সন্ধানে বেরিয়ে সুযোগ হয় এখানকার সুপ্রাচীন সভ্যতার বহু নিদর্শন দেখার। বাস থেকে নেমে ভ্যানে বেড়িয়ে পড়ি দেশনায়কের মূর্তির সন্ধানে। গন্তব্য জানালে ভ্যানচালক ভুলে আমাদের নিয়ে চলেন বালিয়াটি রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমে। স্থানীয় জমিদারদের বদান্যতায় এই সেবাশ্রম গড়ে উঠে ১৯১০ সালে। সেবাশ্রমের একজন কর্মী আমাদের জানালেন বালিয়াটি পুরাতন বাজার কালীমন্দিরের পাশে রয়েছে নেতাজির মূর্তি। আমরা রওনা হই সেদিকে। ছোটনদী আলেক’র পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা পথে মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে পৌছে যাই কাঙ্খিত মন্দিরে। মন্দিরের পাশেই স্থির দাঁড়িয়ে মহানায়কের মলিন মূর্তি। চত্বরে প্রকাণ্ড বটবৃক্ষের ছায়ায় গোটা অঙ্গন। দক্ষিণে বিশাল দীঘি। দীঘির সুশীতল ‘দক্ষিণবায়ু’ এখানে আগতদের প্রাণ ভরিয়ে দেয়।

খণ্ডিত ভারতে ‘অন্যদেশে’র মাটিতে নেতাজির ধূলিমলিন মূর্তি! নতুন প্রজন্মের কত না শিশু-কিশোরের দল নিত্যদিন এ পথে যেতে যেতে প্রশ্ন ছোঁড়ে দেয়, কার মূর্তি এটি? কে এই ব্যক্তি? কখনো হয়ত ওদের প্রশ্নের উত্তর মেলে, কখনো বা মেলে না! হৈ চৈ করে এক সময় তারা হয়ত ফিরে যায় খেলার মাঠে কিংবা শ্রেণিকক্ষে। সামরিক পেশাকে শির উঁচু করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে মহানায়কের মূর্তি। শ্রদ্ধায়-আবেগে স্পর্শ করি ধূলিমলিন রূপের নেতাজিকে, সিক্ত করি চুম্বনে। তাঁর পৌরষদীপ্ত  এই ব্যক্তিত্বের কাছেই তো অবনত হয়েছিলো বিশ্ব! তাঁর তেজোদীপ্ত আহ্বানেই তো হাজারে হাজারে তরুণ-তরুণীরা শামিল হয়েছিলো যুদ্ধের ময়দানে জননী জন্মভূমিকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে।

এক স্থানীয় জানালেন মন্দিরের পুরোহিতই জানাতে পারেন মূর্তির আদ্যোপান্ত। অনতিদূরে পাওয়া গেলো পুরোহিতের বাড়ি। খোঁজ করতেই বেরিয়ে এলেন স্বয়ং পুরোহিত প্রসাদ চক্রবর্তী। সম্ভাষণ জানিয়ে আমাদের নিয়ে চললেন মন্দির চত্বরে। তাঁর কাছে বহু জিজ্ঞাসা। বিস্ময়ের সঙ্গে জানালেন এই প্রথম কেউ এসে মূর্তির বিষয়ে এতো কথা জানতে চাইছেন!

আশৈশব নেতাজি অনুরাগী প্রসাদ চক্রবর্তী। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি এই মূর্তির দেখভাল করছেন। জানালেন নেতাজি ভক্ত স্থানীয় প্রমোদ চন্দ্র কর্মকার এই মূর্তির নির্মাতা।

‘দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গে যখন ক্রমশঃ বিস্মৃতির অতলে হারিয়ে যাচ্ছিলেন অখণ্ড ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামী মহানায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, তখন প্রমোদ কর্মকার নিজের অর্থে সিমেন্ট দিয়ে তৈরি করেন তাঁর স্বপ্নের সিংহপুরুষকে। নিজের বাড়ির পাশেই স্থাপন করেন সামরিক পোশাকের নেতাজির মূর্তি। প্রমোদ কর্মকারের প্রয়াণের পর অনেকদিন সেখানেই অযত্নে পড়ে ছিলো মূর্তিটি’-বলেন প্রসাদ চক্রবর্তী।

কিন্তু আবার পটপরিবর্তন। এলো ১৯৭১। পাকিস্তান শাসন-শোষণের বিরুদ্ধের বাঙালির রক্তাক্ত প্রতিরোধ। চললো সীমাহীন বর্বরতা। গণহত্যা-ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগের মাঝে সন্ত্রস্ত লাখো মানুষ ছুটছে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে। স্থানীয়রা ভাবলেন নেতাজির মূর্তি দেখলে পুরো গ্রাম জ্বালিয়ে দেবে সামরিক জান্তারা।

