Bahumatrik :: বহুমাত্রিক
 
২৬ আষাঢ় ১৪২৭, শনিবার ১১ জুলাই ২০২০, ১:১৮ পূর্বাহ্ণ
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর

‘ততদিন বাঁচতে পারবো তো আমরা’


২২ জুন ২০২০ সোমবার, ০১:৪২  পিএম

মাকামে মাহমুদ চৌধুরী

বহুমাত্রিক.কম


‘ততদিন বাঁচতে পারবো তো আমরা’

‘রাত থম থম স্তব্ধ, ঘোর-ঘোর-আন্ধার,
নিঃশ্বাস ফেলি, তাও শোনা যায়, নাই কোথা সাড়া কার।`  (পল্লী জননী-জসীম উদ্‌দীন)  

শীতের তীব্রতায় আমলকি বন যেমন পাতা হারানোর ভয়ে থর থর করে কাঁপে, নোভেল করোনা ভাইরাসের ধ্বংস লীলা পৃথিবীকে সেভাবেই যেন কাঁপাচ্ছে। সেই কাপুনির ঝড়ো দমকা হাওয়ার ঝটকায় হারিয়ে যাচ্ছে মানুষ, বিলীন হচ্ছে মানব সম্পদ, ফুরিয়ে যাচ্ছে জীবনের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়।

এই ভয়াল পরিস্থিতি চলতে থাকলে ধীরে ধীরে পৃথিবী হয়তো একসময় মানব শুন্য হয়ে যাবে। জসীম উদ্‌দীনের পল্লী জননী কবিতায় উল্লেখিত রূপকথার সেই নিঝুম অন্ধকারের মতো করোনার এই ভয়াল অন্ধকারে কারো সাড়া পাওয়াটাই যেন দায়। প্রফুল্ল নিঃশ্বাস ফেলানোর সেই তেজস্বীয়তাও আর নেই। ফেললেই আছে মহাবিপদ। ভ্রমরের ফুলে ফুলে ঘুরে মধু আহরণের মতো করোনার জীবানু আহরিত করে যাবে নিত্য নতুন পোষকে।

আক্রান্ত করবে অচেতনভাবে, সহজে বোঝার সাধ্যটিও আর নেই। পাহাড়ের কোল ঘেঁষে পতিত ঝরনার স্রোত কালের বিবর্তনে যেমন গতিপথ পরিবর্তন করে রুদ্ধ হয়ে যায় তেমনি ঘর বন্দি করে আমাদের রুদ্ধ জীবনের গতিপথ রেখার পরিবর্তন আনতে কন্টকময় সিংহাসন ও সৈন্য নিয়ে সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটাতে চায় উহান থেকে ছড়িয়ে পড়া নোভেল করোনা ভাইরাস। যার নিত্য নতুন রূপে ও লক্ষণে পুরো বিশ্ব আজ স্তম্ভিত, আতংকিত এবং বিপর্যস্ত।

করোনার ভাইরাসের এ আলো আধারির খেলায় পৃথিবীর জীবন যেন নিভু নিভু প্রদ্বীপের মতো বাতাসের সাথে নিরন্তর লড়েই চলেছে। যেকোন মুহূর্তে ফুরিয়ে যেতে পারে আয়ু। সেই নিভুয়মান প্রদ্বীপের আলোর দ্বীপ্তি বাড়িয়ে তোলায় বিজ্ঞানীদের শত চেষ্টারও কমতি নেই। চেষ্টা চলছে এবং চলবেই। পিছনে ফিরে তাকানোর সুযোগ নেই। হারতেই হবে করোনা ভাইরাসকে। তাই এখন শুধু একটাই কামনা, সুস্থ হয়ে ওঠো পৃথিবী।

ফিরে আসো তোমার আপন রূপে, আপন মহিমায়। তবেই ফিরে পাবো আমাদের স্বাভাবিক জীবন। ঘোঁচাতে পারবো করোনার কালো অন্ধকার। বাঁচতে শিখবো সুস্থ সবল নতুনভাবে। তবেই ছোট জানালার দৃষ্টির বন্দি শিখল ভেদ করে বেরিয়ে পড়বো আবার, নিজের গন্তব্যের সন্ধানে। ফিরে পাবো সেই সোনালী দিনগুলো।