প্রসাদ চক্রবর্তীর ভাষ্যে, স্থানীয়রা ভাবলেন আপাততঃ মূর্তিটি পুকুরের পানিতে ফেলে রাখা হোক। সে অনুযায়ী ‘গ্রাম বাঁচাতে’ মূর্তিটির ঠাঁই হয় পুকুরে। মুক্তিযুদ্ধের স্বাধীন বাংলাদেশে চাপা পড়ে যায় পুকুরে ডুবিয়ে রাখা নেতাজির মূর্তির কথা। পেরিয়ে যায় আরও অনেক বছর। একবার পুকুরটি শুকিয়ে খনন করতে গেলে মাটির নীচ থেকে বেরিয়ে আসে নেতাজির মূর্তি। স্থানীয়রা ভারী এই মূর্তিটিকে এনে স্থাপন করেন বালিয়াটি পুরাতন বাজার কালীমন্দিরের চত্বরে।

পুরোহিত প্রসাদ চক্রবর্তী বলেন, ‘অর্থাভাবে মূর্তিটির প্রকৃত আকারদান করা সম্ভব হচ্ছে না। উনার কল্পনা ছিলো ব্রোঞ্জ কালার করে মূর্তিটি সুন্দর করে রাখবেন। কিন্তু তখন দেশের পরিস্থিতি ভালো ছিলো না, একটা কমিউনাল ভাব ছিল। জীবদ্দশায় তিনি পারেননি।’

‘মাটির নীচ থেকে তুলে আনতে মূর্তিটির নাকের পাশে একটু ক্ষতিগ্রস্তও হয়। কেউ চুরি করে মূর্তিটি নিয়ে যেতে পারে এই ভয়ে আমরা এটি মন্দিরের ভেতরে এনে রাখি। পরে আমরা কিছু টাকা উঠিয়ে পাড়ার ক্লাবের কিছু ছেলেদের সহযোগিতায় নেতাজির মূর্তিটিকে মন্দিরের পাশে স্থাপন করি। আমরা চেষ্টা করেছিলাম মূর্তিটির উপরে একটি ছাউনী দিয়ে চারপাশ পাকা করে নেতাজির প্রকৃত ছবি দেখে মূর্তিটিকে সঠিকভাবে রাখার। স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যানের কাছেও আমরা দাবি করেছিলাম সহযোগিতা করতে, কিন্তু সেই সহযোগিতা আমরা পাইনি। আমাদের নিজেদেরও সেই সামর্থ্য হয়নি এর সংস্কারের’-হতাশাজড়িত কণ্ঠে বলেন প্রসাদ চক্রবর্তী।

তিনি বলেন, ‘তৎকালে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ তো দূরের ব্যাপার, কথা বলাও অনেক কঠিন ছিলো। নেতাজি যে সাহসের সঙ্গে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়েছিলেন তা আমাদের বিরাট অনুপ্রেরণা। উনার অবদান শুধু ভারত স্বাধীনেই নয়, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধেও তাঁর আদর্শ প্রেরণা যুগিয়েছিলো। আমি নিজেও মুক্তিযুদ্ধের সময় পতকা তুলে ধরেছিলাম। নেতাজিই ছিলেন আমার প্রেরণা। উনার অবদান আমরা স্বীকার করে নিই‘

মূর্তিটির সংস্কারে নেতাজি অনুরাগীদের এগিয়ে আসার আকুতিও এই পুরোহিতের । তিনি বলেন, ‘মূর্তিটির চোখের মনি, মাথায় ক্যাপসহ অন্যান্য অংশ নেতাজির যুদ্ধের সময়কার ছবি দেখে এর আসল রূপ ফুটিয়ে তোলা জরুরি। মূর্তিটির সংস্কারে কেউ এগিয়ে এলে আমরা সাধুবাদ জানাব।’   

সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ফিরে যাওয়ার আগে মূর্তি সংস্কারে প্রসাদ চক্রবর্তীকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ঢাকার বাসে চেপে বসি। পেছনে পড়ে থাকে বালিয়াটির স্মৃতি, সেই আলেক নদী; বটের ছায়া, ভগ্ন প্রাসাদের কান্না আর ইতিহাসের মহানায়কের মলিন মুখচ্ছবি।

লেখক: নেতাজি গবেষক ও প্রধান সম্পাদক-বহুমাত্রিক ডটকম

ইমেইল: [email protected] 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।