যাইহোক একদিন ভ্যাক্সিন আবিষ্কার হবে। পৃথিবীর বেঁকে যাওয়া মেরুদন্ড আবার সোজা হবে। জরাজীর্ণ সব ঝেড়ে, দূরে ঠেলে ভাইরাসের শিকল, ফিরে আনবে পৃথিবী তার সজীবতাকে। তবুও ঘুরে ফিরে অজানা সংশয়ে সেই একটাই প্রশ্নই ফিরে আসছে বারবার, আঘাত হানছে মস্তিষ্কের ছোট কোটরে বারংবার ‘ততদিন বাঁচতে পারবো তো আমরা!’ ব্যক্তি থেকে পরিবার, সমাজ থেকে রাষ্ট্র, দেশ থেকে বিশ্ব সবখানেই করোনার আঘাত পৃথিবীকে করেছে বিপর্যস্ত। রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি কোন কিছু তার হাত থেকে বাদ পড়েনি। সবকিছুকে আবার ঢেলে সাজাতে বাধ্য করছে। করোনার সেই কালো হাত থেকে বাদ যায়নি আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাও।

করোনা ভাইরাস অর্থনীতি এবং স্বাস্থ্যখাতের পরে সব থেকে ক্ষতি মনে হয় শিক্ষাব্যবস্থাকেই করেছে। তিন মাসেরও অধিক সময় বাসায় বন্দি থাকতে থাকতে ক্লান্ত-শ্রান্ত শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি আরেকটি শ্রেণীর মানুষ বেশ কষ্টে রয়েছে, উচ্চমহলের দৃষ্টি যাদের উপর নেই বললেই চলে। বলছি সেই বেসরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষক কর্মচারীদের কথা। করোনা পরিস্থিতিতে টেলিভিশনে যাদের দুঃখ কষ্ট নিয়ে মাঝখানে কয়েকদিন  প্রতিবেদন দেখানো হলেও রংধনুর মতো কোথায় যেন তা আজ বিলীন হয়ে গেছে। আজ স্মরণ করছি তাদের দুঃখ-কষ্টের কথা।

বর্তমানে বাংলাদেশে বেসরকারি স্কুল-কলেজে প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষক এবং অর্ধলক্ষাধিক কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। করোনা ভাইরাস প্রাদুর্ভাবে সাধারণ ছুটি এবং লক ডাউন ঘোষণার ফলে বেসরকারি বিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষক এবং কর্মচারীরা বেশিরভাগই বেতন না পাওয়ায় নানাবিধ সমস্যায় পড়েছেন। তারা কখন বেতন পাবেন, আদৌ পাবেন কিনা এ বিষয়ে তারা সন্দিহান। প্রতিনিয়ত পত্রিকাগুলোতে খবর পাওয়া যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জায়গায় স্কুল-কলেজের শিক্ষক কর্মচারীগণ মার্চ থেকে অদ্যোবধি বেতন পাচ্ছেন না এবং স্কুল- কলেজের কার্যক্রম শুরু না হওয়া পর্যন্ত তাদের কোনো অর্থ প্রদান করা হবে না।  

বেসরকারি বিদ্যালয়গুলো চলে মূলত শিক্ষার্থীদের বেতনের মাধ্যমে পরিশোধিত অর্থের বিনিময়ে এবং যেই অর্থের নির্ধারিত অংশ থেকেই কর্মরত কর্মকর্তা কর্মচারীদের সবার বেতন পরিশোধ করা হয়। শিক্ষামন্ত্রণালয়ের আদেশে স্কুল কলেজ বন্ধ রাখার কারনে বিদ্যালয় গুলোর কার্যক্রম না চলার ফলে শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের নির্ধারিত বেতন ফি কেনোই বা পরিশোধ করবে এবং বেতন পরিশোধ না করলে শিক্ষক ও কর্মচারীরাও কিভাবে বেতন পাবে এ বিষয়টিও ভাবনার বিষয়, তবে সেই ভাবনা সরকারী উচ্চ মহলের এখনো কেন যেন নেই।

এক পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারলাম বাংলাদেশ স্কুল সমিতির সভাপতি মোঃ নজরুল ইসলাম রনি বলেন, “বেসরকারী স্কুল ও কলেজর পাশাপাশি কিন্ডারগার্টেন স্কুল শিক্ষকদের পরিস্থিতি আরও খারাপ, যারা কয়েক মাস ধরে বেতন পাননি এবং তাদের কোনো সমিতি না থাকায় প্রতিবাদও করতে পারেনি।“(তথ্যসূত্রঃ-ইন্টারনেট)

আরেকটি জাতীয় পত্রিকার কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের এক শিক্ষিকার কষ্টকর অভিজ্ঞতার বর্ণনা পেলাম, বেতন না পাওয়ায় যিনি, তার চার সদস্যের পরিবার পরিচালনার জন্য একরকম যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, “আমি এবং আমার স্বামী যে সামান্য বেতন পাই তার সবটুকু চার সদস্যের সংসার চালাতে ব্যয় করেছি, সে হিসাবে আমার কোন সঞ্চয়ও নেই। এখন, আমরা কীভাবে খাবারের ব্যবস্থা করতে পারি বা বাড়ি ভাড়া কীভাবে দিতে হয় তা আমরা জানি না। আমাদের এসব কথা শোনারও কেউ নেই। আমরা এখন নিরুপায়।“

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থীদের পরিশোধিত বেতন দিয়েই মূলত শিক্ষক এবং কর্মচারীদের বেতন দেয়া হয়। এখানে অধিদপ্তরের করার কিছুই থাকে না। তবে, দেশের যে কোনো নাগরিককে সরকার যেকোনো সময়ে যেকোনো অবস্থায় মানবিক সহায়তা দিতে সাহায্যের সক্ষমতা রাখে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উচিত শিক্ষকদের দুর্ভোগের বিষয়ে চিন্তা করা এবং তাদের জন্য আর্থিক সহায়তা প্রদান করা।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলি সেপ্টেম্বর অবধি বন্ধ থাকলে শিক্ষা খাতের জন্য এটি দুর্ভাগ্য হতে পারে। সরকারী সুবিধাভোগী তালিকার বাইরে থাকা শিক্ষক এবং অন্যান্য পেশাদারদের তাদের পরিবার-পরিজনদের কথা চিন্তা করে বেতন প্রদানের ব্যবস্থা করা অতীব জরুরী। এই সময়োপযোগী সমর্থন সমাজে সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের প্রয়োজনে তাদের জন্য আশীর্বাদ বয়ে নিয়ে আসতে পারে।

পরিশেষে আবার স্মরণ করছি আমাদের সেই গরীব দুঃখী খেটে খাওয়া মানুষদের, কবির কবিতার কয়েকটি লাইন দিয়ে যদিও তাদের মানবেতর জীবন ক্ষুদ্র কালির রং দিয়ে চিত্রায়িত করা কঠিন। তবুও বলি-

‘বাড়ি তো নয় পাখির বাসা ভেন্নাপাতার ছানি,
একটু খানি বৃষ্টি হলেই গড়িয়ে পড়ে পানি।
পেটটি ভরে পায় না খেতে বুকের ক-খান হাড়,
সাক্ষি দিচ্ছে অনাহারে কদিন গেছে তার।’

আত্মস্বার্থ বিসর্জন দিয়ে সরকার এবং বিত্ত্ববানেরা তাদের কল্যাণে এগিয়ে আসুক। মানবতা জাগ্রত হোক, মনুষ্যত্বের জয় হোক।

লেখক: শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। 

বহুমাত্রিক.কম এ প্রকাশিত/প্রচারিত সংবাদ, তথ্য, ছবি, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট বিনা অনুমতিতে ব্যবহার বেআইনি।